ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

হরতাল সর্ম্পকে ব্যক্তিগত অভিমত

হরতাল নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোই বেশি বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে। কারণ হরতাল ডাকা দলের নেতাকর্মীদের মাঠে নামতে হয়, নেত্রীর (২দলের প্রধানই নেত্রী) কাছে বাহবা পেতে। পুলিশের প্রহারও সহ্য করতে হয়। এই তো গেল, মাঠের খবর। ব্যবসায়িক পর্যায়ে আসুন। দেশের ৯৮ শতাংশ নেতা-এমপি-মন্ত্রী সরাসরি কোনে না কোনো ব্যবসার সাথে জড়িত। এ ধরনের কর্মসূচীতে তাদেরও ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়।

এরপর আসুন সাধারণ মানুষের কাতারে। দেশে একজন নাগরিকও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে কিনা ইস্যুসহ বা ইস্যুবিহীন হরতাল কর্মসূচী কামনা করেন। নাগরিক মতবাদে না-ই গেলাম। কারণ আমি-আপনি, আমরা সবাই বাংলাদেশের অনাকাঙ্খিত নাগরিক (রাজনৈতিক দলগুলো এটাই ভাবেন)। আপনার মতামতটা এখানে যোগ করে নিন, তবেই হবে।

তারপরও কিছু কথা থেকে যায়, মূলত সেই প্রেক্ষাপট থেকেই এই লেখাটি। আমরা আসলে কেউ-ই হরতাল চাই না। ৯১ সালের পর হরতাল দিয়ে কতটা দাবি আদায় করতে পেরেছেন বিরোধী দলগুলো, তারাই বলতে পারেন। আমার মনে হয়, এই সংখ্যাটা শূন্যের ঘরে।

অর্থনীতির গতিশীলতা নষ্ট হয়েছে টানা তিনদিনের হরতালে। এ সময়ে দেশের সামগ্রিক ক্ষতি পনের শ’ কোটি টাকারও বেশি।

যেমন ধরুন, মতিঝিল ব্যাংক পাড়ায় এলাকায় ফেরি করে সবজি বিক্রি করেন আবদুর রশিদ। টানা তিনদিনের হরতালে তিনি সবজি বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। এক দিনে তাঁর আয় হতো ৫০০-৬০০ টাকা। তিনদিনে তিনি প্রায় দেড় হাজার টাকা আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

রাস্তার বিক্রেতা আবদুর রশিদ যেমন কোনো আয় করতে পারেননি, তেমনি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে দোকান-মালিক, ফিলিং ষ্টেশন, বাস মালিকসহ সকল প্রকার ব্যবসায়ী বঞ্চিত হয়েছেন তিন দিনের আয় থেকে। তাঁদের ক্ষতির অঙ্ক অনেক বড়। এমনকি অভিন্ন প্রশ্নপত্রে অনুষ্ঠিত হওয়া পরীক্ষাগুলোও স্থগিত করা হয়েছে এই সময়ে। এতে ক্ষতির পাশাপাশি ভোগান্তির শিকার হয়েছেন পরীক্ষার্থীরা। সাধারণ দিনে কারওয়ান বাজারে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এক হাজার থেকে এক হাজার ৫০০টি পণ্যবোঝাই ট্রাক আসে। কিন্তু গত তিনদিনের হরতালে ট্রাক এসেছে ৪০০ থেকে ৫০০টি। যেখানে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়, সেখানে লেনদেন হয়েছে তিন ভাগের একভাগ। দেশের সবচেয়ে বড় খুচরা যন্ত্রাংশের বাজার নওয়াবপুরের দোকানগুলো তিন দিন পুরো বন্ধ ছিল। ফলে ওইসব দোকানে কোনো কেনাবেচা হয়নি। মফস্বল শহর বা গ্রামে হরতাল অত কড়াভাবে পালিত না হলেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ঢাকার পণ্যের আড়তগুলো বন্ধ থাকলে জেলায় পণ্য যেতে পারে না। আবার কারওয়ান বাজারে যেসব ট্রাক পণ্য নিয়ে আসে, সেগুলো আবার ঢাকা থেকে পণ্য নিয়ে জেলায় ফিরে যায়। ঢাকা থেকে পণ্য না গেলে জেলা-উপজেলায় বেচাকেনা কমে যায়। ফলে পুরো অর্থনীতির গতিশীলতা নষ্ট হয়।

এক দিনের হরতালে দেশের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়, এর সাম্প্রতিক কোনো গবেষণা নেই। তবে ২০০৫ সালে জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনডিপি এক গবেষণায় জানায়, বাংলাদেশে এক দিনের হরতালে ৫৫৪ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। তবে সংস্থাটির মতে, দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি অনেক বেশি। আর্থিক ক্ষতি ছাড়াও হরতাল দেশের নেতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলে। বৈদেশিক বিনিয়োগ বাধাগ্রস্থ হয়। ইউএনডিপি ২০০৫ সালে যখন ওই গবেষণা করে তখন বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ছিল চার লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। এখন সেটা প্রায় দ্বিগুণ। গত অর্থবছরে এর আকার ছিল সাত লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। এক দিনে এখন মোট দেশজ উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় দুই হাজার ১০০ কোটি টাকা। আকার দ্বিগুণ হলে ক্ষতিও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে ধরে নেওয়া যায়। সে হিসেবে দৈনিক এই ক্ষতিকে তিনদিনের হরতাল সময়কাল দিয়ে গুণ করলে বিএনপি আহুত চলতি হরতালে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৫শ’ কোটি টাকার মতো। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতের মতামত হলো, হরতালের আর্থিক ক্ষতি নির্ধারণ করা কঠিন। আমাদের জিডিপির আকার সাত লাখ কোটি টাকা। এ হিসাবে একদিনের হরতালে সরাসরি আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা। হরতালে শিল্প-বাণিজ্যের ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিংকেজও ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ফলে এক দিন হরতাল হলে শিল্প-বাণিজ্যের তিনদিন বন্ধ থাকার সমান ক্ষতি হয়। আর টানা তিনদিন বন্ধ থাকার মানে এক কথায় দেশকে অচল করে দেয়া।

হরতাল হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় শিল্প ও সেবা খাতের। দেশের জিডিপির ৮০ শতাংশ অবদান শিল্প ও সেবা খাতের। অর্থনীতিতে এই খাতের অবদান বেড়ে যাওয়ায় হরতালের একদিনে ক্ষতির পরিমাণও বেড়েছে। এদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাদের সংগঠন ঢাকা চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিদিনের হরতাল অবরোধে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষতি হচ্ছে জিডিপির ০.১২ শতাংশ। এ জন্য পোশাক শিল্প খাতেই প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে ৩৬০ কোটি টাকা। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর শুধু একদিন বন্ধ থাকলে সরকারের রাজস্ব বাবদ ক্ষতি হয় প্রায় তিন কোটি টাক। বন্দরে কন্টেইনার খালাসের অনুমোদনের তুলনায় খালাস হচ্ছে খুবই কম। বন্দরে রেকর্ড পরিমাণে কন্টেইনার জট সৃষ্টি হওয়ায় আমদানি-রফতানি বাণিজ্য অচল হয়ে পড়ে।

এছাড়া হরতালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় দিনমজুর এবং শ্রমিকরা। দৈনিক উপার্জনে তাদের সংসার চালাতে হয় বলে হরতালে তাদের না খেয়েই থাকতে হয়। াটানা তিনদিনের হরতালে ট্রাকচালক ও শ্রমিকরা বেকার থেকেছেন, বাজারের ভ্যানচালকরা পণ্য পরিবহন করতে না পেরে আয় হারিয়েছেন, পান-সিগারেট বিক্রেতারা ক্রেতা পাননি, হোটেলগুলোয় বিক্রি কম হয়েছে, সবজির আড়তে যাঁরা দৈনিক শ্রম বিক্রি করেন, তাঁরা তিনদিনের আয় হারিয়েছেন। এমনকি কারওয়ান বাজারে যাঁরা সবজি কুড়িয়ে দিন চালান, তাঁদেরও কষ্ট পেতে হয়েছে।

পাঠক, আসুন আমাদের বিজ্ঞ রাজনীতিকদের একটু ভাবতে বলি, তিনদিনের হরতালের তাদের দলীয় লাভ কতটুকু হলো? মিডিয়ায় তারা বিবৃতি না দিক, অথবা সমাবেশে না বলুক, আমরা চাই, ’তারা যেন নিজেরা একটু ভেবে এবং হিসেব কষে নেন’।

হাসান মাহামুদ
সংবাদকর্মী, ২৬.০৪.১২