ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

নববর্ষ উদযাপনের প্রচলন শুরু হয় আজ থেকে চার হাজার বছর আগে প্রাচীন ব্যাবিলনে। সম্ভবত সেটা খ্রিস্ট পূর্ব দুই হাজার সাল। প্রাচীন ব্যাবিলনে নতুন বছর শুরু হতো নতুন চাঁদ দেখা সাপেক্ষে। এবং সেটা ছিল বসন্তকালের পয়লা চাঁদ। কারণ তাদের হিসেবে বসন্তকালকে পুনর্জীবন, নতুন ফসল এবং ফুল ফোটার প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হতো। প্রাচীন ব্যাবিলনে নববর্ষ উৎসব পালন করা হতো ১১ দিন ধরে। এই ১১ দিনের প্রতিটি দিন উদযাপন করা হতো প্রত্যেকটি আলাদা তাৎপর্য নিয়ে।

রোমানরা তাদের বর্ষ গণনা শুরু করত মার্চ মাসের শেষ থেকে। তবে বিভিন্ন রোমান সম্রাটদের শাসনামলে তা পরিবর্তিত হতো। সেজন্য রোমান সৌরবর্ষ কখনই একরকম থাকেনি। এ সমস্যা সমাধানের জন্য রোমান সিনেটররা খ্রিস্টপূর্ব ১৫৩ সালে ঘোষণা করে জানুয়ারির এক তারিখই হবে বছরের পয়লা দিন। কিন্তু তারপরও খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ সাল পর্যন্ত বর্ষপঞ্জি পরিবর্তিত হতে থাকে। তারপর সম্রাট জুলিয়াস সিজার এক তারিখকেই আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। এ কারণে একে ‘জুলিয়ান ক্যালেন্ডার’ও বলা হয়। কিন্তু সূর্যের হিসেবে বর্ষপঞ্জিকে সিজার দীর্ঘায়িত করেন। এর ব্যপ্তি হয় ৪৪৫ দিন।

পরবর্তীতে ১৫৮২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি জুলিয়ান ক্যালেন্ডার সংশোধন করেন এবং নতুন একটি বর্ষপঞ্জি ঘোষণা করেন। একেই বলে গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার বা গ্রেগোরিয়ান বর্ষপঞ্জি। এই সৌর ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বর্তমানে ইংরেজি মাস বা বছর গণনা করা হয়। আর তাই ১ জানুয়ারি এখন ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের আরো অনেক দেশে নববর্ষ হিসেবে পালন করা হয়।

নববর্ষ উদ্যাপনের প্রচলন:
রোমানরা খ্রিস্টীয় প্রথম শতক থেকেই নববর্ষ উদযাপনের প্রচলন শুরু করে। ক্যাথলিক গির্জা এ উৎসবকে পৌত্তলিকতা (প্যাগানিজম) বলে নিন্দা জানায়। কিন্তু এরপর ঐকমত্যের ভিত্তিতে এ উৎসব পালনের প্রবণতা প্যাগানদের পাশাপাশি খ্রিস্ট ধর্মীয়দের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। বছরের পয়লা দিন খ্রিস্ট ধর্মের একদল অনুসারি এ উপলক্ষে বিশেষ ধর্মীয় উৎসবের আয়োজন করে। পরে ধীরে ধীরে গির্জায় উৎসব পালনের রীতিটি উঠে যায়। গত চার’শ বছর ধরে পশ্চিমের দেশগুলোতে নববর্ষের পয়লা দিন ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

নববর্ষের ঐতিহ্য:
প্রাচীন ব্যাবিলন যুগে নববর্ষে সুস্বাস্থ্যের জন্য মানুষ ধূমপান ছেড়ে দেয়া ও শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার সংকল্প করত। তারও আগে নববর্ষের দিনে অন্যের কাছ থেকে ধার করে আনা গৃহস্থালি সামগ্রী ফেরত দেয়া হতো।
১৮৮৬ সালের আগে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়াতে রোজ প্যারেডে ভেরি হান্ট ক্লাবের সদস্যরা তাদের গাড়ি বা মাঠ ফুল দিয়ে সাজাত। এ অনুষ্ঠান কমলালেবু পাকার মৌসুমে শুরু হতো। ১৯০২ সালে রোজ টুর্নামেন্টের অংশ হিসেবে রোজ ফুটবলের প্রচলন শুরু হয়। আসলে এটি ছিল রোমানদের রথ উৎসবের বিকল্প।
শিশুদের জন্য গ্রিসে নববর্ষের পয়লা দিনটি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এ দিন ছোট শিশুদেরকে ঝুড়িতে নিয়ে বিশেষ কুচকাওয়াজ করা হতো। মনে করা হতো এতে আত্মার শক্তি বাড়বে। প্রাচীন মিশরেও এরকম ধারনা করা হতো। শিশুদেরকে আত্মিক শক্তি, পুনর্জাগরণের প্রতীক ধরা হতো।
খ্রিস্টানরা প্রথম দিকে প্যাগানিজমের বিরোধীতা করলেও গির্জায় ঈশ্বরের প্রতীক হিসেবে শিশুদের উপস্থাপনকে তারা বাহবা দিয়েছে। এরপর থেকে গির্জায় শিশুদের মাধ্যমে নববর্ষ উদযাপন করা একটি প্রথায় পরিণত হয়েছে। এর মাধ্যমে যিশু খ্রিস্টের বাল্যকালকেও স্মরণ করা হয়। এই ধারণাটিই আস্তে আস্তে আমেরিকা এবং জার্মানিতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

নববর্ষ নিয়ে কুসংস্কার:
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের মাঝে নববর্ষ নিয়ে অনেক কুসংস্কার প্রচলিত আছে। যদিও এসব ধারণার কোন বাস্তব ভিত্তি নেই, তারপরও এসব অযৌক্তিক ধারণা মানুষ মেনে আসছে যুগ যুগ ধরে। যেমন অনেকে মনে করে, নববর্ষের পয়লা দিনের শুরুতে সে যা করবে বা খাবে সারা বছরই তাই করবে বা খেতে পারবে। এজন্য অনেকেই বছরের পয়লা দিনের কিছু সময় আত্মীয় বা বন্ধু বান্ধবের সান্নিধ্যে সময় কাটায়। অনেকে এই উদ্দেশ্য নিয়ে মিষ্টিমুখ করে। যাতে সারাবছর মিষ্টি খেতে পারে।
আবার অনেকে বিশ্বাস করে, যদি বছরের পয়লা দিনে কোন কালো চুলের লম্বা দেহের কারো সাথে দেখা হয় তা নিজের সৌভাগ্য বয়ে আনবে।
খাবার দাবারের ব্যাপারেও অনেক বিশ্বাস প্রচলিত আছে। পৃথিবীর অনেক দেশে বিশ্বাস আছে গোলাকার খাবার সৌভাগ্যের প্রতীক। এ বিশ্বাস থেকে ওলন্দাজরা বছরের পয়লা দিন গোলাকৃতির ডোনাট খেয়ে থাকে। তাদের ধারণা, এটি তাদের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনবে।
আমেরিকার অধিকাংশ প্রদেশে এ দিন মটরশুটি ও শুকরের মাংস দিয়ে তৈরি বিশেষ খাবার খাওয়া হয়। আর শুকর বা শুকরের মাংস আমেরিকায় উন্নতির প্রতীক বলে ধরা হয়। বাঁধাকপিকেও তারা সৌভাগ্যের সবজি বলে মনে করে। বাঁধাকপির প্রতিটি পাতাকে (প্রতীকি অর্থে) তারা কাগজের মুদ্রা বলে মনে করে। আমেরিকাতে আবার অনেকেই নববর্ষের দিন ভাতও খায়।

নববর্ষ দেশে দেশে:
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নববর্ষ পালনের রীতিনীতি কিন্তু এক নয়। কিছু কিছু মিল থাকলেও নববর্ষের অনুষ্ঠানের সঙ্গে যোগ হয় দেশীয় ঐতিহ্য।

নববর্ষের কিছু প্রথা আছে অবাক করা এবং মজার । যেমন থাইল্যান্ডে একজন আরেকজনের গায়ে পানি ছিটিয়ে নববর্ষকে স্বাগত জানায়। স্পেনে রাত ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ১২টা আঙ্গুর খেয়ে নববর্ষের প্রথম ক্ষণটি উদযাপন করা হয়। এখানে বিভিন্ন দেশের নববর্ষ পালনের কিছু মজার রীতি তুলে ধরা হলো।

আর্জেন্টিনা:
আর্জেন্টিনায় নববর্ষের আগের দিন রাত্রে পরিবারের সব সদস্য একসঙ্গে খাবার টেবিলে বসে আহার করে। তারপর বড়রা নাচের অনুষ্ঠানে চলে যায়। ভোর পর্যন্ত চলে এ নাচের অনুষ্ঠান। নববর্ষের প্রথম দিন নদী বা পুকুরে সাতার কেটে তারা নববর্ষ উদযাপন করে।

ব্রাজিল:
ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো সমুদ্র সৈকতে নববর্ষের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠানটি হয়। এর অন্যতম আকর্ষণ চোখ ধাঁধানো আতশবাজির প্রদর্শনী। এ দিন অধিকাংশ লোকই সাদা পোষাক পরিধান করে। সমুদ্রে সাতটি ডুব দিলে এবং সাতটি ফুল ছুড়ে দিয়ে তারা মনে করে বছরটি খুব ভালো কাটবে। এ উৎসবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় দুই মিলিয়ন পর্যটক যোগ দেয়।

কোরিয়া:
কোরিয়াতে নববর্ষ শুরুর সময় কেউ ঘুমায় না। এ সময় ঘুমালে নাকি চোখের ভ্রু সাদা হয়ে যায়! রাত বারটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে টিভিতে ৩৩ বার ঘণ্টা বাজানো হয়। কোরিয়ার ৩৩ বীরের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এটি করা হয়। কোরিয়াতে প্রায় সবাই সূর্যোদয় দেখে। সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ার সময় একজন আরেকজনকে শুভেচ্ছা জানায়।

মেক্সিকো:
মেক্সিকোতেও ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ১২ বার ঘণ্টা বাজানো হয়। এ সময় প্রতি ঘণ্টা ধ্বনির সঙ্গে একটি করে আঙ্গুর খাওয়া হয়। তারা বিশ্বাস করে এ সময় যা কামনা করা হয় তাই পূরণ হয়।

ভিয়েতনাম:

ভিয়েতনামে ভোর হওয়ার সময় প্রতি নববর্ষে সবাই গুরুজনদের কাছে দীর্ঘায়ূ কামনা করে আশীর্বাদ নেয়।

বাংলা নববর্ষ:
পহেলা বৈশাখ (বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস বৈশাখের ১ তারিখ) বাংলা সনের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ। দিনটি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষ হিসেবে বিশেষ উৎসবের সাথে পালিত হয়। ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালিরাও এই উৎসবে অংশ নেয়। সে হিসেবে এটি বাঙালিদের একটি সার্বজনীন উৎসব। বিশ্বের সকল প্রান্তের সকল বাঙালি এ দিনে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়, ভুলে যাবার চেষ্টা করে অতীত বছরের সকল দুঃখ-গ্লানি। সবার কামনা থাকে যেন নতুন বছরটি সমৃদ্ধ ও সুখময় হয়। বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা একে নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করার উপলক্ষ হিসেবে বরণ করে নেয়। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৪ এপ্রিল অথবা ১৫ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালিত হয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। বাংলা একাডেমী কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক পঞ্জিকা অনুসারে এই দিন নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এদিন বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে।

বাংলা দিনপঞ্জির সঙ্গে হিজরি ও খ্রিস্টীয় সনের মৌলিক পার্থক্য হলো হিজরি সন চাঁদের হিসাবে এবং খ্রিস্টীয় সন ঘড়ির হিসাবে চলে। এ কারণে হিজরি সনে নতুন তারিখ শুরু হয় সন্ধ্যায় নতুন চাঁদের আগমনে। ইংরেজি দিন শুরু হয় মধ্যরাতে। আর বাংলা সনের দিন শুরু হয় ভোরে, সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে। কাজেই সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বাঙালির পহেলা বৈশাখের উৎসব।

ইতিহাস:
হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বারটি মাস অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। এই সৌর পঞ্জিকার শুরু হত গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। হিন্দু সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরল, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিল নাড়– এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, এক সময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হত। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। প্রযুক্তি প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়ায় কৃষকদের ঋতুর উপরই নির্ভর করতে হতো।

বাংলা ক্যালেন্ডারবৃত্তান্ত:
আকবরের শাসনকালে ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দের ২৯ মার্চ ‘তারিখ-ই-ইলাহি’ নামে ক্যালেন্ডার শুরু হয়। আবার কোথাও কোথাও ১৫৮৪ সালের ১১ কিংবা ১২ জানুয়ারির কথা বলা হয়। তবে পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ শেষে আকবরের সিংহাসনে আসীন হবার বছর, অর্থাৎ ১৫৫৬ থেকে এই হিসেব শুরু হয়। সেই সময় ‘লক্ষ্মণাব্দ, বিক্রমাব্দ, জালালি সন, সিকন্দর সন, সপ্তাব্দ, শকাব্দ’ ইত্যাদি ক্যালেন্ডার প্রচলিত ছিল। সবই প্রধানত রাজাদের শাসনকাল চিহ্নিত করার হিসেব। ভারতে মুঘল রাজত্বের ইতিহাসের এক বিশেষ ঘটনাকে যথোচিত সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্য ছাড়াও রাজস্ব আদায়ের দিন ঠিক রাখার জন্যও তারিখ-ই-ইলাহি নামে ক্যালেন্ডার শুরু হয়। আকবরের সময়ের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী এবং জ্যোতির্বিদ আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজি এবং আকবরনামা’র রচয়িতা হিসেবে খ্যাত আবুল ফজল এই ক্যালেন্ডার তৈরি করেন।

সেসময় মাসের নামগুলো ছিল:-
১. কারওয়াদিন ২. আর্দি ৩. বোহসু ৪. খোরদাদ
৫. টীর ৬. অমরদাদ ৭. শাহরিয়ার ৮. আবান
৯. আজুর ১০. ডই ১১. আহাম ১২. ইস্কান্দার মিজ

ঠিক কবে থেকে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ইত্যাদি মাসের নামের প্রচলন হয়েছে জানা যায় না। তবে, নক্ষত্রের নামের সঙ্গে মিলিয়ে রাখা এই নামের উৎস খুব সম্ভবতঃ ৭৮ খ্রিস্টাব্দের শক শাসনের সঙ্গে সঙ্গে আসা শকাব্দের হিসেবেই।

নক্ষত্রসূচি ও মাসের নামের সূচিটি এইরূপ-
১. বৈশাখা নক্ষত্র- বৈশাখ ২. জ্যেষ্ঠা নক্ষত্র- জ্যৈষ্ঠ
৩. শর নক্ষত্র- আষাঢ় ৪. শ্রাবণী নক্ষত্র- শ্রাবণ
৫. ভদ্রপদ নক্ষত্র- ভাদ্র ৬. আশ্বনী নক্ষত্র- আশ্বিন
৭. কৃত্তিকা নক্ষত্র- কার্ত্তিক ৮. অগ্রহায়ণী নক্ষত্র- অগ্রহায়ণ
৯. পুষ্য নক্ষত্র- পৌষ ১০. মঘা নক্ষত্র- মাঘ
১১. ফাল্গুনি নক্ষত্র- ফাল্গুন ১২. চিত্রা নক্ষত্র- চৈত্র

কোন কোন ইতিহাসবিদ মনে করেন, বাংলার রাজা শশাঙ্ক এই বাংলা ক্যালেন্ডারের প্রণেতা। তাঁদের মতে, রাজা শশাঙ্কের আসাম বিজয়ের স্মৃতিস্বরূপ এই ক্যালেন্ডারের সৃষ্টি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ইতিহাসের প্রামাণ্য তথ্য হল এই যে, মহারাজ শশাঙ্ক বেনারস বিজয়ের পর চিল্কাহ্রদ পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে তা অধিকার করলেও আসামের পথে যানই নি। তাই আসাম বিজয়ের সঙ্গে বাংলা ক্যালেন্ডার তৈরির তথ্যটি প্রমাণাভাবে ত্যাজ্য হয়েছে। পয়লা বৈশাখের দিনটি নববর্ষ হিসেবে পালনের প্রথা হিসেবে শুরু হয় সম্রাট আকবরের রাজত্বেই। তারিখ-ই-ইলাহি শুরু করার পর সেই সময়ের মুসলমান সমাজে পালাপার্বণের সংখ্যা নির্দিষ্ট হয় বছরে চৌদ্দটি। তার মধ্যে একটি প্রধান উৎসব হল ‘নওরোজ’ বা নববর্ষ পালন-উৎসব। পয়লা বৈশাখের দিনটিই সেদিন।
এই নওরোজ উৎসবের সময়েই যুবরাজ সেলিম (পরবর্তীকালে সম্রাট জাহাঙ্গীর) মেহেরুন্নিসার (নুরজাহান নামে খ্যাত) প্রেমে পড়েন। বাবার এই নওরোজের উৎসবেই যুবরাজ খুররম (পরবর্তীকালে সম্রাট শাহজাহান) প্রথম চোখের দেখায় হৃদয় দিয়ে ফেলেন কিশোরী মমতাজ মহলকে। নওরোজ উৎসব না হলে ইতিহাসের পাতায় নুরজাহানই বা কোথায় থাকতেন, কোথা থেকেই বা তৈরি হতো শ্বেতমর্মরের তাজমহল! ভারতীয় সমাজে মুঘল সভ্যতার এক অন্যতম অবদান এই বাংলা ক্যালেন্ডার।

সন-তারিখ:
‘সন’ এবং ‘তারিখ’ শব্দদুটির উৎপত্তি আরবি শব্দ থেকে। ‘সন’ অর্থ বছর, ‘তারিখ’ অর্থ ইতিহাস। ‘সাল’ শব্দটির উৎপত্তি ফার্সি শব্দ থেকে, যার অর্থও বছর। বাংলা ক্যালেন্ডারের উৎপত্তিও আরবি ক্যালেন্ডার ‘হিজরি’ থেকে। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে রাসূলের (সা) মক্কা থেকে মদিনা যাবার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ ক্যালেন্ডারের উদ্ভব। মুহররম উৎসবের প্রথম দিন থেকে এই ক্যালেন্ডারের সূচনা হয়। এই হিসেবে প্রথম বাংলা ক্যালেন্ডার শুরু হয় ৯৬৩ হিজরি থেকে, সেই বছরের প্রথম মুহররমের দিন।
যেহেতু বাংলায় ভূমি-রাজস্ব আদায় ঠিক ঠিক করার জন্যেই এই ক্যালেন্ডারের প্রচলন, তাই একে প্রথম দিকে ‘ফসলি সন’ বলা হতো। মুঘল রাজত্ব শেষ হবার পর ‘ফসলি’ মুছে শুধু ‘সন’ থেকে গেছে।
হিজরি ক্যালেন্ডারের সঙ্গে বাংলা ক্যালেন্ডারের মূল তফাৎ হল- প্রথমটিতে পৃথিবীকে চন্দ্র-পরিক্রমার সঙ্গে, অন্যটিতে পৃথিবীর সূর্য-পরিক্রমা দিয়ে হিসেব হয়। সেজন্য হিজরি ক্যালেন্ডারে বছরে ১১/১২ দিন কম হয়।
১৯৬৭ সালে বাংলা একাডেমী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর তত্ত্বাবধানে ঋতুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মাসের এবং দিনের হিসেব তৈরি করে। সেই হিসেব অনুযায়ী বৈশাখ থেকে ভাদ্র হচ্ছে ৩১ দিনের মাস এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র ৩০ দিনের মাস। লিপ-ইয়ারের ৩৬৬তম দিনটি যুক্ত হবে ফাল্গুন মাসের সঙ্গে। বাংলা ক্যালেন্ডারে ‘তিথির’ হিসেব যোগ হওয়া তার অনেক পরে। ‘তিথি’ হল চন্দ্রের পৃথিবী-পরিক্রমার দিনের হিসেব। সেই হিসেবে ৩০ তিথির অর্ধেক ১৫টি ‘শুক্লা’, বাকি ১৫টি ‘কৃষ্ণা’।

ভারত বর্ষে নববর্ষ উদযাপন:
ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকরা খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য হতো। খাজনা আদায়ে সুব্যবস্থার জন্য মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।
আকবরের সময়কাল থেকেই এ অঞ্চলে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হত। এর পরদিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হত। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রূপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। হালখাতা বলতে একটি নতুন হিসাব বই বোঝানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে হালখাতা হল বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা, সকল স্থানেই পুরনো বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই খোলা হয়। হালখাতার দিনে দোকানদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন আপ্যায়ন করে থাকেন। এই প্রথাটি এখনও অনেকাংশে প্রচলিত আছে, বিশেষত স্বর্ণের দোকানে।
আধুনিককালে নববর্ষ প্রথম উদ্যাপনের খবর পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্ত্তণ ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকাণ্ডের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সনের আগে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয়নি।

কলকাতায় পহেলা বৈশাখ উদযাপন:
কলকাতায় শুধু পহেলা বৈশাখ নয়, পুরো বৈশাখকে বিবাহের জন্য উপযুক্ত ভাবা হয়। কাজেই মাস জুড়ে নতুন পোশাক পরা, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া লেগেই থাকে। আগের বছরের শেষ মাসে, অর্থাৎ চৈত্র মাসের শেষ দিনগুলোতে পোশাকের দোকানগুলোতে অনেক মূল্যছাড় দেওয়া হয়। কোন কোন স্থানে আয়োজিত হয় চৈত্র মাসের বিক্রি উৎসব।

বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ উদযাপন:
নতুন বছরের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠির কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ। গ্রামে মানুষ ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, নতুন জামাকাপড় পরে এবং আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে বেড়াতে যায়। বাড়িঘর পরিষ্কার করা হয় এবং মোটমুটি সুন্দর করে সাজানো হয়। বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। কয়েকটি গ্রামের মিলিত এলাকায়, কোন খোলা মাঠে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। মেলাতে থাকে নানা রকম কুটিরশিল্পজাত সামগ্রীর বিপণন, থাকে নানারকম পিঠা-পুলির আয়োজন। অনেক স্থানে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। এই দিনের একটি পুরনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। এর মধ্যে থাকে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা কিংবা কুস্তি। বাংলাদেশে এরকম কুস্তির সবচেয়ে বড় আসরটি হয় ১২ বৈশাখ, চট্টগ্রাম-এর লালদিঘী ময়দানে। এটি জব্বারের বলি খেলা নামে পরিচিত।

রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা:
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের গানের মাধ্যমে নতুন বছরের সূর্যকে আহ্বান। পহেলা বৈশাখ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে আহ্বান জানান। স্থানটির পরিচিতি বটমূল হলেও প্রকৃতপক্ষে যে গাছের নিচে মঞ্চ তৈরি হয় সেটি বট গাছ নয়, অশ্বত্থ গাছ। ১৯৬০ এর দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠির নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা।
ঢাকার বৈশাখী উৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখ সকালে এই শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়। এই শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবন এবং আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয়। শোভাযাত্রায় সকল শ্রেণী-পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করে। শোভাযাত্রার জন্য বানানো হয় রং-বেরঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিলিপি। ১৯৮৯ সাল থেকে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখের উৎসবের একটি অন্যতম আকর্ষণ।

চট্টগ্রামে বর্ষবরণ:
বন্দরনগরী চট্টগ্রামে পহেলা বৈশাখের উৎসবের মূল কেন্দ্র ডিসি পাহাড় পার্ক। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে এখানে পুরোনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করার জন্য দুইদিনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মুক্তমঞ্চে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি থাকে নানা গ্রামীণ পণ্যের পশরা। থাকে পান্তা ইলিশের ব্যবস্থাও।
চট্টগ্রামে সম্মিলিতভাবে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনের উদ্যোগ ১৯৭৩, ১৯৭৪ ও ১৯৭৫ সালে রাজনীতিকদের প্রচেষ্টায়। ইস্পাহানি পাহাড়ের পাদদেশে এই অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। ১৯৭৮ সালে এই উৎসব এখনকার ডিসি হিল পার্কে সরিয়ে নেওয়া হয়। ১৯৭৮ সালের উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন ওয়াহিদুল হক, নির্মল মিত্র, মিহির নন্দী, অরুন দাশ গুপ্ত, আবুল মোমেন, সুভাষ দে প্রমুখ। প্রথম দিকে প্রত্যেক সংগঠন থেকে দুইজন করে নিয়ে একটি স্কোয়াড গঠন করা হতো। সেই স্কোয়াডই সম্মিলিত সংগীত পরিবেশন করতো। ১৯৮০ সাল থেকে সংগঠনগুলো আলাদাভাবে গান পরিবেশন শুরু করে। পরে গ্রুপ থিয়েটার সমন্বয় পরিষদ যুক্ত হওয়ার পর অনুষ্ঠানে নাটকও যুক্ত হয়েছে। নগরীর অন্যান্য নিয়মিত আয়োজনের মধ্যে রয়েছে শিশু সংগঠন ফুলকীর তিনদিন ব্যাপী উৎসব যা শেষ হয় বৈশাখের প্রথম দিবসে। নগরীর মহিলা সমিতি স্কুলে একটি বর্ষবরণ মেলা হয়ে থাকে।

পার্বত্য জেলায় আদিবাসীদের বর্ষবরণ:
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার প্রধান তিনটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তা রয়েছে যাদের প্রত্যেকেরই বছরের নতুন দিনে উৎসব আছে। ত্রিপুরাদের বৈশুখ, মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজু উৎসব। বর্তমানে তিনটি জাতিসত্ত্বা একত্রে এই উৎসবটি পালন করে। যৌথ এই উৎসবের নাম বৈসাবি। উৎসবের নানা দিক রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো মারমাদের পানি উৎসব।

বিভিন্ন ভাষায় নববর্ষের শুভেচ্ছা বার্তা:
নতুন বছরে শুভেচ্ছা জানাতে বাংলায় ‘শুভ নববর্ষ’ বলা হয়। আর ইংরেজিতে বলা হয় ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’। একইভাবে বিশ্বের অন্যান্য ভাষাতেও শুভেচ্ছা বিনিময়ে রয়েছে ভিন্নতা। এখানে আরো কিছু ভাষায় নতুন বছরের শুভেচ্ছা বার্তা দেয়া হলো:
আরবি : কুল আম আনতুম সালিমুন
চাইনিজ : চু সেন তান
ফ্রেঞ্চ : বন্নে আন্নি
জার্মান : প্রোসিট নেউযার
হিন্দি : নয়া সাল মোবারক
রাশিয়ান : এস নোভিম গুদুম
স্প্যানিশ : ফেলিজ আনো নিউভো
উর্দু : খোশ আমদেদ নয়া সাল
ডাচ : গুল্লুকিগ নাইয়ো যার
ইটালিয়ান : বুয়োন কাপোডান্নো
পর্তুগিজ : ফেলিজ আনো নিউভো
ভিয়েতনামিজ : চুং চুক তান জুয়ান
টার্কিশ : ইয়েনি ইয়েলিনিজ কুটলু ওলসান
জাপানিজ : আকেমাশিতে ওমেডেতু গোজাইমাসু
সুইডিশ : গট নিট আর

বর্ষপুঞ্জী

বাংলা সন : বঙ্গাব্দ
সম্রাট আকবরের নির্দেশে আমির ফতেয়ুল্লাহ সিরাজী ১০ মার্চ ১৫৮৪ বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। আমির ফতেয়ুল্লাহ সিরাজী সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহনের দিনটিকে (৫ নভেম্বর ১৫৫৬) বাংলা সনের প্রথম নববর্ষ হিসাবে ধরেন। বাংলা বর্ষপুঞ্জিকার মাসগুলোর নাম যথাক্রমে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবন, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ন, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন এবং চৈত্র। বছরের প্রথম পাঁচ মাস বৈশাখ হতে ভাদ্র পর্যন্ত ৩১ দিনের, বাকী মাসগুলো অর্থাৎ আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যন্ত ৩০ দিনের মাস এবং প্রতি চতুর্থ বছরের চৈত্র মাসে একদিন যোগ করে তা হবে ৩১ দিনের। ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা বর্ষপুঞ্জি সংস্কার করেন।

ইংরেজী সন:
ইংরেজী বর্ষপুঞ্জিকার মাসগুলোর নাম যথাক্রমে জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ, এপ্রিল, মে, জুন, জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর। জানুয়ারি, মার্চ, মে, জুলাই, আগস্ট, অক্টোবর ও ডিসেম্বর ৩১ দিনের মাস। এপ্রিল, জুন, সেপ্টেম্বর, নভেম্বর ৩০ দিনের মাস। ফেব্রুয়ারি মাস ২৮ দিনে কিন্তু সনটি অধিবর্ষ হলে তা হবে ২৯ দিনের।

অধিবর্ষ:
সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে পৃথিবীর ৩৬৫ দিন ৫ ঘন্টা ৪৮ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড সময়ের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ৩৬৫ দিনে সৌর বছর গণনা করা হয়। চার বছরে সময়ের ঘাটতি হয় প্রায় ২৪ ঘন্টা বা একদিন। প্রতি ৪ বছরে একদিন বাড়িয়ে ইংরেজি চতুর্থ বছর ৩৬৬ দিন গণনা করা হয়্ সে বছর ফেব্রুয়ারি মাস ২৮ দিনের পরিবর্তে ২৯ দিন ধার্য করা হয়। এরূপ বছরকে অধিবর্ষ বলে। অধিবর্ষ হয় ৩৬৬ দিনে। জুলিয়াস সিজার অধিবর্ষ প্রবর্তন করেন। ক্যালেন্ডারের ৪ দ্বারা বিভাজ্য বর্ষগুলো অধিবর্ষ।

আরবি সন বা হিজরী সন:
খলিফা হযরত ওমর (রা: ) ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে হিজরি সন প্রবর্তন করেন। হযরত মুহাম্মদ (সা: ) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের দিন অর্থাৎ ১৬ জুলাই, ৬২২ খ্রিস্টাব্দ থেকে এর কার্যকারিতা দেখানো হয়। এজন্য একে হিজরি সন বলা হয়। আরবি সনের মাসগুলো যথাক্রমে মহরম, সফর, রবিউল আউয়াল, রবিউস সানি, জমাদিউল আউয়াল, জমাদিউস সানি, রজম, সাবান, রমজান, শাওয়াল, জ্বিলকদ এবং জ্বিলহজ্জ। বাংলা ও ইংরেজী পুঞ্জিকার ভিত্তি হল সূর্য পক্ষান্তরে আরবি সনের ভিত্তি হল চাঁদ। বাংলা ও ইংরেজী সনের এক বছর=৩৬৫ দিন পক্ষান্তরে আরবি সনের এক বছর=৩৫৪ দিন।

একনজরে সন বা শতাব্দী:
নাম – শুরু – প্রবর্তক
বিক্রমাব্দ – খ্রিস্ট পূর্ব ৫৭- বিক্রমাদিত্য
খ্রিস্টাব্দ – খ্রিস্ট জন্মের ৪বছর পূর্বে- স্কাইথিয়ান
শকাব্দ -৭৮ খ্রিস্টাব্দ- সম্রাট কনিষ্ক
গুপ্তাব্দ -৩২০ খ্রিস্টাব্দ- চন্দ্রগুপ্ত
ত্রিপুরাব্দ- ৬২১ খ্রিস্টাব্দ- চন্দ্রগুপ্ত
হিজরি সাল -৬২২ খ্রিস্টাব্দ- হজরত ওমর (র )
মঘি সন- ৬৩৯ খ্রিস্টাব্দ – মঘ রাজারা
লক্ষনাব্দ – ১১১৮ খ্রিস্টাব্দ- বিজয় সেন
বাংলা সন- ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ- সম্রাট আকবর

এক নজরে কিছু তথ্য:
১. বাংলা সনের প্রবর্তক কে?- ফতেয়ুল্লাহ সিরাজী। (তবে সম্রাট আকবর থাকলে তা সঠিক হবে)
২. বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখ চালু করেছিলেন সম্রাট আকবর
৩. পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয় ইংরেজী বর্ষপুঞ্জিকার কোন তারিখে?- ১৪ এপ্রিল
৪. ২৪ এপ্রিল ২০০৯ তারখে বাংলা সনের কত তারিখ কোন মাসে? ১০ বৈশাখ।
৫. ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ কোন সালে বাংলা পুঞ্জিকা সংস্কার করেন?- ১৯৬৬।
৬. শ্রাবন মাসের আগের ও পরের মাস দুটো হলো- আষাঢ়, ভাদ্র
৭. আজ বাংলা যে তারিখ- পরীক্ষার দিনের বাংলা তারিখ দেখে যাওয়া দরকার।
৮. কোন খলিফার সময় হিজরি সন প্রবর্তন করা হয়?- হযরত ওমর (রা: )
৯. কত খ্রিস্টাব্দ থেকে হিজরি সন গণনা করা হয়? ৬২২ খ্রিস্টাব্দ
১০. হযরত মুহাম্মদ (সা: ) কত সালে হিযরত করেন?- ৬২২ খ্রিস্টাব্দে
১১. ইংরেজী বর্ষ পরিক্রমার পরপর দু’টি ৩১ দিবস বিশিষ্ট মাস হল?- জুলাই, আগস্ট
১২. অধিবর্ষে কত দিন থাকে?- ৩৬৬
১৩. ২০০৮ সালটি অধিবর্ষ এবং ১ম দিনটি মঙ্গলবার হলে ৩১ ডিসেম্বর কি বার? বুধবার (কোন বর্ষ অধিবর্ষ না হলে ১ জানুয়ারি এবং ৩১ ডিসেম্বর একই বার হবে। কিন্তু বর্ষটি অধিবর্ষ হলে ১ জানুয়ারি বারের সাথে ১ যোগ করলে ৩১ ডিসেম্বর এর বার পাওয়া যাবে।)
১৪. ১৯৭১ ইং সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলা কত সন?- ১৩৭৮ ।

বাংলা সন নির্ণয়ের পদ্ধতি:
ক. ইংরেজী সনের তারিখ ১ জানুয়ারি থেকে ১৩ এপ্রিল এর মধ্য হলে, বাংলা সন= ইংরেজী সন- ৫৯৪
খ. ইংরেজী সনের তারিখ ১৪ এপ্রিল থেকে ৩১ ডিসেম্বর এর মধ্য হলে বাংলা সন=ইংরেজী সন- ৫৯৩
প্রশ্নে উল্লেখিত তারিখ হল ১৬ ডিসেম্বর এবং ইংরেজী সন হল ১৯৭১ সুতরাং বাংলা সন= ১৯৭১-৫৯৩=১৩৭৮ বঙ্গাব্দ।