ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

মানুষের একান্ত মৌলিক চাহিদা পূরণের নিমিত্তে চিকিৎসা শাস্ত্রের উৎপত্তি হয়েছে। এ জ্ঞান লিখিত আকারে সংরক্ষণের নেশা অতি প্রাচীন কাল থেকেই মানুষের রয়েছে। প্রাচীন মিশরে খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০ অব্দে ‘রামেসুম প‍্যাপাইরাস’ নামে চিকিৎসা শাস্ত্রের একটি টেস্ট বই রচিত হয়েছিল। একই সময়ে মিশরেই ‘কাহুন প‍্যাপাইরাস’ নামে প্রসূতি বিদ‍্যার আরেকটি পুস্তক রচিত হয়েছিল। ‘হিপোক্রেটিক কর্পাস’ নামে চিকিৎসা শাস্ত্রীয় সংকলনটি প্রাচীন গ্রীসে রচিত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৪০০-২০০ অব্দে। এ সংকলন হিপোক্রিটাস নিজে রচনা করেন নাই, তবে চিকিৎসা শাস্ত্রীয় অনেক নীতি ও জ্ঞান তার নামে লিখিত এ কিতাবে সংরক্ষিত হয়েছে।

বর্তমান শতকে পশ্চিমা জ্ঞান-বিজ্ঞানের আধিপত্যের কারণে প্রাচীন গ্রীকদের চেয়ে ১৫০০ বছর পূর্বে রচিত প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসা শাস্ত্রের অবদান কমই উচ্চারিত হয়। চাইনিজ ট্রেডিশনাল মেডিসিনের উৎপত্তির পিছনে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে চায়নাতে রচিত ‘হুয়াংদি নেইজিং’ নামে চিকিৎসা বিজ্ঞানের পুস্তকটির অনেক অবদান রয়েছে বলে মনে করা হয়।

আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে রচিত প্রথম চিকিৎসা শাস্ত্রীয় পুস্তক হল ‘ছাড়াকা সামহিতা’, যা খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকে সংস্কৃত ভাষায় রচিত হয়েছে। চিকিৎসা শাস্ত্রের এ বইটির বর্তমান বংশধর হল আজকের আয়ুর্বেদিক, ইউনানী ও হারবাল চিকিৎসা পদ্ধতি। তারও পূর্বে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে সংস্কৃত ভাষায় রচিত ‘শুশ্রুতা সমহিতা’ পুস্তকে চোখের ছানি অপারেশনের বিস্তারিত পদ্ধতি আলোচিত হয়েছে।

 

ছবি: ইবনে সিনা রচিত আল কানন অব মেডিসিন

 

পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী ইবনে সিনা ১০২৫ খ্রিস্টাব্দে ‘আল কানন ফিত তিব’ (The Canon of Medicine) নামে মেডিকেল বিশ্বকোষ রচনা সম্পন্ন করেন। মধ‍্যযুগে ইউরোপ ও ইসলামী বিশ্বের সকল চিকিৎসা শাস্ত্রীয় প্রতিষ্ঠানে এ মেডিকেল বিশ্বকোষের টেস্ট বই হিসেবে আধিপত‍্য ছিল নজিরবিহীন। এ সকল প্রতিষ্ঠানে ইবনে সিনা রচিত পাঁচ খণ্ডের এ পুস্তকখানা প্রায় অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত পড়ানো হত। এমনকি বর্তমান একবিংশ শতকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব প্রসারের পরও এ কিতাবখানা এতটাই প্রাসঙ্গিক যে, আজো ইউনানী চিকিৎসাশাস্ত্রে এ পুস্তকখানি পড়ানো হয়।

জন হপকিন্স হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বখ্যাত কানাডীয় চিকিৎসা বিজ্ঞানী উইলিয়াম অসলার বলেছেন, “এ পর্যন্ত লিখিত চিকিৎসা শাস্ত্রীয় সকল পুস্তকের মধ‍্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই হচ্ছে ইবনে সিনা রচিত কানন অফ মেডিসিন, এ বইটিকে চিকিৎসা শাস্ত্রের বাইবেল বলা চলে।”

চিকিৎসা শাস্ত্রীয় পুস্তক প্রণয়নে বাংলাদেশেরও কম-বেশি অবদান রয়েছে। স্বনামধন্য বাংলাদেশি চিকিৎসাবিদ প্রফেসর এবিএম আবদুল্লাহ কর্তৃক ইংরেজি ভাষায় রচিত ‘শর্ট কেসেস ইন ক্লিনিকাল মেডিসিন’ পুস্তকখানি বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, আরব বিশ্ব, বৃটেন ও ইউরোপের অনেক মেডিকেল প্রতিষ্ঠানে ব‍্যাপকভাবে পঠিত হয়। জাতীয় অধ্যাপক এম. আর. খান সহ অন্যান্যদের রচিত পুস্তকাবলীর গ্রহণযোগ্যতা দেশের বাইরে তুলনামূলকভাবে কম।

‘ডেভিডসন’স প্রিন্সিপেল অ্যান্ড প্রাকটিস অফ মেডিসিন’ বইটিকে বাংলায় অনুবাদ করে বাংলা ভাষায় একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিসিন বই হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে প্রায় সিকি শতক পূর্বে। তারও প্রায় এক শতক পূর্ব থেকেই বাংলা ভাষায় বিভিন্ন চিকিৎসাশাস্ত্রীয় বই প্রকাশিত হয়ে আসছে। তবে তার কোনটিই বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই বাংলা ভাষায় একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মেডিকেল বিশ্বকোষ প্রণয়নের জন‍্য ২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল এনসিডি সেণ্টার ডটকম (NCDcenter.com) নামে বাংলা ভাষায় প্রথম মেডিকেল বিশ্বকোষ যাত্রা শুরু করেছে, যা সম্পন্নরূপে অনলাইন ভিত্তিক। তরুণ ও দক্ষ বাংলাদেশি চিকিৎসকদের সক্রিয় অংশগ্রহণে এ মেডিকেল সাইট প্রতিদিনই সমৃদ্ধ হচ্ছে। ইংরেজি ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার বৈশ্বিক স্রোতের বিপরীতে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার ধারা সমুন্নত করার লক্ষ্যে এনসিডি সেন্টার সংগ্রাম করে যাচ্ছে।

এছাড়াও ইংরেজি ভাষায় অনেকগুলো অনলাইন মেডিকেল বিশ্বকোষ রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- Myoclinic, Web MD, Medicine.net, Mediplus ইত‍্যাদি। এ সাইটগুলোর মোটামুটি গ্রহণযোগ্যতা চিকিৎসক সমাজে তৈরি হয়েছে, কিন্তু মেডিকেল উইকিপিডিয়ার গ্রহণযোগ্যতা সে তুলনায় অনেক কম।