ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

আমাদের এই ভূ-খণ্ডের অসংখ্য বীরত্বের কাহিনী পৃথিবীবিখ্যাত। ধারাবাহিকভাবে এসব কাহিনী বা কাহিনীর নায়কদের বর্ণনা ব্যাপক সময়সাপেক্ষ। এসব বীরত্বের ঘটনা কোনো একক গোষ্ঠি বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়। সর্বস্তরের মানুষ অবদান রেখেছে সময়ের চাহিদায়। একজন জমিদার থেকে শুরু করে দরিদ্র পরিবারের একজন কিশোর বালকও বীরত্ব দেখিয়ে গেছেন বাংলার জন্য, এই অঞ্চলের স্বাধীনতার জন্য। যুগে যুগে অবদান রেখে গেছেন কলমসৈনিকরাও, ভাবনার রাজারাও।

বিশ্বব্যাপী মানবতার মুক্তি, স্ব-স্ব দেশপ্রেম, মাতৃভাষা, ইতিহাস ও ঐতিহ্য, সর্বোপরি মানুষের অধিকার রক্ষায় বিশ্বব্যাপী কবি সাহিত্যিকরা অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন। এখনো রেখে চলেছেন। বিশ্বের যেখানেই মানবতা বিপন্ন, কিংবা অধিকারহারা মানুষের চিৎকার অথবা গণতন্ত্র বিপর্যয় সেখানেই দেশপ্রেমিক কবি সাহিত্যিকরা ভূমিকা রাখছেন প্রতিনিয়ত।  তদ্রুপ স্বকীয় ছিল এই অঞ্চলের কবি-সাহিত্যিকরাও।

বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ইংরেজরা এ দেশে শাসনের নামে শোষণ শুরু করে। তাদের অত্যাচার, নিপীড়ন ও নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে গোটা ভারতবর্ষ। তাদের অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে দেশপ্রেমিকরা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কবি সাহিত্যিকরা তাঁদের সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে দেশবাসীকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অনুপ্রেরণা জোগান। তারপর ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে এ দেশের স্বাধীনতার চেতনা ও  স্বাধীনতা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়।

বহুকাল আগে থেকেই এ দেশের কবিদের ভেতর দেশপ্রেমের উন্মেষ ঘটেছিল। বাংলাদেশ যেহেতু কবির দেশ, কবিতার দেশ, গানের দেশ, সুরের দেশ, সেই কারণে এ দেশের কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও গীতিকারের কলমে দেশপ্রেমের গান ও কবিতা উঠে এসেছে বারবার।

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমাযুন আজাদ তার লাল নীল দীপাবলী বা বাঙলা সাহিত্যের জীবনী বইতে উল্লেখ করেছেন- ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পরিবর্তনের ইতিহাসকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা হয়। প্রাচীন যুগ (৯৫০-১২০০খ্রিস্টাব্দ), মধ্যযুগ (১৩৫০-১৮০০খ্রিস্টাব্দ) এবং আধুনিক যুগ (১৮০০খ্রিস্টাব্দ-বর্তমানকাল)।’ আমরা দেখেছি, এ-তিন যুগের সাহিত্যই বাঙলা সাহিত্য, কিন্তু তবু বিষয়বস্তুতে, রচনারীতিতে এ-তিন যুগের সাহিত্য তিন রকম। এর বাইরেও আরো দুটি সাহিত্যযুগের কথা এতে  উল্লেখ করা হয়েছে, উত্তর আধুনিক যুগ (১৯০০খ্রিস্টাব্দ-১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ) এবং বর্তমান যুগ।

প্রতিটি যুগেই কবি-সাহিত্যিকরা নিজের মতো করে বাংলা ভাষাকে, বাংলা ভূ-খন্ডকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। একথা অনস্বীকার্য যে, বাংলাসাহিত্যের কবিতার শাখাটি দেশপ্রেমের কবিতায় সমৃদ্ধ। কবি-সাহিত্যিকরা দেশপ্রেম গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারেন বলে যুগে যুগে যত কবি-সাহিত্যিক জন্মগ্রহণ করেছেন, তাঁদের অধিকাংশই লিখেছেন ভালোবাসার স্বদেশকে নিয়ে। আমাদের বাংলা কবিতা ও সাহিত্যেও দেশপ্রেমের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।

ঊনিশ শতকে বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কবি নবীনচন্দ্র সেন। বাংলা সাহিত্যের এ যাবতকালে পাঁচজন কবিকে মহাকবি বলা হয়। এরা হচ্ছেন- মাইকেল মধুসুদন দত্ত, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন, কায়কোবাদ এবং ইসমাইল হোসেন সিরাজী। নবীনচন্দ্র এই পাঁচ মহাকবির মধ্যে অন্যতম। তিনি সবার থেকে বেশি মহাকাব্য রচনা করেছিলেন। নবীনচন্দ্র সেনের আরো একটি অনন্যতা রয়েছে- তিনিই এই অঞ্চলের প্রথম সার্থক ‘দেশপ্রেমিক কবি’ স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।

যুগপথিক কবি নবীনচন্দ্র সেন ১৭০ বছর আগে এই দিনে (১৮৪৭ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি) চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানার অন্তর্গত পশ্চিমগুজরার (বর্তমান নোয়াপাড়া) সুপ্রসিদ্ধ প্রাচীন জমিদার রায় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। এই দেশপ্রেমিক কবির প্রতি থাকছে শুভেচ্ছা এবং অভিবাদন।

নবীনচন্দ্র সেন তখনকার সেই বৈরি সময়েও উচ্চশিক্ষা গ্রহন করছিলেন। তিনি ১৮৬৩ সালে চট্টগ্রাম স্কুল (বর্তমানে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল) থেকে এন্ট্রাস,  ১৮৬৫ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ (বর্তমান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে এফ.এ. এবং ১৮৬৮ সালে জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশন (স্কটিশচার্চ কলেজ) থেকে বি.এ. পাস করেন। ওই বছরেই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ পান। দীর্ঘ ৩৬ বছর সততা ও কর্তব্যনিষ্ঠার সাথে সরকারী চাকরি করে ১৯০৪ সালে অবসর গ্রহণ করেন। ১৮৭১ সালে কবি নবীনচন্দ্র সেন চট্টগ্রামে বিভাগীয় কমিশনারের পার্সোন্যাল এসিস্ট্যান্ট পদে বদলি হয়ে আসেন। সে সময় চট্টগ্রাম শহরের শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রভুত উন্নতিসহ ফেনী সাবডিভিশনকে একটি পূর্ণাঙ্গ শহরে প্রতিষ্ঠিত করেন। চট্টগ্রামের সাথে নোয়াখালীর রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিতেও তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন।

ছাত্রাবস্থায় প্যারীচরণ সরকার সম্পাদিত ‘এডুকেশন গেজেট’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘কোন এক বিধবা বাসিনীর প্রতি’ নবীনচন্দ্র সেনকে কবিখ্যাতি দেয়। পরে এই কবিতাটি দেশপ্রেম ও আত্নচিন্তামুলক কবিতা সংকলন ‘অবকাশরঞ্জনী-তে’ সংকলিত হয়। এর প্রথম ভাগ প্রকাশিত হয় ১৮৭১ সালে এবং এর দ্বিতীয় খন্ড প্রকাশিত হয় ২৯ জানুয়ারি, ১৮৭৮ সালে। এটি ছিলো দেশপ্রেম ও আত্মচিন্তামূলক কবিতার সংকলন। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ পলাশীর যুদ্ধ (১৮৭৫) কবি নবীনচন্দ্র সেনকে বাংলার কাব্যজগতে স্থায়ী আসন এনে দেয়। একই সঙ্গে দেশপ্রেমিক কবি হিসেবেও স্বীকৃতি এনে দেয়। পলাশীর যুদ্ধ কাব্যটি মহাকাব্য লক্ষণ যুক্ত। এই কাব্যে তাঁর দেশপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যায়। তখন কাব্যটি সরকারের কোপদৃষ্টিতে পড়ে। যে কারণে কর্মজীবনে তাঁর পদোন্নতি বিলম্বিত হয়।

আধুনিক বাংলা মহাকাব্য ধারার শেষ কবি কায়কোবাদ। তার প্রকৃত নাম মোহাম্মদ কাজেম আল কোরেশী। তিনি নবীনচন্দ্র সেনের ধারাতেই মহাকাব্য রচনা করেছিলেন। নবীনচন্দ্রই ছিলেন তার প্রধান আদর্শ। নবীনচন্দ্র সেনের রচিত মহাকাব্য ‘রৈবতক’ (১৮৭৫), ‘করুক্ষেত্র’ (১৮৯৩), এবং ‘প্রভাস’ (১৮৯৬) এই কাব্যত্রয়ীকে দ্বিতীয় মহাভারত বলা হয়।  এমনকি কাব্য তিনটি একটি বিরাট কাব্যের তিনটি স্বতন্ত্র অংশ। এই তিনটি মহাকাব্যে কবি কৃষ্ণচরিত্রকে বিচিত্র কল্পণায় নতুনভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।

 

নবীনচন্দ্র সেনের প্রকাশিত অন্যান্য গ্রন্থ হলো- আখ্যান কাব্য রঙ্গমতী (১৮৮০), মার্কন্ডের চন্ডী (১৮৮৯), পদ্যানুবাদ শ্রীমদ্ভগবদগীতা (১৮৮৯), ভ্রমণবৃন্তান্ত প্রবাসের পত্র (১৮৯২), প্রবাস (১৮৯৬), নাটিকা- শুভ নির্ন্মাল্য (১৯০০), উপন্যাস- ভানুমতি (১৯০৪)। কবি নবীনচন্দ্র সেনের আত্নচরিত্র ‘আমার জীবন’ পাঁচ খন্ডে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসের মতই এটি একটি সুখপাঠ্য গ্রন্থ। এর প্রথম ভাগের প্রকাশ লেখক জীবদ্দশায় দেখে গেছেন। পরের খন্ডগুলো বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক সজনীকান্ত দাশের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে। এই বইটি এদেশে প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের প্রামাণিক দলিল হিসেবে বিবেচ্য। এছাড়া তিনি যিশুখ্রিষ্টের জীবনকাহিনী অবলম্বনে খৃষ্ট, বুদ্ধদেবের জীবনচরিত অবলম্বনে অমিতাভ (১৮৯৫), শ্রীচৈতন্য জীবন অবলম্বনে জীবনীকবাব্য ‘অমৃতাভ’ রচনা করেন।

 

নবীনচন্দ্র সেন অপরূপ বর্ণনা শক্তির অধিকারী। অসংযত উদ্দাম ও ভাবোন্মাদনা তাঁর কাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। মহৎ ও মহত্বের প্রতি তিনি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ প্রতিষ্ঠাতেও মহাকবি নবীনচন্দ্র সেনের বিশেষ ভূমিকা ছিল। তিনি পরিষদের প্রথম সহকারী সভাপতি নির্বাচিত হন। রানাঘাট এবং আলীপুরে কর্মরত থাকাকালে তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের কর্মকান্ডের সাথে জড়িত থাকেন। উনবিংশ শতাব্দীর বাংলায় রেনেসাঁর অন্যতম প্রতিভূ হিসেবে কবি নবীনচন্দ্র সেন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

 

 

লেখক: সাংবাদিক।