ক্যাটেগরিঃ কৃষি

কৃষির আধুনিকায়নে ভারত সরকারের পদক্ষেপের শ্লথগতির জন্য কৃষকদের মনঃকষ্ট দূর হচ্ছে না। ভারতে ঝরছে অসংখ্য কৃষকের প্রাণ। তাদের আত্মহত্যার প্রধান কারণ ঋণের বোঝা। কয়েক দশক ধরে চলমান ঋণের বোঝা মেটাতে পেরে না উঠে কৃষকরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। এ যেন তাদের তাকদিরের লিখন হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন যে ভারতে কৃষকদের আত্মহত্যার কারণ ঋণসুরক্ষার প্রশ্নে নীতি ও পরিকল্পনার অভাব। এটিই কৃষকদের মানসিকভাবে পীড়া দিচ্ছে এবং আত্মহত্যার পথে ঠেলে দিচ্ছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পরিচালিত শাইনিং ইন্ডিয়ায় অগুরুত্বপূর্ণভাবে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হয় কৃষকদের আত্মহত্যা সংক্রান্ত প্রতিবেদন। সেই প্রতিবেদনে ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর বরাত দিয়ে বলা হয়, ভারতে ১৯৯৫ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিন লাখের বেশি কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। অ্যাক্টিভিস্টরা দাবি করছেন এ সংখ্যা আরও বাড়বে। তবে আরও ভয়ংকর একটি তথ্য ভারতের সরকার সুপ্রীমকোর্টকে দিয়েছে তা হলো যে প্রতি বছর ভারতে ১২ হাজার কৃষক আত্মহত্যা করছেন। ২০১৮ সালের মার্চ মাসে ভারতের কৃষি ও কৃষক কল্যাণ এবং গ্রামোন্নয়ন ও পঞ্চায়েতি রাজ মন্ত্রী নরেন্দ্র সিং তোমর কৃষকদের আত্মহত্যার বিষয়টি লোকসভায় উত্থাপনের সময় মন্তব্য করেন, ২০১৬ সালের হিসেব অনুযায়ী প্রতি আট ঘণ্টায় একজন কৃষক আত্মহত্যা করে থাকে।

পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় জানা যায়, ২০১১ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ভারতের মধ্যপ্রদেশে আত্মহত্যা করেছেন ৬০৭১ জন কৃষক। ২০১৩ সাল থেকে কৃষকদের আত্মহত্যার হার বেড়েছে ২১ শতাংশ। শুধু তাই বলেই তারা ক্ষান্ত হয় নি। বরং তারা এর সাথে সংযোজন করেছে যে শুধু পাঞ্জাব রাজ্যেই ২০০০ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ১৬৬০০ কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। তবে ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী তিনশোর কম কৃষক আত্মহত্যা করেছেন।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা দেখিয়েছে যে ঋণ শোধ করতে না পারা এবং সীমাহীন দারিদ্র্যের কারণেই কৃষকরা আত্মহত্যা করছেন। তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইকোনমিক এন্ড পলিটিক্যাল উইকলি তাদের ২০১৮ সালের মে মাসে এক প্রতিবেদনে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পাঞ্জাবভিত্তিক এক গবেষণার কথা বলা হয়েছে। সেই গবেষণার ফলাফল হিসেবে পাওয়া যায় যে ঋণের বোঝাই সেখানে ৭৫ শতাংশ কৃষকের আত্মহত্যার পিছনের কারণ।

কৃষক ফেডারেশনের এক পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের ৯৪ শতাংশ কৃষক উৎপাদিত পন্য ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের (এমএসপি) চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। হরিয়ানার সোনেপাত এলাকার এক বাসিন্দা কোহার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘গম, তুলা, সরিষা অথবা দুধ, সবকিছুরই উৎপাদন খরচ বাড়ছে। কিন্তু কৃষকদের নিশ্চয়তা মূল্যের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হয়।’ তিনি আরও বলেন, এই কারণেই ভারতীয় কৃষকরা অর্থ ধার করছে আর বিশাল দেনার দায়ে জেল পর্যন্ত খাটছেন।’

তবে ভারতের অর্থনীতিবিদরা মনে করেন যে কৃষকদের ঋণ মওকুফ করা হলে তা অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী হবে। অর্থনীতিবিদ প্রসেনজিৎ বোস আলজাজিরাকে বলেন, ‘ঋণ মওকুফ অনেকটা ত্রাণ কার্যক্রমের মতো। এতে হয়তো সাময়িকভাবে কৃষকরা ঋণের বোঝায় পিষ্ট হওয়া থেকে বাঁচবে। কিন্তু এতে কৃষিপণ্যের হতাশাজনক দাম বা কাঠামোগত বিষযগুলোর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী কোনো সমাধান হবে না।’

কৃষকদের পরামর্শক সংগঠন আশা’র কভিথা কারুঙ্গতি বলেন, ‘এটা টেকসই কৃষির অভাব ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, যার ফলে কৃষকরা সবসময় ঋণের আওতায় থাকছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘যখন আয় কমে যাওয়া ও ফসলহানির মতো বিষয়গুলো একসঙ্গে ঘটে তখন পুরো পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কৃষকের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে। ঋণদাতাদের অর্থ ফেরতের জন্য অব্যাহত চাপের পাশাপাশি অনেক সময় তাদের হাতে কৃষককে অপমান হতে হয়। এমনকি সম্পদ কেড়ে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। এসব কারণে ভারতে কৃষকরা প্রায়ই আত্মহত্যা করেন।’

তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো ভারতের সরকারি হিসাব মতে ৫২ শতাংশ কৃষক পরিবার ঋণগ্রস্ত।

 

তথ্যসূত্র:

১. বাংলা ট্রিবিউন, জুন ০৭, ২০১৮

২. ডয়চে ভেলে, জুলাই ২৬, ২০১৫

৩. দৈনিক যুগান্তর অনলাইন, এপ্রিল ১০, ২০১৯

৪. ডয়চে ভেলে, জানুয়ারি ১৮, ২০১১

৫. এনটিভি অনলাইন, জানুয়ারি ১৭, ২০১৬

৬. বিবিসি বাংলা, মে ২৬, ২০১৫

৭. দৈনিক বণিক বার্তা অনলাইন, মার্চ ২৭, ২০১৮

৮. ভয়েস অব আমেরিকা (ভিওএ), জুন ২২, ২০১৯

মন্তব্য ০ পঠিত