ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

বাড়ি থেকে একটু দূরের হাটে যেত গ্রামের সব মানুষ। সর্বহারা পার্টির দলাদলির কারণে বাড়ির পাশেই হাট বসেছে। বাড়ির পরে ছোট একটা কোলা (ফসলের মাঠ), তার পরেই হাট। পোষ্টাপিসের হাট। কোলা দিয়ে যেতে দুই তিন মিনিট লাগে। বর্ষায় অবশ্য রাস্তা দিয়ে যেতে হয়। সময় পাঁচ মিনিট।

 

হাট শুরু হওয়ার দ্বিতীয় দিন হাটে গেলাম। ডালায় সাজিয়ে রাখা রুপালি ইলিশ। দাম করলাম- দোকানী দাম বললো, কিন্তু কতো বলতে হবে তা তো জানি না। খুব সম্ভবত ক্লাস থ্রিতে পরি তখন। এর আগে বাজার করার জন্য কখনো হাটে যাইনি। দৌড়ে বাড়ি আসলাম। আম্মাকে জিজ্ঞাসা করলাম কতো বলবো। আম্মা বলে দিলে আবার দৌড়ে হাটে গিয়ে বললাম মাছওয়ালাকে। দিবে না। আবার বাড়ি, আবার আম্মা, আবার হাটে। এভাবে ৫/৬ বারে মাছ কিনতে পারলাম, ইলিশ মাছ। সেদিন মোট ১৫ থেকে ২০ বার গিয়েছি হাটে। কয়েকদিন পরের হাটে আবার ইলিশ কিনলাম। ততোদিনে দাম করা কিছুটা শিখে ফেলেছি। ২০ টাকায় একটা ইলিশ কিনলাম। এখন মনে হচ্ছে দেড় কেজির মতো ওজন ছিল। তখন গ্রামে পিছ বা হালি হিসাবে মাছ বিক্রি হতো। কিন্তু বাড়ির উপর এক কাকা আর আমার ছোট ফুপা ২টি মাছ কিনেছে ৩০ টাকা করে। আমারটার তুলনায় অনেক বড়। মনটা খারাপ হয়ে গেল, আমি ঠকেছি বলে।

 

যা হোক তখনকার দিনে ইলিশ বাসায় আসলে মাছ কুটতে দেখাটা অনেক বড় বিষয়। আম্মা পুরাতন কুলা, যেটা শুধু মাছ কাটার জন্যই মূলত ব্যবহার হতো, তার উপর রেখে মাছ কাটতেন। আমরা তিনজন চারদিকে গোল হয়ে বসে দেখতাম। তিন ভাই বোনের মধ্যে ডিম কে আগে দেখবে বা কতবড় তা নিয়ে হুরোহুরি লেগে যেত। বলা বাহুল্য আমার কাছে এখনো ইলিশ মাছের ডিম পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং প্রিয় খাবার। রাতে খাওয়ার সময় প্লেটে মাছ চলে আসতো। প্রথম রাত্রে অবশ্যই তিনজনকেই ফাকাওয়ালা মাছ (আমরা বলতাম কোলের মাছ) খেতে হবে। সাথে ইলিশের ডিম। নিজের ভাগের অংশ রেখে দিতাম শেষে খালি খাব বলে। আর মাছের মধ্যে একটু ডিম বোনাস পেলে তো মহাখুশি।  বোনাস কিন্তু পেতাম। কারণ খাবার শেষের দিকে আম্মার অংশ হতে তিনজনই পেতাম একটু একটু করে। আববু যখন বাড়ি আসতো তখনকার অবস্থাও একই। নিজের ভাগ পরে আববু আম্মার প্লেটের দিকে নজর।

 

বড় হয়েও ইলিশ প্রীতি কমে নাই। বিশেষ করে আপার। আমরা দুই ভাই তো ঢাকায় থাকি তাই তাজা ইলিশ আর কোথায় পাই। তবে আপা হয়তো পায়। নববর্ষে ইলিশ খাওয়ার সংস্কৃতি শুরু হয়েছে কয়েক বছর থেকে। হয়তো আগেও শহরে ছিল কিন্তু আমরা গ্রামের মানুষতো জানতাম না। যা হোক নববর্ষে ইলিশ খাওয়ার জন্য ২/১ মাস আগেই ইলিশ কিনে রাখতাম। ২০১৩ সাল । ওইতাতে থাকি। নববর্ষে বরিশালের ইলিশ কোথায় পাবো। সে সময়ে ব্যতিক্রম.কম (জাপানের অনলাইন হালাল খাবারের কোম্পানি, বাংলাদেশী মাছ, মাংস বিক্রি করে) এ এতো দাম যে তাতে ইলিশ না খেয়ে ফেসবুকে ছবি শেয়ার দেয়ায় মনে বেশী শান্তনা পাওয়া যায়। অতএব ইলিশের মতো দেখতে খুব কাটাওয়ালা ছোট ধরণের মাছ নিয়ে আসা। ফ্রাই করা এবং বউকে নিয়ে খাওয়া। যাক পানতা ইলিশ তো খাওয়া হলো।

 

এবছর ইলিশ নাকি সস্তা। কোরবানির ঈদের আগে কাওরান বাজারের কাছ দিয়ে যাচ্ছি এবং অনেক দামাদামি করে কিনেই ফেললাম এক হালি ইলিশ। সেদিনই বাড়ি যাচ্ছি, বাসায় কেঊ নেই তাই ইলিশরা মিছিল করে ঢুকে গেল ফ্রিজে এবং সেখানেই দিনাতিপাত করতে লাগলো। ঈদের পরে এসে শুনলাম আরো দাম কমেছে। ছোটভাই, শাওন নাকি আবার ভোলা থেকে ইলিশ আনিয়েছে বন্ধু রাতুলের মাধ্যমে। আনতে যাবো ভাবছি। অবশ্য এবারের লম্বা ছুটিতে নিজ বাড়ি আর শ্বশুরালয় মিলে ভালই ইলিশ খেয়েছি। খেয়েছি ইলিশের ডিমও। শ্বশুরকুলের সবাইও জানে আমার ইলিশ ডিম ভক্তির কথা। এও জানে যে ভাত খাওয়ার শেষে আমি ডিম খাই এবং তারপর দীর্ঘক্ষণ পানি খাইনা ডিমের স্বাদটা মুখে থাকবে বলে।

 

শুধু যে খাওয়া তা কিন্তু নয়, এবার ঈদে আড্ডাও হয়েছে অনেক। স্কুলের বন্ধুদের আড্ডায়তো আলোচনার বিষয়ের শেষ ছিল না। বারাক ওবামা, হিলারী হয়ে বাড়ির পাশের কুয়োর চ্যাং (টাকি) মাছ পর্যন্ত সবই আলোচনার বিষয়। আমাদের যে বিজ্ঞ/অভিজ্ঞ মতামত তা ভাষাগত কারণে সিএনএন এ না হলেও সময় টিভিতে টকশো হিসেবে অনায়াসে প্রচার করা যেত। দুঃখ, বর্তমান যুগেতো গুনীদের কথার কোন মূল্যায়ন নেই। তবে প্রচার হোক বা না হোক আমাদের আলোচনায় ইলিশ অংশ অবধারিত ভাবেই এসেছিল –

 

  • ইলিশ তো এবার পানির দামে যাচ্ছে।
  • আরে ধুর, কিনতে যাও ঠিকই দেখবে দাম আছে।
  • না আসলেই পানির দর।
  • আমি ভোলা থেকে ৩০ টা তাজা ইলিশ নিয়ে এসেছি (বললো জামাল) অফিসের কাজে গিয়েছিলাম দাম সস্তা দেখে কিনে নিয়ে এসেছি।
  • তাজা মানে কি বরফের মধ্যে রাখাই তো ছিল।

টিপ্পনি কাটলো শহীদ। জামাল আর শহীদের মধ্যে সারাজীবন লাগালাগি। একে আপরের পিছে লাগবেই।

  • লাফায় নাই তবে তাজা। আর যারা ইলিশ কেনে তারা জানে যে, ইলিশ মাছ শহীদের মতো শুধু লাফায় না। জাল থেকে ছাড়ানোর পরে শুধু একটা লাফ দিয়েই মরে যায়।

এইবার সিনে আসলো রিয়াজ। যাকে ভারিক্কি চলনের জন্য আমরা প্রফেসর বলে থাকি।

  • মানুষও লাফায় না। শুধু মরে যায়। ইলিশের মতো মরে।
  • মানে? – জামালের কৌতুহলী প্রশ্ন,
  • দেখনা টাম্পাকোতে, ঈদের সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায়, বিভিন্ন সময়ে লঞ্চডুবিতে মানুষ মরে। ইলিশের থেকেও দ্রুত মরে যায়। আমরা মেনে নেই। কেউ টু শব্দটি করে না। সুতরাং মানুষ আর ইলিশের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।
  • পার্থক্য আছে। প্রতিবাদ করে মনির।

ক্লাসের সেই ছোট সরল মনির এখন অনেক বড় হয়েছে। সুন্দর করে কথা বলতে শিখেছে।

  • পার্থক্য আছে। পার্থক্যটা হলো ইলিশ মরার পর তার দাম হয়। অনেক দাম। মানুষ হুমরি খেয়ে পরে কেনার জন্য। বসের বাসায় নিয়ে যেয়ে বলে ‘দেশী নদীর মাছ’। সব মিডিয়া ইলিশের খবর প্রচার করে। ….. ঈদের সরকে বা টাম্পাকোতে মানুষ মরার খবরও মিডিয়ায় আসে। মানুষ মরার পর কয়েকদিন মিডিয়াতে শুধু খবর হয়। কিন্তু ঐ সব মানুষের কোন দাম থাকে না। কেউ কেউ হয় বেওয়ারিশ লাশ।
  • কিছুদিন পর আবার মানুষ মরে , আবার খবর, কিন্তু কোন দাম নেই। কেউ জবাব দেয় না কার জন্য এতো মানুষ মরলো। তদন্ত হয়। হয়তো রিপোর্টও হয়। কিন্তু কেউ জানি না যে, রিপোর্টে কি লেখা। আর মিডিয়া ব্যস্ত হয় পরবর্তী লাশের খবরের জন্য।

 

চলমান টকশোর মতোই এ আড্ডাও চলমান। কিন্তু আমরা জানি না সড়কে, লঞ্চে, টাম্পাকোতে মরনের মিছিল কবে থামবে? কিভাবে থামবে? কে দেবে জবাব? অনেক প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খায়। কোন উত্তর নেই। উত্তর শুধু সেই দুটো লাইন যা বেসিক ট্রেনিং এ সাইফুল স্যারের মুখ থেকে শুনেছিলাম –

 

‘‘মাথায় কত প্রশ্ন জাগে ,দিচ্ছেনা কেউ জবাব তার

সবাই বলে দুষ্ট সোনা, বকিস নে আর খবরদার’’।

slide

জাপানীজ মাছ। দেখতে ও স্বাদে অনেকটা ইলিশের মতো।