ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

জার্মান শিশু-শিক্ষানুরাগী ফ্রেডরিখ ফ্রোয়েবল ১৮৩৭ সালে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন। তিনি মূলত মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি এটি প্রবর্তন করেছিলেন। এই শিক্ষা ব্যবস্থার আধি ইতিহাস থেকে যতদূর জানা যায়, এই শিক্ষা ব্যবস্থার আলাদা কিছু উদ্দেশ্য ছিল।

শিশুদের খেলার ছলে ছলে শেখানো বা বিনোদনের মাধ্যমে পাঠ দান করাই হচ্ছে এই শিক্ষা পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য। শ্রেণী শিক্ষক বিভিন্ন ধরণের শিক্ষা উপকরণ সঙ্গে রাখবেন এবং এগুলোর বাস্তবমূখী কলা-কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে শিশুদের মনোযোগ আকর্ষণ করবেন। এভাবে বিভিন্ন বিষয়ে পড়াবেন ও পড়তে উদ্বুদ্ধ করবেন।

কালক্রমে এই শিক্ষাব্যবস্থা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রবর্তিত হয়। অধিকাংশ দেশেই এটি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। আমাদের দেশেও দুই যুগের কাছাকাছি সময় হলো এই শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়েছে। তবে গত এক দশকে এটি তার কিছু চরিত্র বদলেছে। শুরুর দিকে সীমিত পরিসরে থাকলেও বর্তমানে এর সংখ্যা ও আওতা বেড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- আমাদের দেশে কি এই শিক্ষা ব্যবস্থা তার মূল উদ্দেশ্য নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে?

School-bags

নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান ছাড়া পরিচালনা, দেশিয় ক্যারিকুলামের পুরোপুরি অনুপস্থিতি, লাগামহীন শিক্ষা ব্যয়, নীতিমালাহীন শিক্ষা কার্যক্রম, প্রভৃতি বিষয়ের প্রেক্ষিতে এই প্রশ্ন বেশ আগে উঠলেও এখন বেশ জোরালো হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গত মাসে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে ‘সেশন ফি’ নিয়ে উচ্চ আদালতের রায় এবং পরবর্তীতে অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক তা ভঙ্গ করার খবর প্রকাশের কারণে।

মোটা দাগে আমাদের দেশে প্রথম থেকেই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হচ্ছে। প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই গড়ে উঠেছে আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাট ভাড়া করে। স্বভাবতই বলা যায়, যে পরিবেশে আমাদের দেশে এই শিক্ষা পাঠ দেওয়া হয় তাতে খেলাধুলা বা বিনোদনের সুযোগ নেই।

আমাদের দেশে যখন নব্বই দশকের পর ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলো গড়ে উঠছিল, তখন বলা হয়েছিল- বিনোদনের মাধ্যমে শিক্ষা, যুগোপযোগি শিক্ষা, পাশ্চাত্যের আদলে দেশেই পড়াশুনা, প্রভৃতি উৎসাহব্যঞ্জক কথাবার্তা। তখন নীতিনির্ধারক ও অভিভাবকরা ভাবলো- এখনকার সময় প্রতিযোগিতামূলক, পড়াশুনার পাশাপাশি অন্য বিষয়েও পারদর্শিতা থাকাটা জরুরী। কিন্তু এসব করতে গিয়ে বাচ্চাদের হাতে সময় থাকে না। কিন্তু তাদের মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলাও জরুরী। বাসায় যে খেলাধুলা করবে সেই অবস্থাও নেই, কারণ তাদের ওপর যে চাপ যায় তাতে খেলাধুলার অবসরটুকু পায়না। সেক্ষেত্রে এসব স্কুলকে অনেকেই সাদরে গ্রহণ করেছিল। সবার ভাবনা ছিল- ভাল ক্যারিকুলামের পড়াশুনা হবে, তবে শিশুরা খেলবে বেশি পড়বে কম।

কিন্তু বর্তমানে তার উল্টো চিত্র দেখতে হচ্ছে। কোমল বাচ্চাদের কাঁধে এক গাদি বই এবং তাতে প্রচুর পড়া। প্রতিদিন হোমওয়ার্ক নামক জাঁতায় তাদের হৃদয়-মন পিষ্ট হয়ে সুন্দর চেহারাগুলো মলিন হয়ে যায়। বাবা-মাদের অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এক প্রকার চেপে ধরে জোর করে তাদের পড়াগুলো গলধঃকরণ করানো হচ্ছে। এতে তাদের মেধা মনন বিকশিত হচ্ছেনা। এ কারণে এখনকার ছেলেমেয়েরা বেশি বেশি পড়ে, কিন্তু ভুলে যায় তাড়াতাড়ি। সব পড়তে যেয়ে যেন কোন কিছুই পড়া হচ্ছেনা। সব রক্ষা করতে চাইলে যেমন করে কোনো কিছুই সঠিকভাবে রক্ষা হয়না। ফলে পরীক্ষা ভীতি ও পড়ার প্রতি অনীহা সৃষ্টি হচ্ছে।

এসব নিয়ে অসংখ্যবার মিডিয়ায় লেখালেখি হওয়ার পর সরকারও চাইলো একে নীতিমালার আওতায় নিয়ে আসা হোক। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনা করেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। এসব সংস্থা বিফল হওয়ার পাশাপাশি উচ্চ আদালত কয়েক দফা নির্দেশনা ও রায় দিয়েছে। কিন্তু এসব কিছুই সফল হয়নি। খুব বিচিত্র হলেও সত্য যে, কোনো রকম নীতিমালা ও কেন্দ্রিয় তদারকি ছাড়া পৃথিবীতে একমাত্র বাংলাদেশে একটি বড় পরিসরে শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে।

সময়ের সাথে সাথে ক্রমবিবর্তনের ধারায় মানবসভ্যতায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। প্রস্তর, ব্রোঞ্জ, তাম্র আর লৌহযুগের এক একটি দীর্ঘ সোপান অতিক্রম করে মানবসভ্যতার ধারা যত এগিয়েছে, মানুষ তার উদ্ভাবনী তথা সৃজনী প্রতিভাকে তত কাজে লাগিয়ে বেঁচে থাকার প্রাথমিক উপকরণ সংগ্রহ, আত্মরক্ষা, নিরাপত্তা ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, আরাম-আয়েশের প্রয়োজনে নিত্যনতুন যন্ত্র ও পদ্ধতি-প্রক্রিয়া আবিষ্কার করে চলেছে। আজ একটা কিছুর উদ্ভাবন হচ্ছে তো আগামীতে তা অচল বা হারিয়ে যাচ্ছে তার বিকল্প উদ্ভাবন হওয়াতে।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাও হালনাগাদ হচ্ছে প্রতিবছর। কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন থেকে এখন আমরা জাতীয় শিক্ষা নীতির অধীনে এসেছি। কিন্তু ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো দড়ি-ছাড়া ষাঁড় হয়ে আছে।

‘শিশুদের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি ওজনের ব্যাগ বহন করলে শরীরে ইনজুরি হয় এবং তা সারাজীবন বহন করতে হয়’, এই বলে শিশুদের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি হয়, এমন ওজনের ব্যাগ বহন নিষিদ্ধ করতে গত বছর ছয় মাসের মধ্যে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছিল উচ্চ আদালত। অতিরিক্ত ব্যাগ বহনের ফলে শিশুরা মেরুদন্ড, কাঁধের ব্যথাসহ মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বেড়ে উঠছে। এভাবে একটি প্রজন্ম গড়ে উঠছে। আদালত এই বিষয়টিকে বলছেন ‘পাবলিক ইনজুরি’। বিষয়টি মান্য করা হয়নি।

গত মাসেও আদালত এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নয়টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু কিছু সংবাদ মাধ্যমে এসেছে- ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে যে কোনো ধরনের সেশন ফি নেওয়ার ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। নানা অজুহাতে ফি বসিয়ে সেশন ফি আদায় করা হচ্ছে।  স্কুলগুলো এখন লাইব্রেরি চার্জ, এসি ও জেনারেটর চার্জ, বিদ্যুৎ, স্কুল     মেইনটেন্যান্স ইত্যাদি বাবদ ফি নিচ্ছে বলে অভিভাবকদের অভিযোগ। এই তালিকায় রাজধানীর নামিদামি অধিকাংশ স্কুলের নাম রয়েছে।

ইংরেজি মাধ্যম বা কিন্ডার গার্টেন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের ১৫ বছর পর ১৮৫২ সালের আজকের দিনে (২১ জুন) এই শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তক ফ্রেডরিখ ফ্রোয়েবল মৃত্যুবরণ করেন। নিশ্চিত করে বলা যায়, জার্মান শিশু-শিক্ষানুরাগী এই ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের বর্তমানে প্রচলিত কিন্ডার গার্টেন শিক্ষা ব্যবস্থা স্বচক্ষে দেখলে লজ্জা পেতেন।

ফ্রেডরিখ ফ্রোয়েবল প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থার ‘কিন্ডারগার্টেন’ হচ্ছে, শিশুদের প্রাক-বিদ্যালয় বা বিদ্যালয়-পূর্ব উপযোগী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষ। এ শব্দটি জার্মান, যার অর্থ হচ্ছে শিশুদের বাগান।  তিনি ব্যাড ব্ল্যাংকেনবার্গে শিশুদের বাড়ী থেকে বিদ্যালয় পর্যন্ত গমন এবং খেলা ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণের ধারণাকে কেন্দ্র করে এ শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, শিশুরা উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষনের মাধ্যমে প্রতিপালিত হবে এবং ‘শিশুদের বাগান’ হিসেবে কিন্ডারগার্টেনে বাগিচায় রোপিত চারাগাছের ন্যায় পরিচর্যা পাবে।

আরো আগেও এই ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থার সন্ধান পাওয়া যায় ইতিহাসে। উইকিপিডিয়া অনুসারে, ১৮১৬ সালে স্কটল্যান্ডে রবার্ট ওয়েন নামের একজন দার্শনিক ও শিশু শিক্ষাবিদ নিউ ল্যানার্কে ‘ইনফ্যান্ট স্কুল’ বা শিশু বিদ্যালয় খোলেন। স্যামুয়েল ওয়াইল্ডারস্পিন নামের একজন শিক্ষানুরাগী লন্ডনে ১৮১৯ সালে এ ধরনের শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। কাউন্টেস থেরেসা ব্রুন্সভিক (১৭৭৫-১৮৬১) উপরের উদাহরণগুলোয় আকৃষ্ট হয়ে বুদাপেস্ট বা বুদা’য় নিজ বাড়ীতে ১৮২৮ সালের ২৭ মে ‘এঙ্গিয়েলকার্ট’ বা পরীদের বাগান খোলেন। এ ধারণাটি তৎকালীন হাঙ্গেরীয়ান রাজতন্ত্রের মধ্যবিত্ত সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং অনুসরণ করে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। তবে সবচেয়ে বেশি নন্দিত ও অনুসরিত হয়েছে ফ্রেডরিখ ফ্রোয়েবল প্রবর্তিত ‘কিন্ডারগার্টেনশিক্ষা ব্যবস্থা’।

আমরা চাই আমাদের দেশেও পুরোপুরি নিয়মনীতি মেনে এবং প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য মেনে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হোক। আমরা জানি, আনুষ্ঠানিক শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য হলো পরিপূর্ণ, সঠিক ও শুদ্ধভাবে সব কিছু জানা। তাই অন্তত আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় পরিপূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। সরকারের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ আবশ্যক।

লেখক: সাংবাদিক।