ক্যাটেগরিঃ চারপাশে, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

শামিম এসেছেন ধামরাই থেকে সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেন বলে। এর আগে নিজেদের আয়োজনে চারটি ফ্যাশন শোতে অংশ নেয়ার অভিজ্ঞতা তার আছে বটে, তবে তিনি জানালেন এবার ‘একটু নার্ভাস লাগছে’। তিতাশা এসেছেন ঢাকার শ্যামপুর থেকে। তিনিও অংশ নেবেন একই প্রতিযোগিতায়।

শামিম বা তিতাশার মতো মোট এগারোজন অংশ নেবেন এই সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায়। এরা এসেছেন ঢাকা বা ঢাকার বাইরে থেকে। আমার-আপনার গড়পরতা বিচারে তারা কখনো নিজেদের সুন্দর বলে দাবী করেননি। পথে হঠাৎ দেখা হয়ে গেলে আমাদের অনেকেই সামাজিক সংস্ড়্গারের কারণেই হয়তো চোখ সরিয়ে নেই তাদের দিক থেকে। আর আজ তারা প্রস্তুত হচ্ছেন নিজেরাই নিজেদের সৌন্দর্য প্রমাণে। এদের সবাই হিজড়া সম্প্রদায়ের। তাদের মহা প্রতিড়্গীত এই প্রতিযোগিতাটি আয়োজিত হবে ১৮ নভেম্বর শুক্রবার। ওই দিন নিজেদের সম্প্রদায়ের সবচেয়ে সুন্দর মানুষটি নির্বাচন করে নেবেন তারা।

আন্ডার দি রেইনবো নামে একটি উৎসব আয়োজন করছে ঢাকার জার্মান সাংস্ড়্গৃতিক কেন্দ্র। ১৭ নভেম্বর শুরম্ন হওয়া তিন দিনের এই উৎসব শেষ হবে ১৯ নভেম্বর। এর মধ্যে রয়েছে আলোকচিত্র প্রদর্শনী, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, মুক্ত আলোচনা এবং এই সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা। এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত আছে গ্যাটে ইনস্টিটিউট, বন্ধু সোশাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি, সৃষ্টি, দৃক, বয়েজ অফ বাংলাদেশ এবং স্বপ্রভা নামের সংগঠন আর প্রতিষ্ঠান।

আয়োজকরা জানিয়ে দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক সুন্দরী প্রতিযোগিতা যেমন, এখানেও অনেকটা সেই নিয়মেই অনুষ্ঠিত হবে প্রতিযোগিতা। কেবল দেখতে সুন্দর হলেই হবে না। জানা থাকতে হবে সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়। বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে প্রমাণ দিতে হবে নিজের মেধার এবং প্রজ্ঞার। কথা বলতে হবে সুন্দর করে এবং জানতে হবে নাচও।

অনন্যা নিজে সাদা-কালো নামে হিজড়াদের একটি সংগঠনের প্রধান। তার সংগঠনে সদস্য সংখ্যা ৭০। তিনি নিজেও এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন। সঙ্গে এসেছেন তার সংগঠনের আরো দুজন প্রতিযোগী। অনন্যা জানালেন, প্রথমে এই আয়োজনে মোট কুড়ি জন প্রতিযোগী ছিলো। বাছাই পর্বের পর এখন মোট আছেন ১১ জন। বাদ পড়া নয় জনের কেউ হয়তো টেকেননি উচ্চতার কারণে, কেউবা শুদ্ধ বাংলায় কথা বলায় দুর্বলতার কারণে।

‘নাচ নিয়ে আমাদের কারোরই তেমন কোনো সমস্যা নেই’- জানালেন একজন প্রতিযোগী। ‘কিন্তু আমরা যেভাবে নাচি সেটা দিয়ে তো এখানে হবে না। তাই মুদ্রাগুলো নতুন করে আবার ঠিক ঠাক করে নিচ্ছি।’ মহা উৎসাহে তিনি তাই চালাচ্ছেন নাচের প্র্যাকটিস।

উৎসাহের প্রকাশ কেবল নাচের বিষয়েই নয়, এই আয়োজনে অংশ নেবেন বলে এদের কেউ কেউ ঢাকায় রিহার্সেলের প্রতিটি দিনই এসেছেন প্রায় দুই ঘন্টার বাস জার্নি করে। ফিরেও যাবেন একই পথে, একই ঝক্কি পার হয়ে।

একজন প্রতিযোগীর নাম ‘ছোটো’। তিনি জানালেন তিনি এখনো জানেন না প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হলে পুরস্ড়্গার হিসেবে কী পাবেন। প্রশ্ন করি, তবে কিসের আশায় এতো পরিশ্রম করে অংশ নিচ্ছেন এই সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায়। জানালেন, এতে বিজয়ী হওয়া মানে একটি স্বীকৃতি পাওয়া। ওই স্বীকৃতিটুকর জন্যই সব কাজ বাদ দিয়ে দিনরাত চেষ্টা করে চলেছেন। মন খারাপ করেই বললেন, এনজিও আর নিজেদের সংগঠনের বাইরে আমাদের কোনো স্বীকৃতি এখনো নেই কোথাও। কোনো প্রতিযোগিতায় যেতে পারিনা আমরা। একবার যখন সুযোগ পাওয়া গেছে সেটি ছাড়তে চাই না।

বিভিন্ন প্রতিযোগিতাই নয় কেবল, আমরা স্বীকৃতির এমন সমস্যায় পরি প্রতিনিয়ত। আমরা নিজেদের শুধু পুরুষ বা নারী ভাবতে পারি না। স্রষ্টা বলেন আর প্রকৃতি বলেন, তার কারণেই আমরা এভাবে এসেছি পৃথিবীতে। এতে তো আমার কোনো হাত ছিলো না।

অনন্যা বলেন, ‘ভারতে এখন কিন্তু আইন হয়েছে- একজন ব্যক্তি চাইলে যে কোনো অফিশিয়াল ফরমে নিজের লৈঙ্গিক পরিচয়টি প্রকাশ না-ও করতে পারেন। সেখানে এটি করা হয়েছে যেন নির্দিষ্ট কোনো লৈঙ্গিক পরিচয়ে একজন হিজড়াকে বেঁধে ফেলা না হয়। বাংলাদেশে আমরা ততোখানি এগোতে পারিনি। এখানে আমরা বহু চেষ্টা করে অধিকার পেয়েছি বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে নামটি ওঠাবার। তবে সেখানে আমরা চাই বা না চাই, পরিচয় হিসেবে নারী বা পুরম্নষ যে কোনোটি আমাদের বেছে নিতে হয়। এইরকম আরো অনেক বিষয় আছে যেখানে আমরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছি প্রতিনিয়ত। কেবল যে হিজড়ারাই এই বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তা নয়, এর মধ্যে নানা ধরনের লৈঙ্গিক সংখ্যালঘুরাও আছেন।’

আয়োজকরা জানাচ্ছেন, হিজড়া সম্প্রদায় বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা তৈরি এই আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য। হিজড়াদের সম্পর্কে এই ‘সচেতনতা’ বিষয়টি একটু যেনো প্রশ্নবিদ্ধ। আমরা বিভিন্ন বিষয়ে যখন সচেতনতার কথা বলি তখন নিজেরাও সেটি মানতে চাই। কেবল ব্যতিক্রম যেনো হিজড়াদের বিষয়ে। তদের বেলায় মানুষ হিসেবে, দেশের নাগরিক হিসেবে প্রাপ্য সুবিধার কথা আমরা জোর গলায় বলি বটে, কিন্তু কেনো যেনো গলার জোরটি কমে যায় যখন নিজেদের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি চলে আসে সামনে।

নিজেকে সুন্দর করে উপস্থাপনের এই প্রতিযোগিতায় যখন অনুশীলন করছেন, একজন অনন্যা বা একজন তিতাশা তখন কি ভুলে যেতে পেরেছেন তাদের ওপর ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় চাপিয়ে দেয়া সামাজিক শর্তগুলো বা সীমাবদ্ধতাগুলো? ছোট ছোট বাধা ডিঙ্গানোই যদি বড় অর্জনে উৎসাহ যোগায় তাহলে এই সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার পর তারা নতুন করে কোন অর্জনের দিকে এগোবেন? এইরকম নানা ধরনের প্রশ্ন আসে বটে, কিন্তু ভাবনায় খুব বেশি এগোয় না। কারণ কিছু প্রশ্ন তীরের মতো ছুটে আসে আমাদের দিকেই। আমরা যারা নিজেদের ‘স্বাভাবিক’ বলে দাবী করি।

তাত্বিক আলোচনায় আমরা জোর গলায় বলি লিঙ্গ বৈষম্যের কারণে কাউকে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। কিন্তু যখনই নিজেদের প্রতিষ্ঠানে বা নেহাত নিজের কোনো প্রয়োজনে একজন মানুষকে নিয়োগের দরকার হয়, আমরাই কি এড়িয়ে যাই না এই বৈষম্যের ইসুøটিকে?

আজ প্রেমা, পায়েল, সুমনা, রনি বা শিমু ব্যস্ত আছেন নিজেদের একটি উৎসবে অংশ নেয়া নিয়ে। ছোট্ট একটি প্রতিযোগিতায় ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে চাইছেন তারা। তবে সম্্‌ভবত সেই দিন খুব বেশি দূরে নয় যখন অধিকারের বিভিন্ন প্রশ্ন নিয়ে তারা এগিয়ে আসবেন আমাদের দিকেই। তার আগে তারা স্রেফ নিজেদের গুছিয়ে নিচ্ছেন শুক্রবারের আয়োজনটির জন্য।

প্রতিযোগী প্রত্যেকেই জানালেন তাদের নানা রকম প্রতিবন্ধকতা আর সামাজিক সীমাবদ্ধতার কথা। আগ্রহ নিয়ে বললেন, শুক্রবার আসুন গ্যাটে ইনস্টিটিউটে। আমাদের অনুষ্ঠান দেখবেন। মুক্ত আলোচনা আছে, চাই কি আলাপও করা যাবে বিভিন্ন বিষয়ে। শুধু এই অনুষ্ঠান নয়, কথা বলা যাবে পরে যে কোনো সময়। বলেই যার যার মতো ছুট লাগালেন নাচের প্র্যাকটিসে। জগৎ সংসার ভূলে একেকজন প্রাণপন চেষ্টা করছেন নাচের মূদ্রাটি শুদ্ধভাবে তুলে নিতে। ঢাকার ব্যস্ততম এলাকায় একটি এনজিওর অফিসে তারা এগারো জনই যেনো ওই সময়ে হারিয়ে গেছেন বাস্তôবতাকে আড়ালে ফেলে একটি স্বপ্ন জয়ের পথে। বাজনার তালে কারো কারো ঠোঁট নড়ছে, মুদ্রার সঙ্গে মিলিয়ে নিচ্ছেন গানের কথাগুলো। আার সিডি পেস্নয়ারে বাজছে সেই গানটি যার সঙ্গে তারা হয়তো নাচবেন-

লাল শাড়ি পিন্ধি বালা
গলাত দিলো পুতির মালা
সোনার নূপুর দিলো সোনার পায়-

হেলিয়া দুলিয়া হাঁটে
সরিষার হলদা মাঠে
শাড়ির রং লাগলো সারা গায়।