ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

যখন লিখছি তখন মধ্যরাত। তবু আবেগের কাছে, বিবেকের কাছে, গর্বের আনন্দের কাছে ও অপ্রাপ্তির দুঃখের কাছে ক্লান্তি ও নিদ্রার আত্মসমর্পণ ! লিখবই বলে মনঃস্থির করেছি।

আগে প্রাপ্তি ও গর্বের কথা বলি।

আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম এজন্য আমি গর্বিত; এজন্য নয় যে আমি একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম, গর্বিত এই জন্য যে, শামসুজ্জোহা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। যার শিক্ষকতা পৃথিবীর প্রত্যেকটা শিক্ষকের ‘শিক্ষা’।
আমি গর্বিত এই জন্য আমি এক অনন্য শিক্ষকের সমাধিভুমে বিদ্যার্জন করেছি। আমি গর্বিত এই জন্য যে, আমি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, যেখানে শিক্ষক তার ছাত্রের জীবন রক্ষার জন্য বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত করেছিলো মতিহারের সবুজ চত্বর!!

সৈয়দ মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা (মে ১, ১৯৩৪-ফেব্রুয়ারি ১৮, ১৯৬৯) ছিলেন একজন বাঙালি শিক্ষাবিদ এবং অধ্যাপক। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন।১৯৬৫ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত জোহা শাহ মখদুম হলের আবাসিক শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং এরপর নিযুক্ত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর হিসেবে। আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের দায়িত্ব পালনকালে ফেব্রুয়ারি ১৮, ১৯৬৯ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাকে হত্যা করে।

মৃত্যুর আগের দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এক অনুষ্ঠানে উনি বলেছিলেন, “কোনো ছাত্রের গায়ে গুলি লাগার আগে সে গুলি আমার গায়ে লাগবে।” তখন কেউ কল্পনাও করেনি পরদিন জীবন দিয়ে কথা রাখবেন ড. জোহা।

১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ ড. জোহার দায়িত্বে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়ানুষ্ঠান চলাকালীন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হকের হত্যার খবরটি পৌঁছলে সঙ্গে সঙ্গে জোহার নির্দেশে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যার বিচার চেয়ে , আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবের মুক্তি চেয়ে ছাত্ররা ঐদিনই সমগ্র ক্যাম্পাস মিছিলে প্রকম্পিত করে।

১৮ ফেব্রুয়ারি পূর্ব রাত্রির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সকাল সাড়ে ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটে প্রায় হাজার দুয়েক ছাত্র-ছাত্রী বিভিন্ন হল থেকে এসে সমবেত হয় এবং চারজন করে লাইনে দাঁড়িয়ে শহরের দিকে অগ্রসর হবার চেষ্টা করছিল। পুলিশ ও ইপিআর মিছিলে বাধা দেয়, সেনাবাহিনীর জোয়ানরাও মিছিল ঠেকাতে ছাত্রদের দিকে রাইফেল তাক করে প্রস্তুত। ছাত্ররা যে কোন মূল্যে মিছিল করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং তারা কর্মরত সেনা অফিসারের সাথে তুমুল বিতর্কে লিপ্ত হন। মিছিল অগ্রসর হলে গুলি করার হুমকি দেয়া হলে ছাত্ররা আরো উত্তেজিত হয়ে উঠে। ড. জোহা তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে একবার ছাত্রদেরকে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাচ্ছেন আবার কখনও কর্মরত সেনা কর্মকর্তা ও ম্যাজিষ্ট্রেটকে বোঝাচ্ছিলেন। ড. জোহা সামরিক কর্মকর্তাকে বার বার বলছিলেন, ‘প্লিজ ডোন্ট ফায়ার, আমার ছাত্ররা এখনই চলে যাবে ক্যাম্পাসের দিকে।’ কিস্তু অবাঙালি সামরিক অফিসারটিকে প্রথম থেকেই উত্তেজিত মনে হচ্ছিল এবং তিনি বার বার জোয়ানদের গুলি করার জন্য প্রস্তুত হতে বলছিলেন। ড. জোহা তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে অনেক কষ্টে একসময় ছাত্রদেরকে বুঝিয়ে গেটের ভেতরে পাঠাতে সক্ষম হলেন এবং ছাত্রদের অধিকাংশই তখন গেটের ভিতর হকি গ্রাউন্ডে চলে এসেছে । পরিস্থিতি যখন শান্ত হওয়ার পথে তখনই হঠাত্ করে গুড়ুম গুড়ুম করে গুলির শব্দ। ড. জোহাকে প্রথমে কাছ থেকে গুলি ও পরে বেয়নেট চার্জ করে ক্ষত-বিক্ষত করা হয়। ড. জোহাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়,বেলা ১টা ৪০ মিনিটে ড. জোহা ইন্তেকাল করেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান।১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক শহীদ শামসুজ্জোহার মৃত্যু দেশেবাসীকে স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে ধাবিত করে।

প্রতিশ্রুতিমত এবার অপ্রাপ্তির কথা ও অপ্রাপ্তির দুঃখের কোথায় আসি!

ড. জোহা শহীদ হওয়ার পরদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে জরুরি সভা ডাকেন উপাচার্য অধ্যাপক শামসুল হক। সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন ছাত্র হলটি ড. জোহার নামে নামকরণ এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ছুটি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ড. জোহার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে সরকার। ২০০৮ সালে ড. জোহাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার দেয় সরকার। বাংলাদেশে অনেক শহীদের নামে অনেক কিছু হলেও যিনি বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী তার নামে তেমন কিছু এখনো হয়নি। আশা করি, সরকার এই গুণী ব্যক্তিকে সাধারণ মানুষের মনে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিবে।

দিনটি রাবিতে ‘শিক্ষক দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। ড. জোহা শহীদ দিবসকে জাতীয়ভাবে শিক্ষক দিবস হিসেবে পালনের দাবি দীর্ঘদিনের।

আমরা আশা করি জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারও ১৮ ফেব্রুয়ারিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘জাতীয় শিক্ষক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে জোহার স্মৃতি ও আদর্শকে জাতির কাছে চির অম্লান করে রাখবে।