ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির খবর দিলের মধ্যে খপ করে ধরেছিল। ব্যথা পেয়েছিলাম। এখন ধীরে ধীরে কমছে। কমে যাবার পেছনে মিডিয়ার ভূমিকায়ই যথেষ্ট। মিডিয়া এসব প্রসঙ্গ যত দ্রুত ভুলতে পারবে, ততই তাড়াতাড়ি দিলে ধুপ ধুপ শব্দ করা স্পন্দনগুলো ক্রমাগত কমতে থাকবে। তবে হঠাৎ পাওয়া খবরে আঘাত পাওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক! আমাদেরই-তো টাকা! এখানে বসে দিরহাম পাঠাই। দিরহামগুলো অন্যান্য দেশ হতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের সঙ্গে মিলেমিশে রেমিটেন্স হয়ে যায়। সরকার রেমিটেন্সের হিসাব করে। আমরা যেমনি শ্রমে-ঘামে কামানো টাকার পাই পাই করে হিসাব রাখি, তেমনি হিসাব রাখি একেক ফোঁটা ঘামের। এই যে দেখছেন গামছা, মুখ ঢেকে রেখেছি। ঘন্টা-আধা ঘন্টা পর গামছা খুলে নিয়ে ঘাম পরিস্কার করি। আবার পাশ বদল করে মুখ ঢাকি। এভাবেই চলে ভোর চারটা পর্যন্ত। চারটায় কাজ শেষ হয়, গাড়ির জন্যে অপেক্ষা করতে হয় আরো এক কি দেড় ঘন্টা। গাড়ি এলে তবেই ক্যাম্পে ফিরে যাই।

গত শুক্রবার (১ এপ্রিল) গিয়েছিলাম আল আইনের জেবাল হাফিত নামের উঁচু পর্বতটি দেখতে। এ নিয়ে দ্বিতীয় বার। ঘন্টা খানেক সেখানে কাটিয়ে নেমে এলাম আল আইনের অন্যতম দর্শনীয় স্থান গ্রীন মুবাজ্জারাহ পার্কে। সেখানেও বেশ কিছু সময় ব্যয় করে ফিরছিলাম। ফেরার পথে গেইট সংলগ্ন এলাকায় দেখা হয় আবুল হাসেমের সঙ্গে। পর্বতে উঠতে-নামতেও তার মতো অনেকের দেখা মিলেছে, তবে কথা হয়নি। আঁকা-বাঁকা সড়কে গাড়ি পার্কিং করার সুযোগ ছিল না। পার্কের গেইট থেকে সামান্য দূরত্ব, আবুল হাসেমকে দেখেই গাড়ি চালককে বললাম- দাঁড়ান। জানালার কাঁচ নামিয়ে জিজ্ঞাসা করি – বাংলাদেশি ? হ্যাঁ সূচক উত্তর মিলে।

গাড়ি থামিয়ে সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলা আমার এক ধরণের বদ অভ্যাস। গাড়ি থেকে নেমে কুশল বিনিময় করি আবুল হাসেমের সঙ্গে। এটি তার ছদ্মনাম। দেশের বাড়ি নরসিংদী। প্রকৃত নাম প্রকাশে তারই বারণ আছে। পঞ্চাশ বছর বয়সী আবুল হাসেমের কর্মস্থল আল আইন গ্রীন মুবাজ্জারাহ পার্কের সর্পিল সড়কে। কাজ করেন রাতে, বার ঘন্টা ডিউটি। পাহাড়ি রাস্তা হওয়ায় বকশিস বা উপরি পয়সা পান না, মিলেনা কোম্পানি থেকে কোনো আলাদা সুযোগ-সুবিধা। ক্যাম্প আল আইন-ই। কোম্পানির প্রশ্ন তুলতেই আঞ্চলিক ভাষায় একটি গালি দিলেন। সঙ্গত কারণে সেটি উল্লেখ করা গেল না। প্রবাসে কেটে গেছে তার প্রায় পঁচিশ বছর। আঠারো মাস আগে দেশ থেকে ঘুরে এসেছেন, খুব সহজ ভাষায় জানালেন সে কথা। জানিয়ে রাখা ভাল, প্রবাসীরা দেশ হতে ঘুরে এলে বছর হিসাব খুব কমই করেন, সচরাচর হিসাব করেন মাসের। দেশে স্ত্রী ও দুই পুত্র সন্তান। বড় ছেলে দশম ও ছোটজন ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে। পরিবারের কথা বলার সময় মুখখানি বেশ মলিন হয়ে এলো তার। দুই তিনবার চোখ ফেরালেন। মনে হলো, দৃষ্টি লুকাতে চেষ্টা করছেন। যদিও গামছায় ঢাকা মুখের শুধু চোখ দুটোই দেখছি আমি। যাকগে, সাধারণ প্রবাসীরা অনেকেই এমন। এটি নিয়তির সঙ্গে এক প্রকার অদৃশ্য লুকোচুরি খেলা।

addddddddddd

গামছা দিয়ে মুখ ঢেকে রাখার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। আমরা যখন পর্বতের একেবারে উপরে দাঁড়িয়ে তখন প্রচন্ড বাতাস। ঠান্ডা হাওয়া। আবহাওয়া এমন, যেন শীত মৌসুম। হাওয়া ও ধূলোবালি থেকে বাঁচতে হাসেমরা মুখ ঢেকে রাখেন। আবার পরিচিত কারো মুখোমুখি হবার লজ্জায়ও একই পদ্ধতি অবলম্বন করেন তারা। আমার কাছে কেন জানি দ্বিতীয় কারণটাই মূখ্য মনে হয়। ক্লিনারের কাজ করছেন, যদি পরিচিত কেউ দেখে যায়। ভয়টা হয়তো তাদের মনে কাজ করতেই পারে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে হাসেমদের সংখ্যা নেহাৎ কম নয়। সস্তা মজুরিতে এই সেক্টরটা এখনো বাংলাদেশিদের দখলে। তবে আমিরাতের ভিসা বন্ধ থাকায় কিছুটা হাত ছাড়া হচ্ছে বটে। এরা বেতন পান ছয় থেকে সাত’শ দিরহাম। কারো কারো বেসিক বেতন এখনো চার বা সাড়ে চার’শ দিরহাম। শ্রমিকরা কম মজুরিতে শ্রম বিক্রির পেছনের দায়টা কিন্তু নিজ দেশের সরকারের। সেদিকে যেতে চাই না। প্রসঙ্গে আসি, আবুল হাসেম দিচ্ছিলেন তার চূড়ান্ত হিসাব।

খাওয়া নিজের, থাকা কোম্পানির। চালিয়ে নিচ্ছেন নিজেকে আবার সংসারও। একেক দিরহাম হিসাব করে তবেই দেশে পাঠান। উচ্চ বিলাসী স্বপ্ন না হলেও স্বপ্ন দেখেন ছেলেদের মানুষ করবেন। পরিবারের একমাত্র চালকও তিনি। হিসাব-তো করতেই হবে। কিন্তু কাজের ঘন্টার হিসাবের সঙ্গে মিলে না তার বেতনের হিসাব। গড়মিল যেন থেকেই যায়।
– ‘যদি ভিসাটা পাল্টাতে পারতাম!’ এক বাক্যের কথাটি মুখ থেকে বের হতেই সঙ্গে একটি দীর্ঘশ্বাসও বেরিয়ে এলো, ঢের খেয়াল করলাম। বললেন – ‘ভিসা পরিবর্তন করতে পারলে কিছু সেলারি বাড়তো। কিন্তু আমাদের কথা কে ভাবে ? বছরের পর বছর বাংলাদেশিদের ভিসা বন্ধ! বাংলাদেশি হয়ে জন্ম নিয়ে কি এমন পাপ করেছি আল্লাহ্-ই ভাল জানেন।’ এমন প্রশ্নের প্রেক্ষিতে উত্তর বা সান্তনা কোনোটাই খাটে না দেখে কিছু বলতে পারিনি। কারণ, এ প্রশ্নের উত্তর আমার নিজেরও জানা নেই। তাই কথা বাড়াতে পারিনি, মূলত সাহস পাইনি। – ‘ভাল থাকবেন।’ এ বাক্যটি বলেই বিদায় নিলাম। বিদায়ের আগে হাসি মুখে বললাম- ‘আর ক’টা দিন অপেক্ষা করুন সব ঠিক হয়ে যাবে।’ বিদায় নিলাম। গাড়িতে বসে ভাবলাম – ‘আহা, আবুল হাসেমদের চূড়ান্ত হিসাবগুলো মিলছে-ই না ! কবে কাটবে এই আঁধার মেঘ, কবে দেখবেন তারা চকচকে সোনালী রৌদ!’

লেখক : সাংবাদিক।

news.jony@gmail.com