ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

প্রযুক্তির লোভনীয় কারাগারে বন্দী তরুণ প্রজন্ম: পাশ্চাত্য ও বাংলাদেশের তরুণদের প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে শিউরে ওঠার মত ভয়াবহ দুটি প্রতিবেদনের চুম্বক অংশ –

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বব্যাপী নতুন প্রজন্মের জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি ভয়াবহ চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে মাত্র ১ লাখ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দরিদ্র দেশটিতে প্রায় ১৬ কোটি লোকের মধ্যে মোবাইলের ব্যবহারকারী প্রায় ৮ কোটি এবং ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২ কোটির উপরে। যার মধ্যে তরুণ প্রজন্মই বেশি। ধারনা করা হচ্ছে নেটের গতি অনেক বেড়ে যাওয়ার এবং ব্যয় অনেক কমে যাওয়ার কারনে আগামী ২ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের ইন্টারনেটের ব্যবহারকারী ৫ কোটি ছাড়িয়ে যাবে।

ঘটনা-১
সম্প্রতি বিবিসির এক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাপী শিশুদের মাত্রাতিরিক্ত প্রযুক্তি নির্ভরতা ও অপব্যবহারের কারনে ভয়াবহ সামাজিক অবক্ষয়ের এক করুন চিত্র ওঠে এসেছে। প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয় শিশুরা অনেক ক্ষেত্রেই ১২- ১৪ ঘন্টারও অধিক সময় প্রযুক্তি নির্ভর থাকছে। ফলে তারা পরিবার ও সমাজ থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় চরম হতাশা ও নানা রকম অপরাধ প্রবনতায় আক্রান্ত হচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত প্রযুক্তি ব্যবহারের ভয়াবহতা নিরুপনের জন্যে লন্ডনে কয়েকজন শিশুর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণার করুন চিত্র-

“পুরো ১ সপ্তাহ সময় শিশুদেরকে কম্পিউটার, টিভি, গেমস, এমনকি মোবাইলসহ সকল প্রকার প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখা হয়। এ অবস্থায় ট্রেনে করে স্কুলে যাওয়ার পথে ওই শিশুদের একজনের সাথে কথা হয়। সে জানায় এই প্রথম ট্রেনে কেউ আমার সাথে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে। কারন ট্রেনে স্কুলে যাওয়া পথে পাশের সিটে বসা যাত্রীর সাথেও কখনো হ্যালো বলা হয়নি। কারন যাওয়ার পথে আমি আমার মোবাইলে খুব হিট ব্যান্ডের মিউজিক শুনার পাশাপাশি বন্ধুদের জন্য মোবাইলে ম্যাসেজ লিখতে কিংবা চ্যাট করতে ব্যস্ত থাকি। স্কুলে গিয়ে ক্লাস ও ক্লাসের ফাঁকেও এগুলো চলে সমান তালে। স্কুল থেকেও বাসায় ফিরেই বসে পড়ি পড়ার টেবিলে। গভীর রাত পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে চলে স্কুলের এসাইনমেন্ট তৈরির কাজ ও একই সাথে চলে মিউজিক শুনা, বন্ধুদের সাথে চ্যাটিং করা, গেমস খেলা, মুভি দেখা ইত্যাদি। কিন্তু গত ৪ দিন যাবত আমার কাছ থেকে সকল প্রযুক্তি এমনি মোবাইলটিও আম্মু নিয়ে নিয়ে যাওয়ার কারনে আপনার সাথে আমি ট্রেনে কথা বলতে পারলাম। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে আমি এখন আমার জানালার পাশ থেকে বাইরে পাখির ডাকও শুনতে পারছি, আমার আম্মুর সাথে বসে গল্পও করতে পারছি এবং রাতে চাঁদের সৌন্দর্যও উপভোগ করতে পারছি। যেগুলোর স্পর্শ প্রযুক্তির কারনে আমি কখনো উলব্দি করতে পারতাম না। ” চীন, থাইল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশ দাবি করছে শিশুদের প্রতিদিন ৬ ঘন্টার অধিক সময় কম্পিউটার কিংবা টেলিভিশনের ব্যবহারকে ভয়াবহ ধরনের নেশা ঘোষণা করা হোক।”

শখ- সারারাত প্রেমিকার সাথে ফোনালাপ-
ঘটনা-২
বাংলাদেশেও তরুণ প্রজন্মেরর মাঝে প্রযুক্তির অপব্যবহার যে কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে তার করুণ চিত্র ফুটে ওঠেছে নিচের গবেষণায়- জানুয়ারি ২০০৯ এ- স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পরিচালিত একটি গবেষণা জরিপে নিন্মোক্ত ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায়।
এক নজরে:
– জরিপকৃত মোট শিক্ষার্থী ১০০ জন
– মোবাইল ব্যবহারকারী ৯৩ জন
– তরুণ ৬০ জন
– তরুণী ৪০ জন
– ৪টির বেশি সিম ব্যবহারকারী ৯ জন
– একাধিক সিম ব্যবহারকারী ৪৩ জন
– সরাসরি প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে ৮ জনের
– কোনভাবেই প্রেমের সম্পর্ক নেই ৩৫ জনের
– মোবাইলের মাধ্যমে সম্পর্ক ৫০ জনের
– দুষ্টামী/ কৌতুহলবশত/ মজা করে মোবাইলের মাধ্যমে প্রেমের/ আড্ডার সম্পর্ক ২৬ জনের
– সিরিয়াসলি মোবাইলের মাধ্যমে প্রেমের সম্পর্ক ২৪ জনের
– মোবাইলের মাধ্যমে একাধিক জনের সাথে প্রেমের সম্পর্ক ২২ জনের
– অসম বয়সের বিপরীত লিঙ্গের সাথে মোবাইলে কথা বলেন ১৩ জন
– মোবাইলে অস্বাভাবিক (বিকৃত) আলাপ করেন ২৮ জন
– প্রতিদিন গড়ে ৪ ঘন্টার বেশি মোবাইলে কথা বলেন ১৫ জন
– প্রতিদিন গড়ে ২ ঘন্টার বেশি মোবাইলে কথা বলেন ২০ জন
– প্রতিদিন গড়ে ১ ঘন্টার বেশি মোবাইলে কথা বলেন ৮ জন
– মোবাইলে পরিচয়ের পর সরাসরি স্বাক্ষাৎ করেছেন ৩২ জন
– মোবাইলে পরিচয়ের পর একাধিক জনের সাথে সরাসরি স্বাক্ষাৎ করেছেন ১৭ জন
– মোবাইলে পরিচয়ের পর সরাসরি স্বাক্ষাৎ করতে গিয়ে দূর থেকে দেখেই পালিয়েছেন ১৫ জন তরুণ (অনেকেই একাধিক বার)
– প্রতারণার উদ্দেশ্যে সম্পর্ক রেখেছেন ১১ জন
– নিছক গল্প করার জন্যই ফোনালাপ করেন ১৪ জন
– ফোনালাপের মাধ্যমে তরুণীদের সাথে দেখা করতে গিয়ে প্রতারণা তথা সর্বস্ব খুইয়েছেন ৬ জন।
– শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছেন ১৯ জন।
তবে মোবাইল প্রেমের সূত্রপাত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছেলেদের পক্ষ থেকে।

জরিপটি আমরা ৪ জন বন্ধু মিলে সম্পন্ন করি ২০০৯ এর জানুয়ারিতে। সাম্প্রতিক সময়ের তরুণ প্রজন্মের এই চরম অধ:পতনের বিয়টি আমাদের নীতি নির্ধারকদের ভাবনার বাইরেই ছিল। মোবাইলের সর্বনিম্ন একটা রেট করার পেছনে আমাদের জরিপটির একটা ভাল ভূমিকা ছিল।
আর জরিপটি করা হয়েছিল আজ থেকে ২ বছরের অধিক সময় পূর্বে। তাই বর্তমান অবস্থা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে সেটিও ভাববার বিষয়।

আমার বিবেচনায় মোবাইল কিংবা ইন্টারনেটে তথা প্রযুক্তির ভালো দিক ৯৯% হলে খারাপ দিক মাত্র ১%। কিন্তু সমস্যা হলো কেউ যদি সেই খারাপ দিক তথা অপব্যবহার নিয়ে পুরো সময় ব্যস্ত থাকে।

তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তির লোভনীয় কারাগারে বন্দী হয়ে যাচ্ছে কেন?
১) আগের মত খেলাধূলার পরিবেশ ও চর্চা না থাকা।
২) ক্লাব-সংঘ তথা তরুণদের সামাজিক কর্মকান্ডে অংশ গ্রহণ অনেক কমে যাওয়া।
৩) জাতীয় নেতৃত্বের ইতিবাচক প্রভাবের পরিবর্তে নেতিবাচক প্রভাব বেশি হওয়া।
৪) ছাত্র রাজনীতি তথা ছাত্র সংগঠন গুলোর ব্যর্থতা
৫) হতাশা ও বেকারত্ব
৬) আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব
৭) মাদকের সহজলভ্যতা ….
আরো যত কারন আপনাদের চোখে পড়ে….

কিন্তু শুধু কারন বললেই হবেনা। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতেই হবে। আর এজন্য আমাদের কি কি করনীয় হতে পারে?
আসুন পোস্টে আমরা আমাদের মতামত গুলো তুলে ধরি।

সবার জন্য ৩ টি প্রশ্ন:
১) এর কারণ
২) ফলাফল কি হচ্ছে?
৩) উত্তরনের উপায়

তাই আসুন। শেয়ার করুন আপনার মনের গভীরের সকল কথা।
“একটি সার্থক চিন্তা, পরামর্শ কিংবা পরিকল্পনা, কোটি টাকার চেয়েও মূল্যবান।” তাই দেশ গঠনে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে সুন্দর ভাবে গড়ে তুলতে আপনার মুল্যবান পরিকল্পনা বলুন। হয়তো আপনাকে দিয়েই শুরু হবে দেশের দিনবদল!