ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

হেলতে দুলতে এসে ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়ায় একটি বাস। কিছু যাত্রী নামেন, কিছু ওঠেন। বাসের হেলপার মহাব্যস্ত নতুন যাত্রীর হাঁকডাকে। তার আরো বেশি যাত্রী চাই। বেশ কিছুক্ষণ হয়তো গাড়ি আসেনি, তাই নতুন যাত্রী উঠার চাপও খুব বেশি। বসার সীট একটাও ফাঁকা নেই। তাই যুতসই ভাবে দাঁড়ানোর জায়গা করে নিতে ব্যস্ত সবাই। রাজধানীতে এখন যাত্রীর থেকে পরিবহনের সংখ্যা বেশি মনে হয়। তবুও কিছুক্ষণ বাস না আসলেই যাত্রীর চাপ বেড়ে যায়। অল্প সময়ের মধ্যে এই বাসের অবস্থাও তেমন হলো। অহেতুক ধাক্কাধাক্কিতে সীটে বসা এবং আগে থেকে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীরা মহা বিরক্ত। ড্রাইভার ইচ্ছা করেই সিগন্যালে থেমেছে- এমন অভিযোগ করে বেশ কয়েক জন মহা রাগ ঝেড়েই যাচ্ছেন। ঠাসাঠাসি করে আরো নতুন যাত্রী উঠছে। বাসে তিল ধারনের স্থান নেই অবস্থা। ট্রাফিক পুলিশ কেন যেন বাসের কাছে এসে ড্রাইভারকে জোরে একটা ধমক দিল।

এর মধ্যে ড্রাইভারের মোবাইলের রিংটোন বেজে ওঠে। তিনি ডান হাতে স্টিয়ারিং এবং বাম হাতে মোবাইল ফোন ধরে কথা বলতে শুরু করেন। ড্রাইভারের কথার মধ্যেই সিগন্যাল ছেড়ে দেয়া হয়। ড্রাইভার মোবাইলের লাইন না কেটেই গাড়ি চালানো শুরু করে। ব্যাপারটি কোনো যাত্রীর নজরে পড়েনি। এমনকি কর্তব্যরত পুলিশ সদস্য বা ট্রাফিক অফিসারেরও না। পেছনে থাকা একই পরিবহনের অন্য একটি গাড়িতে সাইড না দিয়ে আড়াআড়ি চালাতে গীয়ে বাসটি ধাক্কা লাগায় সামনে থাকা গাজীপুর পরিবহনের পেছনে। তখন গাড়ির সামনের সিটে বসা কিছু যাত্রী মাথা গরম করে চালককে বকা দেয়া শুরু করলো। খুব করে ঝাঁড়িও দেয় দুয়েকজন। তখন গাড়ির একেবারে সামনে থাকা এক যাত্রী খেয়াল করে চালকের কানে মোবাইল। দাঁড়িয়ে থাকা ওই যাত্রী ড্রাইভারের ফোনে কথা বলাটাকে ধাক্কা লাগার কারণ হিসেবে উল্লেখ করে একটি ধমক দেয়। সেই ধমকের রেশ ধরে নিমিষেই বেশ কয়েকজন যাত্রী সমস্বরে ড্রাইভারকে বকা দিতে থাকে। শুরু হয় অহেতুক চেঁচামেঁচি। ড্রাইভার বলেন, ‘গাড়ি খাড়ায়া আছে বইলাই তো ফোনটা ধরছিলাম।’ এই বলে ফোন রেখে আবার গাড়ি চালাচ্ছিলেন তিনি।

কিন্তু এরপরও বেশ কিছুক্ষণ কয়েকজন উত্তেজিত যাত্রী ড্রাইভারের ফোন নিয়ে কথা বলেই যাচ্ছেন। গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে নানান যুক্তি দেখিয়েও চিল্লা-চিল্লি করছিলেন কেউ কেউ। এক পর্যায়ে প্রসঙ্গত থেমে গেল। চালক তার মতো করে গাড়ি চালিয়ে গেলেন, যাত্রীরা যে যার গন্তব্যে নেমে গেলেন। এটি রাজধানীর বুকের লোকাল থেকে কাউন্টার সার্ভিস পর্যন্ত সকল ধরনের যাত্রী পরিবহনের স্বাভাবিক চিত্র।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে ২০১১ সালের ১১ জুলাই। সেদিন চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৩ জন স্কুলছাত্র অকালে প্রাণ হারায়। পৃথিবীটাকে পুরোপুরি দেখার আগে এক সঙ্গে অতগুলো কচি প্রাণ ঝরে যাওয়ায় পুরো জাতি স্তব্দ হয়ে গিয়েছিল। জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয় এই ঘটনায়। পরবর্তী বেশ কয়েক মাস এটি ছিল টক অব দ্য কান্ট্রি।

পরে জানা যায়, স্কুলের ছাত্রদের বহনকারী ট্রাকটি যখন দুর্ঘটনায় পড়ে তখন চালক মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। নিয়ম মোতাবেক আমাদের দেশে বড় কোন ঘটনার পর কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। মূলত এই ঘটণার পর সারা দেশে সকল ধরনের যানবাহনে চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। যানবাহন নিয়ন্ত্রণকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান বিআরটিএ এবং ট্রাফিক পুলিশ কড়া নির্দেশ দিল, যাতে চলন্ত গাড়ির চালকরা কেউ মোবাইল ফোনে কথা না বলেন। শাস্তি প্রদান আর জরিমানার বিধানও করা হলো। এরপর ওই বছরেরই ২৬ জুলাই দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘ফরিদপুরে বাস চালককে কারাদন্ড’ সংবাদটি। এতে বলা হয় ‘এক হাত দিয়ে মোবাইল কানে ধরে কথা বলছিলেন আর অন্য হাতে জলন্ত সিগারেট আঙ্গুলের ফাঁকে গুজে স্টিয়ারিং ধরে গাড়ী চালাচ্ছেন গাড়ির চালক। পেছনে বসা নারী পুরুষ শিশুসহ অসংখ্য যাত্রী। গতকাল সোমবার ফরিদপুর শহরের ব্যস্ততম ফরিদপুর-বরিশাল মহাসড়কে এভাবেই চলছিল লোকাল বাস ঢাকা মেট্টো-গ-০২-০০৪৬। হাতে নাতে ধরা পড়েন বিপরীত দিক থেকে আসা ভ্রাম্যমান আদালতের কাছে। ভ্রাম্যমান আদালত চালকের জরিমানা ও কারাদন্ড প্রদান করেন।’ (দৈনিক যুগান্তর, ২৬ জুলাই ২০১১ ইং)

এটি অবশ্যই মীরসরাইয়ের ঘটণার শিক্ষা, এতে কোনো দ্বিমত নেই। এমনকি বেশ কয়েকদিন ঢাকাসহ সারাদেশের ট্রাফিক পুলিশ থেকে শুরু করে পুলিশ সদস্যরাও গাড়ি চালানো অবস্থায় ড্রাইভারের কর্মকান্ড নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষন করতো। কিন্তু সেই ঘোর কাটতে আমাদের বেশিদিন সময় লাগেনি। এখন গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইলে কথা বলার বিষয়টা অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখে এখন আর এই বিষয়টি পড়ে না। পড়লেও তারা আমল নেয় না। কারণ এর থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে তাদের এখন ব্যস্ত থাকতে হয়। এই কারণে আবারো বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে হয়তো আবারো তা আমলে আসতে পারে!

প্রতিদিন কর্মব্যস্ততার কারণে আমাদের বাইরে বের হতে হয়, আধুনিক সমাজে এটা নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম বা বাহন হচ্ছে যান্ত্রিক বা অযান্ত্রিক কোনো পরিবহন। নিয়ম মোতাবেক, ভাড়া প্রদানের ভিত্তিতে তারা নিরাপদ ও সুস্থ সেবা দেবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো; কোনো প্রকার পর্যবেক্ষণ ছাড়াই সারাদেশের পরিবহনগুলো তাদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। ২০০৫ সালে তামাক ও তামাকজাত দ্রব্যের আইনের বিধানসাপেক্ষে কোনো ব্যক্তি পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে ধূমপান করতে পারবে না, এটা দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ খোদ রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের অসংখ্য পরিবহনের চালকসহ অন্যান্য কর্মচারী (অনেক সময় যাত্রীরাও) সবাই আইনের কোনো তোয়াক্কা না করে গাড়ি চালানো অবস্থায় অবাধে ধূমপান করে যাচ্ছে। এতে মহিলা, শিশুসহ অন্যান্য যাত্রী ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। আমরা সবাই জানি, বাসে চালকের বাম পাশের সারিতে মহিলা যাত্রীদের বসার অবস্থান। ফলে চালক যদি ধূমপান করে মহিলারাই বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরোক্ষ ধূমপানও প্রত্যক্ষ ধূমপানের মতোই ভয়াবহ। কিন্তু হরহামেশাই এই আইন লঙ্ঘন করা হচ্ছে।

২০১২ সালের মাঝের দিকে যুক্তরাজ্যের একদল ডাক্তার গবেষণা চালিয়ে জানায়, গাড়ি চালানো অবস্থায় বা গাড়ির ভেতর ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য বেশি ক্ষতিকর। তাঁরা বলছেন, গাড়ির ভেতর ধূমপান করলে ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে বেশি মাত্রায় ফুসফুসে প্রবেশ করে। উন্মুক্ত স্থানে ধূমপানে যে ক্ষতি হয় তার চেয়ে গাড়িতে সিগারেট খেলে বেশি মাত্রায় স্বাস্থ্যহানি ঘটায়। লন্ডন গণস্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞ ডাউগ্লাস নোবল এক গবেষণায় এ তথ্য জানিয়েছেন। এতে বলা হয়েছে, উন্মুক্ত জায়গায় ধূমপান করলে স্বাস্থ্যের যে ক্ষতি হয়, বাসায় ধূমপান করলে তার চেয়ে ২০ গুণ ক্ষতি বেশি হয়। আবার বাসায় ধূমপানে যে পরিমাণ ক্ষতি হয় তার চেয়ে ২৭ গুণ বেশি ক্ষতি করে গাড়িতে। আর ধূমপানের ফলে ধূমপায়ীর পাশে থাকা শিশু বা গর্ভবতী মায়ের ক্ষতি হয় সবচেয়ে বেশি।’ কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, একজন ধূমপায়ী শুধু নিজেরই ক্ষতি করে না, তার আশেপাশের অতি আপনজনেরও প্রায় সমপরিমাণ ক্ষতি করে। শরীরের এমন কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নেই যা তামাক বা ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে।

প্রথমে উল্লেখ করা বাসটি এবং সিগন্যালের এ ঘটনায় যা উপলদ্ধি করা যায় তা হলো; সরকারের নির্দেশ চালকরা প্রথমদিকে ভয়ে মোটামুটি মেনে চললেও সময় যত গড়াচ্ছে, নির্দেশের রশিও তত শিথিল হচ্ছে। বাসের যাত্রী চল্লিশোর্ধ্ব মল্লিক সাহেবের মতো বলা যায়, ‘চলন্ত গাড়ির চালকদের মোবাইল ফোনে কথা বলা নিষেধ’ মাস দুয়েক পরে সকলে এই নিষেধাজ্ঞার কথা বেমালুম ভুলে যাবেন।

পাঠকের নিশ্চয়ই মনে আছে, এর আগে প্রাইভেট কারের চালক এবং সামনের আসনে বসা যাত্রীর সিট বেল্ট বাঁধা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। একইসঙ্গে মোটরসাইকেল আরোহীরও হেলমেট পরার ওপরেও বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। শুরুতে মাস খানেক ঢাকার রাস্তায় সকল গাড়ির চালক এবং সামনের সিটের যাত্রী সিট বেল্ট বাঁধতেন। মোটরসাইকেল চালকদের অধিকাংশই হেলমেট ব্যবহার করতেন। কিন্তু এই ভ্রম ভাঙতে সময় বেশি লাগেনি। ধীরে ধীরে প্রাইভেট কারের চালক ও সামনের আসনের যাত্রীর শরীর থেকে সিট বেল্ট খুলে পড়েছে। মোটরসাইকেল আরোহীর মাথা থেকেও হেলমেট নেমে গেছে। ২০১৩ সালের প্রথম দিকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত রায় দিল, ফুটপাতে মোটর সাইকেল চালানো আইনত দন্ডনিয় অপরাধ। নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের জন্য শাস্তির বিধান হলো। বড় জোর দুয়েক সপ্তাহ এই নিষেধাজ্ঞা সবাই মেনে চলেছিল। এমনকি তখন ফুটপাতে মোটর সাইকেল উঠলে পথচারীরাই বাঁধা দিত। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা এখন কয়জন মেনে চলেন, তা রাস্তায় নামলেই দেখা যায়।

সরকার ২০০৫ সালে প্রকাশ্যে ধূমপান ও তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করে আইন পাস করে। ওই বছরের ১৩ মার্চে পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে ধূমপান এবং গণমাধ্যমে তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করার বিধান সংবলিত একটি আইন সংসদে পাস করা হয়। তখন এ আইনকে স্বাগত জানায় সবাই। কিন্তু আইন পাসের ১০ বছর পেরিয়ে গেছে। এখন বিদ্যমান এই আইনটি সম্পর্কে মানুষের ধারণাই আস্তে আস্তে অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। এমনকি তামাকজাত পণ্য ক্রয়ে অনুৎসাহিত করার জন্য মোড়কে তামাকের ক্ষতিকর ছবি ছাপানোর বিষয়ে আইনও রয়েছে দেশে। কিন্তু এখন পর্যন্ত একটিও কোম্পানি তাদের উৎপাদিত ও বাজারজাত করা কোনো পণ্যের মোড়কে নির্দেশ মতো ছবি সংযোজন করেনি। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত তদারিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বা আইনশঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো রকম অভিযান পরিচালনা ও জরিমানা করার মতো ঘটনা ঘটেনি।

তামাকজনিত মৃত্যু স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। কোন অস্বাভাবিক মৃত্যু রাষ্ট্রের কাম্য হতে পারে না। তামাকের কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর ৫৭ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়, পঙ্গুত্ববরণ করেন আরও তিন লক্ষাধিক মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বে প্রতি বছর তামাকের কারণে মারা যাবে ১ কোটি মানুষ, যার ৭০ লক্ষই বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের। আসন্ন এই তামাক মহামারির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া প্রতিটি জনগণের নাগরিক অধিকার। রাষ্ট্র তথা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব এই বিশাল মৃত্যু ও অসুস্থতাজনিত ক্ষয়-ক্ষতি মোকাবিলার মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা করা। বাংলাদেশ সরকার এ বাস্তবতা অনুধাবন করেই ২০০৩ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক চুক্তি এফসিটিসি’তে সাক্ষর এবং পরবর্তীতে ২০০৫ সালে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন’ প্রণয়ন করে। কিন্তু কিছু দুর্বলতার কারণে এ আইনটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছিল না। এরপর এটি সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয় ২০০৯ সালে। নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ২০১৩ সালের ২৯ এপ্রিল এ সংক্রান্ত সংশোধনী বিলটি জাতীয় সংসদে পাশ হয়, যা ২রা মে থেকে গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়ে কার্যকর আছে। তবে তামাক কোম্পানিগুলো আইনের সংশোধনীটি যাতে পাশ না হয় সেজন্য যেভাবে তাদের নানাবিধ কূটকৌশল অব্যাহত রেখেছিল, বর্তমানে আইনটির গুরুত্বপূর্ন ধারাগুলো (যেমন: ছবিসহ সতর্কবাণী প্রবর্তন) যাতে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত না হতে পারে সেজন্যও তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এভাবে অসংখ্য আইন থাকার পরও অকার্যকর করে রাখার চেষ্টা আমরা দেখেছি। কিন্তু এসব আইন যাদের জন্য, আমরা সাধারণ মানুষ এসব আইন মানার ক্ষেত্রে কতটা আন্তরিক সেটাও দেখার বিষয়।

পরিবেশবাদীরা সোচ্চার হওয়ায় ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিনের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। শুধু ব্যবহারই নয়, পলিথিন উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয়, মজুদ, বিতরণ, পরিবহন ইত্যাদি সবই নিষিদ্ধ। অর্থাৎ আইনটি প্রণয়নের সময় কোনো প্রকার ফাঁক রাখা হয়নি। তবু এই সংক্রান্ত আইনের বাস্তবায়ন নিয়ে পরিবেশবিদসহ অনেকের মধ্যেই হতাশা কাজ করছে। পলিথিনের ব্যবহার একটুও কমেনি, বরং বহুক্ষেত্রে বেড়েই চলছে। আশির দশকে দেশে পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়। আইন পড়ে আছে, আইনের খাতায়। এর ব্যবহার কিন্তু বেড়েই চলেছে। মজার বিষয় হচ্ছে, পলিথিনের বিপরীতে দেশে পাটজাত দ্রব্যের ব্যবহার বৃদ্ধির জন্যও আইন রয়েছে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন তো দূরের কথা অনেকে জানেনই না বিষয়টি।

অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যানার, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড ও পোস্টার লাগানোর কারণে সৌন্দর্য হারাচ্ছে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম নগরসহ দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলা শহর। বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এই প্রচারণা চলছে। যদিও গত কয়েক বছরে সরকারী প্রচারণা অতীতের সব বাণিজ্যিক প্রচারণাকে হার মানিয়েছে। অথচ এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার আইন রয়েছে। স্থানীয় সরকার আইনের (২০০৯) পঞ্চম তফসিলের ৪৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী, ‘করপোরেশন কর্তৃক নির্ধারিত কোনো স্থান ব্যতীত অন্য কোনো স্থানে বিজ্ঞাপন, নোটিশ, প্ল্যাকার্ড বা অন্য কোনো প্রকার প্রচারপত্র আঁটিয়া দেওয়া অপরাধ।’ এখানে সরকারের কারণে আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি ক্ষতিকর কিছুই ইঙ্গিত করে।

রাজধানীর পুরান ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ আগুনের স্মৃতি এখনও মানুষের মনে আছে। ২০১০ সালের ৩ জুন আগুনে পুড়ে প্রাণ হারায় ১২৩ জন। অপরিকল্পিত রাসায়নিক গুদাম, প্লাস্টিক কারখানাই ছিল স্মরণকালের ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনার মূল কারণ। ঘটনার পর সরকারও উদ্যোগী হয়েছিল আবাসিক এলাকা, বাসাবাড়িতে গড়ে তোলা রাসায়নিক দ্রব্যের অবৈধ গুদাম সরানোর কাজে। গঠিত হয়েছিল কমিটি। তারপর ৪ বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করতে পারেনি কমিটি। উদ্যোগ এগিয়েছে সুপারিশ পর্যন্ত।

এ দুর্ঘটনার পর ঢাকা মহানগরীর আবাসিক এলাকা থেকে অনুমোদিত রাসায়নিক গোডাউন ও কারখানা সরিয়ে দিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি টাস্কফোর্স গঠন করে। ওই টাস্কফোর্সের সুপারিশ মতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্মসচিবকে আহ্বায়ক করে ১৪ সদস্য নিয়ে একটি কমিটি করা হয়। ওই কমিটির পর তিনটি সাব-কমিটি করে দেয়। সাব-কমিটি মহানগরীর আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিক গোডাউন সরিয়ে নিতে বেশকিছু সুপারিশ করে। এসব সুপারিশের সঙ্গে উঠে এসেছে অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ আইন-২০০২, অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০০৪, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৯০ এবং মাদকদ্রব্য বিধিমালা-১৯৯৮-এর যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ার চিত্র। কিভাবে অবৈধভাবে বিপজ্জনক ও দাহ্য পদার্থ আমদানি, উৎপাদন, মজুদ, পরিবহন ও বিক্রি হচ্ছে সেই বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। কিন্তু এখনো ওই এলাকার বিপজ্জনক স্থাপনাগুলো সরানো যায়নি। এখনও আবাসিক বাড়ির ভেতরে লুকিয়ে রাখা হচ্ছে দাহ্য পদার্থ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৯০ অনুযায়ী রাসায়নিক আমদানি-রপ্তানি, ব্যবসা ও ব্যবহার করতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। আর লাইসেন্স পেতে বিস্ফোরক পরিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, গুদামের নকশা, আমদানি-রপ্তানি লাইসেন্স, অগ্নিনির্বাপণ সনদসহ কমপক্ষে ১৫টি শর্ত পূরণ করতে হয়। অথচ পুরান ঢাকার অধিকাংশ রাসায়নিক ব্যবসায়ীর বৈধতার একমাত্র সনদ সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স। আর এভাবে চলছে বছরের পর বছর। অবশ্যই এসবের বিপরীতে কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠানে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেও তথ্য না পাওয়ার মতো অভিযোগ রয়েছে।

দেশের বিভিন্ন জনবসতি এলাকায় দেদারচ্ছে পোড়ানো হচ্ছে ইট। অথচ ইট পোঁড়ানোর জন্য দেশে এক বছরের বেশি সময় আগে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু এই বিষয়ক আইন ভাটা মালিকরা কেউ মানছে না। ২০১৩ সালের ২০ নভেম্বর বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩’ প্রকাশিত হয়। নতুন আইনের ধারা-১ এর উপধারা-২ অনুযায়ী ২০১৪ সালের ১ জুলাই থেকে এটি কার্যকর করার বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন আইন অনুযায়ী দেশের সকল পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন এলাকার ইটভাটা ওই বছরের ৩০ জুনের মধ্যে বন্ধ অথবা অন্যত্র স্থানান্তর করার জন্য নির্দেশনা ছিল। ইট ভাটা মালিকদের এ কাজে উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ সহায়তা প্রদানের ঘোষণা সত্ত্বেও আধুনিক পদ্ধতিতে পরিবেশ বান্ধব ইটভাটা স্থাপনে এগিয়ে আসেনি ভাটার মালিকরা।

নতুন আইনে দেশের প্রতিটি ইটভাটা আধুনিক ও পরিবেশ বান্ধব পদ্ধতিতেই নির্মাণ ও পরিচালনার নির্দেশ রয়েছে। এ বিষয়ে সকল জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশনাও পাঠানো হয়। আইন এবং এসব নির্দেশনা কাগজেই পড়ে আছে ইট ভাটার আর পরিবর্তন হয়নি।

মানুষের কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণকারী কতগুলো সর্বমান্য ও সুসংহত নিয়মকানুনই আইন। কিন্তু দেশে আইন অমান্য করার যেন মহোৎসব চলছে। শিশুশ্রমের দন্ডনীয় অপরাধকে অমান্য করে প্রতিনিয়ত কোমলমত এবং স্কুলগামী শিশুদের শ্রম ব্যবহার করা হচ্ছে। মারাÍক ভূমিকম্প বিপর্যয়ের আশংকা থাকলেও প্রতিনিয়ত রাজধানীসহ সারাদেশে স্থায়ী পাকা স্থাপনা নির্মাণে ইমারত নির্মাণ আইন মানা হচ্ছে না। কালো ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে পরিবেশ, মানা হচ্ছে না পরিবেশ আইন। আশি ভাগ গার্মেন্টসে কোনো আইন মানা হয় না। চিংড়ি পোনা আহরনে কিংবা পশুজবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণে থাকা কোনো আইনও মানা হয় না।

সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়া তেলের প্রভাব নিরূপণে ২০১৪ সালের ২২ ডিসেম্বর বাংলাদেশে আসে জাতিসংঘের দুই সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল। তাঁদের মধ্যে একজন রায়ান হুইলার, জাতিসংঘের তেল অপসারণবিষয়ক পরামর্শক মন্তব্য করেছেন, ‘বাংলাদেশের আইনই সুন্দরবন রক্ষায় যথেষ্ট’। তিনি বলেছেন, ‘সুন্দরবনে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় অভিযুক্তকে শাস্তি দেয়ার জন্য বাংলাদেশে যথেষ্ট আইন রয়েছে। বাংলাদেশের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-২০১০, বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন-২০১২, বন আইন, মংলা বন্দর আইন, বিআইডব্লিউটিএ আইনসহ আরও অনেক আইনে বনে তেল ফেললে কী শাস্তি হবে, তা নির্দিষ্ট করা হয়েছে।’

কিন্তু এসব আইন বাস্তবায়নের অবস্থা তো আমরা নিজ চোখেই দেখেছি। জেলেরা হাত দিয়ে, বস্তা দিয়ে সাগরের তেল কুঁড়িয়েছেন। সেখানে দায়িত্বশীল কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপালন আমাদের খুব একটা দেখিনি। সুন্দরবনের সম্পদ হিসাব করে বলা সম্ভব না। কেননা, এই বনের জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার অনেক কিছুই বিজ্ঞানীদের অজানা। এ ছাড়া এই বনের প্রাণীদের মধ্যে যে জিনগত সম্পদ রয়েছে, তা অমূল্যই বলা যায়। তবে এই বনের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের পর্যটনগত সম্পদের মূল্য চিহ্নিত করা সম্ভব। যেমন: এই তো কয়েক বছর আগে বিপি কোম্পানি মেক্সিকো উপসাগরে একেকটি পাখির ক্ষতিপূরণ বাবদ ১০ লাখ ডলার দিয়েছিল। সেখানে যেসব প্রাণী মারা গিয়েছিল, সেগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও ছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে বিপি মোট ৩০০ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগ যেমন: প্রাণিসম্পদ, বন বিভাগ, বন্য প্রাণী বিভাগ আলাদাভাবে ক্ষতিপূরণ আদায় করেছিল। সব মিলিয়ে বিপিকে ক্ষতিপূরণ দিতে হয় ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার।

যদিও ক্ষতিপূরণ আদায়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে অনেক কঠোর হতে হয়েছিল। বিপি বিশ্বের অন্যতম বড় এবং প্রভাবশালী কোম্পানি। কিন্তু ওবামা প্রশাসন একটি উদাহরণ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। এমন ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে পরিণতি কী হবে, তা ওবামা শাস্তির মধ্য দিয়ে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। জাতিসংঘের এই বিশেষজ্ঞ দল মনে করে, বাংলাদেশ যথেষ্ট কঠোরভাবে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে শাস্তির আওতায় আনলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা কমে আসবে। আমরাও আশাবাদী হতে চাই। কিন্তু বাস্তবতা কী হবে, সেটাই হচ্ছে ভাবার বিষয়।

গণপরিবহন ধূমপানমুক্ত হলেও আইন মানা হচ্ছে না। আইন অনুযায়ী পাবলিক পরিবহনগুলো ধূমপানমুক্ত। এছাড়া পাবলিক পরিবহন ধূমপানমুক্ত রাখতে যানবাহনে নো-স্মোকিং সাইনসহ লেখা রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নইলে ফিটনেস না দেয়ারও বিধান রয়েছে। এছাড়া কোনো চালক যেন যানবাহনে ধূমপান না করেন সেজন্য চালকদের প্রশিক্ষণে ধূমপানসহ তামাক ও মাদক সেবন রহিতকরণ বিষয়টিও অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। কিন্তু দেশের এক-শতাংশ চালকও যানবাহনে ধূমপানের ওপর যে সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তা এতদিনে নিশ্চয়ই মনে রাখেননি। একবার মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়ের একজন কম্পিউটার বিষয়ের শিক্ষককে প্রশ্ন করা হলো, কম্পিউটার দিয়ে কী কী কাজ করা যায় বলুন। তিনি উত্তরে বলেছিলেন, এটা অনেক চিন্তার বিষয়, বড় বিষয়। তার চেয়ে যদি প্রশ্ন করেন, কম্পিউটার দিয়ে কী কী করা যায় না, ওই উত্তর দেয়া যাবে খুব তাড়াতাড়ি। আমাদের দেশে তেমনি মেনে চলা হচ্ছে, এমন আইন খুঁজে বের করাটাই যেন দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিয়ম পড়ে আছে নিয়মের খাতায়। আবার হয়তো একটি মানিকগঞ্জ বা মীরসরাইয়ের অপেক্ষা করছেন কর্তৃপক্ষ। অত বড় ক্ষতি যাদের হয়েছে তারা সারাজীবন এর রেশ টেনে যাবেন। বছরের বিশেষ একটি দিন ছাড়া সরকার বা সংশ্লিষ্ট কেউ-ই বিষয়টি স্মরণ করবেন না। আইনটি মেনে চলার এবং মানানোর জন্য সবার আন্তরিকতা এবং গুরুত্ব দেয়া প্রায় শেষ হয়ে গেছে। ব্যাপারটা এমন যেন, আমাদের দেশে আইন প্রণয়ন করা হয় কেবল লোক দেখানো, কখনো মানার জন্য করা হয় না!

লেখক: সাংবাদিক।

ইমেইল: hasanf14@gmail.com