ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

চারপাশে যখন তোলপাড় চলছে “নারী উন্নযন নীতিমালা” নিয়ে আমারও জানা ছিল না কি আছে এই নীতিমালায়। আর কতটুকুইবা ইসলাম ধর্মের সাথে বৈপরিত্য তা খুজতে গিয়েই দেখতে হলো মুসলিম পারিবারিক আইন, সম্পত্তির উত্তরাধিকার আইন গুলো। আমি আসলে জানিনা কতটুকু বাস্তবায়ন হবে, আর কতটুকুই বা লাভবান হবেন আমাদের নারীরা। গতকাল সকালে অফিসে আসার পথে বাসে উঠার সময় এক ভদ্র লোকের আচরণ দেখে অবাক হলাম। …”একজন ভদ্র মহিলাকে তিনি বলছেন-এখনতো আপনাদের অধিকার ফিরা পাইছেন, একটু ঠেলাঠেলি করে উঠেন, সমান অধিকার।”
এই যদি হয় বাহিরের অবস্থা, তাহলে ঘরের ভিতরে কি হবে!!

নারী উন্নযন নীতিমালা সম্পূর্ণ জানার জন্য bdnews24 ব্লগের পাঠকদরে জন্য খসড়াটি তুলে ধরছি। ) -হাসান ইকবাল

জাতীয় নারী উন্নযন নীতিমালা

পটভূমি
বাংলাদেশের নারী যুগ যুগ ধরে শোষিত অবহেলিত হয়ে আসছে। পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থায় ধর্মীয় গোঁড়ামী, সামাজিক কুসংস্কার, কুপমন্ডুকতা, নিপীড়ন ও বৈষম্যের বেড়াজালে তাকে সর্বদা রাখা হয়েছে অবদমিত। তার মেধা শ্রমশক্তিকে শুধুমাত্র সাংসারিক কাজেই ব্যয় করা হয়েছে। সমাজ ও দেশ গঠন কাজে তাকে কখনও সম্পৃক্ত করা হয়নি। নারী আন্দোলনের অগ্রদূত মহীয়সী বেগম রোকেয়া নারী জাগরণের আহবান জানিয়ে বলেছিলেন তোমাদের কন্যাগুলিকে শিক্ষা দিয়া ছাড়িয়া দাও, তাহারা নিজেরাই নিজেদের অন্নের সংস্থান করুক।” তাঁর এ আহ্বানে নারীর অধিকার অর্জনের পন্থা সম্পর্কে সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা রয়েছে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এ দেশের নারী জাগরণে সাড়া পড়েছিল সাধারনতঃ শিক্ষা গ্রহণকে কেন্দ্র করে। এছাড়া, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে নারী তার অধিকার আদায়ে সচেতন হয়ে ওঠে। পাকিস্তান আমলে ভাষা আন্দোলন ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও স্বাধিকার আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য।

১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযদ্ধের পর বাংলাদেশ দীর্ঘ প্রত্যাশিত স্বাধীনতা লাভ করে। এ স্বাধীনতা যুদ্ধে পুরুষের পাশাপাশি নারীও অসামান্য অবদান রাখে। যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়াও বিভিন্নভাবে সহায়তা প্রদান এবং স্বামী ও সন্তানকে মুক্তিযুদ্ধে পাঠিয়ে আমাদের মায়েরা এক বিশাল দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের নিদর্শন রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্থানী সেনাবাহিনীর হাতে আমাদের লক্ষাধিক মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই জঘন্য অপরাধ কখনই ভুলবার নয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে নারী আত্মনির্ভরশীল হতে সচেতন হয়ে ওঠে। শিক্ষা গ্রহণের, কর্মসংস্থানের প্রত্যাশায় নারী সমাজের মাঝে বিপুল সাড়া জাগে। গ্রামে নিরক্ষর নারী সমাজের মাঝেও কাজের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হবার আগ্রহ জাগে। জাতীয় উৎপাদনে নারীর অংশগ্রহণ আবশ্যক হয়ে ওঠে। নারী উন্নয়নে সরকারী ও বেসরকারীভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।

১৯৭৫ সনের ১৫ই আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবর রহমানের শাহাদাৎ বরণের পর বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় অগণতান্ত্রিক স্বৈরশাসন জেঁকে বসে। গত ২১ বছর যাবৎ দেশে গণতন্ত্র না থাকায় জনগণের দু:খ দারিদ্র্য যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি নারীর উন্নয়নের বিষয়টিও কার্যতঃ অবহেলিত ছিল। দেশের প্রচলিত আইন কানুনকে উপেক্ষা করে নারী নির্যাতন ও নারীর প্রতি অবহেলার মাত্রা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। অবশ্য এ সময়ে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় নারী সংগঠনগুলির আন্দোলনের ভূমিকাও ছিল অগ্রণী। বেসরকারি সাহায্য সংস্থাগুলিও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নারীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন কর্মসূচি অব্যাহত রাখে। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে রাজনৈতিক দলগুলির পাশাপাশি নারী সংগঠনগুলিও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে। ফলশ্রুতিতে নিজেদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁরা সচেতন হয়ে ওঠে। এতে করে দেশে নারী উন্নয়নে এক বিরাট সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। বর্তমান সরকার দেশের বৃহত্তর নারী সমাজের ভাগ্যোন্নয়ন ঘটিয়ে তাদেরকে পশ্চাৎপদ অবস্থা থেকে তুলে আনতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে নারীর সার্বিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

নারীর মানবাধিকার ও সংবিধান

১৯৭২ সনে নবগঠিত রাষ্ট্র বাংলাদেশের সংবিধান রচিত হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় রচিত এ সংবিধানে নারীর মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। সংবিধানে ২৭ ধারায় উল্লেখ আছে যে, “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান ও আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।” ২৮(১) ধারায় রয়েছে, কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবে না”। ২৮(২) ধারায় আছে, “রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার লাভ করিবেন”। ২৮(৩)-এ আছে,“কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ নারী-পুরুষভেদ বা বিশ্রামের কারণে জনসাধারনের কোন বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোন নাগরিককে কোনরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না”। ২৮(৪)-এ উল্লেখ আছে যে,“নারী বা শিশুদের অনূকুলে কিংবা নাগরিকদের কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না”। ২৯(১) এ রয়েছে ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে’ সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে’। ২৯(২) এ আছে “ কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ নারী-পুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মের নিয়োগ বা পদলাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না”। ৬৫ (৩) ধারা নারীর জন্য জাতীয় সংসদে আসন সংরক্ষিত হয়েছে এবং ধারার অধীনে স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান সমূহে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে।

বিশ্ব প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সত্তর দশকের প্রথম ভাগ থেকেই তৎকালীন বঙ্গবন্ধু সরকার নারী উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ১৯৭৫ সনে মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব নারী সম্মেলনে বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। ফলশ্রুতিতে দেশের বাইরে নারী উন্নয়নের যে আন্দোলন চলছিল তার মূল স্রোতধারায় বাংলাদেশ যুক্ত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে নারী সমাজ উন্নয়নের যে অবস্থানে রয়েছে তার ভিত্তি এই উদ্যোগের ফলে রচিত হয়। জাতিসংঘ নারীর রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালকে ‘নারী বর্ষ হিসাবে ঘোষনা করে। ১৯৭৫ সালে প্রথম বিশ্ব নারী সম্মেলনে ১৯৭৬-১৯৮৫ সালকে নারী দশক হিসেবে ঘোষনা করা হয়। নারী দশকের মূল লক্ষ্য ছিল সমতা, উন্নয়ন ও শান্তি। ১৯৮০ সালে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় নারী সম্মেলন। এতে ১৯৭৬-৮৫ পর্বের নারী দশকের প্রথম পাঁচ বছরের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয় এবং নারী দশকের লক্ষ্যের আওতায় আরও তিনটি লক্ষ্য-শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান চিহ্নিত হয়। ১৯৮৫ সালে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবীতে তৃতীয় বিশ্ব নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং নারী উন্নয়নের জন্য সমতা, উন্নয়ন ও শান্তির ভিত্তিতে অগ্রমূখী কৌশল গৃহীত হয়। চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনের প্রস্তুতি পর্বে ১৯৯৪ সালে জাকার্তায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় নারী উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে জাকার্তা ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনা গৃহীত হয়। এ ঘোষনায় বলা হয় ক্ষমতা বন্টন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারী পুরুষের মাঝে তীব্র অসমতা বিদ্যমান। এই অসমতা ও সীমাবদ্ধতা নিরসনের উদ্দেশ্যে

সরকারসমূহকে উদ্যোগ নিতে তাগিদ দেয়া হয়। কমনওয়েলথ ১৯৯৫ সালে জেন্ডার ও উন্নয়ন কর্ম-পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। সার্ক দেশসমূহও নারী উন্নয়নের জন্য কর্ম-পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ১৯৯৫ সালের ৪-১৫ সেপ্টেম্বর বেইজিং-এর চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে বেইজিং ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনা গৃহীত হয়। বেইজিং কর্মপরিকল্পনা নারী উন্নয়নে ১২টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে। ক্ষেত্রগুলো হলো-নারীর ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য; শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অসম সুযোগ; স্বাস্থ্য সেবার অসম সুযোগ; নারী নির্যাতন; সশস্ত্র সংঘর্ষের শিকার নারী; অর্থনৈতিক সম্পদে নারীর সীমিত অধিকার; সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ক্ষমতায় অংশগ্রহণে অসমতা; নারী উন্নয়নে অপর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো; নারীর মানবাধিকার লংঘন; গণমাধ্যমে নারীর নেতিবাচক প্রতিফলন এবং অপ্রতুল অংশগ্রহণ; পরিবেশ সংরক্ষণে ও প্রাকৃতিক সম্পদে নারীর সীমিত অধিকার এবং মেয়ে শিশুর প্রতি বৈষম্য। সকল আন্তর্জাতিক ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাংলাদেশ অঙ্গীকারাবদ্ধ।
১৯৯২ সালে রিও-ডিজেনেরিওতে অনুষ্ঠিত ধরিত্রী সম্মেলনে গৃহীত পরিবেশ ও উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা, ১৯৯৩ সালে ভিয়েতনাম মানবাধিকার ঘোষণা, ১৯৯৪ সালে কায়রোতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গৃহীত জনসংখ্যা ও উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা এবং ১৯৯৫ সালে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব সামাজিক শীর্ষ সম্মেলনে গৃহীত কর্মপরিকল্পনায় নারী ও শিশু উন্নয়ন ও তাদের অধিকারের উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এ সকল সনদ ও কর্মপরিকল্পনায় বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষর এবং এগুলোর বাস্তবায়নে অঙ্গীকার করেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে শিশুদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৯৮৯ সালে গৃহীত শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরকৃত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।

নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ সনদ

রাষ্ট্র, অর্থনীতি, পরিবার ও সমাজ জীবনের সকল ক্ষেত্রে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে ডিসেম্বর, ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও) গৃহীত হয় এবং ৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৮১ সালে কার্যকর হয়। নারীর জন্য আন্তর্জাতিক বিল অব রাইটস বলে চিহ্নিত এ দলিল নারী অধিকার সংরক্ষণের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ মানদন্ড বলে বিবেচিত। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ তিনটি ধারায় [২, ১৩(ক), ১৬ (ক), ও (চ)] সংরক্ষণসহ এ সনদ অনুস্বাক্ষর করে।

বাংলাদেশে নারীর অবস্থা

  • উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নারী

    প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৩-৭৮) স্বাধীনতা যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থ, ছিন্নমূল নারীর পুনর্বাসনের লক্ষ্যে কর্মসূচী গৃহীত হয়। নারী শিক্ষা, স্বস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, সমাজকল্যাণমূলক বিভিন্ন আর্থিক স্বাবলম্বীতা অর্জনের জন্য প্রথমবারের মত নারী উন্নয়ন বিষয়টি গুরুত্ব পায় ও নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে বিদেশী সাহায্যের মাধ্যমে কর্মসূচী গ্রহণ ও অর্থ বরাদ্দ করা হয়। ১৯৭২ সনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক-বাহিনীর হাতে সম্ভ্রম হারানো মা-বোনদের আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণীয় করে রাখার জন্য বীরাঙ্গনা উপাধিতে ভূষিত করেন। যে সব পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর অত্যাচারের কবল থেকে মুক্ত করা গিয়েছিল তাঁদের পুনর্বাসনের জন্য বঙ্গবন্ধু সরকার ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করেছিল। শহীদ পরিবারের সদস্যদের জন্য বিশেষতঃ শহীদের স্ত্রী ও কন্যাদের জন্য চাকুরী ও ভাতার ব্যবস্থা করেছিল বঙ্গবন্ধুর সরকার। বঙ্গবন্ধুর সরকার ১৯৭২ সনে বাংলাদেশ নারী পুনর্বাসন বোর্ড প্রতিষ্ঠা করে। এই বোর্ডের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম ছিল: (ক) স্বাধীনতা যুদ্ধে নির্যাতিত নারী ও শিশুর সঠিক তথ্য আহরণের জন্য জরিপকাজ পরিচালনা করা এবং তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা; (খ) যুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের বিভিন্ন বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করা; (গ) বীরঙ্গনা নারী সহ যেসব পরিবারের উপার্জনক্ষম পুরুষ মুক্তিযুদ্ধে নিহত হন সেই সমস্ত পরিবারের কর্মক্ষম নারীদের চাকুরী এবং প্রশিক্ষণ প্রদান করা। এছাড়াও, বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের প্রচেষ্টায় দশজন বীরাঙ্গনা নারীর বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে অধিকাংশ মেয়ের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

    নারী পুনর্বাসন বোর্ডের দায়িত্ব ও কার্যপরিধি ক্রমশ: বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯৭৪ সনে এই বোর্ডকে বৃহত্তর কলেবরে পুনর্গঠিত করে সংসদের একটি এ্যাক্ট-এর মাধ্যমে নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশনে রূপান্তরিত করা হয়। ফাউন্ডেশনের বহুবিধ কার্যক্রমের মধ্যে অন্যতম ছিল: ১) দেশের সকল জেলা ও মহকুমায় নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে ভৌত অবকাঠামো গড়ে তোলা; (২) নারীর ব্যাপক কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করা; (৩) নারীকে উৎপাদনমূখী কর্মকান্ডে নিয়োজিত করে প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপন করা; (৪) উৎপাদন ও প্রশিক্ষণ কাজে নিয়োজিত নারীর জন্য দিবাযত্ন সুবিধা প্রদান করা; (৫) যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের চিকিৎসা প্রদান করা; এবং (৬) মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীর ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য বৃত্তিপ্রথা চালু করা যা বর্তমানে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের আওতায় দুঃস্থ মহিলা ও শিশু কল্যাণ তহবিল” নামে পরিচালিত হচ্ছে। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নারীদের অর্থকরী কাজে নিয়োজিত করার উদ্দেশ্যে সর্বপ্রথম আন্তঃখাত উদ্যোগ গৃহীত হয়। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় নারীদের জন্য বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচী (গ্রামীণ মহিলা ক্লাব) চালু করে। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয় গণশিক্ষা কার্যক্রম চালু করে। পরবর্তীতে এই কর্মসূচী বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় নারী সমবায় কর্মসূচীতে রূপান্তরিত হয়। সাভারে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের ৩৩ বিঘা জমির উপর প্রতিষ্ঠিত “গ্রামীণ মহিলাদের জন্য কৃষিভিত্তিক কর্মসূচীর” কাজও শুরু হয় ১৯৭৩ সনে। দ্বিবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৮-১৯৮০) ও নারী কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধি কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়। তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও (১৯৮৫-৯০) একই কর্মসূচী গৃহীত হয়। চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৯০-৯৫) নারী উন্নয়নকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করে উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্তকরণের লক্ষ্যে আন্তঃখাত উদ্যোগ গৃহীত হয়। এ পরিকল্পনায় মূল উদ্দেশ্যগুলোর প্রধান কয়েকটি হলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প-বাণিজ্য, সেবা ও অন্যান্য খাতে নারীর বর্ধিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, দারিদ্র্য দূর করা, দক্ষতা বৃদ্ধি করা, স্ব-কর্মসংস্থান ও ঋণ সুবিধা সমপ্রসারণ করা, জেন্ডার সম্পর্কীয় সচেতনতা বৃদ্ধি করা, এবং নারীর জন্য সহায়ক সুবিধা সমপ্রসারণ যথা: হোস্টেল, শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, আইন সহায়তা প্রদান উল্লেখযোগ্য।

    ত্রিবার্ষিক আবর্তক পরিকল্পনা ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীতে নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে স্ব-কর্মসংস্থান, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, অনানুষ্ঠানিক ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন, নারী সহায়তা কর্মসূচী, কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল স্থাপন, দু:স্থ নারীর জন্য খাদ্য-সহায়তা কর্মসূচী, খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা কর্মসূচী, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, পল্লী অঞ্চলে মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা, স্বাস্থসেবা, টিকাদান কর্মসূচী গ্রহণ ও বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ সকল কর্মসূচী নারী উন্নয়ন ও নারী পুরুষের সমতা অর্জনের লক্ষ্যে সামগ্রিক প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল এবং নারী উন্নয়ন ও সমতার যথাযথ প্রেক্ষিতের উপর বিন্যস্ত হয়নি বলে অনেক ক্ষেত্রেই ফলপ্রসূ হয়নি। প্রচুর বিদেশী আর্থিক সাহায্য এলেও বিগত সরকারের অনভিজ্ঞতার কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।

  • নারী ও আইন
  • বাংলাদেশে নারী ও মেয়ে শিশুর প্রতি নির্যাতন রোধকল্পে কতিপয় প্রচলিত আইনের সংশোধন ও নতুন আইন প্রণীত হয়েছে। এসব আইনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মুসলিম পারিবারিক আইন, যৌতুক নিরোধ আইন, বাল্যবিবাহ রোধ আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ (বিশেষ বিধান) আইন প্রভৃতি। নারী ও শিশু নির্যাতনপ্রতিরোধে আইনগত সহায়তা ও পরামর্শ প্রদানের জন্য নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেল, নির্যাতিত নারীদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। তাছাড়া আইনজীবীর ফি ও অন্যান্য খরচ বহনের সহায়তা দানের উদ্দেশ্যে জেলা ও সেশন জজ-এর অধীনে নির্যাতিত নারীদের জন্য একটি তহবিল রয়েছে। যদিও ইতোমধ্যে বেশ কিছু আইন প্রণীত হয়েছে, তবু গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক আইনে বৈষম্য বিদ্যমান থাকায় নারী পুরুষের সমতা অর্জনে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সুতরাং এসব আইনের মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। বিভিন্ন পদক্ষেপ সত্ত্বেও মেয়ে শিশুর অবস্থার বিশেষ পরিবর্তন ঘটেনি। মেয়ে শিশুর বাল্যবিবাহ, পাচার, নির্যাতন ও অপব্যবহার চলছে অব্যাহতভাবে। বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপটে মেয়ে শিশুর সাংস্কৃতিক, মানসিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে উল্লেখযোগ্য পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি।

  • নারী নির্যাতন
  • যদিও ইতোমধ্যে বেশ কিছু আইন প্রণীত হয়েছে তথাপি নারী নির্যাতন আশানুরূপ হ্রাস পায়নি। নারী নির্যাতন, যৌতুকের জন্য নারী হত্যা, নারী ও মেয়ে শিশু অপহরণ ও পাচার, ধর্ষণ, শ্লীলতাহানী, নারী ও মেয়ে শিশুর প্রতি এসিড নিক্ষেপ ও অন্যান্য নারী নির্যাতনমূলক অপরাধ অনেকটা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রাম্য সালিশির মাধ্যমে ধর্মীয় অপব্যাখ্যা দিয়ে ১০১ দোররা, গর্ত করে পাথর মারা, পুড়িয়ে মারার ঘটনাও এদেশে ঘটেছে। নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে একটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো রাষ্ট্রীয় তথা পুলিশের নির্যাতন। নিকট অতীতে পুলিশের হাতে বেশ কিছু নারী নির্যাতিত হয়েছে, এমনকি পুলিশ দ্বারা নারী ধর্ষিত ও নিহত হয়েছে। নারী নির্যাতনের মামলাগুলো তদন্তের জন্য যথেষ্ট ফরেনসিক সুবিধা এখনও গড়ে ওঠেনি। এখনও প্রয়োজনীয় নারী কনস্টেবল, নারী পুলিশ ইন্সপেক্টর ও নারী এ.এস.আই এবং উচ্চতর পদসোপানে নারী পুলিশ কর্মকর্তা নেই। ফলে নারী বিষয়ের তদন্ত এবং অন্যান্য কাজ পরিচালনায় বিশেষ অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে মামলা দায়ের হয় না এবং বিভিন্ন কারণে বিচার বিলম্বিত হয়। সরকার নির্যাতিত নারী ও মেয়ে শিশুর সহায়তার জন্য একটি মহিলা সহায়তা কেন্দ্র চালু করেছে। এ কেন্দ্রে নির্যাতিত নারীদের আশ্রয়, বিনা খরচে আইনগত পরামর্শ ও মামলা পরিচালনার জন্য সহায়তা দেয়া হয়। পাশাপাশি নির্যাতিত নারীদের বিভিন্ন পেশায় প্রশিক্ষণ দান করে আত্মনির্ভর হওয়ার সুযোগ দেয়া হয়। নারী ও মেয়ে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের লক্ষ্যে দেশের ১০টি জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালত স্থাপিত হয়েছে।

  • রাজনীতি ও প্রশাসন
  • নারীর প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নালরি অন্তর্ভূক্ত তথা উন্নয়নের মূলস্রোতধারায় নারীকে সম্পৃক্ত করার প্রথম উদ্যোগ ১৯৭২ সনে বঙ্গবন্ধু সরকার গ্রহণ করেন। সরকারী চাকুরীতে মেয়েদের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে দিয়ে সকল ক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ অবারিত করে দশভাগ কোটা সংরক্ষণ করা হয়। ১৯৭৩ সনে দু’জন নারীকে মন্ত্রী সভায় অন্তর্ভূক্ত করা হয় এবং ১৯৭৪ সনে একজন নারীকে বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক নিয়োগ করা হয়। নারীর ব্যাপক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে সরকারী চাকুরীতে কোটা প্রবর্তন হলেও এখন পর্যন্ত সরকারের নীতি নির্ধারণী পদে নারীর অংশগ্রহণ প্রান্তিক পর্যায়ে রয়েছে। মন্ত্রী সভায় ৪ জন এবং সংসদে ৩৩০ জন সদস্যদের মধ্যে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত ৩০ জন সদস্যসহ ৩৭ জন নারী। স্থানীয় সরকারে ১৩,৮৭৯ জন নারী বিভিন্ন প্রতিনিধিত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন। তবে এদের অধিকাংশই পরোক্ষভাবে নির্বাচিত। বাংলাদেশে সরকারী ও আধাসরকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১০,৯৭৩৩৪ তন্মধ্যে মহিলাদের সংখ্যা ৮৩,১৩৩ জন অর্থাৎ শতকরা ৭.৬ ভাগ। এর মধ্যে গেজেটেড পদে শতকরা ৬.৫ ভাগ এবং অন্যান্য পদে শতকরা ৭.৪০ ভাগ। উপ-সচিব পদ হতে সচিব পর্যন্ত পদগুলোতে নারীদের সংখ্যা শতকরা ১ ভাগেরও নীচে। বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের সমতুল্য পদসহ সচিবদের পদ ৬৪টি। কোন নারী এই পদে অধিষ্ঠিত নেই। অতিরিক্ত সচিবদের পদে ৬০টি। এ পদসমূহে ২ জন মাত্র নারী রয়েছেন। ২৯৫টি যুগ্ম-সচিব পদের মধ্যে ২ জন নারী এবং ৬৬৫ জন উপ-সচিবের মধ্যে ৩ জন মাত্র নারী রয়েছেন। বিএসএস-এর অন্যান্য ক্যাডারেও উচ্চ পদে নারীর সংখ্যা নগণ্য। রাষ্ট্রদূত পদে মাত্র ১ জন নারী বর্তমানে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন। হাইকোর্টের বিচারপতি পদে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরী কমিশন, পরিকল্পনা কমিশন ও নির্বাচন কমিশনে উচ্চ পদে কোন নারী নেই। এছাড়া বিভিন্ন স্বায়ত্বশাসিত সংস্থার উচ্চ পদে অতি সীমিত সংখ্যক নারী নিয়োজিত রয়েছেন। ক্ষমতায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য গেজেটেড বা তদসম পদে প্রবেশ পর্যায়ে শতকরা ১০ ভাগ এবং ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণী পদে প্রবেশ পর্যায়ে শতকরা ১৫ ভাগ কোটা নির্দিষ্ট রয়েছে। এই পদ্ধতিতে কোট পূরণ সম্ভব হলেও কখনোই নীতি নির্ধারণী ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতা সৃষ্টি হবে না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে শতকরা ৬০ ভাগ নারীদের জন্য সংরক্ষিত। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মাত্র শতকরা ৬০ ভাগ নারীদের জন্য সংরক্ষিত। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মাত্র শতকরা ২৫ ভাগ নারী। পলিশ বিভাগে নারীদের এ এস পিসহ অন্যান্য পদে নিয়োগের ব্যবস্থা না থাকায় বিগত কয়েক বছর ঐ পদে নিয়োগ বন্ধ ছিল। এছাড়া পুলিশ বিভাগে অন্যান্য পদেও নারীদের সংখ্যা অত্যন্ত কম। সেনাবাহিনীতেও নারীদের নিয়োগ একেবারেই সীমিত।
    দারিদ্র্য দেশের শতকরা ৪৬ ভাগ দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাসকারীজনগোষ্ঠীর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই নারী। চাকুরী ও স্ব-কর্মসংস্থান উভয়ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারী পিছিয়ে আছে। ১৯৯০-৯১ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তি ৫১.২ মিলিয়ন। এর মধ্যে পুরুষ ৩১.১ ও নারী ২০.১ মিলিয়ন। অন্যদিকে এখনও পর্যন্ত নারীর অনেক কাজের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন হয় নাই। সংসারের পরিসরে নারীর শ্রম বিনিয়োগের কোন মাপকাঠি এখনও উদ্ভাবন করা যায়নি এবং কৃষি অর্থনীতিতে নারীর অবদানের সঠিক মূল্যায়ন নিরূপিত হয়নি বলেই নারী শ্রমশক্তি হিসেবে অনেক সময় চিহ্নিত হয়নি।

  • নারী মানব সম্পদ
  • বাংলাদেশের নারীদের গড় আয়ু ৫৮.১ বছর, অন্যদিকে পুরুষের গড় আয়ূ ৫৮.৪ বছর। নারী ও পুরুষের অনুপাত ১০০ : ১০৬-পৃথিবীর মাত্র ৩টি দেশে পুরুষের গড় আয়ু নারী থেকে বেশী। পুরুষের স্বাক্ষরতার হার শতকরা ৩৮.৯ ভাগ, সেখানে নারীর স্বাক্ষরতার হার ২৫.৫ ভাগ। শিক্ষার সর্বস্তরে পুরুষের তুলনায় নারী পিছিয়ে আছে। ১৯৯৬ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু ভর্তির হার হল ৮৩.৬; এর মধ্যে বালক ৮৮.৯ ভাগ ও বালিকা ৭৮ ভাগ এবং বালক বালিকা অনুপাত ৫২ঃ ৪৮; এর মধ্যে মেয়ে শিশুর ভর্তি ও ঝরে পড়ার হার যথাক্রমে ৮৮.৩ ও ১৫.৩ দেশে এবং বিদেশে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও পেশাগত শিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, কারিগরী প্রশিক্ষণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারী সমান সুযোগের অভাবে পুরুষের তুলনায় সংখ্যা ও গুণগত দিকে থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। ছেলে ও মেয়ে শিশুর অপুষ্টির আনুপাতিক হার ৪৩.৮ ঃ ৪৭.৬- এ থেকে নারী-পুরুষের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

    নারী উন্নয়নে সাংগঠনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরণ

    নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ নারী পুনর্বাসন কল্যাণ ফাউন্ডেশন, ১৯৭৬ সালে জাতীয় মহিলা সংস্থা ও ১৯৭৮ সালে মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করে। ১৯৮৪ সালে মহিলা বিষয়ক পরিদপ্তর গঠিত হয়। ১৯৯০ সালে পরিদপ্তরকে অধিদপ্তরে উন্নীত করা হয়। ১৯৯৪ সালে শিশু বিষয় অন্তর্ভূক্ত করে মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নামকরণ “মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়” রাখা হয়। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের অধীনে, জাতীয় মহিলা প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন একাডেমী, কর্মজীবি মহিলা হোস্টেল, শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, নারীদের কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বেগম রোকেয়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। সকল জেলা ও থানায় বিভিন্ন প্রকল্পেপর আওতায় শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন, অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

    জাতীয় মহিলা সংস্থা ৬৪টি জেলা ও ১৩৬টি থানায় নারী উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। শিশুদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমী প্রতিষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় নারী উন্নয়ন কর্মকান্ড সমন্বিত করার লক্ষ্যে ৩৩টি নারী উন্নয়ন ফোকাল পয়েন্ট মনোনীত করা হয়েছে। এছাড়া জাতীয় পর্যায়ে নারীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, নীতি নির্ধারণ ও উন্নয়ন কর্মসূচী বাস্তবায়ন ও পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে ৪৪ সদস্য বিশিষ্ট “জাতীয় মহিলা ও উন্নযন পরিষদ” গঠন করা হয়েছে। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে আন্তঃমন্ত্রণালয় নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়েছে। নারী ও মেয়ে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের লক্ষ্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ সেল, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, জাতীয় মহিলা সংস্থায় নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ সেল এবং জেলা, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান সমূহের মধ্যে সহযোগিতা ও সংযোগ রয়েছে। বেসরকারী প্রতিষ্ঠান সমূহকে সরকার সক্রিয় সহযোগিতা প্রদান করছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দলিল ও নীতিমালায় সরকারী-বেসরকারী ও সংযোগের জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে।

    সরকারী ও বেসরকারী কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতা

    বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দলিল ও নীতিমালায় নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে সক্রিয় সরকারী-বেসরকারী সংযোগ ও সহযোগিতার কথা থাকলেও এবং সরকারী-বেসরকারী উভয় পর্যায়ে কর্মীদের মধ্যে সংযোগ ও সহযোগিতার আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই লক্ষ্যটি এখনও পূর্ণমাত্রায় অর্জিত হয়নি। এক্ষেত্রে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু সময়ের দাবী হলো সরকারী এবং বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিবিড় সমন্বয়ও সহযোগিতা। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, নারী আন্দোলন ও নারী সংগঠনগুলি নারী উন্নয়ন ও সমতার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। নারী সমাজকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলা হবে অন্যতম লক্ষ্য।

    সম্পদ ও অর্থায়ন

    বিগত পঞ্চবার্ষিক ও দ্বিবার্ষিক পরিকল্পনাগুলোতে বরাদ্দকৃত সম্পদ নারী উন্নয়নের প্রয়োজনের নিরিখে অপ্রতুল ছিল। এখন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে ব্যাপক গবেষণা ও উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে কার্যকরী ও সম্ভাবনাময় কর্মসূচী গৃহীত হলে প্রয়োজনীয় সম্পদ প্রাপ্তির সম্ভাবনা উজ্জ্বল। চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সরকার সমূহ ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থাসমূহকে দেশে দেশে নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে ক্রমবর্ধমান হারে অর্থ বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে অবহিত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

    মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব

    সরকারের রুলস অব বিজনেস অনুসারে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অন্যতম দায়িত্ব নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে নীতি প্রণয়ন করা। এ দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সংবিধানে স্বীকৃত নারীর মৌলিক অধিকার, আন্তর্জাতিক সনদসমূহ যথা: সিডও, সিআরসি এবং বেইজিং ঘোষণা ও কর্ম-পরিকল্পনার আলোকে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন করেছে।

    জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির লক্ষ্য
    ১৯৯৬ সালের ১২ জুন জাতীয় নির্বাচনে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বর্তমান সরকার দেশে প্রথম বারের মত নারী উন্নয়ন নীতি প্রদান করছে, যার প্রধান লক্ষ্য হবে যুগ যুগ ধরে নির্যাতিত ও অবহেলিত এদেশের বৃহত্তর নারী সমাজের ভাগ্যোন্নয়ণ করা।
    জাতীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা করা;
    রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের সকল ক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা;
    নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা;
    নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা;
    নারীকে শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ হিসাবে গড়ে তোলা
    নারী সমাজকে দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা;
    নারী পুরুষের বিদ্যমান বৈষম্য নিরসন করা;
    সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিমন্ডলে নারী অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান করা;
    নারী ও মেয়ে শিশুর প্রতি সকল প্রকার নির্যাতন দূর করা;
    নারী ও মেয়ে শিশুর প্রতি বৈষম্য দূর করা;
    রাজনীতি, প্রশাসন ও অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে, আর্থসামাজিক কর্মকান্ড, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া এবং পারিবারিক জীবনের সর্বত্র নারী পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা;
    নারীর স্বার্থের অনুক্থল প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও আমদানী করা এবং নারীর স্বার্থ বিরোধী প্রযুক্তির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা;
    নারীর সুস্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করা;
    নারীর জন্য উপযুক্ত আশ্রয় এবং গৃহায়ন ব্যবস্থায় নারীর অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা;
    প্রাকৃতিক দূর্যোগ ও সশস্ত্র সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত নারীর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা;
    বিশেষ দূদর্শাগ্রস্ত নারীর চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করা;
    বিধবা, অভিভাবকহীন,স্বামী পরিত্যাক্তা, অবিবাহিত ও সন্তানহীন নারীর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা;
    গণমাধ্যমে নারী ও মেয়ে শিশুর ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরাসহ জেন্ডার প্রেক্ষিত প্রতিফলিত করা;
    মেধাবী ও প্রতিভাময়ী নারীর সৃজনশীল ক্ষমতা বিকাশে সহায়তা দেয়া;
    নারী উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সহায়ক সেবা প্রদান করা।

    জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি

    ১. নারীর মানবাধিকার এবং মৌলিক স্বাধীনতার বাস্তবায়ন মানবাধিকার এবং মৌলিক স্বাধীনতার সকল ক্ষেত্রে যেমন: রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ যে সম-অধিকারী, তার স্বীকৃতি স্বরূপ নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ করা;
    ২. নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও) বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা;
    ৩. নারীর মানবাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিদ্যমান আইন সংশোধন ও প্রয়োজনীয় নতুন আইন প্রণয়ন করা;
    ৪. বিদ্যমান সকল বৈষম্যমূলক আইন বিলোপ করা এবং আইন প্রণয়ন করা;
    ৫. বিদ্যমান সকল বৈষম্যমূলক আইন বিলোপ করা এবং আইন প্রণয়ন ও সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত কমিশন বা কমিটিতে নারী আইনজ্ঞদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা;
    ৬. স্থানীয় বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোন ধর্মের, কোন অনুশাসনের ভূল ব্যাখ্যার ভিত্তিতে নারী স্বার্থের পরিপন্থী এবং প্রচলিত আইন বিরোধী কোন বক্তব্য বা অনুরূপ কাজ করা বা কোন উদ্যোগ নেয়া যাবে না;
    ৭. বৈষম্যমূলক কোন আইন প্রণয়ন না করা বা বৈষম্যমূলক কোন সামাজিক প্রথার উন্মেষ ঘটতে না দেয়া;
    ৮. গুণগত শিক্ষার সকল পর্যায়ে, চাকুরীতে, কারিগরী প্রশিক্ষণে, সম পারিতোষিকের ক্ষেত্রে, কর্মরত অবস্থায় স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তায়, সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য পরিচর্যায় নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা;
    ৯. মানবাধিকার ও নারী বিষয়ক আইন সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান ও সংবেদশীলতা বৃদ্ধি করা;
    ১০. পিতা ও মাতা উভয়ের পরিচয়ে সন্তানের পরিচিতির ব্যবস্থা করা, যেমন জন্মনিবন্ধীকরণ, সকল সনদপত্র, ভোটার তালিকা, ফরম, চাকুরীরর আবেদনপত্র, পাসপোর্ট ইত্যাদিতে ব্যক্তির নাম প্রদানের সময় পিতা ও মাতার নাম উল্লেখ করা;
    ১১. মেয়ে শিশুর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সাধন এবং সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নতুন আইন প্রণয়ন করা
    ১২. বাল্য বিবাহ, মেয়ে শিশু ধর্ষণ, নিপীড়ন, পাচার এবং পতিতাবৃত্তির বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ করা;
    ১৩. পরিবারের মধ্যে এবং বাইরে মেয়ে শিশুর প্রতি বৈষম্যহীন আচরণ করা এবং মেয়ে শিশুর ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরা;
    ১৪. মেয়ে শিশুর চাহিদা যেমন: খাদ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা;
    ১৫. শিশুশ্রম বিশেষ করে মেয়ে শিশুশ্রম দূরীকরণ কর্মসূচী বাস্তবায়নের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া;
    ১৬. নারীর প্রতি সকল প্রকার নির্যাতন দূরীকরণ

  • পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি শারীরিক, মানসিক ও যৌন নিপীড়ন, নারী ধর্ষণ, পতিতাবৃত্তিতে নিয়োগ, যৌতুক ও নারীর প্রতি সহিংসতা দূর করা;
  • নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সম্পর্কিত প্রচলিত আইন যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে সংশোধন এবং নতুন আইন প্রণয়ন করা;

  • নির্যাতিত নারীকে আইনগত সহায়তা দেয়া;
    ১৭. নারী পাচার বন্ধ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন করা;
    ১৮. নারীর প্রতি নির্যাতন দূরীকরণ এবং এক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগের জন্য বিচার ব্যবস্থায় পুলিশ বাহিনীর সর্বস্তরে বর্ধিত হারে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা;
    ১৯. বিচার বিভাগ ও পুলিশ বিভাগকে নারীর অধিকার সংশ্লিষ্ট আইন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া ও জেন্ডার সংবেদনশীল করা;
    ২০. নারী ও মেয়ে শিশু নির্যাতন ও পাচার সম্পর্কীয় অপরাধের বিচার ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পন্ন করার লক্ষ্যে বিচার পদ্ধতি সহজতর করা।
    ২১. সশস্ত্র সংঘর্ষ ও নারীর অবস্থান
  • সশস্ত্র সংঘর্ষ ও জাতিগত যুদ্ধে নারীর অধিকতর নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিরুদ্ধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা;

  • সংঘর্ষ বন্ধ ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা;
  • আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার মিশনে নারী প্রতিনিধি অন্তর্ভূক্ত করা;
    ২২. শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ

  • নারী শিক্ষা বৃদ্ধি, নারী পুরুষের মধ্যে শিক্ষার হার ও সুযোগের বৈষম্য দূর করা এবং উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় নারীকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে সক্রিয় ও স্পষ্ট নীতি অনুসরণ করা;
  • আগামী দশ বছরে নিরক্ষরতা দূর করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করা, বিশেষতঃ মেয়ে শিশু ও নারী সমাজের শিক্ষা প্রশিক্ষণের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া;

  • বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে একটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা;
  • মেয়েদের জন্য দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা;

  • টেকসই উন্নয়ন ও অব্যাহত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে নারীর জন্য আনুষ্ঠানিক ও অআনুষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ এবং শক্তিশালী করা;
  • শিক্ষার ক্ষেত্রে নারী ও মেয়ে শিশুর সমান অধিকার নিশ্চিত করা, শিক্ষার সকল পর্যায়ে অসমতা দূর করা, শিক্ষাকে সর্বজনীন করা, ভর্তির হার বৃদ্ধিসহ নিরক্ষরতা দূর করা এবং মেয়ে শিশুকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখার লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা;

  • জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে সকল স্তরের পাঠ্যসূচীতে নারী-পুরুষ সমতা প্রেক্ষিত সংযোজন করা;
  • নারীর দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সকল প্রশিক্ষণে নারীকে সমান সুযোগ দেয়া;

  • নারী ও মেয়ের প্রতি দৃষ্টি রেখে বিদ্যমান নীতিসমূহের খাতওয়ারী সময়ভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা;
  • কারিগরী প্রযুক্তগত ও উচ্চ শিক্ষাসহ সকল পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করা;
    ২৩. ক্রীড়া ও সংস্কৃতি

  • ক্রীড়া ক্ষেত্রে নারীর বর্ধিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা;
  • স্থানীয় পর্যায়ে নারীর জন্য পৃথক ক্রীড়া কমপ্লেক্স গড়ে তোলা;

  • সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে নারীর বর্ধিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা;
  • নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণে নারীকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে সরকারী অনুদানের ব্যবস্থা করা;
    ২৪. জাতীয় অর্থনীতির সকল কর্মকান্ডে নারীর সক্রিয় ও সমঅধিকার নিশ্চিতকরণ

  • অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান সমূহের সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং নারী-পুরুষের মধ্যে বিরাজমান পার্থক্য দূর করা;
  • অর্থনৈতিক নীতি (বাণিজ্যনীতি, মূদ্রানীতি, করনীতি প্রভৃতি) প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা;

  • নারীর ক্ষমতায়নের প্রতি লক্ষ্য রেখে সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে ও কর্মসূচিতে নারীর চাহিদা বিবেচনায় রাখা;
  • সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতির প্রয়োগে বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রতিহত করার লক্ষ্যে নারীর অনুক্থলে safety nets গড়ে তোলা;

  • সম্পদ, কর্মসংস্থান, বাজার ও ব্যবসায় নারীকে সমান সুযোগ ও অংশীদারিত্ব দেয়া;
  • শিক্ষাপাঠ্যক্রম, বিভিন্ন পুস্তকাদিতে নারীর অবমূল্যায়ন দূরীভূত করা এবং নারীর ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরা;

  • নারী-পুরুষ শ্রমিকদের সমান মজুরী ও কর্মস্থলে নিরাপত্তা প্রদান এবং চাকুরী ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা;
  • নারীর অংশগ্রহণ প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নারী অবদানের স্বীকৃতি দেয়া;

  • জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর অবদান প্রতিফলনের জন্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোসহ সকল প্রতিষ্ঠানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা;
  • সরকারের জাতীয় হিসাবসমূহে গার্হস্থ্য শ্রমসহ সকল নারী শ্রমের সঠিক প্রতিফলন নিশ্চিত করা;

  • নারী যেখানে অধিক সংখ্যায় কর্মরত আছেন সেখানে যাতায়াত ব্যবস্থা, বাসস্থান, বিশ্রামাগার, পৃথক প্রক্ষালনকক্ষ এবং দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপনসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
    ২৫. নারীর দারিদ্র্য দূরীকরণ
  • দরিদ্র নারী শ্রমশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধিকল্পে তাদের সংগঠিত করে ও প্রশিক্ষণ দিয়ে নতুন এবং বিকল্প অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুযোগ সৃষ্টি করা;

  • দরিদ্র নারীকে উৎপাদনশীল কর্মে এবং অর্থনৈতিক মূলধারায় সম্পৃক্ত করা;
  • অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ নারীর সকল চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা;

  • জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও সংগঠনগুলোকে নারীর দারিদ্র্য দূরীকরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সহায়তা দান ও অনুপ্রাণিত করা।
    ২৬. নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন
  • নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে জরুরী বিষয়াদি যথা: শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, জীবনব্যাপি শিক্ষা, কারিগরী শিক্ষা, তথ্য, উপার্জনের সুযোগ, উত্তরাধিকার, সম্পদ, ঋণ প্রযুক্তি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদসহ ভূমির উপর অধিকার ইত্যাদির ক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ ও সমান সুযোগ এবং নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেয়া এবং সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নতুন আইন প্রণয়ন করা।
    ২৭. নারীর কর্মসংস্থান

  • নারী শ্রমশক্তির শিক্ষিত ও নিরক্ষর উভয় অংশের কর্মসংস্থানের জন্যে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করা;
  • চাকুরী ক্ষেত্রে নারীর বর্ধিত নিয়োগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রবেশ পর্যায়সহ সকল ক্ষেত্রে কোটা বৃদ্ধি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা;

  • সকল নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে সরকার অনুসৃত কোটা ও কর্মসংস্থান নীতির আওতায় চাকুরী ক্ষেত্রে নারীকে সকল প্রকার সম-সুযোগ প্রদানের জন্য উদ্বুদ্ধ করা;
  • নারী উদ্যোক্তা শ্রেণী গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও ঋণদান কর্মসূচী গ্রহণ করা;

  • নারীর বর্ধিত হারে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ, অবস্থান ও অগ্রসরমানতা বজায় রাখার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পরিবেশ গড়ে তোলা;
  • নারীর ব্যাপক কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সকল আইন, বিধি ও নীতির প্রয়োজনীয় সংস্কার করা।

    ২৮. সহায়ক সেবা
    সকল অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নারীর কার্যকর অংশগ্রহণের লক্ষ্যে সহায়ক সেবা যেমন: শিশুযত্ন সুবিধা, কর্মস্থলে শিশু দিবাযত্ন পরিচর্যা কেন্দ্র, বৃদ্ধ, অক্ষম, প্রতিবন্ধী নারীদের জন্যে গৃহায়ন, স্বাস্থ্য, বিনোদনের ব্যবস্থা প্রবর্তন, সমপ্রসারণ এবং উন্নীত করা;
    ২৯. নারী ও প্রযুক্তি

  • নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন, আমদানী ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে জেন্ডার প্রেক্ষিত প্রতিফলিত করা;
  • উদ্ভাবিত প্রযুক্তির প্রয়োগের ফলে নারীর স্বার্থ বিঘ্নিত হলে গবেষণার মাধ্যমে ঐ প্রযুক্তিকে নারীর প্রতি ক্ষতিকারক উপাদানমুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা;

  • প্রযুক্তি ক্ষেত্রে নারীর স্বার্থের অনুকূলে লক্ষ্যসমূহ অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও সংস্কার করা;
    ৩০. নারীর খাদ্য নিরাপত্তা
  • দুঃস্থ নারীর চাহিদা ও প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য রেখে সরকারী খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা;

  • খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন প্রক্রিয়ায় পরিকল্পনা, তত্ত্বাবধান ও বিতরণে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা;
    ৩১. নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন
  • রাজনীতিতে অধিকহারে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্যে প্রচার মাধ্যমসহ রাজনৈতিক দলসমূহকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা;
  • নারীর রাজনৈতিক অধিকার অর্জন ও প্রয়োগ এবং এর সুফল সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা;

  • নির্বাচনে অধিকহারে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে অনুপ্রাণিত করা;
  • নারীর রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের ও প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভোটাধিকার প্রয়োগে সচেতন করা এবং তৃণমূল পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত ভোটার প্রশিক্ষণ কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা;

  • রাজনীতিতে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণের তাগিদ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে নারী সংগঠনসহ বেসরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে প্রচার অভিযান গ্রহণ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা;
  • জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনে চলতি সময়সীমা শেষ হবার পর ২০০১ সালে বর্ধিত সংরক্ষিত আসনে প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য উদ্যোগ নেয়া;

  • স্থানীয় সরকার পদ্ধতির সকল পর্যায়ে বর্ধিত সংরক্ষিত আসনে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা;
  • সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ স্তর মন্ত্রী পরিষদে, প্রয়োজনে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট ধারার অধীনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী নিয়োগ করা;
    ৩২. নারীর প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন

  • প্রশাসনিক কাঠামোর উচ্চ পর্যায়ে নারীর জন্য সরকারী চাকুরীতে প্রবেশ সহজ করার লক্ষ্যে চুক্তিভিত্তিক এবং সরাসরি প্রবেশের (লেটারেল এন্ট্রি) ব্যবস্থা করা;
  • বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে রাষ্ট্রদূতসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরী কমিশন, পরিকল্পনা কমিশন, বিচার বিভাগের উচ্চ পদে নারীদের নিয়োগ প্রদান করা;

  • জাতিসংঘের বিভিন্ন শাখা ও অঙ্গ সংগঠনে এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংগঠনে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি বা প্রার্থী হিসেবে নারীকে নিয়োগ/মনোনয়ন দেয়া;
  • নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে প্রবেশ পর্যায়সহ সকল পর্যায়ে, গেজেটেড ও নন-গেজেটেজ পদে কোটা বৃদ্ধি করা;

  • সকল ক্ষেত্রে নারীর জন্য নির্ধারিত কোটা পূরণ সাপেক্ষে কোটা পদ্ধতি চালু রাখা;
  • কোটার একই পদ্ধতি স্বায়ত্বশাসিত ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে প্রযোজ্য হবে এবং বেসরকারী ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানসমূহকেও এই নীতি অনুসরণের জন্য উৎসাহিত করা;

  • জাতিসংঘের অথনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের সুপারিশ অনুসারে সরকারের নীতি নির্ধারনী পদসহ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সকল স্তরে নারীর সম ও পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শতকরা ৩০ ভাগ পদে নারী নিয়োগের উদ্দেশ্যে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করা।
    ৩৩. স্বাস্থ্য ও পুষ্টি
  • নারীর জীবন চক্রের সকল পর্যায়ে যথা: শৈশব, কৈশোর, যৌবন, গর্ভকালীন সময় এবং বৃদ্ধ বয়সে পুষ্টি, সর্বোচ্চ মানের শারিরীক ও মানসিক স্বাস’্য লাভের অধিকার নিশ্চিত করা;

  • নারীর জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা;
  • প্রসূতি ও শিশু মৃত্যুর হার কমানো;

  • এইডস রোগসহ সকল ঘাতক ব্যাধির প্রতিরোধ করা বিশেষত: গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসহ নারীর স্বাস্থ্য সম্পর্কীত গবেষণা করা এবং স্বাস্থ্য তথ্যের প্রচার ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা;
  • নারীর পুষ্টি বিষয়ক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করা;

  • জনসংখ্যা পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য ও প্রজনন অধিকারের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা;
  • বিশুদ্ধ নিরাপদ পানীয় জল ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় নারীর প্রয়োজনের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া;

  • উল্লেখিত সকল সেবার পরিকল্পনা, বিতরণ এবং সংরক্ষণে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা;
    পরিবার পরিকল্পনা ও সন্তান গ্রহণের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা;
    নারীর স্বাস্থ্য , শিশুর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি, জন্ম-নিয়ন্ত্রণে সাহায্য, কর্মস্থলে মা’র কর্মক্ষমতা বাড়ানো ও মাতৃবান্ধব কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মায়ের বুকের দুধের উপকারিতার পক্ষে যথোপযুক্ত আইন প্রণয়ন করা;
    মায়ের দুধ শিশুর অধিকার, এই অধিকার (পাঁচ মাস শুধুমাত্র বুকের দুধ) নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শিশু প্রসবের সময় থেকে পরবর্তী ৪ মাস ছুটি ভোগের জন্য আইন প্রণয়ন ও বাস্তায়ন করা এবং শিশুর জন্মের পূর্বে মা-কে মাতৃত্বজনিত প্রয়োজনীয় ছুটি দেয়া;
  • ৩৪. গৃহায়ন ও আশ্রয়

  • পল্লী ও শহর এলাকায় গৃহায়ন পরিকল্পনা ও আশ্রয় ব্যবস্থায় নারী প্রেক্ষিত অন্তর্ভূক্ত করা;
    একক নারী, নারী প্রধান পরিবার, শ্রমজীবি ও পেশাজীবি নারী, শিক্ষানবিশ ও প্রশিক্ষণার্থী নারীর জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ গৃহ ও আবাসন সুবিধা প্রদানের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া;
    নারীর জন্য বিশেষ সুবিধা যেমন, হোস্টেল, ডরমেটরী, বয়স্কদের হোম, স্বল্পকালীন আবাসস্থলের ব্যবস্থা করা এবং গৃহায়ন ও নগরায়ন পরিকল্পনায় দরিদ্র, দুঃস্থ ও শ্রমজীবী নারীর জন্য সংরক্ষিত ব্যবস্থা রাখা;
    সরকারী বাসস্থান বরাদ্দের ক্ষেত্রে নিম্নবেতনভূক্ত নারী কর্মচারীসহ সকল স্তরের নারীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা।
  • ৩৫. নারী ও পরিবেশ

  • প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশের নিরাপত্তায় নারীর অবদান স্বীকার করে পরিবেশ সংরক্ষণের নীতি ও কর্মসূচীতে নারীর সমান অংশগ্রহণের সুযোগ ও নারী প্রেক্ষিত প্রতিফলিত করা;
    পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কর্মসূচী বাস্তবায়নে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা;
    নদীভাঙ্গন ও প্রাকৃতিক দূর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও শিশুর পুনর্বাসন করা;
    কৃষি, মৎস্য, গবাদি পশুপালন ও বনায়নে নারীকে উৎসাহিত ও সমান সুযোগ দেয়।
  • ৩৬. নারী ও গণমাধ্যম
    গণমাধ্যমে নারীর সঠিক ভূমিকা প্রচার, প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং অংশগ্রহণের বৈষম্য দূর করা, গণমাধ্যমে নারী ও মেয়ে শিশুর অংশগ্রহণ, মতামত প্রকাশ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি এবং নারী ও মেয়ে শিশুর ইতিবাচক প্রতিফলন ঘটানো;
    নারীর প্রতি অবমাননাকর, নেতিবাচক, সনাতনী প্রতিফলন এবং নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধের লক্ষ্যে প্রচার ব্যবস্থা করা;
    বিভিন্ন গণমাধ্যমের ব্যবস্থাপনা ও আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণে নারীর জন্য সমান সুযোগ রাখা;
    প্রচার মাধ্যম্ ও নীতিমালায় জেন্ডার প্রেক্ষিত সমন্বিত করা;
    উপরোক্ত বিষয়ের আলোকে আইন, প্রচারনীতি, নিয়ন্ত্রণবিধি ও আচরণবিধি প্রণয়ন করা।

    ৩৭. বিশেষ দুর্দশাগ্রস্ত নারী
    নারীর অবস্থানের বিভিন্নতা এবং বিশেষভাবে দুর্দশাগ্রস্ত নারীর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তাদেরকে বিশেষ সুবিধা প্রদানের পদক্ষেপ ও কর্মসূচী গ্রহণ করা।
    জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়ন কৌশল

  • প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ও কৌশল
    নারী উন্নয়ন নীতি ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব সরকারের। একটি সুসংগঠিত ও সবিন্যাস্ত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ার মাধ্যমে এ দায়িত্ব সূচারুরূপে সম্পন্ন করা সম্ভব। সরকারী – বেসরকারী সকল পর্যায়ের কর্মকান্ডে নারী উন্নয়ন প্রেক্ষিত অন্তর্ভূক্তির বিষয়ে প্রচেষ্টা নেয়া হবে। এ লক্ষ্যে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে
    ১.১ জাতীয় পর্যায়
    ক) নারী উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো
    নারীর সমতা, উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে জাতীয় অবকাঠামো যেমন : মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় , মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, জাতীয় মহিলা সংস্থা ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালী করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানে জনবল ও সম্পদ নিশ্চিত করা হবে। পর্যায়ক্রমে দেশের সকল বিভাগ, জেলা, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামো বিস্তৃত করা হবে। নারী উন্নয়নের যাবতীয় কর্মসূচী প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণের জন্য এ প্রতিষ্ঠান সমূহের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। জাতীয় মহিলা সংস্থা, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমীকে থানা, জেলা, ও জাতীয় পর্যায়ে সংগঠিত ও শক্তিশালী করা হবে।
    খ) জাতীয় মহিলা উন্নয়ন পরিষদ
    নারী উন্নয়ন নীতি নির্ধারণ ও উন্নয়ন কর্মসূচী বাস্তবায়ন ও পর্যালোচনার জন্যে প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে ৪৪ সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় মহিলা উন্নয়ন পরিষদ গঠন করা হয়েছে। এ পরিষদে কার্যপরিধি নিম্নরূপ:
    (1) আর্থ-সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে মহিলাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্দ্যেশে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার উন্নয়নমূলক কার্যক্রম সংক্রান্ত নীতি প্রণয়ন ও কার্যক্রমের সমন্বয় সাধন ;
    (2) মহিলাদের আইনগত অধিকার, মহিলা উন্নয়ন এবং মহিলাদের নির্যাতন প্রতিরোধ সংক্রান্ত বিষয়াবলী সম্বন্ধে নীতি প্রণয়ন;
    (3) সকল কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের স্বার্থ সংরক্ষণ, অংশগ্রহণ ও তাদের ভাগ্যোন্নয়ন সম্পর্কে গৃহীত পদক্ষেপ বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ।
    জাতীয় মহিলা উন্নয়ন পরিষদের সভা বছরে ন্যূনপক্ষে দ’ুবার অনুষ্ঠিত হবে।
    (গ) সংসদীয় কমিটি
    বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ কর্তৃক গঠিত নারী উন্নয়ন বিষয়ক সংসদীয় স্থানীয় কমিটি নারী উন্নয়ন কর্মসূচী পর্যালোচনা করে নারী অগ্রগতির লক্ষ্যে সরকারকে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করার পরামর্শ প্রদান করবে।
    (ঘ) নারী উন্নয়নে ফোকাল পয়েন্ট
    বিভিন্ন ফোকাল পয়েন্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগ/সংস্থা জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির আলোকে কর্মসূচী গ্রহণ, প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ/সংস্থায় নারী উন্নয়ন কার্যক্রম যাতে যথাযথ ভাবে সম্পন্ন করা যায় সে জন্য ঐ প্রতিষ্ঠানসমূহে উপ-সচিব/উপ-প্রধানের স্থলে ন্যূনতম পক্ষে যুগ্ম-সচিব/যুগ্ম-প্রধান পদমর্যাদাসম্পন্ন কর্মকর্তাকে ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে মনোনীত করা হবে । নারী উন্নয়ন কার্যক্রমের নিয়মিত মনিটরিং এর উদ্দ্যেশে মন্ত্রণালয়/বিভাগ/সংস্থার মাসিক এডিপি পর্যালোচনা সভা ও মাসিক সমন্বয় সভায় আলোচনা ও পর্যালোচনা করা হবে। তাছাড়া ফোকল পয়েন্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগ/সংস্থার কার্যক্রমে যাতে জেন্ডার প্রেক্ষিত প্রতিফলিত হয় ও তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদন ও দলিলসমূহে জেন্ডার বিষয়ে সুষ্পষ্ট ও পর্যাপ্ত তথ্য সন্নিবেশিত হয় সে লক্ষ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
    (ঙ) মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রীকে সভাপতি এবং নারী উন্নয়নে চিহ্নিত ফোকাল পয়েন্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারী-বেসরকারী নারী উন্নয়নমূলক সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি “নারী উন্নয়ন বাস্তবায়ন ও মূল্যায়ন কমিটি” গঠন করা হবে। এ কমিটি নারী উন্নয়ন সম্পর্কীয় কর্মসূচী পর্যালোচনা, সমন্বয় ও মূল্যায়ন করবে। কমিটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমস্যা চিহ্নিত করে ভবিষ্যৎ কর্মসূচী দ্রুত বাস্তবায়নের জন্যে পরামর্শ প্রদান করবে।
    ১.২ থানা ও জেলা পর্যায়
    নারীর অগ্রগতি এবং ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে জেলা পর্যায়ের প্রশাসন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা, স্থানীয় সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দপ্তর ও এনজিওদের কার্যক্রমের সমন্বয় সাধন ও নারী উন্নয়ন কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে।
    ১.৩ তৃণমূল পর্যায়
    তৃণমূল পর্যায়ে গ্রাম ও ইউনিয়নে নারীকে স্বাবলম্বী দল হিসেবে সংগঠিত করা হবে। এ দল সমূহকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সরকারী সংস্থার আওতায় নিবন্ধীকৃত সংগঠন হিসেবে রূপ দেয়া হবে। সরকারী,বেসরকারী উৎস, ব্যাংক,অন্যান্য আর্থিক সংস্থা থেকে প্রাপ্ত সম্পদ আহরণ করে এ সংগঠনগুলোর সাতে ইউনিয়ন পরিষদ, থানা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন সমূহের নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন ও সমন্বয় সাধন করা হবে। উপরন্তু তৃণমূল পর্যায়ের সকল সংগঠনের কার্যক্রমের স্থানীয় উন্নয়নের প্রেক্ষিত অন্তর্ভূক্তির জন্য উৎসাহিত এবং সহায়তা দান করা হবে।
    ২ নারী উন্নয়নে এনজিও এবং সামাজিক সংগঠনের সাথে সহযোগিতা
    প্রকৃত নারী উন্নয়ন একটি ব্যাপক কাজ। সরকারের একার পক্ষে এ কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা কার্যতঃ অসম্ভব। তাই এ কাজে সরকারী বেসরকারী উদ্যোগের সমন্বয় ঘটানোর প্রয়াস নেয়া হবে যাতে করে সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এক্ষেত্রে নিজস্ব কর্মসূচীর অতিরিক্ত Catalyst বা সহায়কের ভূমিকা পালন করাই হবে সরকারের মূল দায়িত্ব। বেসরকারী ও সামাজিক সংগঠন সমূহকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে নিম্ন লিখিত পদক্ষেপ নেয়া হবেঃ
    ক. গ্রাম, থানা, জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে নারী উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা পালনকারী স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্তকরণ ও তাদের কর্মকান্ডের সাথে সমন্বয় সাধন করতে হবে। নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে সহায়ক সেবা প্রদান করা হবে। সরকারী সকল কর্মকান্ডে তাদের সহযোগিতা নিশ্চিত করা হবে। নারীর ক্ষমতায়ন প্রক্রিয়ায় যথোপযুক্ত ভূমিকা পালনের লক্ষ্যে নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তনের উদ্দ্যেশে এসব প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় কর্মসূচী গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে।
    খ. জাতীয় থেকে তৃণমূল পর্যায়ে নারী উন্নয়ন, নারী অধিকার সংরক্ষণ, সচেতনতা সৃষ্টি, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, আইনগত সহায়তা দান এবং এ জাতীয় কর্মসূচী বাস্তবায়নরত নারী সংগঠন সমূহকে শক্তিশালী করার জন্য সহায়তা দান করা হবে। উল্লেখিত ধরণের কর্মসূচী প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নারী সংগঠন সমূহের সাথে সহায়তা ও সমন্বয় করা হবে।
    ৩ নারী ও জেন্ডার সমতা বিষয়ক গবেষণা
    নারী উন্নয়ন ও সমতা বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা পরিচালনার জন্য দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা নেয়া হবে। সকল গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে নারী উন্নয়ন, ক্ষমতায়ন এবং নারী ও শিশুদের অধিকার সম্পর্কিত বিষয়ে গবেষণা পরিচালনায় উৎসাহিত করা হবে। পৃথক জেন্ডার গবেষণা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে। সেখান থেকে নীতি নর্ধারকদের প্রয়োজনীয়
    ৩.১ জেন্ডার ভিত্তিক তথ্য ও উপাত্ত
    জেন্ডার ভিত্তিক পৃথক তথ্য/উপাত্ত সংগ্রহ, সন্নিবেশ এবং নিয়মিত প্রকাশনার ব্যবস্থা করা হবে। সরকারি ও বেসরকারী গবেষণা কেন্দ্র, ব্যুরো আব স্ট্যাটিসটিকস এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠারে প্রাথমিক তথ্য/উপাত্ত সংগ্রহ কারী । অঙ্গসমূহ নারীর অবসআন ও ভূমিকা সংক্রান্ত যেসব উপাত্তের ঘাটতি রয়েছেতা সংগ্রহ এবং প্রতিফলনের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ ও জেন্ডার ভিত্তিক ডেটাবেজ গড়ে তুলবে। সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়/দপ্তর, কর্পোরেশন, ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান সকল কার্যের জন্য জেন্ডার ভিত্তক তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং প্রকাশনার ব্যবস্থা করবে।
    ৪ নারী উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান
    ঢাকায় বিদ্যমান নারী উন্নয়ন প্রশিক্ষন প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণসহ বিভাগ, জেলা ও থানায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। এসব কেন্দ্রে বিভিন্ন কারিগরী, বৃত্তিমূলক, নারী অধিকার এবং শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।
    ৫ কর্ম-পরিকল্পনা কর্মসূচীগত কৌশল
    ক) মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য মন্ত্রনালয়/বিভাগ/সংস্থা এবং জেলা, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের সরকারী বেসরকারী সংগঠনসমূহ জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য কর্ম-পরিকল্পনা গ্রহণ করবে।
    খ) সকল মন্ত্রণালয়/বিভাগ/সংস্থার নিজ নিজ কর্ম-পরিকলপনায় জেন্ডার প্রেক্ষিতের প্রতিফলন ঘটানো হবে যাতে করে সকল খাতে নারীর সুষম অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষিত হয়।
    গ) সকল কর্ম-পরিকল্পনা ও কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেয়া হবে।
    ঘ) মনিটরিং ও মূল্যায়নের উদ্দেশ্যে সকল কর্ম-পরিকল্পনা ও কর্মসূচীর অগ্রগতি নির্দিষ্ট সময় অন্তর পর্যালোচনা করা হবে।
    ঙ) বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ/সংস্থার কর্ম-পরিকল্পনা ও কর্মসূচীতে যাতে নারী প্রেক্ষিত সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয় সে লক্ষ্যে কর্ম-পরিকল্পনা ও কর্মসূচী প্রণয়নকারী কর্মকর্তাবৃন্দকে পিএটিসি, প্ল্যানিং একাডেমি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে জেন্ডার এবং উন্নয়ন বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এ লক্ষ্যে পাঠ্যসূচীতে ও কোর্সে জেন্ডার ও উন্নয়ন সম্পর্কীয় বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
    চ) নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে সামাজিক সচেতনায়ন কর্মসূচীর উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে। এই সচেতনায়ন কমসূচীতে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে
    (১) আইনবিধি ও দলিলাদি থেকে নারীর মর্যাদাহানিকর বক্ত্যব্য ও মন্তব্য অপসারণ
    (২) মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কার্যনির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তানীতি নির্ধারক, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তা, বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাবৃন্দের সচেতনায়ন এবং
    (৩) নারী-পুরুষের সম্পর্ক, অধিকার ও নারী উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয়াবলী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভূক্তকরণ ইত্যাদি বিষয়ের উপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হবে। সমাজের সকল স্তরে বিশেষভাবে প্রণীত এবং সুষ্ঠু অর্থায়নের ভিত্তিতে নারী বিষয়ে সংবেদনশীলকরণ কর্মসূচী নিয়মিতভাবে পরিচালনা করা হবে। এ ব্যাপারে প্রশাসন, বিশেষতঃ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার বিভাগ, এবং সরকারী বেসরকারী সকল উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে। নারীর বিষয়ে সংবেদনশীলকরণ কর্মসূচী সরকারী ও বেসরকারী উভয় ক্ষেত্রে সকল চলতি প্রশিক্ষণ কর্মসূচীতে পর্যায়ক্রমে সমন্বিত করা হবে।
    ছ) নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে নারী নির্যাতনের প্রতিরোধ কর্মসূচীর উপরও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হবে। বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানকে এ উদ্দেশ্যে সুপরিকল্পিত কর্মসূচী গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করা হবে। এ সব কর্মসূচীতে সচেতনায়ন, আইনগত পরামর্শ ও শিক্ষা , শাস্তিমূলক ব্যবস্থা তথা মামলা পরিচালনা করা, মামলা পরিচালনার জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও পুনর্বাসন, আর্থিক সহায়তা ইত্যাদি কার্যক্রম অন্তর্ভূক্ত থাকবে। এ ক্ষেত্রে একটি বিশেষ কৌশল হিসেবে মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কেন্দী্রয় নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ সেলসহ অন্যান্য নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের কর্মপরিধিকে বিস্তৃত ও শক্তিশালী করা হবে।
    ৬ আর্থিক ব্যবস্থা
    তৃণমূল পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদ, থানা পরিষদ ও জেলা পরিষদে নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে অর্থ বরাদ্দ করা হবে।
    জাতীয় পর্যায়ে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট বৃদ্ধি করা হবে। নারী উন্নয়নে নিয়োজিত মন্ত্রণালয় এবং সংস্থা যেমন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়, শ্রম ও জনশক্তি, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রভৃতি মন্ত্রণালয়ে নারী উন্নয়নের জন্য লক্ষমাত্রা ও কর্মসূচী চিহ্নিত করে অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ করা হবে।
    পরিকল্পনা কমিশন সকল খাতে বিশেষ করে শিক্ষা, শিল্প, গৃহায়ন, পানিসম্পদ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং অন্যান্য উপ-খাতে নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক ভৌত ও আর্থিক সম্পদ চিহ্নিত করে অর্থ বরাদ্দ করবে।
    অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ নারী উন্নয়নে আন্তর্জাতিক উৎস থেকে নতুন ও অতিরিক্ত আর্থিক সহযোগিতা প্রপ্তির প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
    বাণিজ্যিক ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারী নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে।
    ৭ সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা
    নারী উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তৃণমূল পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় সর্বস্তরে সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্ভাব্য সহযোগিতার যোগসুত্র গড়ে তোলা হবে। সরকারের পক্ষ থেকে বেসরকারী স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান সমুহকে যথোপযুক্ত এবং সময়োপযোগী সহায়তা প্রদান করা হবে। সরকারী- বেসরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে চিন্তাধারা, দক্ষতা ও তথ্যের আদান প্রদান করা হবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, বৈঠক, কর্মশালা ইত্যাদির মাধ্যমে এই আদান প্রদান চলবে। ক্ষেত্র বিশেষে সরকারী সেরকারী যৌথ উদ্যোগে নারী উন্নয়ন কর্মসুচী গ্রহণ করা হবে।
    ৮ নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক আর্থিক ও কারিগরী সহযোগিতা এবং অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি বিনিময়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও উপ- আঞ্চলিক সহযোগিতাকে উৎসাহিত করা হবে।

    মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়
    গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

    —————————————————————————————————————————–
    ফিচার ছবিঃ নাফিজ আহমেদ এর ওয়ার্ডপ্রেস ব্লগ থেকে

  •