ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

ছবি:পায়রা নদীর অব্যাহত ভাঙনে বিলীন হওয়ার পথে পিঁপড়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

পায়রা শুধু একটি নদীর নাম নয়, কয়েকটি জনপদের ভাঙা-গড়ার ইতিহাস।

পটুয়াখালী জেলাধীন মির্জাগঞ্জ পায়রা নদী বিধৌত একটি উপজেলা। উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে প্রায় পাচটি ইউনিয়নেরই কম/বেশি অংশ পায়রা নদীর সাথে সম্পৃক্ত। উপজেলার ১নং মাদবখালী ইউনিয়নের কিছু অংশ, ২নং মির্জাগঞ্জ ইউনিয়নের বৃহৎ অংশ, ৪নং দেউলি সুবিদখালী ইউনিয়ন, ৫নং কাকড়াবুনিয়া ইউনিয়ন এবং ৬নং মজিদবাড়িয়া ইউনিয়নের কোল ঘেঁষে পায়রা নদী বয়ে গেছে। পায়রা নদীর তীরবর্তী হওয়ার কারনে স্বাভাবিক ভাবেই এ নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠেছিল গ্রাম্য হাট-বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ অনেক কিছু। নদী ভাঙন এই এলাকায় নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। দীর্ঘদিন থেকেই পায়রা’র ভাঙন অব্যাহত আছে এবং ক্রমেই তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুনেছি ‘নদীর এপাড় ভাঙ্গে ওপাড় গড়ে এইতো নদীর খেলা’। কিন্তু প্রমত্তা পায়রার এই ভাঙা-গড়ার খেলায় গ্রামের পর গ্রাম বিলীন হচ্ছে, উজাড় হচ্ছে ফসলি ক্ষেত, শেষ সম্বল মাথা গোঁজার বাস্তুভিটা হারিয়ে সর্বহারা হচ্ছে বেশ কয়েকটি জনপদের মানুষ। মাইলের পর মাইল জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়াতে ক্রমেই ছোট হয়ে যাচ্ছে মির্জাগঞ্জ উপজেলার মানচিত্র। সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে অনেক মানুষ বেড়িবাঁধে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। অনেকেই অন্যের জমিতে বসবাস করছেন। পায়রা নদী সংলগ্ন ইউনিয়ন গুলোর অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। পায়রা তীরবর্তী বেড়িবাঁধের কালভার্ট, স্লুইস গেট সহ রাস্তাঘাট বিলীন হয়ে যাচ্ছে। উপজেলার গোলখালী, চরখালী, রাণীপুর, হাজীখালী, মেন্দিয়াবাদ, কলাগাছিয়া, কাকড়াবুনিয়া বাজার, ভয়াং, ভিকাখালী বাজার, পিপড়াখালী, মনোহরখালী, সাতবাড়িয়া, রামপুর, সুন্দ্রা কালিকাপুর বাজার ও অন্যান্য বিভিন্ন এলাকা পায়রার অব্যাহত ভাঙনে বিলীন হওয়ার পথে। তাই এই ভাঙন রোধ ও ক্ষতিগ্রস্থদের পুনর্বাসনে এখনই কার্যকর ভূমিকা নেয়া দরকার।

ছবি: পায়রার ভাঙনের কারনে মির্জাগঞ্জে প্রতিতিনিয়ত গ্রাম ও বসত বাড়ী বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

পায়রার ভাঙন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে স্থানীয়-জাতীয় পত্রিকায় অনেক খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ বা অগ্রগতি দেখা যায়না। পায়রা নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকাসমূহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত। এসকল ইউনিয়নে নির্দিষ্ট সময় পর পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিনিধি নির্বাচিত হয় আবার মেয়াদ শেষে নতুন প্রতিনিধি দায়িত্ব গ্রহন করেন। কিন্তু বাস্তুহারা, সর্বহারা মানুষ ভাঙনের কবল থেকে মুক্তি পায়না। পায়রা নদীর ভাঙন মির্জাগঞ্জ উপজেলার জন্য এই মুহূর্তে সর্বাপেক্ষা জরুরি ও জনগুরুত্বপূর্ন বিষয়। ভাঙন ঠেকানো না গেলে হয়ত গ্রামের পর গ্রাম বিলীন হয়ে যাবে। অনেক এলাকার নাম শুধু কাগজ-পত্রেই থাকবে, বাস্তবে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। সর্বস্ব হারানো মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলবে। স্থানীয় জন প্রতিনিধিদের অর্থাৎ ইউনিয়ন সমূহের চেয়ারম্যানদের অবশ্যই এ ব্যাপারে দায় থেকে যায়। যেহেতু ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষনা হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। সেহেতু পরবর্তীতে যিনি বা যারা উক্ত ইউনিয়ন সমূহের জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন, উক্ত সমস্যা সমাধানে তারা কি ভূমিকা নিবেন তা পরিষ্কার হওয়া দরকার। এ ব্যাপারে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে। নির্বাচিত হলে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আপনি কি ভূমিকা নিবেন অথবা যদি কেউ ইতোপূর্বে চেয়ারম্যান থেকে থাকেন, তবে এই সমস্যা নিরসনে তিনি কি ভূমিকা নিয়েছিলেন, প্রার্থী হিসেবে সাধারন ভোটারদের সামনে এখনই তুলে ধরতে হবে এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করতে পারলে আপনার কি ভূমিকা থাকবে তাও সাধারনের সামনে তুলে ধরতে হবে। বিশেষ করে যে পাচটি ইউনিয়নের বিভিন্ন অংশ পায়রা নদী সংলগ্ন, ভাঙন কবলিত সেসব অঞ্চলের জন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের দায়িত্বশীল হওয়া দরকার এবং ভোটারদের সচেতন হওয়া দরকার। যাতে করে আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে যোগ্যতম প্রতিনিধি আমরা নির্বাচিত করতে পারি এবং পাশাপাশি এই জরুরী-জনগুরুত্বপূর্ন নদী ভাঙন ও পুনর্বাসন সমস্যার সমাধান হয়।
পায়রা নদীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম/বাজার/প্রতিষ্ঠান বিলীন হওয়ার পথে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার দেশের সকল স্তরে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বদ্ধ পরিকর। ইউনিয়ন পরিষদ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। সঠিক তথ্য ও সমাধান পাওয়ার অধিকার সকল জনগনের আছে। তাই প্রার্থীদের উচিত হবে সঠিক-বাস্তবমুখী প্রতিশ্রুতি প্রদান করা।
ভোট একটি মূল্যবান আমানত। তাই মূল্যবান ভোট প্রদানের পূর্বে ভাঙন রোধ এবং ক্ষতিগ্রস্থদের পুনর্বাসনে প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে পরিষ্কার হওয়া দরকার। ভাঙল কবলিত এলাকার মানুষের এই জীবন-মরন সমস্যার সমাধানই ভোটের রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। প্রশ্ন উঠতে পারে যে, এই সমস্যার সমাধান ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের হাতে কিনা বা তাদের ক্ষমতার আওতাভুক্ত কিনা। হ্যা এটা ঠিক যে, নদী ভাঙন রোধ এবং ক্ষতিগ্রস্থদের পূনর্বাসন অনেক বড় কাজ। আর শুধুমাত্র ইউনিয়ন পরিষদের বাৎসরিক বাজেটের মাধ্যমেও এই বিষয়ের সমাধান সম্ভব নয়। কিন্তু এজন্যই আমরা জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করি যাতে করে আমাদের সমস্যা প্রতিনিধিরা সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তুলে ধরবেন, সমাধানের প্রানপন চেষ্টা করবেন। তাই ভোটারদের অনুধাবন করতে হবে, কোন প্রার্থীকে ভোট দিলে সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ড সহজেই আমাদের নাগালে আসবে। বুঝতে হবে কোন প্রার্থীর পক্ষে মন্ত্রনালয় বা উচ্চ দফতর থেকে উন্নয়নের বাজেট/প্রকল্প অনুমোদন করিয়ে নিজ ইউনিয়নে নিয়ে আসা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা- বরগুনা মহাসড়কের বাকেরগঞ্জ-বরগুনা অংশের সড়কের উন্নয়ন কাজ একনেকে পাশ হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করা যায়। এই রাস্তার উন্নয়ন কাজ কোনো উপজেলার বাজেটে ছিলনা। কিন্তু মির্জাগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান খান মোঃ আবু বকর সিদ্দিকের একান্ত প্রচেষ্টায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়ের সচিব মহোদয় জনাব আঃ মালেকের সহযোগিতায় তা সম্ভব হয়েছে। নদী ভাঙন রোধ ও পুনর্বাসনের বরাদ্দও এভাবে গুছিয়ে জনগনের দোরগোড়ায় নিয়ে আসতে হবে।
পায়রা নদীর অব্যাহত ভাঙনে বিলীন হওয়ার পথে সুন্দ্রা কালিকাপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়।

চটকদার বিজ্ঞাপন, আপ্যায়ন, সুমিষ্ট কথায় নয়, সাধারন ভোটারদের উচিত হবে এই প্রকট সমস্যা সমাধানের বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি নিয়ে তবেই ভোট প্রদান করা। কোন প্রার্থী ভোট চাইতে এলে তার কাছে জানতে চাইতে হবে এই সমস্যা সমাধানে তার ভূমিকা কি হবে, কি তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ? আর প্রার্থীদেরও উচিত পথসভা, উঠান বৈঠক বা অন্যান্য মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানে স্বচ্ছ-গ্রহনযোগ্য প্রতিশ্রুতি প্রদান করা। প্রতিটি নির্বাচনের সময়ই আমরা প্রার্থীদের কাছ থেকে নিজ নিজ এলাকার উন্নয়নকল্পে বিভিন্ন ধরনের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বা ইশতেহার দেখতে পাই। কিন্তু মির্জাগঞ্জ উপজেলার প্রধানতম সমস্যা এই নদী ভাঙন রোধে, ক্ষতিগ্রস্থদের পুনর্বাসনে কার্যকর পদক্ষেপ জনগন দেখতে চায়, এটা সময়ের দাবী। কল্পনাপ্রসূত নয়, বাস্তবমুখী ও গ্রহনযোগ্য প্রতিশ্রুতি জনগন প্রত্যাশা করে। কেননা উক্ত ইউনিয়ন সমূহের বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে খাদের কিনারায় অব্যাহত ভাঙনের মুখে রেখে, মানবেতর পরিস্থিতির মধ্যে রেখে উপজেলার সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

আশা করি উপজেলার পায়রা নদীর ভাঙন কবলিত ইউনিয়ন সমূহের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীগন ভাঙন রোধে, ক্ষতিগ্রস্থদের পুনর্বাসনে তাদের পরিকল্পনা-প্রতিশ্রুতি জনগনের সামনে তুলে ধরবেন, এবং জনগন সেই প্রতিশ্রুতি মোতাবেক পছন্দের প্রার্থীকে তাদের মূল্যবান ভোট প্রদান করবেন। আমরা আরও প্রত্যাশা করি আজকের প্রার্থীদের মধ্য থেকে যারা নির্বাচিত হবেন, তারা জনগনের কাছে দেয়া তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন এবং ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন। নতুবা গ্রামের পর গ্রাম, মাইলের পর মাইল জমি, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বাজার নদীগর্ভে বিলীন হওয়া এবং চরম মানবিক বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব নয়।