ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

 

আমার বাসার অস্থায়ী গৃহপরিচারিকার হাতে একটি বিশেষ রিং/বালা/ব্রেসলেট (এর সত্যিকার নাম আমার অজানা)সদৃশ বস্তুর দিকে চোখ পড়ায় আমার মিসেস তার কাছে ভিন্ন টাইপের জিনিসটির ব্যাপারে জানতে চাইল। তখন গৃহপরিচারিকা অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে রিং টির নানাবিধ উপকারিতা তথা সর্ব রোগের ওষুধ হিসেবে বয়ান করলেন। তিনি রিং টি বসুন্ধরা থেকে ৫০০০ টাকা কিনেছেন তার প্রতিবেশি আরেকজন বস্তিবাসীর পরামর্শে। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মী অধ্যাপকের হাতেও দেখলাম বিশেষ রিং টি। বেশ কিছু ছাত্রের হাতেও নজরে পড়ল তথাকথিত সর্ব রোগের ওষুধ তথা বিশেষ রিং টি। পরে জানতে পেরেছি বড়জোড় ৫০ টাকা উৎপাদন খরচের রিং টি থেকে এজেন্টরা পান ৬০০ টাকা, অবশিষ্ট ৫৩০০/৫৪০০ টাকা চলে যাচ্ছে বাইরের প্রতারকদের হাতে। এভাবে বস্তির তথা গৃহহীন অসহায় মানুষ থেকে শুরু করে সমাজের শিক্ষিত শ্রেণীও জড়িয়ে পড়ছে প্রতারকদের খপ্পরে। এরকম অনুৎপাদনশীল খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যাবার পর মিডিয়া ও সরকারের নজরে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, ভারত, চীন, জাপান, ডব্লিউবি, আইএমএফ প্রভৃতি দেশ ও সংস্থার দরিদ্র এই দেশটির দিকে নজর দেয়ার কারণ হিসেবে অনেকে শুধু দেশটির তেল-গ্যাস-বন্দর প্রভৃতি সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক সম্পদ ও তথাকথিত সন্ত্রাস দমনের কথা বলে থাকলেও এর সাথে জড়িত রয়েছে অনেক বড় অর্থনৈতিক স্বার্থ। কারণ দেশটি আয়তনে বিশ্বের ৩ হাজার ভাগের মাত্র ১ ভাগ হলেও এর লোকসংখ্যা ৪০ ভাগের ১ ভাগ। যা কি না বাংলাদেশের চেয়ে আয়তনে ২০-৪০ গুণ বড় এরকম অনেক দেশেই অনুপস্থিত। আর এই বিশাল ভোক্তার জনসংখ্যার কারণে আয়তনে দরিদ্র হলেও এই দেশটি একটি বিশাল বাজার। এই ১৮ কোটি লোকের বাজার দখল বিশ্বমোড়লদের অতিরিক্ত নজরের একটি অন্যতম কারণ। কেননা অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমাদের নিজেদের অর্থনীতিকে উৎপাদনমুখীর পরিবর্তে ভোগমুখী করে তোলা হয়েছে দৃশ্যমান এসব দাতা দেশ ও সংস্থাগুলোর পরামর্শে। বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, তৃতীয় বিশ্বের এই জনবহুল উন্নয়নশীল দেশটির রাজধানী শহরকে এখন বিশ্বের ‘সিটি অব শপিংমল’ বললে অত্যুক্তি হবে না। অথচ বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহর টোকিও “সিটি অব প্রোডাকশন” তথা উৎপাদনের শহর হিসেবে বিবেচিত।

দেশের অর্থনীতির দিকে তাকান, দেখতে পাবেন আমাদের ভোগকৃত অধিকাংশ পণ্যসামগ্রীই শুধু নয়, চিন্তা-চেতনা তথা সংস্কৃতিও হয় প্রতিবেশী দেশ নতুবা ওই সব মোড়ল দেশের বহুজাতিক কোম্পানি বা চ্যানেল থেকে আমদানি করা। যেখানে আমাদের নিজস্ব যোগান নামমাত্র। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে আরো ৮০ শতাংশ খাঁটি দুধ উৎপাদন সম্ভব অথচ শিশুখাদ্যের জন্য বিদেশীদের ভেজাল দুধেই আমরা অধিক সন্তুষ্ট। এখন প্রশ্ন আসতে পারে- দেশের বাজেটে ও বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদ ও সংস্থাগুলোর গবেষণায় আমাদের প্রবৃদ্ধি তো বাড়ছেই। এ ক্ষেত্রে অর্থনীতির একজন ছাত্র হিসেবে আমার কাছে যেটা মনে হয়, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেখানে বাস্তবতার আলোকে অনেক বেশি উৎপাদনমুখী হওয়ার কথা ছিল সেখানে তা কেবলই ফটকা কারবারি ও প্রতারণার ফাঁদে বন্দী। এখানে যেটা হচ্ছে তা হলো ১০ টাকাকে ২০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে দেশের প্রকৃত প্রবৃদ্ধি সত্যিকার অর্থে খুবই নগণ্য।