ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

ভাষার মাধ্যমে মানুষ শুধু তার মনের ভাব প্রকাশই করে না, অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। নিজস্ব সংস্কৃতির নানান অনুষঙ্গ আদান-প্রদান করে। এই ভাষার দ্বারাই সৃজনশীল ক্ষমতার প্রকাশ ঘটায়। দেশে দেশে-সমাজে, ভাষার যেমন পার্থক্য বিদ্যমান। এই ভাষাই মানুষের সমাজ অর্থনীতি-বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটায়।

সমাজে আমরা নারীকে যেভাবে মূল্যায়ন করে থাকি, আমাদের ভাষাতেও তার প্রতিচ্ছবি পরিলক্ষিত হয়। নারীর জন্য অবলা, কোমল, নরম, লজ্জাবতী এসব শব্দ তৈরি করা হয়। অন্যদিকে পুরুষকে পৌরুষত্বের বীর গাঁথায় বীর বা শক্তিমানের সারিতে রেখে নারীকে রাঁধুনি, গৃহিনী, মায়াবতী, আখ্যা দিয়ে চার দেয়ালের অতন্ত্র প্রহরী করে রাখে। আর ভাষাগত অদৃশ্য দেয়ালের অবরোধে নারী হয়ে পড়ে অসহায়। যুক্ত হয় পুরুষতান্ত্রিক ভাষা, গালি ও নেতিবাচক শব্দের উৎপীড়ন, নিপীড়ন।

আমাদের ভাষার ভাব, শব্দ, ধ্বনি, অর্থ প্রভৃতি গড়ে উঠেছে সমাজ, রাষ্ট্র ও পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা দ্বারা। সমাজের প্রধান নিয়ন্ত্রক হচ্ছে পুরুষ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে পুরুষ, আধিপত্য বিস্তার করে পুরুষ, উপভোগ করে পুরুষ, মালিকানা ক্ষমতায়নকেই মর্যাদা দেয়। নারী পায় অবহেলা, অমর্যাদা, অপমান, লাঞ্ছনা, বঞ্জনা আর নিগ্রহ। তাই নারীর জন্য এ সমাজ যেন পৃথক ও দুর্বল ভাষাভঙ্গি তৈরি করে দিয়েছে। আমাদের সমাজে নারীর পারিবারিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নেই বলেই তার ধ্বনিগত বা বাকস্বাধীনতাও নেই। শিক্ষার অভাব, রক্ষণশীলতা, কুপমণ্ডুকতা, কুসংস্কার এবং পুরুষতান্ত্রিক কারণে নারী পিছিয়ে আছে। ভাষা যেমন ভাব প্রকাশের মাধ্যম, তেমনি কখনো নির্যাতনের মাধ্যম হয়েও দাঁড়ায়। পুরুষ নারীকে শারীরিক নির্যাতন যেমন করে, ঠিক তেমনি করে থাকে ভাষা দিয়ে নির্যাতন। কাব্যকথায় তাই বলা যায়-

হাতে যদি না মারিত,

শত মারিত ঠোঁটে।

হাতে শারীরিকভাবে নির্যাতন না করতে পারলেও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়- ঠোঁটে-মানে- অশ্লীল ভাষার মাধ্যমে। অশ্লীল, অকথ্য, গালিশব্দের মাধ্যমে কিভাবে নারীকে অবদমন, হেয় প্রতিপন্ন, তুচ্ছ, খাটো, নিন্দা বা অপমান করা যায় তার জন্যই পুরুষ তৈরি করে নিয়েছে আলাদা ভাষা যে ভাষায় চালায় নারীর প্রতি ভাষিক নিপীড়ন। গালিশব্দের ভাষা দিয়েই পুরুষ গড়ে তোলে নারীর প্রতি ভাষিক অবরোধ।