ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

আমরা সাধারণ মানুষ। রাজনীতি বা মন্ত্রী এমপি, ঠিকাদার, সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি এসব আমরা কী আর বুঝি! কিন্তু যখন মানবসৃষ্ট দুর্যোগকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়, তখন ঘৃণা আর কান্না লুকিয়ে রাখতে ভালো লাগে না। আর যখন অসহায় মানুষদের প্রকৃত পরিস্থিতি লুকিয়ে রাখা হয়, অসামান্যকে সামান্য বলে ঊর্ধ্বতনদের বুঝানো হয়, তখন কষ্টে কান্না আসে; অক্ষমতায় হাত-পা কাঁপে। দেশের ক্ষমতাধর উত্তম পুরুষদের বলছি-  আমাদের রাতকে যারা দুঃস্বপ্নের করেছে আর  আমাদের দিনকে যারা দুর্ভাবনার করে দিয়েছে, আমাদের সহযোগিতার পাশাপাশি সেইসব দায়ী চোরদের শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা নিন। তদন্তের নামে যেনো এরা সাধু হতে না পারে; দয়া করুন।

লেখাটি শুরু করবো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ দিয়ে। তিনি হাওর এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণ তৎপরতা জোরদার করার নির্দেশ  দিয়েছেন। একই সঙ্গে এ পর্যন্ত যেসব পদক্ষেপ নেওয়া  হয়েছে,  তিনি সেগুলো আরও বেশি প্রচারের ব্যবস্থা করার জন্য সংশ্লিষ্ট  মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন । পত্রিকা মারফত জেনেছি, হাওর এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছানো গেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চারটি মন্ত্রণালয় সঙ্গে  সঙ্গে পদক্ষেপ নিয়েছে। বিষয়টি ভালো লেগেছে। কিন্তু সেই সাথে কিছু দুর্ভাবনাও মনে উঁকি দিচ্ছে। কেননা হাওর রক্ষায় বাঁধ নির্মাণেও সরকারি বাজেট কিন্তু ছিলো। অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির কারণে যথাযথভাবে কিছুই হয়নি। আর বর্তমান ত্রাণ ও অন্য আর্থিক বরাদ্দের ক্ষেত্রে যদি এই অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির বিষাক্ত ছোঁয়া লাগে, তবে কী হবে তা আমরা আন্দাজ করতে পারি।

এ দুর্যোগে একটি সুসংবাদ জেনে ভালো লেগেছে। বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, হাওরে পানি দূষণের পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। সে সময় যেসব হাওরে বা নদীতে পানি দূষণ হয়েছে এবং মাছ মরে ভেসে উঠছে, সেগুলো না খাওয়ার জন্য বলা হয়েছিল।এখন হাওরে মাছ ধরা ও খাওয়ার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এখন মাছ খেলে সমস্যা হবে না। তবে সবচেয়ে ভালো খবরটি হলো, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হাওর অঞ্চলের কৃষিঋণ আদায় স্থগিতের জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত ঋণ আদায় স্থগিত রেখে পরবর্তী সময়ে সহজ কিস্তির মাধ্যমে ঋণ পুনঃ তফসিল করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ফসল ও মৎস্য খাতে প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতে নতুন ঋণ বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংককে ধন্যবাদ। তবে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা যাতে প্রকৃত চাহিদা মোতাবেক যথাসময়ে নতুন ঋণসুবিধা প্রহণ করতে পারেন এবং ঋণ পেতে কোনোরূপ হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়টি নিবিড়ভাবে তদারকি করতে হবে। না হলে ঠিকঠাক সুফল কৃষকেরা পাবেন না।

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা কেয়ার, অ্যাকশনএইড, অক্সফাম কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইড, ওয়াটারএইড, সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজসহ (সিএনআরএর) ৩৫টি সংস্থা হাওরকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করার দাবি জানিয়ে বলছে, সর্বাধিক জাতীয় গুরুত্ব দিয়ে হাওরের সংকট মোকাবিলায় সরকারের এগিয়ে আসা উচিত। হাওরের উন্নয়ন ও গবেষণা নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলো বলছে, এই ক্ষতির প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতির ওপর। কেননা সরকারের হাওর  মহাপরিকল্পনার হিসাবে দেশের মোট ধানের ১৮ শতাংশ এবং উন্মুক্ত উৎসের মাছের ২৮ শতাংশ আসে হাওর থেকে। দেশের জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে (জিডিপি) হাওরের অবদান ৬ শতাংশ।

আমার জন্ম হাওর পাড়ে। আমি জানি এ এলাকায় বাঁধ নির্মাণে যে টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়, তার সম্পূর্ণ টাকা বাঁধ তৈরিতে ব্যবহার করা হয় না। এটা একেবারে প্রচলিত প্রথা হয়ে গেছে। দুদকের কাছে প্রত্যাশা হাওর নিয়ে করা সকল দুর্নীতির তদন্ত হবে। আর হাওর এলাকায় এই  বিপর্যয়ের পেছনে মানবসৃষ্ট কারণ কতটুকু আর প্রাকৃতিক কারণ কতোটা সেটিও তদন্ত করা দরকার। সেই সাথে খুঁজে বের করতে হবে এই দুর্যোগের কতখানি আসলে  দুর্নীতির কারণে ঘটেছে, কতখানি দায়িত্ব অবহেলার  কারণে ঘটেছে, কতখানি এই মানুষগুলোর জীবনের প্রতি অবজ্ঞার কারণে ঘটেছে, কতখানি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার মধ্যে নীতির ভুলভ্রান্তির কারণে ঘটেছে। এগুলো  তদন্ত করে দোষীদেরকে শাস্তির আওতায় আনুন। আর তা না হলে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে আগামীতেও।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০১২ এর ৪৯ ধারায় মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগে শাস্তি সম্পর্কে বলা আছে। সেখানে উল্লেখ আছে, উপধারা (১) কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃত বা অবহেলাক্রমে যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ব্যতিরেকে কোন কার্য দ্বারা পরিবেশের এইরূপ বিপর্যয় ঘটান যাহা কোন দুর্যোগের কারণ সৃষ্টি করে এবং ফলশ্রুতিতে অন্য কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জান, মাল, সম্পদ, স্থাপনা বা ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি সাধিত হয়, তাহা হইলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান উক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিকট হইতে ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য উপযুক্ত আদালতে মামলা দায়ের করিতে পারিবে। উপধারা (২) এই ধারার অধীন ক্ষতিপূরণ আদায়ের মামলা পরিচালনায়  Code of Civil Procedure, 1908 (Act No. V of 1908) এর বিধানাবলী প্রযোজ্য হইবে।

দুর্যোগের পর সবচেয়ে বেশি দরকার মানুষের কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করা। কিন্তু এই হাওর অঞ্চলে ধান আর মাছ ছাড়া তেমন কিছু নেই কর্ম সংস্থানের। সেসব বিবেচনায় হাওরের সম্ভাব্য জলমহালের লিজ বাতিল করে উন্মুক্ত জলাশয়ে সকলের মাছ ধরার অধিকার  দেয়া গেলে ভালো হতো। সামনে কী দিন কতোটা দুর্ভাবনা নিয়ে আসছে তা এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারছে না কেউ। তবে সব ফসল  হারানোর কষ্ট আর ঘরবাড়ি হারানোর দুর্ভোগ অনেক দিন হাওরবাসীকে ভোগাবে, এতে সন্দেহ নেই। আর তাই দুঃস্বপ্নে কাটছে হাওরবাসীর রাত।

(লেখক – গবেষক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কর্মকর্তা)