ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

অভিবাসন সমস্যায় থাকাদের মধ্যে এই মুহূর্তে সারাবিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত নাম ‘রোহিঙ্গা’। কিছুদিন রোহিঙ্গাদের গণনায় একটি জরিপ চালায় সরকার।  প্রাথমিক ধারণা করা হয়েছিল বাংলাদেশের সীমাবর্তী জেলাগুলোতে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিয়ে বসবাস করছে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এসব নাগরিক গণনা করতে গিয়ে সরকার দেখছে মাকড়সার জালের মতো পুরো বাংলাদেশেই ছড়িয়ে গেছে রোহিঙ্গারা। এর প্রমাণ মিললো রোববার ধানমন্ডি থানায় হওয়া একটি মামলা থেকে।

রাজধানীর ধানমণ্ডিতে এক কিশোরি গৃহকর্মীকে ধর্ষনের অভিযোগ উঠেছে। রোববার তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ফরেনসিক বিভাগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। এ ঘটনা থানায় মামলা হয়েছে।

বলা হচ্ছে, মেয়েটি মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিল। ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা ১১/এ নম্বর রোডের ৫/এ নম্বর ফ্লাটে এই মেয়েটি গৃহকর্মী হিসেবে থাকতো। ধর্ষণের অভিযোগে থানায় মামলা হয়েছে। শনিবার ওই ধর্ষিতা নিজে বাদি হয়ে তার গৃহকর্তা আইনজীবী কাজী মহতুল হোসাইন যত্নের (৫৫) বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করেন।  মামলার এজাহারে বাদি উল্লেখ করেন, গত ৪ বছর পূর্বে তিনি মিয়ানমার থেকে কক্সবাজার আসার পথে পুলিশের কাছে আটক হন। সেখান থেকে পুলিশ তাকে বান্দরবন কোর্টে সোপর্দ করে। পরে এ্যাডভোকেট কাজী মহতুল হোসাইন তাকে ছাড়িয়ে আনেন। তার বাসায় গৃহকর্মীর কাজ দেয়। এরপর বিভিন্ন সময় কাজী মহতুল তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করতো। তা গোপন রাখার জন্য ভয়ভীতি দেখাতো। সর্বশেষ গত শনিবার সকাল ৭টায় তাকে ধর্ষণ করে বলেও মেয়েটি জানিয়েছে। রোববার দুপুরে অভিযোগকারী গৃহকর্মীকে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পরীক্ষা শেষে ঢাকা সিএমএম কোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়।

এই ঘটনা থেকে তিনটি বিষয় ইঙ্গিত করে। প্রথমত, অনেক আগে থেকে বাংলাদেশে মোটাদাগে রোহিঙ্গা আসছে। রোহিঙ্গারা অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশে আসে, এটা মোটামুটি প্রমাণিত। কিন্তু এই হার অনেক বেশি ছিল আগে থেকেই এই তথ্যটি আমাদের জানা ছিল না।  দ্বিতীয়ত, দুর্বলের প্রতি সবলের অত্যাচার পৃথিবী জোড়া হয়। আর তৃতীয়ত, যেটি সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক, তা হলো- আরাকান আর্মিদের হাতে প্রাণ বা সম্ভ্রম হারানোর ভয়ে বাংলাদেশে এসেও দিনের পর দিন রোহিঙ্গা মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এটি আমাদের জাতিগত লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজধানীতে প্রায়ই গৃহকর্মী ধর্ষণের সংবাদ পাওয়া যায়। এটি এখন একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু নিগ্রহের শিকার মেয়েটির বৈশিষ্ট্য নিয়েই মূলত আলোচনাটা বেশি আসে। যেমন- যদি খুব কম বয়সী কোনো মেয়ে নির্যাতনের শিকার হয়, কর্মক্ষেত্রে যদি কেউ নির্যাতিত হয়, কোনো শৃঙ্খল বাহিনী কর্তৃক যদি এমন ঘটণা ঘটে প্রভৃতি। এই মেয়েটির ক্ষেত্রেও বিষয়টি তেমন হয়েছে। যেহেতু, সে এই দেশে এসেছে জীবন রক্ষার জন্য, তাকে কোনো ভাবেই নির্যাতন মেনে নেয়া যায় না। তারউপর কূটনৈতিকভাবে আমরা এখন রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে কথা বলছি। ক’দিন আগে মাত্র আনান কমিশন ঘুরে গেল দেশ থেকে। অং সান সুচির বিশেষ দূতের সঙ্গে এ বিষয়ে বলিষ্ট অবস্থান নিয়ে আমরা কথা বলেছি। ওআইসি সম্মেলনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমরা আমাদের পরিষ্কার অবস্থান জানিয়ে এসেছি। সবচেয়ে বড় কথা, বর্তমানে এই ইস্যুতে জাতিসংঘের বিশেষ দূত বাংলাদশে অবস্থান করছেন। এই অবস্থায় এ ধরনের শুধুমাত্র একটি সংবাদ পুরো দেশের ভাবমুর্তি নষ্ট করে দিতে পারে। সেক্ষেত্রে আমাদের দাবি থাকবে, এই মামলার দ্রুত রায় দেওয়া উচিত। একটি সমীচিন বিচার হওয়া উচিত। যদিও সব ধরনের যৌন নির্যাতনের বিচার আমরা প্রত্যাশা করি, দ্রুততম সময়েই প্রত্যাশা করি। কিন্তু এই ঘটণাটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার দাবি রাখে।

কদিন আগেও আমরা দেখেছি আরাকান আর্মিদের লোমহর্ষক নির্যাতনের ভিডিও। এসব ভিডিও’র অধিকাংশই এডিট করা। হয়তো কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোর লক্ষ্যে কেউ ছড়িয়ে থাকতে পারে, কিন্তু কিছু ঘটনা তো ঘটেছে, এটা মানতে হবে। এমনকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কয়েকদিন আগেও আনান কমিশনকে জানানো হয়েছে, ‘বাংলাদেশে আসা ৮০ শতাংশ রোহিঙ্গা নারীই মিয়ানমারে ধর্ষণের শিকার’। এমনকি এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল দায়িত্ব নিয়েই বলেছেন যে, আনান কমিশন এই তথ্যের সঙ্গে দ্বিমত করেনি। তার মানে বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত সত্য।

এখন তাহলে আমরা কী করলাম! একজন মহতুল হোসাইনের জন্য তো আমরা জাতিগত ভাবে দায় নিতে পারি না। তাই এই ঘটনার আশু বিচার নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। অন্তত, যাতে এই বিষয়টিকে যেন আর কোনো খাতে প্রভাবিত করতে না পারে কেউ।

ধর্ষণ এখন একটি সামাজিক ব্যাধি। উন্নত থেকে উন্নতশীল দেশ, হতদরিদ্র দেশে গরিব, মধ্যবিত্ত এমনকি বিত্তশালী সমাজ মেয়ে শিশু ও নারীরা ধর্ষণের শিকার হয়। আমাদের সমাজে ধর্ষণ একটি আতঙ্কের নাম। প্রতিটি দেশে, প্রতিটি সমাজে প্রতিটি ব্যবস্থায় ধর্ষণকে সব থেকে বড় এবং ঘৃণ্য অপরাধ বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে অন্যান্য দেশে দ্রুত এসব মামলার বিচার হয়, উপযুক্ত বিচার হয়। কিন্তু আমাদের দীর্ঘসূত্রিতা হয়।

তারপরেও বলবো, নারী ও শিশু নির্যাতনের কঠিন আইন বাংলাদেশে বিদ্যমান। বর্তমান সরকারের প্রতি দেশের মানুষের আস্থা রয়েছে। আমরা আশা করবো, জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের মূল্যায়ন করে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধ করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত হবে। আর এই ঘটণাকে যেন কোনো ভাবেই হালকা ভাবে না নেওয়া হয়।

 

লেখক: সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক।

ইমেইল: hasanf14@gmail.com