ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

শান্তির প্রত‍্যাশা মানুষের চিরায়ত। যাদের কর্মে অশান্তি বৃদ্ধি পায় তাদের যদি জিজ্ঞেস করা হয়, তুমি এটা কেন করেছ? উত্তরে তারা বলে, শান্তি আনয়নের স্বার্থেই আমরা এ কাজ করেছি! যদিও উক্ত কর্মের পিছনে তাদের ব‍্যক্তি, দলীয় বা দেশীয় স্বার্থ তাদের মনের গহীনে লুক্কায়িত আছে। এতে করে কখনো কখনো আক্রান্ত ব‍্যক্তি, গোষ্ঠী বা জাতির অনেক বড় ক্ষতিও হয়ে যায়।

যে কোন দেশ ধ্বংসের জন্য ঐ দেশের জাতীয় অনৈক্যই সর্বাধিক দায়ি। আমরা বিগত এক দশক ধরে ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া এবং ইয়েমেনে এমনটা দেখতে পাচ্ছি। এসব দেশে সরকার বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিসমূহের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অবারিত সুযোগ থাকলে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের সুযোগ অনেক সংকুচিত থাকত। এজন্য জাতীয় ঐক্য ও রাজনীতিতে আগ্রহী সকলের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা যেকোন কল‍্যাণ রাষ্ট্রের উন্নতির পূর্বশর্ত। সিরিয়ায় অশান্তি ও নাগরিক অধিকার ধ্বংসের কারণ হিসেবে এ দুটি প্রভাবকের অনুপুস্থিতি সবচেয়ে বেশি দায়ি।

২০১১ সালে আরব বসন্তের সময় সিরিয়ায় শুরু হওয়া অশান্তির বীজ আজো দাউ দাউ করে জ্বলছে। আট বছর ধরে চলা এ সমস্যা আর কত সময় ধরে চলবে এখনো কেউ তা আঁচ করতে পারছে না। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ সমস্যাটিকে আরো জটিল করে তুলছে। এ আরব দেশটিতে দুই পক্ষই তাদের নিজেদের দেশীয় স্বার্থের বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। পক্ষান্তরে বাহ‍্যিকভাবে বিশ্ববাসীকে দেখাতে চাচ্ছে যে, শান্তি আনয়নের স্বার্থেই তারা এমনটা করছেন।

আইএস উত্তর যুগে সিরিয়ায় পরাশক্তি সমূহের আধিপত্য বিস্তারের খেলা যত বিস্তৃত হবে, সাধারণ সিরিয়দের দুর্ভোগ তত বৃদ্ধি পাবে। সিরিয়ায় এখন প্রয়োজন ইস্পাতের ন‍্যায় কঠিন জাতীয় ঐক‍্য। সবার রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সমান সুযোগ ব‍্যতীত দেশটিতে পরম আরাধ্য জাতীয় ঐক্য অসম্ভব বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নাগরিক অধিকার, সুশাসন, বাক স্বাধীনতা ইত‍্যাদি অর্জনের দায়বদ্ধতা দেশটির সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্বসহ সিভিল সোসাইটির রয়েছে। শক্তিশালী সিভিল সোসাইটি গড়ে না উঠায় দেশটিতে জাতীয় অনৈক্য রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে।

পক্ষান্তরে তিউনিশিয়াতে আমরা দেখলাম যে, তাদের সিভিল সোসাইটি এন্নাহদা ও ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতার মধ‍্যস্থতা করেছে। যার ফলে দেশটি রাজনৈতিক হানাহানি থেকে রক্ষা পেয়েছে। তিউনিসিয়ার সিভিল সোসাইটির এ মহান কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তারা ২০১৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার অর্জন করে বিশ্বে এক বিরল রেকর্ড স্থাপন করেছে।

সিরিয়ার বর্তমান সংকট এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যে সরকার ও বিরোধী দল কারো উপর কারো কোন আস্থা নেই। পরাশক্তিসমূহ তাদের দেশে শান্তি স্থাপন করে দিবে না অথবা কোন ভিন্ন গ্রহের এলিয়েনরা এসে তাদের দেশে শান্তি স্থাপন করে দিবে না। তাদের দেশের শান্তি তাদেরকেই স্থাপন করতে হবে। সেজন‍্য সিরিয়াতে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন।

সিরিয়ার বর্তমান সংকটের প্রেক্ষাপটে একটি প্রবল আশঙ্কা এই যে, দেশটি নিকট ভবিষ্যতে ইরান ও ইসরাইল, এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। এমন হলে দামেস্ক সহ সমগ্র সিরিয়ার পরিণতি কি হবে তা সহজেই কল্পনা করা যায়। এমন পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য সবচেয়ে বেশি করণীয় রয়েছে অবশ্যই সিরিয়ার নেতাদের। এক্ষেত্রে বিদেশি লেজুড়বৃত্তি এড়িয়ে জাতীয় ঐক্যকেই মজবুত করতে হবে তাদেরকে।