ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

Madrasa-09-(2)

বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার একটি ধারা কওমী মাদ্রাসা। সংবাদ মাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দেশে পাঁচ হাজারের অধিক কওমী মাদ্রাসা রয়েছে। এই মাদ্রাসাগুলোতে ২০ লক্ষাধিক তলবে এলেম অর্থাৎ ছাত্ররা লেখা-পড়া করে। বাংলাদেশ কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক) এই মাদ্রাসাগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। তারা নিজস্ব ভাবধারায় তাদের একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। তাতে সরকারের নিয়ন্ত্রন নেই বললেই চলে।

এসকল প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অনেক দিন থেকেই বিতর্কিত অনেক অভিযোগ আছে। জঙ্গিবাদে মদদ দেয়া, জঙ্গি প্রশিক্ষন দেয়া, এমনকি অনেক মাদ্রাসায় অভিযান চালিয়ে তার প্রমানও পাওয়া গেছে। এবার জানা গেল ইতিহাস বিকৃতির চাঞ্চল্যকর খবর। বাংলাদেশ কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক) এই মাদ্রাসাগুলোর পাঠ-পরিকল্পনা প্রনয়ন করে, সকল পাঠ্যসূচি, পাঠ্যপুস্তক ছাপানোর কাজও তারাই করে থাকে। সেই পাঠ্যপুস্তকে দেশের ইতিহাসকে নিজস্ব মর্জিমাফিক তারা প্রকাশ করেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তারা বিশেষ ধরনের ইতিহাস পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করেছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়কেও তারা আমলে নিচ্ছে না। এককথায় বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করছে। মেজর জিয়াকে তারা স্বাধীনতার ঘোষক নামেই তাদের তলবে এলেমদের শিক্ষা দিচ্ছে। ঠিক যেরকমভাবে ইতিহাস বিকৃতি ঘটিয়েছিল বিএনপি-জামাত শাসনামলে। ‘৭৫ পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা বিরোধীদের মদদপুষ্ট সরকারগুলো দেশের সীকৃত ইতিহাসকে বিকৃত করে এমনভাবে প্রচার করেছে, যাতে করে ঐ বিকৃত ইতিহাসে বিশ্বাসী বিশাল একটি প্রজন্ম তৈরি হয়েছে। এসব জাতিকে বিভাজিত করার, বহুধা-বিভক্ত করার ষড়যন্ত্রেরই অংশ। আমার দেখা মতে ‘৯১ থেকে ‘৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত দেশের প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ্যপুস্তকে এই ইতিহাসই লেখা ছিল। তাতে না ছিল জাতির জনকের স্বীকৃতি, না ছিল স্বাধীনতার ঘোষকের সঠিক ইতিহাস। সেখানেও মেজর জিয়াই ছিল স্বাধীনতার ঘোষক ।

“কওমী মাদ্রাসার পঞ্চম শ্রেণির ইতিহাস বইয়ে ‘স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম’ প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের মধ্যরাতে ইতিহাসের বৃহত্তম গণহত্যা শুরু হয়। শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। দেশবাসী দিশেহারা হয়ে পড়ে। এমনি এক সময়ে ২৭ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তার ঘোষণা শুনে বাংলার জনগণ অনুপ্রাণিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

প্রবন্ধে জিয়াকে স্বাধীনতার ‘ঘোষক’ বলা হলেও শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির জনক বা বঙ্গবন্ধু হিসাবেও উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি মুক্তিযুদ্ধে কতজন শহীদ হয়েছেন সে বিষয়েও কোনো তথ্য নেই।” দেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠী স্বাধীনতার বিকৃত এই ইতিহাস শিখছে এবং মেধা-মননে এই বিশ্বাস নিয়েই বড় হচ্ছে। যা দেশদ্রোহী চক্রের জন্য এক বিশাল নিয়ামক বটে। এহেন পরিস্থিতি অবশ্যই দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য উদ্বেগজনক। কেননা বিশ্বাস থেকেই আদর্শের জন্ম। হতে পারে এই ইতিহাস বিকৃতি অনেক বড় কোন ষড়যন্ত্রের অংশ।

দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষনা সংক্রান্ত রায়ে এই ধরনের ইতিহাস বিকৃতিকে সংবিধান লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যা প্রচলিত আইন অনুসারে শাস্তিযোগ্য। শুধু তাই নয়, বেফাক মহাসচিব মাওলানা আব্দুল জব্বার জাহানবাদী ‘আইন করে’ বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার ঘোষক বলাটা ‘জুয়াচুরি’ বলে মনে করেন।

“বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে আব্দুল জব্বার বলেন, “সরকার আইন করে শেখ মুজিবকে স্বাধীনতার ঘোষক বলাটা ভুয়া আইন, জুয়াচুরি- এটা হয় না। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক- আমিও এটার পক্ষে। জেনেশুনেই তাকে স্বাধীনতার ঘোষক বলা হয়েছে।”
অর্থাৎ কোন অনিচ্ছাকৃত ভুল নয়। সম্পূর্ণ সজ্ঞানেই এহেন ইতিহাস বিকৃতির সাথে তারা জড়িত। দেশের অতীত-ইতিহাস সম্পর্কে ধারনাহীন একটি সম্প্রদায় তৈরি হচ্ছে। যা অবশ্যই দেশ-জাতির জন্য সুখকর নয়।

স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসার পরে দেশের একটি সঠিক একক ইতিহাস জাতির সামনে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিল। স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে দেশের সকল প্রজন্মের সম্যক জ্ঞান থাকা আবশ্যক। সেখানে এই রকম খবর আঁতকে ওঠার মত। প্রশ্ন উঠতে পারে কওমী মাদ্রাসাগুলো বা কওমী মাদ্রাসা বোর্ড কিসের এবং কার স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে ? কোন বিশেষ গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়নে কওমি মাদ্রাসা ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা। এই ইতিহাস বিকৃতি কোন বিশেষ এজেন্ডার অংশ বৈ অন্য কিছু নয়। কেননা বিএনপি-জামাত রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকাকালীন যেভাবে ইতিহাসকে বিকৃত করেছে, সেই ধারাকেই কওমী মাদ্রাসা বোর্ড এখনও অব্যাহত রেখেছে। স্বাধীনতার পক্ষের এই সরকার অবশ্যই এর দায় এড়াতে পারেনা। এই সরকার যে ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল উক্ত পরিস্থিতি তার পরিপন্থী।

কওমী শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন দরকার। লক্ষ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রীরা এখানে এলেম শিক্ষাগ্রহণ করে। কিন্তু প্রচলিত মূল ধারার সাথে সমান্তরালে তারা আসতে পারেনা। ইচ্ছা থাকা স্বত্বেও উচ্চ শিক্ষা অর্জন থেকে বিঞ্চিত হচ্ছে বিপুল সং্খক শিক্ষার্থী। কওমী শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো গেলেই তা সম্ভব। বিশ্বের সকল দেশেই শিক্ষানীতি আছে এবং সেই শিক্ষানীতি অনুসারে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালিত হয়। বিশেষ ধরনের শিক্ষার জন্য পৃথক নীতি থাকতে পারে। বাংলাদেশের সকল ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা সরকার নিয়ন্ত্রিত বোর্ড বা শিক্ষানীতি অনুসারেই পরিচালিত হয়, শুধুমাত্র কওমি শিক্ষাই এর ব্যতিক্রম। দীর্ঘদিন থেকেই আমরা শুনে আসছি কওমী মাদ্রাসাগুলোও সরকারের নিয়ন্ত্রনে আসছে। কিন্তু সম্ভবত তা শুধু আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বেফাক নামক পৃথক একটি বোর্ডের মাধ্যমে কওমি মাদ্রাসাগুলো পরিচালিত হয়, যা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রনহীন। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সব প্রতিষ্ঠান সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে কওমি মাদ্রাসাগুলোকে এখনও পর্যন্ত কোন নীতিমালার আওতায় নেয়া সম্ভব হয়নি। পক্ষান্তরে আলিয়া মাদ্রাসাগুলো মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের অধীনে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সাথে সমান্তরালে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

‘৭১ এর ঘাতকদের বিচারের পাশাপাশি সঠিক ইতিহাস সংরক্ষন করা সরকারের দায়িত্বের মধ্যেই পরে। বিকৃত ইতিহাসকে মহীরূহে পরিনত হওয়ার পূর্বেই অঙ্কুরে নিঃশেষ করা উচিত। তবেই কেবল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়িত হবে। দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে মূল ধারার বাইরে রাখাও সমিচিন নয়। কিন্তু আপসোসের বিষয় এত দিনেও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ কওমি শিক্ষাকে স্পষ্ট কোন নীতিমালার মধ্যে আনতে পারেনি। যেটা সত্যিই পীড়াদায়ক। কেননা এই সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কোন কিছুই সরকারের আওতার বাইরে নয়। রাষ্ট্রব্যবস্থা বা রাষ্ট্রবিজ্ঞান তাই বলে। পক্ষান্তরে কওমী মাদ্রাসাগুলো স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অংশ হয়েও সরকারের নিয়ন্ত্রনহীন বিচ্ছিন্ন জনপদের মত রয়ে গেছে এবং তাদের তলবে এলেমদের ভুল ইতিহাস শিক্ষা দিয়ে উল্টো পথে পরিচালিত করছে। এ বিষয়ে সরকারের আশু পদক্ষেপ গ্রহন একান্তভাবে কাম্য। যদিও শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, কওমি মাদ্রাসাগুলো মূল ধারায় নিয়ে আসার কাজ চলছে। বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর বিধায় এ নিয়ে হেলা করার সুযোগ নেই। ইতিহাস শুধুমাত্র একটি প্রজন্মই ধারন করে না। যেসব কোমলমতি কিশোররা কওমি মাদ্রাসার পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে এই বিকৃত ইতিহাস জানছে, তারা এই ইতিহাসকেই ধারন করবে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম তা বহন করবে। তাই সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকেই এ ব্যাপারে তদারকি আবশ্যক। ভুল বা বিকৃত ইতিহাস নিয়ে গড়ে ওঠা প্রজন্মের এই বিশাল অংশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের পথে অন্তরায় হয়ে দাড়াতে পারে। ‘৭৫ পরবর্তী দীর্ঘ প্রায় তিন দশকে অনেক ভুল ইতিহাসের জন্ম হয়েছে, যার প্রায়শ্চিত্ত জাতিকে এখনও করতে হচ্ছে। তাই যাতে গোদের উপর বিশফোড়ার মত নতুন কোন জনগোষ্ঠী তৈরি না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা আবশ্যক।

সংবাদ সূত্রঃ bdnews24.com