ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 
untitled

বিএনপি’র সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নামে রেড অ্যালার্ট জারি করেছে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা- ইন্টারপোল। ১লা বৈশাখ সকাল থেকে এই খবরটাই ঘুরে ফিরে দেখছি। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা চলমান থাকা অবস্থায় ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর চিকিৎসার্থে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন। ২০০৮ থেকে ২০১৫, অনেক জল গড়িয়ে অনেক দূর চলে গিয়েছে। প্যারোলে মুক্ত তারেক রহমান এখন আইনের চোখে ফেরারি আসামী। সন্যাসী চোর না, দ্রব্যে ঘটায়। (http://www.interpol.int/notice/search/wanted/2015-9532)

প্যারোলে মুক্তি মানে স্বাভাবিক মুক্তি নয় বা মামলা থেকে বেকসুর খালাস নন। যে কারনে বিশেষ বিবেচনায় আদালত তাকে প্যারোলে মুক্তি দিয়েছে, সেই নির্দিষ্ট কাজ অর্থাৎ চিকিৎসা শেষ করে আবার আদালতের শরনাপন্ন হবেন, আইনের কাছে নিজেকে সমর্পন করবেন। পুরো প্রক্রিয়াই আইনের আওতাধীন এবং তিনি মুক্ত নন। প্যারোলের মেয়াদ অনন্তকাল নয়। যেহেতু তিনি ফিরলেন না অথবা এমন জায়গায় আশ্রয় নিলেন যা দেশীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আওতার বাইরে, সেহেতু তিনি স্বাভাবিক ভাবেই আইনের চোখে পলাতক। তারেক রহমানের অনুসারীবৃন্দ ব্যাপারটিকে একটি ঐতিহাসিক মর্যাদা প্রদান করতে কার্পণ্য করে নাই। কারামুক্তি দিবস পালন শুরু করলেন।

ইন্টারপোল-আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা। যার রয়েছে বিশেষ নীতিমালা। সেই নীতিমালায় বর্নিত আছে সদস্য হয়ার শর্ত, সদস্যদের দায়িত্ব-কর্তব্য, কাজের প্রক্রিয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। বিশ্বের ১৮৮টি দেশ এর সদস্য। সদস্য দেশগুলো ইন্টারপোলের কাছে কোন ব্যক্তি বা আসামিকে খুঁজে পেতে আবেদন করতে পারে। ইন্টারপোল সেই আবেদন যাচাই-বাছাই, বিচার-বিশ্লেষন করে নোটিশ জারি করে। বিষয় ভিত্তিক গুরুত্বের উপর নির্ভর করে সংস্থাটি আট রকমের নোটিশ জারি করে, রেড (লাল), ইয়োলো (হলুদ), ব্লু (নীল), ব্ল্যাক (কালো), গ্রিন (সবুজ), অরেঞ্জ (কমলা), ইন্টারপোল-জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বিশেষ নোটিশ ও পার্পল (হালকা বেগুনি)।এর মধ্যে রেড এলার্ট সর্বাপেক্ষা গুরুতর, যা তারেক রহমানের নামে জারি করা হয়েছে। তার আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন, এড. সানাউল্লাহ মিয়া রেড অ্যালার্টের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আমরা সাধারন জনগন আইনজ্ঞ নই, কিন্তু অসংলগ্ন তথ্য সরবরাহ করে আমাদেরকে বিভ্রান্ত করা অন্তত আইনজীবীদের কাছ থেকে কাম্য নয়। ইন্টারপোল সম্পর্কে ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের অজানা থাকার কথা নয়। অবশ্য আইনজীবী হিসেবে তার মক্কেলের পক্ষে কথা বলতেই পারেন, স্বাভাবিক। বেগম জিয়ার উপদেষ্টা ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, রেড অ্যালার্ট সরকারের সৃষ্টি, সরকার তাদের কাছে (ইন্টারপোল) সাহায্য চেয়েছে। ইন্টারপোলের সদস্য দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তাদের কাছে সাহায্য অবশ্যই চাইতে পারে। কিন্তু তাই বলে রেড নোটিশ সরকার সৃষ্টি করতে পারে না। জনগনকে অন্ধ ভাবার সুযোগ নাই, জনগন এখন ডিজিটাল। চাইলেই ইন্টারপোলের ওয়েব সাইটে গিয়ে দেখতে পারে। এই রেড এলার্ট মার্কিন কংগ্রেসম্যানদের সাক্ষর জ্বাল করে মিথ্যা বিবৃতির মত নয়। তাই কানা’কে(জনগন) হাইকোর্ট না চিনানোই ভাল।
ইন্টারপোলের বাংলাদেশ শাখা ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) প্রধান মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া বলেছেন, আমরা অনেক দিন আগেই ইন্টারপোলে এ নোটিশ পাঠিয়েছিলাম। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন ছিল, পরবর্তীতে তারা যাচাই-বাছাই করে রেড এলার্ট জারি করেছে। এখন তারেক রহমান যে দেশে আছেন সেখানকার পুলিশের দায়িত্ব তাকে আটক করে ইন্টারপোলের কাছে হস্তান্তর করা। নিকট অতীতে বিএনপি’র তরফ থেকে ব্যাপক অপপ্রচার আমরা দেখেছি। বিএনপি’র দ্বিতীয় প্রধান কর্তাকে পলাতক দেখিয়ে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থার রেড এলার্ট জারি করেছে, সংগত কারনেই প্রোপাগান্ডা শুরু হয়ে যাবে। যেমন- বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন বললেন, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড অ্যালার্ট ‘অপকৌশল’ ও ‘অপপ্রচার’। এর আগে সরকারের কিছু মন্ত্রী ইন্টারপোলের মাধ্যমে তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করা হবে বলে বক্তব্য দিয়েছেন। এই রেড অ্যালার্ট তারই বহিঃপ্রকাশ। এটি সরকারের আরেকটি নাটক।
তিনি আরও বলেন, ইন্টারপোল রেড অ্যালার্ট জারি করে না। তারা সদস্যদেশের দেয়া তথ্য প্রকাশ করে। বাংলাদেশ থেকে যে তথ্য পাঠানো হয়েছে, ইন্টারপোল তা প্রকাশ করেছে মাত্র। তার দাবি, তারেক রহমান পলাতক নন। তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে রয়েছেন। আর তিনি যেখানে রয়েছেন সেই দেশ ‘আইনের শাসনে বিশ্বাসী ও মানুষের অধিকারের প্রতি সচেতন’।(http://bangla.bdnews24.com/politics/article954688.bdnews) প্রশ্ন ঐ একই, প্যারোলের মেয়াদ কি অনন্তকাল বা চিকিৎসা কতদিন চলবে? লন্ডনে রাজনৈতিক কর্মকান্ড, ইতিহাস আবিষ্কার কি চিকিৎসার অংশ? বিএনপি নেতাদের এই সাফাই শাক দিয়ে মাছ ধাকার নামান্তর মাত্র। এতে তারেক রহমানের বিশেষ কোন উপকার হচ্ছে না। তারেকের উপকার করতে চাইলে বিএনপি’র শীর্ষ নেতৃত্ব তাকে শোধরাতেন, আস্কারা দিতেননা। আর নাটক তো আপনারা দেখিয়েছেন। তদন্তের নকমে জজ মিয়া নাটক মঞ্চস্থ করেছেন। আমরা নিরুপায় জনগন তাতে দর্শক সেজেছি। আজ থলের বিড়াল বেড়িয়ে আসাতে খুব গাত্রদাহ হচ্ছে আপনাদের।
ইন্টারপোলের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রেড নোটিশের মাধ্যমে ওয়ান্টেড ব্যক্তিদের অবস্থান জানা এবং গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হয়। আর এর লক্ষ্য থাকে ওই ব্যক্তিরা যে দেশে দোষী সাব্যস্ত, সেই দেশে প্রত্যর্পণ বা এ ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।
untitled 7
ইন্টারপোলের ওয়েব সাইটে বাংলাদেশি ৬১ জন মোষ্ট ওয়ান্টেড ব্যক্তির তালিকা দেয়া আছে। যার মধ্যে সর্বশেষ সংযোজন তারেক রহমানের নাম। এই তালিকায় আছেন পলাতক যুদ্ধাপরাধী, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামি, শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাৎ, প্রকাশ, কালা জাহাঙ্গীর, গোলাম ফারুক অভি সহ ২১ আগষ্টের গ্রেনেড হামলা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি জেএমবি নেতা মাওলানা তাজ উদ্দিন। শীর্ষ সন্ত্রাসী কালা জাহাঙ্গীরের ব্যাপারে মিডিয়ায় অনেক গসিপ শুনেছি। লোক মুখে শোনা যেত কালা জাহাঙ্গীর নাকি তারেক রহমানের কাছের লোক ছিল। সত্য-মিথ্যা যাই হোক, ভাষানটেক-মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় কালা জাহাঙ্গীরের ছিল দুর্দান্ত দাপট। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সাথে একই তালিকায় তারেক রহমান স্থান পেয়েছেন। এটা বিএনপি’র জন্য অনেক বড় অর্জন না হলেও, কালা জাহাঙ্গীর বা সন্ত্রাসীদের জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করার মতই। আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলায় তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তারেক রহমানের এহেন পরিনতির কারনে আবারও জাতিকে লজ্জিত করলেন। ক্ষমতায় থাকাকালীন অবস্থায় একাধিকবার দূর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশ-জাতিকে লজ্জিত করেছেন, আর এখন আইনের প্রতি অবজ্ঞা করে ফেরারী হয়ে লজ্জিত করছেন। কেননা ইন্টারপোলের খাতায় তারেক জিয়ার জাতীয়তা বাংলাদেশী হিসেবে উল্লেখ আছে। রাজনীতিবিদ হিসেবে এর পূর্বে এই তালিকায় গোলাম ফারুক অভি’র নাম এসেছে। কিন্তু একটি রাজনৈতিক দলের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তির নাম ইন্টারপোলের মোষ্ট ওয়ান্টেড তালিকায় আসাতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দলটির ভাবমূর্তি স্বাভাবিক ভাবেই নেতিবাচক হবে। কর্তার ইচ্ছাই তো কর্ম। বিগত তিন মাসে যে পরিমান সহিংস কর্মকান্ড, জঙ্গিবাদী তৎপরতা হয়েছে বিএনপি এর দায় এড়াতে পারেনা এবং তা কোন রাজনৈতিক কর্মকান্ড হতে পারে না। এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে সন্ত্রাসী বা জঙ্গি সংগঠনের তালিকায়ও বিএনপি’র নাম চলে আসতে পারে।
পূর্বেই বলেছিলাম বিএনপি’র বর্তমান দূরাবস্থার জন্য তারেক রহমানই দায়ী। তিনি এবং বেগম জিয়া তাদের অদূরদর্শী নেতৃত্বের কারনে তাদের রাজনৈতিক অবসরকে ত্বরান্বিত করেছেন। হয়তো সেদিকেই যাচ্ছেন তারা।

আর এখন চলবে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থার সন্ত্রাসী তালিকায় নাম ওঠায় সরকার, আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অপপ্রচার, বিষেদাগার, দোষারোপ। যেন এরাই তারেক রহমানকে দাগী আসামি বানিয়েছেন। নাচতে না জানলেই উঠোন বাকা হয়। বিএনপি’র ‘দেশনায়ক’ বাস্তবতার নিরিখে হয়ে গেল ফেরারী, অন্তরে যাতনা হাওয়াই স্বাভাবিক। তাই বলে অন্যকে গালমন্দ করে কি লাভ?

সন্যাসী চোর না, দ্রব্যে ঘটায়। যদি নিজেকে রাজনীতিবিদ মনে করেন তবে গুপ্ত ঘাতকের মত পালিয়ে না থেকে আইনের কাছে আত্নসমর্পন করুন, ভিডিও বার্তা দিয়ে আর কত দিন। যদি অন্ধকারের রাজনীতি করেন তবে কোন কথা নাই। আশা করি আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।

সংবাদ সূত্রঃ

bdnews24.com
কালের কন্ঠ