ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 
কর্ম ব্যস্ততার মাঝে ভ্রমণ পিপাসায় যখন ছটপট করছে মন, তখনই নিজেদের তৃপ্ত করতে আমরা ক’জন ছুটে যাই পারস্য উপসাগরের তীর ঘেঁষে থাকা আজমানের লবনাক্ত সমুদ্র কূলে। এটি আজমান কর্ণেশ নামে পরিচিত। আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব কোনায় অবস্থিত সাতটি স্বাধীন রাষ্ট্রের একটি ফেডারেশন দাওলাত্ আল্-ইমারাত্ আল্-আরবিয়াহ্ আল্-মুত্তাহিদাহ্ যাকে আমরা সংযুক্ত আরব আমিরাত বা ইউএই নামে জানি। সেই আরব আমিরাতের সাতটি ভিন্ন আমিরাতের একটি হচ্ছে আজমান। আজমানের সৌন্দর্য বর্ধণ ও এখানকার দর্শনার্থী-পর্যটকদের জন্য অপার মহিমায় নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছে এ সৈকত। যত কাছে যাই ততই মনে হয় এ যেন সদ্য ভিজে যাওয়া কোনো লজ্জাবতী নারী। কবি-লেখকরা সদা জল আর নারীর মাঝে মিল খুঁজেন, সমতা দেখেন সৌন্দর্যে। অথচ আমরা যে ক’জন ঘর হতে প্রকৃতি দেখতে বের হয়েছি, তাদের কেউ প্রসিদ্ধ লেখক বা কবি নই। একে অপরের বন্ধু বটে। ছোট বেলায় একি স্কুলে পড়ালেখা করা ছয়জন যুবকের সাথে সেদিন যোগ হয়েছিলো প্রবাসী আরো দুই বন্ধু। বিদেশে পাড়ি দেয়ার পর যোগযোগ ছাড়া দীর্ঘদিন কাটলেও একত্র হয়ে ফের পুরোনো স্মৃতিচারণ আর আড্ডায় কাটিয়েছি সারাবেলা।
11304443_1643738889194760_1677664604_n
প্রস্তুতিটা সকাল থেকেই নেয়া। বন্ধু মামুনের গাড়িতে করে আমরা রওনা হলাম আজমানের দিকে। তখন বিকেল চারটা। রৌদের তাপ কমেনি। এসময় আমিরাতের তাপমাত্রাও অধিক। দশ মিনিট বাইরে দাঁড়ানো মানে অসহ্য গরমের সাথে নিজের যুদ্ধ ঘোষণা করা। কিন্তু গরমের সাথে আমাদের যুদ্ধ করতে হয়নি। মামুনের এসি’র গাড়ি। সবাই আরাম করেই বসেছি। রুম থেকে আব্দুল হালিম, বাবুল শীল, মাজহার সুমন, শাহজান আর আমি বের হয়েছি মামুনের সাথে। গাড়ি নিজে ড্রাইভ করছে বলেই আমিরাতের ট্রাফিক আইন সম্পর্কে একটু বেশি সচেতন মামুন। মামুন বললো- কিছু সমস্যা আছে, আজমান ইন্ড্রাস্টিয়াল এরিয়ায় পর্যন্ত এ গাড়িতে যাওয়া যাবে। পরবর্তীতে গাড়ি পরিবর্তন করতে হবে আমাদের। কথা মতো কাজ। লোক হিসেবে আমরা ছয়জন। আমিরাতের টেক্সিতে অতিরিক্ত যাত্রী উঠার নিয়ম নেই। তাই এক গাড়িতে সবার যাওয়াও হচ্ছে না। এখানেই বিদায় দিতে হলো কৈশোরের সহপাঠী মামুনকে। পৃথক পৃথক দুটি টেক্সি নিয়ে আজমান ইন্ড্রাস্টিয়াল এরিয়া থেকে কর্ণেশের উদ্দেশ্যে শুরু হলো আমাদের যাত্রা। গাড়ি চলছে ইন্ড্রাস্টিয়াল এরিয়ার রোড ধরে।
PhotoGrid_1434127834743
আবুধাবী বা দুবাই থেকে ভিন্ন এই আমিরাত। ধূলো মাখা পথ-ঘাট। তুলনামূলকভাবে অত্যান্ত সাধারণ জীবন মান এখানকার প্রবাসীদের। এখানে শ্রমজীবি প্রবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান সংখ্যা গরিষ্ঠ। আবার সস্তায় ভাড়া বাসা পাওয়ায় অধিকাংশ বাংলাদেশি ও ভারতীয় নাগরিক পরিবার নিয়ে থাকেন আজমানে। শুধু যে বাসা ভাড়া কম তা নয়, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যও এখানে প্রবাসীরা পাচ্ছেন সাশ্রয়ী মূল্যে। এসব তথ্য প্রথমই জেনেছি। যখন আমরা ইন্ড্রাস্টিয়াল এরিয়ার লাকী গোল চত্ত্বরে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছি, তখন বেশ কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশির সাথে কথা হয় আমাদের। লাকী গোল চত্ত্বরে প্রতি শুক্রবার বসে বাংলা বাজার। দিনটি শুক্রবার হওয়ায় আমাদেরও সুযোগ হলো গ্রাম বাংলার মেলা বা হাট-বাজারের মতো হরেক রকম পণ্যে সাজানো বাংলা বাজার ঘুরে দেখার। প্রচুর বাংলাদেশির সমাগম। এ যেন মরুর দেশে এক খন্ড বাংলাদেশ। তবে ভিনদেশিদেরও চোখে পড়ে। তুলনায় কম। ঝালমুড়ি, সিদ্ধ ডিম, জামা-কাপড়, মোবাইল সামগ্রী ও প্রসাধনীর ভিন্ন রকম এক আয়োজন বাংলা বাজারে। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে কিছু প্রবাসী বাংলাদেশি এখানেও দেশের ন্যায় খেলার নামে জুয়ার আসর বসান। খোঁজ নিয়ে জানলাম, এর মূল হোঁতারা পাকিস্তানি। তারা বাংলাদেশিদের দ্বারাই এ অবৈধ খেলা পরিচালনা করে। লাভের দুই তৃতীয়াংশ তারাই ভাগ করে নেয়। লাকী গোল চত্ত্বরের একটু সামনে আছে মানুষের স্টেশন। এখানে কাজের সন্ধানী শ্রমিকরা সকাল-সন্ধ্যা কাজ বিক্রি করেন। সন্ধ্যায় চুক্তি হলে পরের দিন কাজ। দিনের কাজ দিনে শেষ করে এরা মুজরী নিয়ে ঘরে ফিরেন। আবার কেউ কেউ সপ্তাহে সাতদিনের চুক্তি করে কাজ করেন। আজমানে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে রাস্তায় বিকল গাড়ি। রাস্তার পাশে এতো বেশি বিকল গাড়ি দেখে কেউ কেউতো মন্তব্য করেই বসেন, এটি চায়নাদের আবর্জনা পেলার জায়গা! তবে এখানেই বাংলাদেশিদের সাফল্য আর গৌরব গাথাঁর আছে অনেক গল্প। আজমান ইন্ড্রাস্টিয়াল এরিয়া গ্যারেজ ও গার্মেন্টস শিল্পের জন্য নামকরা। আর এ দুটি সেক্টরেই সফলতার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন বাংলাদেশি লাখ শ্রমিক। কাগজে কলমে হিসাব করলে দেখা যাবে, আজমানের প্রায় সত্তর ভাগ গ্যারেজ মালিক বাংলাদেশি। একই হিসাবের কম নয় গার্মেন্টস শিল্পেও। যেখানে মালিক বাংলাদেশি সেখানে কর্মী নিজ দেশি হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভিসা জটিলতায় বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন যোগদান করছে ভিনদেশি শ্রমিক। যা একদিকে মালিকদের জন্য হতাশার গল্প রচনা করছে, অন্যদিকে রেমিটেন্স প্রবাহে বাংলাদেশের গতি করছে মন্থর।
ইতোমধ্যে আমাদের গাড়ি পৌঁছে গেছে আজমান লুলু সেন্টারের খুব কাছাকাছি। লুলু সেন্টারের বিপরীত পার্শ্ব থেকে আমাদের সাথে যোগ হয়েছে কৈশোরের অন্য বন্ধু আরিফ হোসেন। সদ্য বিয়ে করে দেশ থেকে ফিরেছে সে। তার সাথে ভাগিনা মুরশেদ। সবাই মিলে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা আজমান কর্ণেশে পৌঁছে যাই। এবার এক সঙ্গে চলার পালা। পর্যটকদের ভিড়ে মুখরিত সমুদ্র কূল। খানেকটা হাঁটার পর ক্লান্ত শরীরে ছুঁয়ে দেখলাম সমুদ্র জল। বেশ লবনাক্ত। বড় বড় পাথরগুলোতে বসে উপভোগ করছিলাম প্রতিটি ঢেউয়ের খেলা। চিৎকার চেচামেচি আর অ্যারাবিয়ান ছেলেদের স্পীড বোটের খেলা অন্য রকম আনন্দই দিচ্ছিলো আমাদের। কেউ জমিয়ে সাঁতার কাটছে। কেউবা পানিতে বসে রয়েছে। এখানে দাঁড়িয়ে নিয়ে নিলাম বেশ কিছু গ্রুপ ছবি। এরপর আবার হাঁটছি। সামনে যেতে্ই চোখে পড়লো বাদামওয়ালা। কে যেন বললো, ‘এই বাদাম খাবো’। কথা মতো নেয়া হলো বাদাম। বাদামওয়ালা বাংলাদেশি।
শুধু বাদামওয়ালাই নয়, এখানে কিছু বাংলাদেশি ভাইদের বেলুন ও বাচ্চাদের খেলনা বিক্রি করতেও দেখা গেছে। বাদাম বিক্রেতার সাথে কথা বলতে চেয়েছিলাম আমরা, কিন্তু তিনি রাজি হননি। হয়তো ভেবেছেন সাংবাদিক! আমরা হাঁটছি, সূর্য তখন অস্ত যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমাদের চোখে পড়লো তিনজন অ্যারাবিয়ান ছেলে বালি সরিয়ে গর্ত করছে। কৌতুহল নিয়ে সবাই তাদের সামনে গিয়ে বসলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের গর্ত করা শেষ হলে একটি ছেলে সেখানে শুয়ে পড়ে। গর্তের দিকে মুখ করে ছেলেটি শোয়ার সাথে সাথে অন্য দুজন মাটি চাপা দেয় তাকে। আশ্চর্য্য হয়ে আমরা তাকিয়ে ছিলাম বেশ কিছুক্ষণ। অদ্ভুত রকম কারুকাজ। মূহুর্ত্বে চারদিক থেকে মানুষের উপছে পড়া ভিড়। সবাই কৌতুহলী দৃষ্টিতে দেখছে এদের। হাতের স্পর্শেই তারা সদ্য দাফন করা মৃত ব্যক্তির কবর তৈরী করে দেখালো। ভিতরের ছেলেটিও প্রায় সাত থেকে দশ মিনিটের মতো ওভাবেই শুয়ে ছিলো। ওখান থেকেই আমরা দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখলাম। তখন অপরিচিত এক পর্যটক আমাদের গ্রুপ ছবি তুলে দিলেন। আমরা শহীদ মিনার আকৃতিতে পোজ দিলাম। সন্ধ্যা নাগাদ আমাদের ফেরার প্রস্তুতি। হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌঁছলাম হলিডে বীচ সংলগ্ন মুজরা নৃত্যের ক্লাবগুলোর সামনে। নৃত্য দেখতে কেউই আগ্রহী ছিলো না। সমুদ্রের নিকটবর্তী ছোট্ট রেস্টুরেন্টের পাশে ঘাসের উপর আমরা বসে খানেকটা বিশ্রাম ও সাথে হালকা নাস্তা সেরে নিলাম। চিপস আর ম্যাংগো জুস খাওয়া চলছে, ফাঁকে বিশ্রামও। এর মধ্যেই জমে উঠেছিলো আমাদের আড্ডা। স্মৃতিচারণ, গল্প আর গানে গানে যেন হারিয়ে যাচ্ছিলাম সেই দুরন্ত কৈশোরে। কিছুক্ষণের জন্য হলেও আমরা ফিরে গেলাম ছোটবেলায়। মনে পড়তে লাগলো সেই হারানো দিন। যখন একই শ্রেণী কক্ষে বসে পড়া হতো, আড্ডা হতো। স্কুল কিংবা বাইরে বন্ধুত্বের টানে নিবিড় ছিলো বন্ধুত্বের সম্পর্ক। সেই স্মৃতি, এই সময়। অথচ কত মানুষের ভিড়ে এখান আমরা হারিয়ে গেছি। আমরা বসে আছি। কেউ কেউ এ পথ ধরে হাঁটছে। কেউ আড্ডা দিচ্ছে, কেউ উটের পিঠে ছড়ছে। কেউবা খাচ্ছে। অ্যারাবিয়ান মহিলারা বাসা থেকে খাবার তৈরি করে সমুদ্র পাড়ে খাবারের স্বাদ নিচ্ছেন। এখানে খাওয়ার মজাটাই যেন অন্য রকম। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা বালিতে খেলছে, কেউ ঘুড়ি উড়াতে ব্যস্ত। আর বারবিকিউ পার্টির প্রস্তুতিতো আছেই। আমিরাতে একটি ছুটির দিনও কর্ম ব্যস্ত মানুষগুলো মিস করতে চান না, উপভোগ করেন ছুটির দিনের পুরো সময়টাই। তারই একটি চিত্র যেন ফুটে উঠেছে আজমান কর্ণেশে। মানুষের ভিড়ের মাঝে হঠাৎ করে আমিরাতি কয়েকজন সিআইডি এসে বসে থাকা জায়গাটি ছেড়ে দিতে বললেন সবাইকে। কারণও আছে, এটা-ওটা খেয়ে আবর্জনা পেলে রীতিমতো জায়গাটি নোংরা করে ফেলেছিলো আড্ডারত মানুষগুলো। তাই হয়তো দায়িত্ব সচেতন সিআইডিরা জায়গটা খালি করতে বাধ্য করলেন। সবার মতো আমরাও উঠে গেলাম। এবার রাস্তা পার হয়ে আরিফ ও মুরশেদকে বিদায় দিয়ে দুটি টেক্সি নিয়ে হালিম, সুমন ও আমি একটিতে আর অন্য টেক্সিতে বাবলু ও শাহজাহান ফের রওনা হলাম নিজেদের অস্থায়ী গন্তব্যের দিকে।
লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক ; দুবাই, আরব আমিরাত।