ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

এই বইয়ের লেখাগুলোকে নানা জন নানা নামে বা নানা ভাবে আখ্যায়িত এবং ব্যাখ্যায়িত করেছেন। অনেকে এই লেখা গুলোকে কাব্যকল্প বলছেন। আবার কেউ কেউ দৃশ্যকল্প কিংবা কাব্যকথা হিসেবে জেনেছেন। আবার কেউ স্মৃতিবাহী ঝাঁপি হিসেবে মেনে নিচ্ছেন। তবে, যে কোন পাঠক এই বইটি পাঠরত অবস্থায় থাকতেই নিজেকে খুঁজবেন অথবা মিলিয়ে নিতে চাইবেন লেখার সাথে। তাই বোধকরি, প্রতিটি লেখা নিয়ে যাবে একদম অজান্তেই পরের লেখায়। অথবা, কবি’র লেখা অন্য যে কোন কবিতায় ……

আসুন, বইয়ের সূচনা ফ্ল্যাপ হয়ে আমরা কবিতার দিকে নেমে যাই। সূচনা ফ্ল্যাপের বয়ানে যা আছে –

“উভয় বাংলায় ভালো লিখেছেন অনেকেই। কিন্তু এক্সপেরিমেন্টাল বইপত্র কম হচ্ছে। প্রচলিত কবিতা ও গল্পের বাইরে এই বই। বাংলা কবিতা – গল্পে অন্যসব নিরীক্ষা পাশ কাটিয়ে এখন অনুভূতিপ্রবণতাই প্রধান। এ গ্রন্থ পুরোপুরি অনুভূতি প্রধান ও মায়ামেদুর আলো পৃথিবীর এক ভাষায় বিনির্মিত যার গভীরতায় নামতে ভয় নেই – বিবশ অবচেতনায় নয় , আরো নিবিড় চেতনতার আবেগে – অতিঘুমে – বিষাদে – দৃশ্যান্তরে – বোবামুহূর্তে। সমকালীন বাংলা কবিতার আরেকটি প্রবণতা লেখাগুলোতে চোখে পড়ে, সেটি হলো গল্প বলার প্রবণতা। এ লেখাগুলোর ছায়াচ্ছন্ন রহস্য ম্লান হবেনা বলেই মনে হচ্ছে, স্পর্শের ভেতর দিয়ে পুনর্গঠিত হবে।”

বইয়ের প্রচ্ছদ গঠিত করেছেন – রচিষ্ণু সান্যাল।

আর উৎসর্গপত্র অনুসারে কবি’র বাবা থাকছেন, প্রতিটি শব্দের বন্ধু হয়ে; অথবা লাইনের, অথবা ……

সূচি জানাচ্ছে – এই বইয়ে কবি’র লেখা পঁয়ত্রিশটি কবিতা বা কাব্যকল্প অবস্থান করছে। নামগুলো যথাক্রমে এমন – তরঙ্গিম শব্দগুচ্ছ, বনকুসুম, কম্পোজিশন, পরিবৃত্ত, কাল রাতে সাপে কেটেছিল, ঘনোপলে আজ এমারেলড, কাঙ্ক্ষা, সৃজন, জলদহন, পথভুল, বাতিঘর এক সবুজ, দংশন, কালো কুকুর, অন্ধকার ও শিকার বিষয়ক, রাতকথা, নির্বাসন, নিঃশব্দ দহন, ইনটেনসিভ কেয়ার, অনিন্দ্য রাত্রিপ্রাঙ্গনে, শূনের ভিতর ঢেউ, এইবার আকাশের গা বেয়ে, নেই এখানে কোনো দৃশ্যকল্প নেই, রেবতীকথন, বিবমিষায় ভ্রান্ত বিলাপ, শব্দকুহক, অনুবোধ, শিরোনামহীন সরলরেখা, ছায়ামুখোশ, শিঞ্জিনী, স্থিরচিত্র, মেঘমাল্লার, তেপান্তরের মাঠে, অনিশ্চিত, অলীক, আগুনজলে ভাসা এবং নামাঙ্কিত কবিতা “জলডুমুরের ঘুম”।

এবার আমারা নেমে পড়ি কবিতায়।
প্রথম কবিতা, “তরঙ্গিম শব্দগুচ্ছ” থেকে অপূর্ব প্রারম্ভিক লাইন এমন- “পুরো শীতকাল একবার অতিথি পাখিদের সঙ্গে ছিলাম। সারাদিন কাছে কাছে। রাত হলে উড়ে যেতাম পল্টনের সাততলা বাড়ির ছাদে।” অথবা, বইয়ের তৃতীয় কবিতার শেষ লাইনে কথা যেভাবে সুরে নামছে – “একজীবন ধরে বয়ে বেড়ানো কান্না গুলো বিটোভেনের চেয়ে কম দামি কিছু কম্পোজিশন নয়।” বইটির এগারতম কবিতা থেকে কিছুটা উল্লেখ করতে চাই, যেখানে পাঠক লেখার সাথে একাত্ম হয়ে যেতে এক মুহূর্তও লাগবেনা-

হ্যাঁ, বলছিলাম আমার সেই সবুজ আলোর ফুটকির কথা। আমি সযত্নে রেখেছি রাধাকৃষ্ণের মূর্তিটার পাশে। রোজ জল-বাতাসা দিই, তারপর সন্ধ্যেবেলা আবার ঘরে তুলে রাখি। এই আলোক বিন্দুটি যাকে আমি সবুজ ফুটকি বলছি সে একসময় সত্যিই নাজুক ছিল ভারি। ওকে যত্ন না করলে কবেই মরে যেতো। আমি জানতাম এই বিন্দুটিকে সাথে সাথে রাখতে হবে। জানি, ওকে সাথে করে আমি পৌঁছে যেতে পারি আমাদের ছায়াপথে। আমি জেনে গেছি এইসব বিন্দুগুলোকে আগলে রাখতে জানলে কেউ যেমন হারে না, তেমন হারায়ও না। নিজের অবস্থানটি চিনে নিয়ে সে নিজের মত করে বেঁচে থাকতে শিখে যায়!

আমি জানি তুমি কেমন আছো! তুমি এখন চেনা গন্ডির সীমানা ছুঁয়ে, আটপৌরে হয়ে, চাঁদ দেখে দেখে বাঁচো।”
(বাতিঘর এক সবুজ)

শব্দসম্পদে ভরপুর এই কবি’র “বনকুসুম” থেকে কিছু চমকপ্রদ লাইন এখানকার পাঠকের সমীপে দিলাম –

“আকাশ মস্ত নীল। যেন খুব করে কেউ রঙ গুলে আকাশকে স্নান করিয়েছে। তাতে হালকা পলকা পাল তুলে ভাসছে হাসিমুখে সাদা সাদা মেঘ। কচি সবুজ রঙে জুড়ে আছে পুরো প্রান্তর, খুব দূরে গিয়ে ছুঁতে চেয়েছে সে দিগন্তরেখা। চুপ করে বসে রঙগুলো দেখি। তোমাকে বলেছিলাম এখানে এলেই মন ভালো হয়ে যায়! তোমার চোখও সেকথাই বলছে। বিকেলের পড়ন্ত রোদের লালচে আভা তোমার চুলে এসে বসেছে চুপ করে। বুকে মাদল বেজে ওঠে। ভিমপলশ্রীর কোমল নিখাদ বাতাসে ভেসে বেড়ায়। শাড়ির আঁচলে রাধা-কৃষ্ণ চিত্রবুনোট। কপালে ছোটো কালো টিপ।” (বনকুসুম)

অথবা, অদ্ভুত সে সুন্দর লাইনগুলো; যা আছে “শূন্যের ভেতরে ঢেউ” কল্পের মাঝে-
“জানলা দিয়ে তাকিয়ে আছি। নারকেলগাছের গা গলে ঢুকে পড়ছে রোদ্দুর। উঠোনে দু’টো শালিকের দীর্ঘ বাক্য বিনিময়ে বিঘ্ন ঘটিয়ে কার্নিশে বসে ডেকে যাচ্ছে চড়াই। রোদ আরও চওড়া হয়ে এবার উঠোনে এসে পড়েছে। ভ্রু কুঁচকে, চোখ কুঁচকে তবু রোদ্দুরের দিকে তাকিয়ে আমি। প্রায়ান্ধকার জানালার এপাশে দাঁড়িয়ে মুখ ভেঙ্গে চুরে যায়, আমি ভাঙ্গতে শুরু করি ভিতর থেকে। মনে হয় মানুষ হয়ে জন্মালাম কেন! পাখি হতে পারতাম, ঘাস হতে পারতাম অথবা প্রজাপতি, শালিক, চড়াই বা রোদ্দুর যে কোনো কিছুই তো হতে পারতাম! মানুষ না হয়ে এসবের যে কোনো কিছু হয়ে জন্মালে আমার অনুভূতি থাকতো কি!!”

এবার গ্রন্থানুসারে নামাঙ্কিত কবিতায় নামি। এবং এটি এই গ্রন্থের সর্বশেষ কবিতা হিসেবে লিপিবদ্ধ আছে! আসুন-জানতে চেষ্টা করি, কেমন সে “জলডুমুরের ঘুম”?
“আমরা ধ্রুবতারার সাথে পূর্ব জন্মে ফিরে যেতে চাই।
লোকাল ট্রেনের মত ধীরগতি হয়ে পড়া আমাদের চোখ তখন কেউ বেঁধে দিয়ে বলেঃ
ঘুমাও জলডুমুর।”

অনেকগুলো কবিতা এখানে অনুল্লেখ থাকলো। যা পাঠক নিজে খুঁজে নিবেন। কেননা, কবি মনে করেন- লেখকের পাঠক খুঁজে ফেরার দায় নেই! পাঠকই খুঁজে ফিরবে লেখা। অথবা, একবার পাঠেও এমন লেখার উল্লেখ আসতে বাধ্য বলে আমি মনে করছি। কেননা, এই বইয়ের লেখাগুলো পাঠকের হাত ধরে কালোত্তীর্ণের পথে যেতে চায়। তাই এখানে কাজটি একমাত্র পাঠকই করতে পারেন। অথবা, পাঠকই সঙ্গী হতে পারেন এমন লেখার। সেজন্য পাঠক আবিস্কার করে নিতে পারেন নিজেকে, এই বই পাঠের মাধ্যমে। কিংবা নিজের অনুভূত জগতকে, যা অপঠিত থেকে যাচ্ছিল; খোদ নিজের কাছেই। তাই বলা হচ্ছে, নিজেকে আবিস্কারের এহেন কথা।

সৌভাগ্য বশত আমরা কবি’র সাম্প্রতিক সময়ের লেখায়ও হেঁটে আসতে পারি। যেখানে লেখার নামাঙ্কিত আছে “তবু খোঁজো স্মৃতিবিন্দু” নামে। পুরো লেখাটি এভাবে পাওয়া-
যা কিছু গভীর তার সবটুকু দিয়েছি তোমাকে
মাছরাঙা নাভিতল নিভৃতের হরিতকি বন
তবু খোঁজো স্মৃতিবিন্দু, সঙ্গোপনে দেরাজে যখন
হৃদয় আগলে রাখি অর্থহীন অপার বিষাদে
নিজেকে সরিয়ে ভাবি এই বেশ লুকোচুরি খেলা
ছেঁড়াখোঁড়া ধারাপাতে থেকে যাবো এমন ভ্রমণে
এতো সে’ই তুমি নও, যাকে আমি অনিরুদ্ধ জানি
চেতনার কোন স্তরে ভালবাসা নিজেকে চেনায়?
উত্তর অজ্ঞাত তাই লক্ষ্যভেদি সে শিকার আমি
তুমি যাকে প্রেম বলো তাকে আমি স্পর্শ বলে জানি.

এই অসাধারণ বইয়ের লেখক কবি মেঘ অদিতি। বইয়ের সমাপ্তি ফ্ল্যাপে জানা যাচ্ছে, কবি জন্মেছেন- জামালপুর। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম মারফতে জানতে পারি- কবি শুধু সু-লেখক’ই নন, রঙের একজন জাদুকরও। কেননা, অনেকগুলো ছোট কাগজ সহ নানা বইয়ের প্রচ্ছদ দখল করে আছে তাঁর আঁকা ছবি।

বইটি প্রকাশ করেছে- সাম্প্রতিক প্রকাশনী। এছাড়া অনলাইন শপ রকমারি ডট কম’এ বইটি সব সময় পাওয়া যেতে পারে।
প্রকাশ কাল – একুশে বইমেলা, ২০১২।

সাম্প্রতিক সময়ে কবি মেঘ অদিতি’র লিখা আমার একটি ভীষণ প্রিয় কবিতা পড়তে পড়তে সামগ্রিক কবিতা সময়ের দিকে মিলিয়ে যেতে চাই। যার রেশ থেকে যেতে পারে আগামীর যে কোন কবিতা পাঠ পরও । কবিতার শিরোনাম “বলিনি কখনো”
স্মৃতিবাহী ঢেউ ঘুমআড়ালে
স্তব্ধতা চিরে দিলে ওই বাঁশি বাজে
বলিনি কখনো-
আমাকেও ছিন্নভিন্ন করেছে সে
থাকা না থাকার এই দীর্ঘ পরবাসে
আত্মজীবনীর সবটুকু মুছে দিয়ে গেছে …