ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

আজকের দিনটা আমার খুব ভালো কাটবে তখনই বুঝে গেছি যখন অফিস থেকে বের হয়ে আমাদের নির্ধারিত এভেনজা গাড়িতে চড়ে বসলাম। গাড়িতে চড়ার সাথে সাথে আমাদের ড্রাইভার সিরাজ ভাই প্লেয়ারে বাজিয়ে দিলেন আসাম অঞ্চলের গান। একটা কেমন যেন স্নিগ্ধতার অনুভূতি পেলাম। আকাশ জুড়ে কালো মেঘ, আবার চোখ ধাঁধানো রোদ। আর আজকের দিনটি কাটাবো শিশদের সাথে। আজকে আমার সারাদিনের এসাইনমেন্ট হলো “ফটোগ্রাফি অন চাইল্ড্ পোর্ট্রেট”। সাথে তেমন ভালো ক্যামেরা নেই। নাইকনের পি সিরিজ নিয়েই শুরু করতে হবে।

আসাম অঞ্চলের গান শুনতে শুনতে মনে পড়ে গেল সেই সিলেটে থাকাকালীন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতিময় দিন গুলোর কথা। সামাজিক গবেষনার একাডেমিক অংশ হিসেবে গবেষনার কাজে এবং “সেভ দ্য চিলড্রেন-ইউ এস এ” তে “Provision of HIV prevention information to young people through mass and print media under the Global fund to fight AIDS.” প্রফেশনাল কাজের জন্য আমার অনেক সময় কেটেছে সিলেটের চা বাগান গুলোতে ইয়ূথ ও এডলসেন্ট পিপলদের সাথে। সে এক দারুন অভিজ্ঞতা। সে নিয়ে পড়ে একদিন লিখার আশা রাখছি। সেই সময় গুলোতে চা বাগানে অনেক গান শুনেছি। অনেক মনিপুরী গানতো বটেই। তো, আজ “আম পাতা লম্বা লম্বা” শুনে সেই স্মৃতিজাগানিয়া দিন গুলো ভেসে উঠল চোখের পাতায়।

“আম পাতা লম্বা লম্বা
তেঁতুল পাতা ছোটারে
শহরের ঐ দুলারীর কি
কেঁশ ছোটা ছোটা।

বাঁও মোর কর্মচারী
অল্প টাকা বেতন
হায়রে অল্পটাকা বেতন,
নাই দিতে পারব আমি সোনা চাঁন্দী চুড়ি।

মুই দু:খী বাগানীয়া
দু:খ জীবন সাথী রে
দু:খ জীবন সাথী।

তোকে দিতে পারব আমি
চা বাগানের হাসি
হায়রে চা বাগানের হাসি।

বড় বাপের বড় বেটি
কেনে মন চুরালী
মন কেনে চুরালী।

থাকিস যদি মোর বাগানে
দেবরে চিনি চুঁড়িরে
দেবরে চিনি চুঁড়ি।”

আজকের ট্যুরটা খুব টাফ একটা জব। ছোট বাচ্চাদের ছবি তোলা কঠিন কাজ। আন-কনশাসলি ওদের এক্সপ্রেসন কেপচার করতে হয়। যাদের কথা বলছি। আমাদের চিলড্রেন হোমের শিশুদের কথা। ঢাকার উত্তরার সেক্টর সাথে আমাদের এই শিশুরা থাকে। খুব-ই মিশুক ও দুষ্টুমিতে ভরা এই শিশুদের সাথেই আমার সারাদিনের কাজ। আজ ৪৬ চিলড্রেন-র উপর ফটোগ্রাফি করব। মূলত: এই শিশুদের স্পন্সরদের কাছে আপডেট তথ্য পাঠানোর জন্যই আজকের সেসন।

শিশুদের সামাজিকীকরন প্রক্রিয়া যেমন বিভিন্নতা রয়েছে তেমনি বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য গুলোও একেক রকমের। সে এক বিশাল রহস্যময়তার ঘেরা শিশুদের মনোজগত।

আমাদের চিলড্রেন হোমের শিশুদের ম্যানেজারকে আগেই ই-মেইলে জানিয়ে রেখেছিলাম আমাদের আসার কথা, তাই তারা প্রস্তুতও ছিলেন। আমাদের কে হোমের প্রতিটি ছেলে-মেয়েই চেনে। হোমে নতুন কোনো অতিথি এলে ওদের মধ্যে হৈ হৈ রব উঠে…আনন্দে উদেবলিত হয়। আর মিষ্টি মিষ্টি তাদের নাম।

কেউ কেউ হাজির হয় তাদের ড্রয়িং খাতা নিয়ে। আমি একদিন একটা প্রকান্ড “ডাইনোসর” আর “ইতলে ভূত”, “বিতলে ভূত”, মামদো ভূতের” ছবি একে দিয়েছিলাম তাদের খাতায়। সেই থেকে…তারা অপেক্ষায় থাকে কবে আসব …আরো কোনো নতুন ভূত নিয়ে।


(শিশুদের সাথে একটি মুহূর্ত…..শাটার ক্লিক করেছিল সাগর ভাই)

ছবি তুলে যাচ্ছি একের পর এক। কিন্তু সূয্যিমামা খুব ডিস্টার্ব করছিল।
আর শিশুরা যেন আজ ছুটি পেল। ছোটাছুটি, হৈ-হুল্লোড় বেড়ে গেল। ভিজিট করলাম শিশুদের থাকার ঘর, খাবার ঘর, পড়ার টেবিল, বিনোদনের জায়গা, আনন্দময় শিশু শিক্ষা উপকরন, খেলাধুলার সরঞ্জাম।

ছবি তোলা শেষ।
বিকেলে বসতে হবে সাড়ে চারশ ছবি নিয়ে আমার ডেস্কে। ছবি বাছাই করে পাঠাবো এফ টি পি সার্ভারে।
অনেক কথা হলো, গান হলো, ছবি তোলা হলো…আমাদের গাড়ি ছেড়ে দিল চিলড্রেন হোম থেকে। পিছনে হাসি খুশি অনাথ শিশুদের মুখ পড়ে রইলো। টা-টা….বাই…বাই….

এবার আমার কথায় ফিরে আসি।
আমি আমার চাকুরী সূত্রে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করছি একটি স্পানিশ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায়। চাইল্ড্ রাইটস প্রমোশন এবং কোলাবরেটরদের স্পন্সরশিপ নিয়ে কাজ করছি। প্রায় আট হাজার শিশু নিয়ে আমাদের এই বিরাট শিশু পরিবার। তার সাথে আছে তাদের পরিবাররের অন্যান্য সদস্যরাও। সুবিধাবঞ্চিত সেই শিশুদের মুখে হাসি ফুটানোর জন্যই আমাদের নিরন্তর প্রচেষ্টা। সেই প্রচেষ্টার নাম- “ফুন্ডাসিয়ন ইন্টারভিডা”।
১৯৯৯ সাল থেকে স্পানিশ এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটি বাংলাদেশে সুবিধা বঞ্চিত ছেলে মেয়েদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। চাইল্ড স্পন্সরশীপ প্রোগ্রামের মাধ্যমে ছেলে মেয়েরা স্কুলে ভর্তির সুযোগ পায়। ইন্টারভিডার শিক্ষা বিভাগ স্কুল গুলো পরিচালনা করে থাকে ।

ফুন্ডাসিয়ন ইন্টাভিডার জন্ম ২৪ ফের্রুয়ারী ১৯৯৪ সালে স্পেনের বার্সেলোনাতে । এটি একটা উন্নয়নে সাহায্যকারী অলাভজনক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য দরিদ্র, সুবিধা বঞ্চিত মানুষের জীবনমান উন্নয়ণ- যাতে করে তারা সম্মানজনক জীবনের অধিকারী হয়ে নিজেদের ভাগ্য উন্নয়ন করতে পারে।

……………ভালোবাসা সকল সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য।