ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

আমার মনে হয়, মাননীয় অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশের (স্বাধীন!) সংবিধানের ১৫ তম অনুচ্ছেদটি স্মরণে নাই। তার জ্ঞাতার্থে বলতে চাই, অন্ন, বস্র, আস্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাকে মৌলিক অধিকার হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে এই অধিকার গুলো নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র যদি এগুলোকে সুযোগ হিসাবে দেখে এটা রাষ্ট্রের দৈন্যতা, কারণ শিক্ষা প্রত্যেকটা নাগরিকের অধিকার, কখনোই সুযোগ নয়। শিক্ষাখাতে রাষ্ট্র যা খরচ করবে, তা বিনিয়োগ হিসাবে দেখবে, আর অনুন্নত কিংবা উন্নয়নশীল দেশের জন্য শিক্ষা তো উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার। আর, তদ্রূপ আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষা খাত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ গুলোতে ৭.৫% ভ্যাট শুধুই অযৌক্তিক না বরং সংবিধানের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ।
এটা গেলো, রাষ্ট্রের সংবিধান ও প্রয়োজনের আলোকে শিক্ষার অবস্থান। যদি, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আইনের দিকে তাকাই, সেই দৃষ্টিকোণ থেকেও ভ্যাট বিধিসম্মত নয়, যদি নিতেই হয় তা হলে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট পরিবর্তন দরকার (যদি ভ্যাট দিতে হয়ও!)।
বিশিষ্ট কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হোসেনের একটি কলামে দেখলাম উনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলামের শিক্ষায় ভ্যাট নিয়ে উনার বক্তব্য তুলে ধরেছেন। উনার পুরো বক্তব্যে ভ্যাট আরোপ নিয়ে উদ্বেগ ফুটে উঠেছে। বক্তব্যে উনি বলছেন, এটি খুবই অযৌক্তিক ও অমানবিক সিদ্ধান্ত। শিক্ষা হচ্ছে সামাজিক সেবা, এটা কোন পণ্য নয়। তিনি আরও মনে করেন, এখানে যারা পড়েন সবাই উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান, এটা অর্থমন্ত্রির ভুল ধারণা (১২ই সেপ্টেম্বর, প্রথম আলো)।
সৌভাগ্যবশতঃ আমার কর্মরত বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে কর্তব্যরত রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের আরেক সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ডঃ এটিএম জহুরুল হক। যিনি শুধু একজন শিক্ষক বা অর্থনীতিবিদই নন, করেছেন রাষ্ট্র অর্পিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। গতকাল আলাপচারিতার এক ফাঁকে এ বিষয়ে উনার দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। উনার বক্তব্যেও হতাশা ও উদ্বেগ লক্ষ্য করলাম। উনি ভ্যাট নিয়ে, এনবিআর ও অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, ভ্যাট একটি পরোক্ষ কর, যার চূড়ান্ত ভার ব্যয় বহন করে ভোক্তা। আর, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে তা শিক্ষার্থীরা, যারা এর চূড়ান্ত ভার বহন করবে (যদি ধরি, ভ্যাট এক্ষেত্রে প্রযোজ্য)। আর নজরুল ইসলামের মত উনিও এই ভ্যাট আরোপের বিপক্ষে। উনি অর্থ জোগানে বিকল্প উৎসের পরামর্শও দিলেন।
সরকার ভালো করেই জানে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র অর্থের উৎস শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি। যার বর্ধিত অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। এখন এই ভ্যাট আরোপিত হলে, শিক্ষার্থীদের উপর বাড়তি চাপ আসবে, যা মোটেও যৎসামান্য নয়। তাছাড়া যদি ধরেই নেই বিশ্ববিদ্যালয় ভ্যাট পরিশোধ করে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়নকে ব্যপকভাবে তা বাধাগ্রস্থ করবে। অথচ সরকার বরাবরই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোকে শিক্ষার মান উন্নয়নে তাগাদা দিয়ে আসছে। তাই এটাও সরকারের স্ববিরোধী অবস্থান। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মালিক সমিতির চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেন এ প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর বন্ধ হওয়ারও আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
আর শিক্ষাখাতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। আবার, আমার মতে এগুলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলো রাষ্ট্রের ব্যর্থতার গ্লানিও মোচন করছে। কারণ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ আখনে পড়াশুনা করছে বিদ্যমান সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর আসন সংকট আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (অধিভুক্ত কলেজে) সীমাহীন সেশনজট থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য। আর এই দুটি সমস্যাই রাষ্ট্রের ব্যর্থতা নির্দেশক। কারণ, রাষ্ট্র সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত আসন নিশ্চিত কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে আশানুরুপভাবে গতিশীল ও কার্যকর করতে পারে নাই। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে সরকার উল্টো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও কার্যকর করার জন্য উন্নয়ন অংশীদার হওয়া প্রয়োজন।
এটা অনস্বীকার্য যে, দেশে বিদ্যমান ৮৩ টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশই প্রত্যাশিত মান অর্জন করে নাই এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মুনাফার দিকে অলিখিত ভাবে ঝুঁকছে। তাই, বলে তাদের চলার পথে ঢালাওভাবে এ খাতকে অঙ্গুলি প্রদর্শন করা সমীচীন নয়। কারণ, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোও নানাবিদ সমস্যায় জর্জরিত। কিন্তু সরকার কিন্তু বছরের পর বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অর্থ জুগিয়ে আসছে, বন্ধ করে দেয় নি। অর্থ জোগানে বিকল্প খাত অথবা অনুন্নয়ন খাতে সীমিত ব্যয় করেও শিক্ষা খাত থেকে এ শকুনে চোখ সরানো যেতে পারে।
আশার কথা হল, বিশ্বব্যাংক উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আর্থিকভাবে সাহায্য করছে। যেখানে ভিন্ন দেশের একটি ব্যাংক বেসরকারি শিক্ষা খাতের উন্নয়নের জন্য এগিয়ে এসেছে, সেখানে আমাদের দেশের সরকার শিক্ষার উপর ভ্যাট আরোপ উপহাস বৈকি। সরকারের উচিৎ আশু এ আত্মঘাতী সিধান্ত থেকে সরে আসা এবং শিক্ষা তথা উন্নয়নয়ের পথকে সুগম করা। মনে রাখতে হবে, এসব প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা এ দেশেরই, কেউ পশ্চিম পাকিস্তানি নয়। তাদের প্রতি বৈষম্য করলে তা আমাদের স্বাধীনতার লক্ষ্য ও চেতনাকে কটাক্ষই করা হবে।

লেখক ও শিক্ষক
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
ই-মেইলঃ hemelmbaru@gmail.com

slide