ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

সিআইএ ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক অনুসারে, ২০১২ সালে বাংলাদেশের unemployment rate হিসাব করা হয়েছে ৫%। মানে ষোল কোটি জনসংখ্যার এ দেশে ৮০ লাখ মানুষ পুরোপুরি বেকার। তারা এক্টিভলি কাজের সন্ধান করছে। এর সাথে underemployed মানুষের সংখ্যা ৪০%। মানে ৬ কোটি ৪ লাখ মানুষ সপ্তাহে মাত্র কয়েক ঘণ্টা কাজ করে এবং খুব কম আয় করে। এর প্রধান কারণ হতে পারে জনসংখ্যার তুলনায় আমরা কাজের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারি নি।

২০১৩ সালের ৩৪ তম বিসিএস পরীক্ষার জন্য- ২ লাখ ২১ হাজার ৫৭৫ জন প্রার্থী অনলাইনে আবেদন করেছেন বলে জানা গেছে। সাধারণ ক্যাডার ছাড়াও প্রফেশনাল ক্যাডার এবং সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার সহ সর্বমোট শূন্য পদের সংখ্যা ২,০৫২টি।  ২০১২ সালে ৩৩তম বিসিএস পরীক্ষায় প্রার্থী সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৯৩ হাজার ৫৯ জন। ২০১৩ সালের মোট প্রার্থীর মাত্র .৯৩ ভাগ শেষপর্যন্ত ক্যাডার হতে পারবেন। বাকিরা হয়ত ২য় বার চেষ্টা করবেন। ৩য় বার করবেন। গতকাল ৪ বার বিসিএস ভাইভা দিয়ে ফেরত আসা এক ভাইয়ের কথা শুনলাম। অনেকে হয়ত অন্য কোন পেশায় চলে যাবেন। কেউ কেউ হয়ত স্বাধীন পেশা বেছে নেবেন এবং অনেকেই দিনের পর দিন বেকার থাকবেন একটা সরকারি চাকরির আশায়। এজন্য এখন সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ পর্যন্ত উন্নীত করারও দাবী উঠেছে।

যেহেতু বিসিএস থেকে ছাটাই হয়ে তরুণরা অন্যান্য পেশায় প্রবেশ করছে সেহেতু সমাজে বিসিএস ক্যাডার হতে পারাকেই সবচেয়ে সম্মানজনক এবং ক্রেডিটের  একটা ব্যাপার হিসেবে মধ্যবিত্ত তরুণদের বিশ্বাস জন্মেছে। এর সাথে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার,ব্যাংকার, বহুজাতিক কোম্পানির এক্সিকিউটিভ সহ আরো কয়েকটি পেশাকে বেশ ভালোই মূল্য দেয়া হয়। এই দুইলাখ ২১ হাজার তরুণ বেশিরভাগই মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে মেধাবী অংশ। আমরা এদের বিশ্বাস এবং ক্যারিয়ার চিন্তা মোটামুটি জেনে ফেললাম। এখন দেখা যাক যে মুষ্টিমেয় শিক্ষিত তরুণ ব্যবসা করতে চায় বা উদ্যোক্তা হতে চায় তাদের কী অবস্থা।

আমার হলের এক বড় ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস ফ্যাকাল্টি থেকে এমবিএ করে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই তিনি এজন্য বেশ প্রস্তুতিও নিয়েছেন। এমবিএ শেষ করে তিনি গ্রামে গেছেন ব্যবসা করতে। খুবই ইনোভেটিভ একটা আইডিয়া। আইডিয়াটা বলছি না। ঐ এলাকার মানুষ ২ দিনে যে কাজ করে শেষ করতে পারত না সেই কাজ তিনি ২ ঘণ্টায় করে দেন। সমস্যাটা হলো এখানে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করা একজন ছেলে কিভাবে গ্রামে এসে ব্যবসা করতে পারে এইটা তাদের এলাকার মানুষ বিশ্বাস করতে পারছে না। তিনি অবশ্য তারপর বলা শুরু করলেন যে এটা আসলে তার ব্যবসা না। ঢাকার একজন বড় ব্যবসায়ীর কোম্পানির একটা শাখা । তিনি এই শাখার ম্যানেজার হিসেবে আছেন। তারপর অবশ্য তার গ্রামবাসী খুশি হয়েছে। যাক! ছেলেটা ভালো কিছু করছে।

আমার এক বন্ধু ব্যবসা করতে চায়। বিশ্ববিদ্যালয় আসার পর থেকে এ পর্যন্ত দুটি ব্যবসা শুরু করেছিল। প্রথমটাতে বড় ধরনের লস করেছে। দ্বিতীয়টাতে লস না হলেও লাভ হয় নি। তার একজন গার্লফ্রেন্ড ছিল। সম্পর্ক ভেঙে গেছে। তাকে এখন মাঝে মাঝে আফসোস করতে শুনি যদি সে একটা ব্যাংকে চাকরি করত বা বিসিএস ক্যাডার হত তাহলে ঐ মেয়ে তাকে ছেড়ে চলে যেত না। মোটামুটি এই হলো উদ্যোক্তা হতে চাওয়া মধ্যবিত্ত শিক্ষিত তরুণদের  অবস্থা। এই ঘটনাগুলো বর্তমান পরিস্থিতিকে পুরোপুরিভাবে তুলে ধরতে না পারলেও পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ইঙ্গিত দিতে পারে।

মধ্যবিত্তের ভদ্রলোকী জীবনের আকাঙ্ক্ষা এবং ব্যবসায়ের প্রতি তার অনীহা, অশ্রদ্ধাঃ প্রেক্ষাপট এবং কারণ

১৯ শতকের শেষভাগের উদ্যোক্তা চিন্তার বিকাশ ২০ শতকের উদ্যোগ ধারণাকে প্রভাবিত করেছে। কার্ল মেঞ্জার (১৮৪০-১৯২১) ১৮৭১ সালে লেখা “Principles of Economics” গ্রন্থে Subjecting Prospective of Economics” বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি বলেন “কোন পরিস্থতির প্রয়োজনে কোন অর্থনৈতিক পরিবর্তন হয় না। বরং সেই পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা এবং গভীরভাবে বুঝতে পারলেই অর্থনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব। উদ্যোক্তা নিয়ে সবচেয়ে কম্প্রিহেনসিভ কাজ করেছেন অস্ট্রিয়ান অর্থনীতিবিদ জোসেফ সুমপিটার ( ১৮৮৩-১৮৫০)। ১৯১১ সাল থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত তিনি অনেক ট্রিটি, বই লিখেছেন এই বিষয়ে। তিনি বলেন, ‘উদ্যোগ হলো একধরনের “ক্রিয়েটিভ ডিস্ট্রাকশনের’ শক্তি। যা কোন কাজ করার প্রতিষ্ঠিত মাধ্যমকে ধ্বংস করে আরো কার্যকর কোন মাধ্যম তৈরি করে। তিনি একজন উদ্যোক্তাকে একজন উদ্ভাবক হিসেবে দেখেন এবং যিনি সম্পদের নতুন কম্বিনেশন এবং বিনিময়ের নতুন পথ উদ্ভাবন করে সমাজের স্টাটাস কুয়ো কে ভেঙে ফেলেন।

বাঙালি মধ্যবিত্ত কারা

ফরাসি বুর্জোয়া শব্দের অর্থ নাগরিক, মধ্যবিত্ত শ্রেণী বা ব্যবসায়ী। পুঁজিবাদী ধারণার বিকাশ (১৬৬০) এবং শিল্পবিপ্লবের ফলে ইংল্যাণ্ডে বিকশিত যে বুর্জোয়াগোষ্ঠী তৈরি হয় তার সাথে ব্রিটিশ ভারতের মধ্যবিত্তের তেমন কোন মিল নেই। এই মধ্যবিত্তকে বড়জোর পাতি বুর্জোয়া বলা যায়। ঐতিহাসিক বিশ্লেষনে দেখা যায় মধ্যবিত্ত তারাই যারা ধর্মযাজক নন এবং রাজবংশীও কিন্তু শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিনিময়ে প্রয়োজনীয় ধনসম্পদ আহরণ করে থাকেন। সামন্ততান্ত্রিক সমাজে মধ্যবিত্ত ছিলেন ব্যবসায়ী বা কেরানী শ্রেনী। এরা শিক্ষা-দীক্ষায় উন্নত এবং সাংস্কৃতিক বোধসম্পন্ন হয়ে থাকেন। সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা পছন্দ করে এবং সন্তানের প্রতি বিশেষ যত্নবান হন।

১৭৫৭ সাল থেকে ১৮৫৭ সালের মধ্যে কোম্পানি ও সরকারের গৃহীত নানামুখী প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপের ফলে বাংলার ইতিহাসে মধ্যবিত্ত শ্রেনীর জন্ম হয়। এগুলোর মধ্যে ভুমি ব্যবস্থার নতুন বিন্যাস, ব্যবসা-বাণিজ্যে পুঁজিবাদী চেতনা সৃষ্টি, ইংরেজি ভাষার সরকারিকরণ, আইন আদালত স্থাপন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শিল্প স্থাপন উল্লেখযোগ্য। এই সকল পদক্ষেপের ফলেই বাংলায় আধুনিক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব অনিবার্য হয়ে যায়।

বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রধানত ভূমি নির্ভর, ব্যবসা নির্ভর এবং শিক্ষিত ও পেশাজীবীদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল। বাঙালি মধ্যবিত্ত সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ডক্টর তাঁরা চাঁদ বলেন “ এই শ্রেণীর অর্থনৈতিক ভিত্তি হলো কৃষি। আর কৃষি নির্ভর শিল্পের মুনাফা হতে এই শ্রেণির লোকেরা অর্থ উপার্জন করেন। বাংলার ইতিহাসে ১৭৯৩ সাল টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রবর্তনের ফলে নতুন নতুন সুবিধাভোগী শ্রেনী যেমন-উকিল, মোক্তার,মুনসেফ, কালেক্টর, আমলা, শহরের বাড়ীওয়ালা প্রমুখের আবির্ভাব ঘটে। ১৮৩০ এর দশকে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে আধুনিক শিক্ষার প্রবর্তন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের অধিক হারে দেশীয় লোকদের নিয়োগ নীতির মাধ্যমে একটি প্রশাসনিক মধ্যবিত্তশ্রেণির বিকাশ ও বিস্তার ঘটে। (আবদুল বাছির – বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব,বিকাশ ও দৃষ্টিভঙ্গি)

বাণিজ্যের স্বার্থে সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতি ও ধনতান্ত্রিক সংস্কৃতির সংমিশ্রনে গড়ে ওঠে বণিক শহর কলকাতা। আর অর্থ উপার্জনের আশায় কোম্পানির সঙ্গে সহযোগিতা করার জন্য সেই কলকাতায় ভিড় করেছেন নবগঠিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির দল। এরা জীবনযাত্রায় ছিল ইউরোপীয়দের মতোই। বিনোদন, বিলাশ-ব্যসন, ভোগ, নৃত্যগীত সমারোহ এদের উৎসাহ ছিল দেখার মত। অষ্টাদশ শতকের নবাবি সংস্কৃতির রূপান্তর ঘটেছে উনিশ শতকের বাবু সংস্কৃতি এবং ভদ্রলোক সংস্কৃতিতে। বাবুরা কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে ব্যবসা বাণিজ্যে অংশ গ্রহণ করলেও ভদ্রলোক কালচারের মানুষেরা অনীহা প্রকাশ করে। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে কোম্পানির কেরাণি গোছের কোন চাকরি পেলেই নিজেদেরকে ধন্য মনে করত এই শ্রেনী। আজকের বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেনী ঐ শ্রেনীরই পরিবর্তিত রূপ।

ইতিহাস পার্যলোচনা করে দেখা যায় প্রাচীন ভারত থেকে শুরু করে মুসলিম যুগ এবং মুঘল আমলে এই অঞ্চলের শিল্পোদ্যোগ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের যে চিত্র দেখা যায় তা হয়ত শিল্প বিপ্লবের মত এত সুদূরপ্রসারী কোন ঘটনার শর্ত তৈরি করতে পারে নি, কিন্তু ব্রিটিশদের আগমনে এবং তাদের সাম্রাজ্যবাদী কার্যক্রমে এ ক্ষেত্রের স্বাভাবিক বিকাশ চরমভাবে ব্যাহত হয়। ইংল্যাণ্ডের শিল্প বিপ্লবের নেতিবাচক প্রভাব পরেছিল ভারতে। পূর্বে ইংল্যাণ্ড এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ সমূহ এ দেশ থেকে ফিনিসড প্রোডাক্ট আমদানি করলেও শিল্প বিপ্লবের ফলে তারা কাঁচামাল আমদানি করা শুরু করল। ফলে এই অঞ্চলের যারা পন্যের বিভিন্ন ভ্যালু যোগ করত তারা প্রান্তিক হয়ে গেল। বিভিন্নভাবে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী কাঁচামাল উৎপাদনে বাধ্য করত। ব্যাপক মাত্রায় নীল চাষ এই প্রেজেক্টরই অংশ।

প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চল লবণে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং এখান থেকে বহুকাল আগে থেকেই লবন রপ্তানি হত। কিন্তু ব্রিটিশরা এখানে তাদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে লবণ আমদানি করা শুরু করল। এতে হাজার হাজার লবন চাষী এবং এই ব্যবসায়ের সাথে জড়ীত অনেকই তাদের পেশা হারিয়ে ফেলেন।

ট্রেডিশনাল ব্যাবসায়ী সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু লাভ হয় ইংরেজদের স্বার্থ রক্ষাকারী এই মধ্যবিত্ত সমাজের। এক তারা জমিদারী করেন এবং দ্বিতীয়ত কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে ব্যবসা-বাণিজ্যও করেন। তারা ব্রিটিশ শাসনের গুণমুগ্ধ ছিলেন, কারণ এই শাসনে তারাই সবচেয়ে সুবিধাভোগী শ্রেনী। এক এক করে ইনফ্যন্ট ইন্ডাস্ট্রি ধ্বংস হয়েছে কিন্তু তাদের কোন ভ্রুক্ষেপ ছিল না। স্বভাবজাত বিলাস-ব্যসনে ব্যস্ত এবং ব্রিটিশ শাসনের হুকুম তালিম করাই ছিল তাদের কাজ।  সেই সময় ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্বারা যাঁরা ভাগ্য নির্মাণ করেছিলেন সেই রামমোহন, রামদুলাল দে, দ্বারকানাথ ঠাকুর, আশুতোষ দে, রামগোপাল ঘোশযহ তাঁদের কারো বংশগত পেশা ব্যবসা ছিল না। ব্রিটিশদের দেয়া সুযোগ সুবিধা ভোগ করেই তারা এই ভাগ্য নির্মাণ করেন।

এই সময়ের মধ্যবিত্তকে সুযোগ সুবিধা দেয়ার মত কোন কলোনিয়াল পাওয়ার নেই কিন্তু আছে বহুজাতিক কোম্পানি। মধ্যবিত্ত চাকরি করবে, অর্থ উপার্জন করবে আর সেই কোম্পানিগুলো সুখ উৎপাদনকারী ভোগ্য দ্রব্য সরবারহ করবে। সুখে শান্তিতে থাকবে একটা পরজীবী জাতি হিসেবে। মধ্যবিত্ত হয়ত কিছু দিকে বিকশিত হয়েছে। কিন্তু তার পরজীবীতার ঘুম ভাঙেনি। তবে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে হলে, পৃথিবীর বুকে একটি জাতি হিসেব মাথা তুলে দাঁড়াতে হলে তার এই ঘুম ভাঙাতে হবে। নিজের মত করে বেড়ে ওঠার সাহস এবং শক্তি যোগাতে হবে। এই শক্তির প্রকাশ হবে যে কোন সৃজনশীল উদ্যোগে।

ট্যাগঃ:

মন্তব্য ০ পঠিত