ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

বলছিলাম কলাম ও কলামিস্টদের বিষয়ে। এবং আরো ইচ্ছে ব্যক্ত করেছিলাম যে আমিও একজন কলামিস্ট হতে চাই। তবে কখনো কখনো সময়, অবস্থা এবং ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু গল্প বা উপকথাও কলাম হয়ে উঠতে পারে। সমালোচকরা হয়তো নাক সিটকে উঠবেন; কবিতা কলাম হয় না?

শুধু লিখতে পারলেই যে কোন কিছু লিখে ফেলা যাবে না। নিজের প্রান বিপন্ন করে কিংবা জীবন ঝুকিপুর্ন করে কিছু লিখে ফেলার দায়িত্ব কেউ লেখককে বুঝিয়ে দেয় নি। কিংবা তারও এই ধরনের দায়িত্ব নেওয়া ঠিক হবে না।

পৃথিবীর মানুষ এই পর্যন্ত যত আবিস্কার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক আন্দোলন ও পরিবর্তন করছে এবং যত প্রকার সংবিধান রচনা করেছে সবই মানুষের জীবনকে সুন্দর ও সুসংগঠিত করার জন্যই। তবে হ্যা, এসব প্রত্যেকটির পিছনে অনেক ত্যাগ, রক্ত, অশ্রু দিতে হয়েছে।
কবিতার ভাষায় বলতে গেলে;
সময় হয়েছে মুক্তির।
অদ্ভুদ এক আধার এসেছে পৃথিবীতে আজ।
তৃষিত মাটি রক্ত চায়।
রক্তে আগুন প্রতিরোধ করে।
কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান
হাকিছে ভবিষ্যত।
ইত্যাদি।
এগুলির অধিকাংশই রাজনৈতিক। যেমন বাংরাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ – মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তবাহিনীদের উদ্দিপ্ত করতে বহু গান রচনা ও পরিবেশনা করা হয়েছিল।

অর্থনৈতিক কিংবা বৈজ্ঞানিক আন্দোলন ও পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই কোন পথ আছে।

সমাজ বিজ্ঞানীরা বলেছেন; পরিবার হলো সমাজের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম প্রতিষ্ঠান।
আমি সমাজ বিজ্ঞানী কিংবা পলিটিক্যাল সায়েন্টিস্টও নই কিন্তু তবুও আমার কিছু উপলব্ধি আছে যা সবার মত অতি সাধারন ও প্রায় একই রকম। যেমন; রাজনীতি হচ্ছে একটি রাষ্ট্রযন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যবস্থা।
বিচ্ছিন্ন ভাবে একটি ক্ষুদ্র সমাজে কেউ হয়তো রাজনীতিকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্যে এটাকে এড়িয়ে বা পাশ কাটিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আসলে রাজনীতির নশ্বরতা বলতে কিছু নেই। রাজনীতি শুধু এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থা বা ব্যবস্থায় পরিবর্তন হয়।

আমি প্রায়শই চিন্তা করি যারা বিভিন্ন পত্রিকায় কলাম লিখে থাকে সেই সব কলামিস্টদের অবশ্যই অনেক শক্তিশালী এবং পরিবার, সমাজ, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগতভাবে অনেক স্থিতিশীল হতে হয়। কোন রাজনৈতিক দল, কোন কর্পোরেট গোষ্ঠি, কোন বিশেষ গোষ্ঠী কিংবা সরকার যদি নিজেও সেই কলামিস্টের লেখার কোন অংশের প্রতি রাগান্বিত হয়ে পাল্টা আঘাত করে তবে তার সেটা সইবার বা প্রতিহত করার বা সেটাকে পাশ কাটিয়ে যাবার এবং সেটাকে এডজাস্ট করার মত ক্ষমতা, শক্তি কিংবা নেটওয়ার্কিং থাকেত কবে নতুবা সাংবাদিক – রিপোর্টারদের মত রাস্তাঘাটে মরে, পড়ে থাকলে খোজ নেবারও কেউ থাকবে না কিংবা দুচারদিন একটু লেখা-লেখি করে সব নিরব হয়ে যাবে। তবে কলাম লেখা কোন পেশা নয়।

কারন সমাজ ও দেশের প্রথাগত কোন রাজনৈতিক স্রোতধারার বিরুদ্ধে যদি কারো লেখা চলে যায় আর সে যদি একজন দুর্বল লেখক হয় তবে তাকে অতি সহজেই এর জন্য অনেক মুল্য দিতে হবে।

কলাম যদি সাংবাদিকতার একটি বিশেষ শাখা হয় তবে আমি এর জন্য তিনটি প্রস্তাবনা উপস্থাপন করবো;
এক. # একজন কলামিস্ট অবশ্যই তার কলামের গুরুত্ব এবং লেখার মান সম্পর্কে বুঝতে সক্ষম।
দুই. # একজন কলামিস্ট কখনোই এমন হন না যে কোন কর্পোরেট বা রাজনৈতিক বা সরকার ব্যবস্থা তাকে সমাজে বা দেশে বা আরো বড় কোন কমিউনিটিতে একজন বিশ্বস্থ এবং শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি ও লেখক – কলামিস্ট হিসেবে উপস্থাপন করলো আর তিনি তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য শুধু ভাল ভাল প্রস্তাবনা ও প্রেডিকশন করে যাবেন। কারন তিনি যদি এমনটা করেন তবে কিছু দিন মানুষ হয়তো তার কথা বিশ্বাস করে সেইমত আচরনে ধাবিত হবে কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে যখন তার গবেষনা, প্র্রস্তাবনা ও প্র্রেডিকশন কার্যকারীতা হারাবে তখন তার আর গ্রহন যোগ্যতা থাকবে না।
তিন. # সুতরাং একটি কলাম অবশ্যই বাস্তবতার নিরিখে লিখা হয়ে থাকে। এবং একজন কলামিস্ট অবশ্যই তার নিজের নিরাপত্তার বিষয়গুলিও বিবেচনায় রাখবেন।

মেরিডিটিরিয়ান সী বা ভুমধ্যসাগর কিংবা হাসু দরিয়ার ছোট একটি উপকথা বা গল্প দিয়ে লিখাটা শেষ করতে চাই।

উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে; হাসু দরিয়া ইউরোপ ও আফ্রিকা দুইটি মহাদেশের মধ্যবর্তী একটি সাগর। এটি জিব্রাল্টার প্রণালী দ্বারা আটলান্টিক মহাসাগরের সাথে সংযুক্ত হয়েছে। হাসু দরিয়ার উত্তরে রয়েছে ইউরোপ, দক্ষিণে আফ্রিকা, এবং পূর্বে এশিয়া। হাসু দরিয়ার আয়তন প্রায় ২৫ লক্ষ বর্গকিলোমিটার (৯,৬৫,০০০ বর্গমাইল)। কিন্তু জিব্রাল্টার প্রণালী দ্বারা আটলান্টিকের প্রধান জলভাগের সঙ্গে সংযুক্ত স্থানে এটি মাত্র ১৪ কিলোমিটার (৯ মাইল) পর্যন্ত প্রশস্ত হয়েছে।

এই হাসু দরিয়ায় অবস্থিত নির্জন একটি রাজতন্ত্র ছিল সিসিলি কিংডম যা সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে গঠিত হয়েছিল।

সিসিলি রাজতন্ত্রের সিরাকাস শহরে ২৮৭ খ্রিষ্টপুর্বে জম্নেছিলেন মহান গনিতবিদ ও পদার্থবিদ আর্কিমিডিস।
আর্কিমিডিস ছিলেন সিসিলি রাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। সিসিলির নিরাপত্তার দায়িত্বে রাজা তাকে নিয়োজিত করেছিল।

একবার সিসিলি রাজা ঠিক করলেন পবিত্র রোমন এম্পায়ারের সম্রাটকে একটি স্বর্নের মুকুট উপহার পাঠাবেন। উল্লেখ্য তখন রোমান এম্পায়ার ছিল শৌর্যে বির্যে পৃথিবীর শীর্ষদের অন্যতম একটি দেশ। এবং রোমান সম্রাটের গুপ্তচর ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশগুলিতে। তেমনি এক গুপ্তচর সম্রাটের কাছে সংবাদ নিয়ে আসলেন সিসিলি রাজা তাকে একটি স্বর্নের রাজ মুকুট উপহার হিসেবে পাঠানোর ইচ্ছে ব্যক্ত করেছেন। রোমান সম্রাট দেখলেন সিসিলি ছোট একটি রাজ্য এবং ধ্বন-সম্পদের প্রাচুর্য বলতে খুব একটা ছিল না – দ্বীপ আর দ্বীপপুঞ্জ রাষ্ট্র ছিল। যেহেতু সিসিলি রাজা তাকে স্বর্নের মুকুট পাঠাতে মনস্থির করেছেন তাই সেটা যেন রোমান সম্রাটের ব্যাক্তিত্ব এবং সুনামকে আরো বৃদ্ধি করতে পারে, এবং একই সাথে এই নতুন বন্ধু রাজা সুনাম ও নামও যেন ছড়িয়ে পড়ে আর সারা বিশ্বের শাসকরা দেখে যেন অভিভুত হয়ে যায় তাই তিনি সিসিলি রাজা – তার অদেখা বন্ধু রাজাকে এক লরি বোঝাই স্বর্ন পাঠিয়ে দিলেন।

বন্ধুত্ব আর ভালবাসার কি অপরুপ নিদর্শন।

সিসিলি রাজা সেই স্বর্ন তার রাজ স্বর্নকারকে দিয়ে বললেন একটি রাজ মুকুট ও আরো আনুসাংগিক কিছু জিনিসপত্র বানিয়ে দিতে।
কারিগর দিনরাত একমাস পরিশ্রম করে অতি সুন্দর একটি রাজ মুকুট তৈরী করলো যা এত সুন্দর মুকুট পৃথিবীর ইতিহাসে আগে কখনো তৈরী হয় নি।

মুকুটটি হাতে নিয়ে রাজার সন্দেহ হলো এখানে খাটি সোনা নেই কিছুটা ভেজাল আছে। তখন তিনি তার রাজ বিজ্ঞানী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আর্কিমিডিস’কে ডেকে বললেন এটা পরীক্ষা করে দিতে। আর্কিমিডিস পরীক্ষা করে বললেন যে এই স্বর্নের মুকুটে সামান্য কিছু ভেজাল আছে। তখনই তলব করা হলো কারিগরকে।
কারিগর এসে বলল; রাজা মশাই, আমি কোন অসততার আশ্রয় নেই নি এমনকি কোন স্বর্নও চুরি করি নি কিন্তু অতিরিক্ত কিছু তামা মিশিয়েছি কারন স্বর্নে সামান্য পরিমান খাদ বা ভেজাল মিশ্রিত না করলে সেটা দিয়ে কোন গহনা, মুকুট কিংবা কোন জিনিসপত্র তৈরী করা যায় না। তাই এই মুকুট তৈরী করার জন্য আমি সামান্য পরিমান খাদ মিশিয়েছি।

হাসু দরিয়া অঞ্চলের সিসিলি দ্বীপ পুঞ্জ রাজতন্ত্রের রাজা রোমান সম্রাটকে সেই স্বর্নের রাজ মুকুটি পাঠালেন এবং মুকুটের প্যাকেটের সাথে একটা ছোট্ট কাগজও জুড়ৈ দিলেন সেখানে উল্লেখ করা হল এই মুকুটে কতটুকু স্বর্ন আছে, কতটুকু খাদ আছে, নির্মানকারীর নাম, সিসিলি রাজার নাম, নির্মানের তারিখ, রোমান সম্রাটের নাম – আজকের দিনে আমরা যাকে কোন ডিভাইস বা যন্ত্র বা পন্যের টেকনিক্যাল ডিসক্রিপশন যাকে বলি।
সেই থেকে টেকনিক্যাল ডিসক্রিপশন বা টেকনিক্যাল ফিচার পদ্ধতিটি চালু হলো।

যাইহোক, কলামের শিরোনাম ছিল “হাসু দরিয়ার উপকথা”যা উপরের গল্পটির সাথে সম্পৃক্ত কিন্তু লিখছিলাম কলাম ও কলামিস্ট বিষয়ে। আর সবশেষে কলাম কাকে বলে একটু লিখার চেষ্টা করা যেতে পারে; “কলাম হচ্ছে সাংবাদ মাধ্যমের সেই বিশেষ শাখা যা কোন সমাজ বা সমন্বিত জনগোষ্টি কিংবা মানব সমাজ ভিন্ন অন্য কোন ব্যবস্থা যার সাথে মানুষের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট থাকে এরুপ পরিবেশের পর্যালোচনা, সমস্যা ও সমাধান সহ তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষন ইত্যাদি প্রবন্ধ আকারে লিপিবদ্ধ করে প্রকাশ করা হয়।”

আগের পর্বে বলেছিলাম; “একটি পত্রিকার প্রান হচ্ছে কলামসমুহ। সংবাদ ও অন্যন্য তথ্যসমুহ নিয়েই পত্রিকা তবে কিছু কিছু পত্রিকা বিশেষ বিশেষ প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরী করার জন্য জনপ্রিয়তা সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু সর্বপরি কলামগুলির উপর নির্ভর করে পত্রিকার মান এবং জনপ্রিয়তা ও সার্কুলেশন।”

অনেক সময় রাষ্ট্র নায়করাও লেখালেখি করেন। তাদের ব্যাপার-স্যাপার ভিন্ন।

তবে আমি মনে করি কোন সাংবাদিক, অধ্যাপক, লেখক কিংবা অন্য যে কেউ যদি অর্থনৈতিক, সামাজিক ভাবে স্থিতিশীল, এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ স্থরে ভালো যোগাযোগ বা লিংকিং না থাকে তবে তার কলাম লেখা থেকে বিরত থাকা উচিত।

লেখক;
হাসানুজ্জামান তালুকদার শিমুল
স্নাতোকত্তর ছাত্র –
দুর্যোগ ও মানব সম্পদ নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা বিভাগ
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ প্রফেশনালশ্ (বিইউপি)