ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

সম্প্রতি রাজধানীর কয়েকটি প্রধান সড়কে রিকশা তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন। রিকশা চলাচলকে যানজটের ‘প্রধান’ কারণ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম  জুলাইয়ের গোড়াতেই এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। ৭ জুলাই থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। এরপর থেকে প্রতিদিনই অভিযানে নামছে পুলিশ।

যেসব এলাকায় রিকশা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আছে সেসব এলাকায় রিকশা পেলে তা উল্টে ফেলা হচ্ছে। করা হচ্ছে বিশাল অঙ্কের টাকার মামলা। এর ফলে মাথায় হাত হতদরিদ্র রিকশাচালকদের। দারিদ্র্য হার কমেছে বলে দাবি করে যদি রাজধানীতে রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করা হয় তাহলে এসব রিকশাচালকরা খাবেন কী? তাদের পরিবারের ভরণপোষণ কে দেবে?

যানজটের মূল কারণ কী? যানজট হওয়ার পিছনে প্রাইভেট কারগুলোও কি দায়ী নয়?  ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন রিকশাচালকদের যে ধান কাটার পরামর্শ ‍দিয়েছেন, সেই ধানের জমি কি আর আছে? কৃষকরাই তো  মূল্য না পেয়ে ধান চাষে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। তাহলে রিকশাওয়ালারা রিকশা চালানো বাদ দিয়ে কি ধান কাটতে যেতে চাইবে?

কয়েকজন রিকশাচালকের সাথে কথা হয়েছিলো। তারা কথাগুলো এভাবে বলছিলো যে তাদের প্রত্যেকেরই পরিবারে স্ত্রী-সন্তান আছে। তারা কেউ থাকেন বউবাজার এলাকায়, কেউ থাকেন আদাবরে, আবার কেউ থাকেন মোহাম্মদপুরে।

এদের মধ্যে একজন রিকশাচালক মোহাম্মদ ইমদাদুল যিনি বর্গাচাষে লাভ করতে না পেরে নওগাঁ থেকে ঢাকায় এসে রিকশা চালাচ্ছেন। তিনি সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত এবং মাগরিবের পর থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত রিকশা চালান। তার আয় হয় দিনে ১২০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। তিনি বললেন,  “কিছু করার নেই। সরকার আমাদের কথা ভাবে না। তাই গরীবরা অসহায়।”

মোহাম্মদ ইমদাদুলের স্ত্রী-সন্তান নওগাঁয় থাকেন। তিনি আরও বলেন,  “কষ্ট করে কোনো রকমে দুই মেয়েকে পড়াচ্ছি। যদি এরকম হয় তাহলে ভবিষ্যতে পড়াতে পারবো কি না বুঝছি না।”

মোহাম্মদ ইমদাদুলের মতো আরেক রিকশাচালক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলামও বর্গাচাষে লাভ করতে না পেরে কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে রিকশা চালানো শুরু করেন। কিন্তু অভিশপ্ত এই শহরে স্বস্তি পাওয়াটা অনেক কঠিন। তিনি বলেন,  “রাস্তাগুলো বন্ধ করার উদ্দেশ্য হলো গরিবের পেটে লাথি মারা।”

মোহাম্মদ আমিনুল ইসলামের পরিবারের দুই ছেলে ও এক মেয়ে আছে। মেয়েকে বিয়ে দেয়া হয়েছে বলে জানালেন তিনি। তিনি আরও জানান যে রিকশা চালিয়ে এমনিতেই খুব বেশি আয় হয় না। তার উপর যদি এই নিয়ম চালু করা হয় তাহলে মাঠে মারা পড়বে রিকশাচালকরা।

এরকমই বলছিলেন আরেক রিকশাচালক মোহাম্মদ কমর আলী। তিনি বলেন,  “যদি এভাবে মেইন রাস্তায় যেতে না দেয়া হয়, তাহলে আমরা গরীব মানুষ, আমরা কী করে খাবো?”

রিকশা ঢাকার একটি ঐতিহ্যবাহী বাহন। এর সাথে জড়িয়ে আছে যাদের জীবিকা, রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে তাদের নিষিদ্ধ করে দেওয়া এবং তাদের ধানচাষ করতে বলা কতটুকু বাস্তবসম্মত?

যানজন নিরসরে কঠোর ব্যবস্থা যদি নিতেই হয়, তবে প্রাইভেট কারগুলোর ওপর নজর দিতে হবে। অথচ তা না করে রিকশাকে প্রধান সড়কগুলোতে নিষিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে উচ্চবিত্ত তোষণ করা হলো, আর নিম্নবিত্তদের করা হলো আরো কোনঠাসা।

মন্তব্য ০ পঠিত