ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

রাজধানীর গণপরিবহনে মহিলারা যে  বিড়ম্বনায় পড়েন, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। কারণ গণপরিবহনে মহিলা সিট নিয়ে যে বাকবিতণ্ডা হয় প্রতিদিন, তার মূলে আছে পুরুষ শ্রেণির আত্মকেন্দ্রীকতা আর স্বার্থপরতা। হ্যাঁ, বলতে বাধ্য হচ্ছি। নিজে পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও এই শ্রেণিটির মধ্যে থাকা গলদগুলো দেখেও না দেখার ভান করবো সেরকম লোক আমি নই। বেশ কিছুদিন আগে আমি গণপরিবহণে উঠে শোরগোল শুনতে পেলাম। তখন আমি ঘুমাচ্ছিলাম। গণপরিবহনে ঘুম থেকে উঠে শোরগোল শুনে বিরক্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমি কানে নিতে না চাইলেও কানে আসলো, একজন বৃদ্ধ মহিলার কণ্ঠস্বর আর একজন আমার বয়সী বা আমার চেয়ে বয়সে বড় তরুণের কণ্ঠস্বর।

-আপনারাই নারী অধিকারের কথা বলেন আর আপনারাই পুরুষের ওপর নির্ভর করেন।

-এর মধ্যে নারী অধিকারের কি হলো? বুঝলাম না।

-দাঁড়ায় থাকেন। আমার কিছু করার নেই।

-এটা তো মহিলা সিট।

-আমি কিছু করতে পারবো না।

হেলপার ইতস্তত করে বলল- ভাই, ছাইড়া বসেন।

ওই ছেলেটা বলল- আমি কেন ছাড়ব?

এরপর গণপরিবহনে চালকের সহযোগী মধ্যস্থতা করতে করতে এসে বেদম মার খেল।

ঢাকায় মেয়েদের এমন অভিজ্ঞতা কম আর বেশি হয়েই থাকে।

এরকম একটা বাজে ঘটনার স্বাক্ষী হয়েও আমি ওই মহিলার সাথে কথা বলতে পারিনি। তবে এই বিষয়ে কিছুটা গবেষণা করার চেষ্টা করেছি। কথা বলেছি কয়েকজন নারীর সাথে যারা গণপরিবহনে নিয়মিত যাতায়াত করে থাকেন।

গোড়াতেই ভয়ংকর তথ্য দিয়ে শুরু করতে চাই। বেসরকারি সংগঠন ব্র্যাকের গত বছরের এক  জরিপে উঠে এসেছিল যে ৯৪% নারীই গণপরিবহনে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সংখ্যাটা ভয়াবহ। হারটিও ভয়াবহ। তার মানে আমাদের পুরুষ শ্রেণির (সবার না) মাঝে  এই প্রবণতা জড়িয়ে গেছে।


গণপরিবহনে যাতায়াতে যৌন হয়রানির শিকার ৯৪% নারী: গবেষণা


একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা আয়েশা বেগম বলেন,  “গণপরিবহনে যারাই ওঠেন, যেসব পুরুষ, তারা গোপনে কোনো নারীর শরীরে হাত দিতে পারলেই মহারাজা বনে যান।

“এটা খুবই অস্বস্তিকর একজন মেয়ের কাছে যে সুযোগ পেলেই তার গায়ে হাত লাগিয়ে দেওয়া এবং মনে হয় কিছু পুরুষ লোক বাসে ওঠেনই এরকম মেয়েদের সাথে খারাপ ব্যবহার করার জন্য।”

আমাদের দেশে মেয়েদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান অতি নিম্নে যার প্রধান কারণ যৌনতা সম্পর্কে গাফেল থাকা। আমরা যৌনতাকে ট্যাবু বানিয়ে রেখেছি। এই কারণেই মেয়েদের নিরাপত্তা দিতে আমরা সফল হতে পারছি না।

আয়েশা বেগম আরও বলেন, “কোনোকিছু বলতে গেলেই উল্টো আমাকেই ছোট করে দেখা হয়। আমারও একবার এরকম অবস্থা হয়েছিলো। একবার না, প্রায় প্রতিদিনই এরকম পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়।

“তো আমি অফিস থেকে বাসায় ফিরছি। বাসে আমি মহিলা সিটে বসে আছি। হঠাৎ পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছেলে আমার পাশের সিট ফাঁকা পেয়ে পাশে বসল। তখন আমার মেজাজ প্রচণ্ড খারাপ অফিসিয়াল কারণে। হঠাৎ আমি খেয়াল করলাম ওই ছেলেটা আমার কোমরে হাত দেওয়ার চেষ্টা করছে।

“আমি তাকে বললাম, আপনি এখানে হাত দিচ্ছেন কেন? সে দ্রুত হাত সরিয়ে নিয়ে বললো, কই না তো? আমি বললাম, আপনি এইমাত্র এখানে হাত দিচ্ছেন। পরে চালক ও অন্য সহযাত্রীদের বলার পরও কেউ এই বিষয়ে কিছু বলেনি।”

এই হলো আমাদের দেশের নারী নিরাপত্তা। যারা নারী প্রগতি নিয়ে কথা বলে থাকেন, তাদের এই বিষয়টি সামনে আনা উচিৎ। আর যাদের সুযোগ পেলে নারীদের স্পর্শকাতর জায়গায় হাত দেওয়ার অভ্যাস আছে, তাদের সাবধান হওয়া উচিৎ। কারণ তাদের ঘরেও তো নারী আছে। মা, বোন, স্ত্রী, মেয়ে- তাদের সাথেও ‍কি তারা এই ব্যবহার করেন?

মায়ের কথা মনে করে, বোনের কথা মনে করে, মেয়ের কথা মনে করে গণপরিবহনে নারীদের বিরক্ত করবেন না। কারণ যারা প্রাণকে জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, তাদের সাথে এই ব্যবহার প্রত্যাশিত নয়।

মন্তব্য ১ পঠিত