ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

১৯৯৩ এ জনপ্রিয় বাংলা ব্যান্ড দল ফিডব্যাক এর একটা অ্যালবাম বের হয়েছিল ‘বঙ্গাব্দ ১৪০০’ শিরোনামে। এমনিতেই ফিডব্যাক জনপ্রিয়, তার উপর বঙ্গাব্দ ১৪০০ এর গানের নতুনত্ব প্রচন্ড সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছিল, এবং বলা হয়ে থাকে ‘বঙ্গাব্দ ১৪০০’ বাংলা ব্যান্ড এর জগতে সর্বকালের অন্যতম সেরা অ্যালবাম।

যাই হোক, বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের পোস্টমর্টেম বা ফিডব্যাক এর গুণকীর্তন এই লেখার প্রতিপাদ্য বিষয় নয়। মূল ব্যাপার হচ্ছে উল্লেখিত অ্যালবাম এ একটা গান, যার টাইটেল ছিল ‘উচ্চ পদস্থ তদন্ত কমিটি’। গানে গানে ফিডব্যাক বুঝাতে চেয়েছিল কিভাবে কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার তৎপরতা দেখায় এবং সব ঘটনাই কোন এক উচ্চ পদস্থ তদন্ত কমিটি পর্যন্ত এসেই থমকে যায়।

বঙ্গাব্দ ১৪০০ অনেক আগেই গত হয়ে গিয়েছে। ১৯৯৩ থেকে ২০১১ এর মধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক কিছুই এসেছে গিয়েছে। বন্যা, খরা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মত ব্যাপারগুলো তো নিত্যনৈমিত্তিক। এসবের উপরে কারো কোন হাত যে নেই সেটা সবাই স্বীকার করে। কিন্তু এত বছরেও আমরা কি অপঘাতে মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে পেরেছি? প্রতিদিনের সংবাদপত্র খুললেই ‘পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু’, ‘সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু’, ‘ধর্ষণের/গণধর্ষণের পর হত্যা’, ‘গন পিটুনিতে নিহত’, ‘র‍্যাব এর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত’ ইত্যাদি সংবাদ অহরহ চোখে পড়ে। এসব মৃত্যুর মধ্যে শিশু থেকে অশীতিপর বৃদ্ধ পর্যন্ত কেউই বাদ পরছে না। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, অপরাধী ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে, অথবা আইনের ফাক গলিয়ে বাইরে এসে অবলীলায় আরও অপরাধ করে যাচ্ছে। কোন ঘটনা যদি খুব বেশি নিউজ কাভারেজ পেয়ে যায় তাহলে সরকার এর তরফ থেকে খুব বেশি হলে নামকাওয়াস্তে একটা তথাকথিত উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি হচ্ছে, দুই চারদিন খুব মাতামাতি হচ্ছে, এবং সব শেষে সবকিছু সবাই ভুলে যাচ্ছে অথবা নতুন কোন ঘটনা আমাদের চিন্তার স্রোতকে অন্যদিকে নিয়ে যাচ্ছে।

সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের দেশে নতুন কোন ব্যাপার না। পরিবারের কেউ বাইরে গেলে সে জীবিত ফিরে আসবে কিনা সেটা আল্লাহ্‌ ছাড়া কেউ বলতে পারবে না। মিশুক মুনির অথবা তারেক মাসুদরা তো আর প্রটোকল নিয়ে, গাড়িতে পতাকা উড়িয়ে, রাস্তার সব যানবাহন থামিয়ে দিয়ে চলাফেরা করে না। সুতরাং, তাদের জীবনের মূল্য তো খুব সাধারন পর্যায়ের। এরকম দুএকটা মিশুক মুনির অথবা তারেক মাসুদ অপঘাতে চলে গেলে কী আর এমন ক্ষতি হবে। আমাদের বড় বড় রাজনৈতিক নেতা/নেত্রী(!?) আছেন না। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে কতজনের মৃত্যু হয় এবং বছরে কী পরিমান ক্ষয়ক্ষতি হয় এই সড়ক দুর্ঘটনার কারণে, তাদের এত সময় কই যে নজর দেবে।

পুলিশের উপস্থিতিতে ছয় ছাত্রকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হল, কলেজছাত্র লিমনকে পঙ্গু করে দিল র‍্যাব, তুরাগে বাস পড়ে মারা গেল অর্ধশতাধিক মানুষ, আমাদের শেয়ার বাজার থেকে লুট হয়ে গেল চল্লিশ হাজার কোটি টাকার উপরে, চট্টগ্রামে ফুটবল খেলে ফিরে আসার সময় এক দল কচি প্রাণ চলে গেল সড়ক দুর্ঘটনায়, এমন অজস্র ঘটনার মধ্যে সর্বশেষ সংযোজন মিশুক মুনির ও তারেক মাসুদের দুর্ঘটনা। এখানেও সেই একই কায়দায় গঠিত হয়েছে একটা উচ্চ পদস্থ তদন্ত কমিটি। এবং এটাও খুব পরিষ্কার যে তদন্ত কমিটির তদন্ত নিয়ে অলৌকিকভাবে দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া স্বয়ং ক্যাথরিন মাসুদই প্রশ্নের তীর ছুঁড়ে দিয়েছেন। এভাবেই তদন্ত কমিটির তদন্ত শেষ হতে হতে আরেকটা ঘটনা ঘটবে। আমরা সবাই মিলে কুঁজো হয়ে ঐ ঘটনার বিশ্লেষণে নেমে যাব। আবার একটা তদন্ত কমিটি হবে। ভুলে যাব তারেক কিংবা মুনিরের কথা। এই হল স্বাধীন বাংলাদেশ।

শেষ করব একটা গল্প দিয়ে। এক উকিলের সহকারীর কাছে থেকে শোনা। এক গৃহস্থ চাষ দেবার জন্য রাখালকে সকাল সকাল ক্ষেতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ক্ষেতে হাল দিতে গিয়ে রাখাল লাঙ্গল এর ফলা ভেঙ্গে ফেলেছে। খবর যথাসময়ে গৃহস্থের কানে চলে এসেছে। গৃহস্থ রাখালকে ডেকে এনে জিজ্ঞেস করলেন লাঙ্গল কোথায় ভেঙ্গেছে। রাখাল উত্তর দিল ‘মোথায়(গাছের গুড়ি বা শিকড়) বেঁধে’। গৃহস্থ যতবারই জিজ্ঞেস করেন লাঙ্গল কোথায় ভেঙ্গেছে, ততবারই রাখাল উত্তর দেয় ‘মোথায় বেঁধে’। লাঙ্গলের কোথায় ভেঙ্গেছে তা আর গৃহস্থের জানা হয়েছিল কী না আমরা জনি না। কিন্তু আমাদের দেশের সরকার নামক রাখাল যে লাঙ্গল ছেড়ে মোথা নিয়েই বেশি ব্যাস্ত তা তাদের কর্মকাণ্ডে বেশ বোঝা যাচ্ছে।

১৬-০৮-২০১১