ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

ছোটবেলায় বাবার মুখে তাদের শিক্ষাজীবনের কাহিনী মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। বাবা বলতেন যে তারা যখন কোন জায়গায় গিয়ে বলতেন যে তারা স্টুডেন্ট তখন আশেপাশের সবারই ভাবভঙ্গিতে পরিবর্তন আসতো। কেউ তাদেরকে বসার জায়গা দিতো, কেউ আদর আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতো, কেউ এসে কুশল বিনিময় করতো। মোটকথা সবাই যার যার সাধ্যমত চেষ্টা করতো। এর কারণ হিসেবে বাবা বলতেন যে তাদের সময়ে শিক্ষার্থী মানেই ছিল ভদ্রতা, আদর্শ, সততা ইত্যাদি নৈতিকতার প্রতীক।

বাবার কথাগুলো তখন চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করলেও এখন বিশ্বাস করতে একটু দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়তে হয়। কেননা, এখন আমরা কোন জায়গায় গিয়ে বলি যে আমরা স্টুডেন্ট তখন আশেপাশের সবার ভাবভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে ঠিকই কিন্তু সেটি অনেকটা এরকমঃ কেউ বিরক্ত হয়, কেউ ভয়ে আতঁকে উঠে, কেউ দৌড় দিয়ে পালিয়ে যায় কিংবা কেউ পেছনে পেছনে গালি দুটো দিয়ে যায়। এর কারণ কী? কারণটি স্পষ্ট। তা হলো বাবা যে বিষয়গুলো বলেছিলেন সেগুলো এখন মনে হয় শুধু বইয়ের পাতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ভদ্রতা, আদর্শ কিংবা সততা এই জিনিসগুলো কি খায় নাকি মাথায় দেয় আমরা তো তাই জানি না।

শিক্ষার্থীদেরকে বর্তমানে মানুষ কিভাবে সংজ্ঞায়িত করে তার একটি ছোট্ট ঘটনার মাধ্যমে বলি। ঘটনাটি শুনেছি আমার এক ভাইয়ের কাছ থেকে। সে একদিন ঢাকার একটি সুপরিচিত বাস দিয়ে যাচ্ছিল। বাসটি বেপরোয়াভাবে চালানোর কারণে হঠাৎ তার পাশের বাসের লুকিং গ্লাসটি ভেঙে ফেলে। তো….দ্বিতীয় বাসের হেল্পার এসে এই বাসের ড্রাইভারকে বলে যে অই মিয়া গ্লাস ভাঙছেন টাকা দেন। ড্রাইভার নির্বিকার। সে খুব শান্তভাবে বলে যে, টাকা দিমু না। কী করবি? দেখছস আমার বাসে কারা বইসা রইছে? হেল্পার তাকিয়ে দেখে বাস ভর্তি স্টুডেন্ট। সে এটা দেখে চুপচাপ নেমে চলে গেল। এর মানে কী দাড়াঁলো? বাসে কারা বসা? সন্ত্রাসী নাকি গুন্ডা?

বর্তমানে আমরা যারা শিক্ষার্থী আমাদের গুণের কথাতো বলে শেষ করাই যাবে না। প্রথম গুণ বাসে চড়ে ভাড়া না দেওয়া। শিক্ষার্থীদের জন্য বাসের মধ্যে আগে থেকেই হাফ ভাড়া প্রচলিত। কিন্তু আমরা যেহেতু স্টুডেন্ট, আমরা হাফ ভাড়া কেন দেব? আমরা কোন ভাড়াই দেব না। দেখি কে আসে ভাড়া খুঁজতে। যে আসবে তার হাড়গোড় ভাইঙ্গা দেব না? বেয়াদপ…কত বড় সাহস আমার কাছে ভাড়া খোঁজে। আমার একভাইয়ের একটা ঘটনা বলি, সে সাতরাস্তা থেকে যাত্রাবাড়ী গিয়েছে। যাওয়ার পর হেল্পারকে ভাড়া দিলো ১ টাকা। হেল্পার বলে এডা কী দিলেন? সে বলে, ঠিক মামা, বেশি দিয়ে ফেলছি…আটআনা দেওয়া দরকার ছিল।

আমাদের দ্বিতীয় গুণ আমরা কিছু হলেই ভাঙচুর করতে পারি। আমি আমার আগের একটা লেখায় এ ব্যাপারে লিখেছি। আমরা কিন্তু গাড়িঘোড়া এই জন্য ভাঙ্গি কারণ দেশের সব গাড়ি ঘুষের টাকায় কেনা।

আমাদের অন্যতম সেরা গুণ- যেখানে সেখানে মারপিট করাতে আমরা উস্তাদ। কেউ আমাদের সাথে কিছু করলেই হইছে। তার টেংরিডা ভাইঙ্গা দিয়া আসি আমরা। কেউ আমার দলেরে সাপোর্ট না করলে সে তো বহুত বড় পাপ করছে। তারে হাসপাতালে পাঠানো আমার একান্ত নৈতিক দায়িত্ব।

যা হোক… লেখা বড় হয়ে যাচ্ছে……..আমাদের গুণের কথা তো আর বলে শেষ করা যাবে না। চাদাবাজি, লুটতরাজ, বেয়াদপি ইত্যাদিতে আমাদের জুড়ি নেই। আমরা স্টুডেন্ট।

ভাবতে অবাক লাগে….এই আমরা বায়ান্নতে দেশের ভাষার জন্য লড়াই করেছি, এই আমরা বাষত্তি, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অগ্রনায়ক ছিলাম, এই আমরাই তো এনে দিয়েছি দেশকে স্বাধীনতা অথচ আজ এই আমরাই দেশকে উপহার দিচ্ছি অরাজকতা, দুর্নীতি, বিশৃঙ্খলা। কারণ আমরা কইলাম স্টুডেন্ট।