ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

ছেলেবেলা থেকে শুনতাম লেখা পড়া করে মানুষ হতে হবে, বাবা মা তাই চেয়েছিলেন! ফলতঃ লেখাপড়া করতে হয়েছে, তা সে যেমনই হোক! চারিত্রিক শুদ্ধতাকে খুব বেশী মূল্য দেয়া হত আমাদের ছেলেবেলাতে, আমরা চরিত্রবানদের অনুকরণ করার চেষ্টা করতাম! সে ছিল এক অন্য দেশ যেন, তখন পাকিস্তানী আমল, ঢাকা শহর এত বড় ছিল না, রেল স্টেশন ছিল নবাবপুরের ফুলবাড়িয়াতে, ঢাকা শহর ছিল সবুজে সবুজে একাকার! মানুষ ছিল খুবই কম, কমলাপুর ছিল গাছ গাছালিতে ভরা, তখন কেবল শুরু হয়েছে চালতা বাগান কেটে নতুন রেল স্টেশন তৈরীর কাজ! মতিঝিল কলোনিতে পীরজঙ্গী মাজার রোডের এপারে ওপারে ছিল গোটা বিশেক বিল্ডিং, সরকারী কোয়ার্টার! আর চারধারে ইটের সাজানো স্তুপ, দিনে দুপুরে কমলাপুর থেকে কলোনিতে শেয়াল ঢুকে পড়তো!দিনে কি রাতে, রাস্তা প্রায়ই ফাঁকাই থাকতো!

বৃস্টি হলে আমাদের আনন্দ ধরতো না, মাঠের জমা পানিতে নানা রকমের ছোটো মাছেরা চলে আসতো! দূর কোন ফকিরের আখড়াতে গভীর রাতে হতো মুর্শিদি গান, শুনতে শুনতে ঘুনিয়ে পড়তাম!এখনও রাতে ঘুমুতে গেলে যেন সেই গানের রেশ কানে বাজে!

সন্ধ্যে থেকে শুরু হত নির্জনতা, মিউনিসিপ্যালিটির ইলেক্ট্রিক থামে জ্বলতো মিট মিট করে সাধারন বাল্ব, বারান্দায় বসে রাতের নক্ষত্র জ্বলা ঝালরে দেখতাম রূপকথার জগত, মনে হত সেই তারাটির বুকে আছে সেই অচিন রাজ্য, যেখানে ঘুমোয় সোনার কাঠি রুপোর কাঠির সেই রাজকন্যে! কেউ যদিচ রাস্তা দিয়ে হেটে যেত মনে হত সেই “নির্জন পথে জোছনা আলোতে, সন্ন্যাসী একা যাত্রী!” রাতের রুপ ছিল প্রশান্ত, কিছুটা বা নিরানন্দ, কারন খুব কমই আত্মীয় স্বজনেরা ঢাকায় বেড়াতে আসতেন, রাতে গল্প বলার জন্যেও আমাদের কেউ ছিল না, সারা দিনের পরিশ্রান্ত মা আমদের রাত আটটার বা নয়টার ভেতর খাইয়ে দশটার ভেতর ঘুমিয়ে দিতেন!

তখন টেলিভিশন ছিল না, রেডোতে খবর আর অনুরোধের আসর শোনা হতো! কাক ডাকা ভোরে বড় বোনের হাত ধরে যেতাম অনেক দূরের স্টাফ ওয়েলফেয়ার প্রাইমারী স্কুলে, এই বৈশাখে তার পেছনে আর রাস্তার ওপারে মোট্রর মেকানিকের দোকানের চারপাশে ছিল বড় বড় আমগাছ, আমরা আম পেড়ে খেতাম! হায়, জীবন, তুমি বহমান স্রোতের মতো, আর কোন দিন সেই বাসাবোর সুইচোর পাখিটিকে কি দেখবো?