ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

 

“ Never Marry a Child ”

সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারের পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা গুলো একসাথে কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পুষ্টিখাতে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস পেয়েছে।

আমরা যারা উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করছি-; পরিসংখ্যান ও বাস্তবতার দিক থেকে সফলতা দেখালেও অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে শিশু বয়সী মেয়েদের বিবাহের মাত্রা সামাজিক অস্থিরতা, নিরাপত্তার অভাব, বেকারত্ব, দুর্যোগ প্রবণ এলাকা, পারিবারিক ভাঙন ও অবক্ষয়ের কারনে। যে সব সুবিধাবঞ্চিত মেয়েরা স্কুলগামী হচ্ছে তারা ঝরে পড়েছে এবং তাদেরকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে একটা অনিশ্চত জীবনের দিকে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাল্যবিবাহ রোধ আমাদের ভূমিকা ও কার্যক্রম পর্যাপ্ত নয়। আমরা সফল ভাবে তৃণমূল পর্যায়ে অ্যাডভোকেসি করতে পারছিনা। বাবা –মায়ের দারিদ্রতা, বেকারত্ব, ও সামাজিক নিরাপত্তার কারনে বারো বছর বয়সী মেয়েটাকে বিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ না করারই কথা। সেখানে ব্যর্থতার দায়ভার আমাদের -; আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার।

মনে করা হয় – বিয়ে দিলেই হয়তোবা – তাদের মেয়েটি ইভটিজিং-এর শিকার হবেনা। অপ্রত্যাশিত গর্ভপাত, লোলুপ দৃষ্টির বখাটেদের হাত থেকে রক্ষা পাবে মেয়েটি – পারিবারিক ভরন পোষণের খরচ কিছুটা হলেও কমবে। কিছুটা হলেও নিশ্চিত করা যাবে তাদের অভিভাবকত্বের দায়বদ্ধতা।

সম্প্রতি বাংলাদেশে কর্মকান্ড পরিচালনাকারী স্পন্সরশীপ ফান্ড বেজড আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের নেটওয়ার্ক মিটিং- এ এই বিষয়গুলো উঠে এসেছিল সু-স্পষ্ট ভাবে। সে ক্ষেত্রে আমাদের করনীয়- ই বা কি।

মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে – মাত্র একহাজার টাকার দেনমোহরে বিয়ে হচ্ছে এই সব সুবিধা বঞ্চিত মেয়েদের। যাদের বয়স ১২ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে – কোন দেন মোহরই ধার্য করা হয়নি এমনকি বিয়ের রেজিষ্ট্রেশন করা হয়নি।

কোন কোন ক্ষেত্রে বড় অন্ধের যৌতুক দাবী করছে স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির পরিবার। সহায়হীন এইসব কিশোরীরা ছয় মাস না পেরোতেই সন্তান- সম্ভবা হয়ে যাচ্ছে। অপরিনত বাড়ন্ত পুষ্টিহীন শরীরে বেরে উঠে আরেকটি অনাগত ভবিষ্যত অপুষ্টিগত অভিশাপের বোঝা নিয়ে। জন্ম দিবে কিছুদিন পর আরেকটি অপুষ্টিতে আক্রান্ত প্রজন্ম। বেড়ে চলে মা ও নবাগত শিশুর জীবনের ঝুঁকি।

আমরা কি ভয়ানক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছি! এই বিয়ে গুলো কি একটা হেসে খেলে বেড়ানো এক একটা মেয়েকে আরো অসহায়ত্বেও দিকে ঠেলে দিচ্ছে না?

দিন দিন বেড়ে চলেছে পারিবারিক নির্যাতন ও বিবাহ বিচ্ছেদের মাত্রা। বেড়ে যাচ্ছে অবৈধ অনৈতিক সম্পর্কের সমীরন। যা আমরা সভ্য বলে পরিচয়দানকারী কোন নাগরিকই কামনা করিনা। কোন পরিসংখ্যান দাঁত করানো এই লেখাটির উদ্দেশ্য নয়। আমরা আমাদের পরিশীলিত মূল্যবোধ নিয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে সমাজের জন্য কত টুকু কাজ করছি, কতটুকু দায়িত্ব নিজের কাধে তুলে নিতে পারছি, কতজন অসহায় নারী – শিশুর পাশে দাঁড়াতে পারছি।

আমরা আমাদের কাউন্সেলিং, অ্যাডভোকেসি কার্যক্রমকে কিশোরীদের এবং তাদের মায়েদের দোর ঘোরার এখনও সফল ভাবে পৌঁছে দিতে পারিনি। তা না হলে আমাদের রিপোর্টের খাতা এতো পরিসংখ্যান দিয়ে ভারী করতে হতো না। সভা, সেমিনার, সিলোজিয়াম গুলো, সুন্দর সুন্দর পরিকল্পনা গুলো শুধু কম্পিউটারের মনিটরে সুদৃশ্য দেখাচ্ছে – সুন্দর আর সৌন্দর্যের অনুভূতি গুলো সেই সব সুবিধা বঞ্চিত মানুষের মাঝে পৌছে দিতে পারছিনা। আমাদের হাটতে হবে আরো অনেক অনেক পথ – বহু যোজনের পথ।

অনিয়ন্ত্রিত সম্পর্ক বেড়ে যাওয়ায় অভিভাবকরা উদ্বিঘ্ন হয়ে কিশোরী মেয়ের বিয়েটাকে সমাধান হিসাবে দেখেছেন। সেই সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন ভাইরাস “ইভ টিজিং”।

উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা গুলো যে সব কর্ম এলাকায় কাজ করে – যেখানকার বস্তি, গ্রাম কিংবা শহরে এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন জায়গা গুলোতে দেখা যায় অপরাধ প্রবণতার সর্বোচ্চ ধারাবাহিকতা। সেখানকার পরিবেশটাই এমন – ঘর থেকে বেরোলেই মেয়েটা বখাটেদের উৎপাতের মুখোমুখি হবে। তাই সবক্ষেত্রে আমরা অভিভাবকদের দোষারোপ করাটাও আমাদের জন্য যুক্তিযুক্ত হবেনা। অনেক সময় কিশোরী মেয়েটি হয়তো বাবা-মা’র শাসনে সম্মতি দেয় বিয়েতে – নতুবা বেদে নেয় আত্মহননের পথ। কিন্তু এটাই কি সমাধান ? আমরা কি কিছু ভাবছি ?

বিয়েটাকে আমরা সহজলভ্য করে তুলছি বাস্তবতার নিরিখে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কিশোরী মেয়েটির স্কুল ও সামাজিকীকরণের স্বাভাবিক বিকাশ। এমনও দেখা গেছে – জন্ম নিবন্ধন সনদে মেয়ের বয়স আসল জন্মতারিখের চেয়ে বাড়িয়ে দিচ্ছে যাতে করে দ্রুত বিয়ে দেয়া যায়। বা শিশুর মনস্তাত্বিক ও সাধারন আচরন স্পষ্ট হয়ে উঠে।

উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা গুলো শিক্ষা কার্যক্রমে শিশু শিক্ষাকে যুগোপযোগী ও আনন্দময় করে তোলার জন্য সর্বান্তকরণে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু শিশু সুরক্ষার ব্যাপারে পারিবারিক পর্যায়ে কতটুকু সে নিরাপদ ও সুরক্ষিত তার খবর আমরা রাখছিনা।

একটি শিশু যখন স্কুলে আসে – সেই সময়টিতে শিশু নাচে, গানে ও বিভিন্ন আনন্দ পূর্ণ শিক্ষা উপকরণের মাধ্যমে সহপাঠীদের নিয়ে দারুন উল্লসিত থাকে। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ফুন্ডসিয়ন ইন্টারভিডা স্কুল গুলোর প্রেক্ষিতে বলা হচ্ছে এই কথা গুলো। চিকিংসা, টিফিন, শিক্ষা ইপকরন, পোষাক সবই পেয়ে থাকে একটি শিশু। স্পখরশীপ কার্যক্রমের মাধ্যমে বিভিন্ন সময় চিঠি, কার্ড ,ও বিভিন্ন পুরষ্কার পেয়ে থাকে। বিনোদনের অংশ হিসেবে অংশ গ্রহন করে বিশাল এক আটর্ওয়া ক্যাস্পেইন – এ।

কিন্তু সকাল বেলায় যে শিশুটি বস্তি থেকে স্কুল ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে এসে হাজির হয় – মিশে যায় বন্ধুদের সাথে এক আনন্দের রাজ্যে। ভুলে যায় তার ক্ষুধা তৃষ্ণা। স্কুল থেকে বাসায় গিয়ে কি সে খাবার খেতে পারবে ? না কি না খেয়ে মায়ের বকুনি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে অনাদরে । না কি স্কুল ব্যাগ রেখে বেড়িয়ে পড়ে কাগজ কুড়াতে। খুঁজতে থাকে ফেলে রাখা পলিথিন,ডাস্টবিনের আবর্জনার মূল্যবান কিছু – যা দিন শেষে মূল্য দাঁড়ায় দশটাকা। মায়ের হাতে সেই টাকা তুলে দিলে কমে কিছুটা অভাবের সংসারে বকুনির মাত্র। কেউবা কাজ করে সিলভার কিংবা ব্যাটারী শিল্পের ঝুঁকিপূর্ণ দূষণযুক্ত কাজে। শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমে সে খবর রাখাটারও এখন আমাদের জন্য জরুরী। শিশু অধিকারের কথা বলে আমরা যারা চিৎকার করি – তাদের জন্য কিছু করুন -।

স্কুলে দেয়ালে সুন্দর সুন্দর পেইন্টিংস, আনন্দময় শিক্ষার যাবতীয় উপকরণ পুষ্টিকর টিফিন শিশুটির জন্য সহজলভ্য হলেও আরও মনোযোগী হওয়া জরুরী শিশুর আশপাশ ও তার পরিবারের দিন যাপনেও।

“লায়লা” যে এখন ইন্টারভিডা’র পরিচালিত একটি স্কুলে ক্লাশ সিক্সে পড়ে। যে স্বপ্ন দেখে একজন স্কুল শিক্ষিকা হবার। বাবা রিক্সাওয়ালা, মা অন্যের বাসায় বুয়ার কাজ করে। বড়ভাই ঢাকার ইসলামবাগে প্লাস্টিক ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। জীবিকার তাগিদে যাকে ৫ বছর বয়সে কাজে যেতে হয়েছে। ছোট বোনের বয়স এখন তিন। ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় নবোদয় হাউজিং বস্তিতে এক বৃদ্ধার সাথে সময় কাটে সারাদিন এই ছোট্র শিশুর। পনেরশ টাকা বাসা ভাড়া দিতে হয় তাদের। গাদাগাদি করে ৫ সদস্যেও এই সংসারের দিন-রাত্রি যাপন। বিদ্যুৎ বিল আলাদা দিকে হয় একটি বাল্বের জন্য। গ্যাস নেই- লাক্ড়ী দিয়ে রান্না। সেনিটেশন নেই। বর্ষা এলে জলাকার হয় চারপাশ – বেড়ে যায় তাদের দুর্ভোগ। সংসারে লেগে থাকে টানাপোড়ন। স্কুল থেকে এসে লায়লা জুড়ে দেয় রান্না – মা তখনো কাজে। ধোয়ায় লাল হয়ে উঠে দু’চোখ। চুলায় ফুঁক দিতে দিতে মুছে চোখ। ছোট বোন জরিয়ে ধরে পেছন থেকে। বাবা কিরে অনেক রাতে সারা দিনের ক্লান্তি নিয়ে। ভাই কোনদিন ফিরেনা। এই হলো লায়লার সংসারের দিবা-রাত্রির কাজ। সংসারের অভাবের টানাপোড়নে বাবা চায় -আর পড়নের দরকার নাই। বস্তির ছেলেরাও উৎপাত শুরু করে দিয়েছে। বাবা চাইছে বিয়ে দিয়ে দিতে।

লায়লার প্রতিটি দিন কাটে এই সব সমস্যার টানাপোড়নে। যেখানে তার স্বপ্নে বিভোর থাকার কথা স্কুলের পড়াশোনা, সহপাঠীদের নিয়ে খেলাধুলা। সেখানে এতটুকুন মেয়েকে প্রহর গুনতে হয় প্রতিদিনের তিক্ততার মুখোমুখি হয়ে কখন সে নিরাপদে ফিরবে বাসার। বাসার ফিরেও শুরু হয় আরেক সংগ্রাম।

শিশুদের আনন্দময় শিক্ষার জন্য শিশু স্কুল যেমন জরুরী, তেমনি শিশুর সুরক্ষার জন্য নীতিমালা গুলোর বাস্তবায়ন তেমনি জরুরী।

এই মূহুর্তে আমাদের প্রয়োজন সুবিধাবঞ্চিত অসহায় শিশুদের পাশে দাঁড়ানো। তাদের নূন্যতম যে মৌলিক মানবিক চাহিদা গুলো রয়েছে – তার কিয়দংশ হলেও বাস্তবায়ন করা। পাওয়ার জন্য তাদের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া। পেশাগত দিকের পাশাপাশি আমরা ব্যক্তিগত ভাবেও অসমতা কিছুটা কমাতে পারি।

আপনার বাসায় যে কাজের ছোট্র মেয়েটি কাজ করছে। তার পড়াশোনার ভার আপনাকেই নিতে হবে। বাল্যবিবাহ প্রতি রোধ করতে আপনিও পারেন আপনার দায়িত্বও টুকু পালন করতে।
সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়াতে আপনার ইচ্ছাটা যথেষ্ট। যদি আপনি মানবিক হন।

দূর নীল আকাশের সাদা বক উড়তে দেখে শিশুরা যেমন বিশেষিত হয় – একদিন তারা উড়বেই বিকাশিত হবেই – আপনার ভালবাসা প্রয়োজন। “ভালোবাসা পৃথিবীর সব সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য।”
————————————————————————-
-হাসান ইকবাল
ন্যাশনাল হেড অব চাইল্ড স্পন্সরশীপ, ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন,
ই- মেইল : hasan_netsu@yahoo.com

রচনাকাল :
নবদয় হাউজিং, মোহাম্মদপুর, ঢাকা ।
সকাল ৯:২৫ মিনিট, ২৯শে মার্চ ২০১১