ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

আমরা তিন ভাইই নটরডেম কলেজের ছাত্র ছিলাম, এ বিষয়ে পরে লিখছি।
তখন নতুন বেরুলো ক্যারেলিন কাপড়, এটা একরকম কৃত্তিম সুতোয় বোনা, এই কাপড় হয়ে উঠলো ফ্যাশন! যদিও দুই ঈদের একটি, সচরাচর রোজার ঈদ যাকে বলতাম আমরা সেই ঈদ আর ছিড়ে যাওয়া ছাড়া সরকারী কোয়ার্টারে খুব কম বাড়িতেই ছেলে মেয়েদের নতুন জামা কাপড় দেয়া হত, আমরা তার বাত্যয় ছিলাম না। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ততকালীন পুর্ব পাকিস্তানে রেডিমেড শার্ট তেমন পাওয়া যেত না, চকবাজারের কাছে উর্দু রোডে কিছু ফ্যাক্টরী ছিল কিন্তু সে সব এক্সপোর্ট এর জন্যে নয় ও সে সবের খুবই সীমিত প্রডাকশন ছিল!এ গুলোর ভেতর একটি ছিল রিয়াজ গার্মেন্টস!

তবে ততকালীন জিন্নাহ এভিন্যু ও এখনকার বঙ্গবন্ধু এভিন্যুতে অতি সম্ভ্রান্ত রেডিমেড শার্টের দোকান ছিল “রাজ্জাকস”। আমার জানামতে একমাত্র ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ছিল বিশালকায় “গ্যানিস” যার অবস্থান ছিল ঢাকা সেন্ট্রাল জিপিওর উলটো দিকে!ক্যারোলিনের পর এলো টেরেলিন, তারপর প্লেয় বয় শার্টের কাপড়! তখন সোনার ভরি ১৩৩ টাকা, আমার মনে আছে, সবচে বড় বিপনী কেন্দ্র ছিলো নিউমার্কেট, চাপ দাড়িওয়ালা মুরব্বী চালকের স্কুটারে সে খানে যেতে মতিঝিল কলোনী থেকে মিটারে ভাড়া উঠতো ১ টাকা ১০ বা ২০ পয়সা! চালকেরা বেশীর ভাগই ছিলেন স্কুটারের মালিক, তখন ইটালী থেকে “পিয়াজিও” ব্রান্ডের স্কুটার আমদানী হতো। এই চালকরা ছিলেন অতি মাত্রায় দ্বায়িত্বশীল, যাত্রীদের জন্যে প্রয়োজনে তারা কখনোবা গুন্ডাদের সাথে লড়াইও করেছেন বলে শুনতাম, এদের নিয়েই সেটা বোধ হয় ১৯৬৯ সালে তৈরী হয়েছিল বাংলা ছবি “নীল আকাশের নীচে”!সেখানে নায়ক রাজ্জাক স্কুটার ড্রাইভার ছিলেন।

ঈঁদের আগে আগে বাবা আমাদের নিয়ে ফকিরাপুলের (পুরো বাজারটিই কাঁচা ছিল,রাস্তার সাথে “আহসান মঞ্জিল” নামে একটি বিশালাকায় বাড়ীও দেখেছি!) দর্জির দোকানে যেতেন, মাপ জোক দিয়ে জামা কাপড় তৈরী করতে! আমি অনেক আব্দারের পর একটি সবুজ রঙের ক্যারোলিন কাপড়ের শার্ট তৈরী করতে পেরেছিলাম আর তা গায়ে দিয়ে বেশ আত্মশ্লাঘা বোধ করতাম! আমি আমার ছেলেবেলায় কোন বাড়িতে সোফা সেট হয়তো কদাচিত দেখেছি, প্রায় সবাই ই কাঠের চেয়ার টেবিলকেই যথেস্ট মনে করতেন। প্রথম ফ্রিজ দেখেছি ১৯৬৬ সালে, আমদের তিন তলার এক নব বিবাহিত বড় আপার বর জাপানে ট্রেনিং এ গিয়েছিলেন, তিনি নিয়ে এসেছিলেন।
রাস্তায় যত গাড়ী চলতো, তার খুবই কম অংশ ছিল বাঙ্গালীদের! বাঙ্গালীদের ব্যাক্তিগত গাড়ী খুবই কম দেখেছি, দু এক জন কলোনীতে যারা গাড়িতে আসা যাওয়া করতেন, তাদের গাড়ী ছিল অফিসের গাড়ী। এর মধ্যে ব্যাতিক্রম ছিলেন সরকারী ডাক্তার সাহেবরা, তাঁদের অনেকেরই হিলম্যান বা মরিস মাইনর গাড়ী ছিল, তবে একবার বাবার অনুরোধে ডাঃ বি, চৌধুরী সাহেব মাকে চিকিতসা করতে এসেছিলেন তার মার্সিডিস গাড়ী নিয়ে, তিনি তখন মগবাজারে থাকতেন। স্থানীয় খান্দানী লোকজনেরা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নির্বাচন করতেন, বিশেষ করে কমলাপুরের আফিলদ্দী সর্দার পরিবার আর বিখ্যাত সম্পন্ন ঠিকাদার আহমেদউল্লাহ সাহেবদের দেখেছি আমেরিকান উইলী জীপ ব্যাবহার করতে!সে সময় ঢাকাতে ডাঃ নন্দী নামে একজন অতি বিখ্যাত ডাক্তার ছিলেন, তিনি খ্যাতিমান ভারতীয় বাঙ্গালী নায়িকা ও গায়িকা বাসবী নন্দীর বাবা, তাকে পাকিস্তানিরাও খুব কদর করতো, তিনি তার ধন্বন্তরী ওষুধ লিখে দিতেন, গুলিস্তানের ভাম কোম্পানীতে গেলে সেই ওষুধ বানিয়ে দিত! আমার নাকি “ডাবল নিউমোনিয়া” হয়েছিল, তার চিকিৎসাতে ভাল হয়েছিলাম বলে বাবা মায়ের কাছে শুনেছি। পরবর্তীতে ডাঃ নন্দী শুনেছি ভারতের শিলিগুড়ি শহরে চলে যান ও কিছুদিন আগে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। বাবার কাছে শুনেছি যে এখনকার জাতীয় অধ্যাপক ডাঃ নুরুল ইসলাম ও অন্যান্য ডাক্তাররা আমাদের বাড়ী থেকেও ডাঃ নন্দীর করা প্রেসক্রিপ্‌শন সমূহ সংগ্রহ করতেন!

আমাদের ধরা বাঁধা নিয়ম ছিল সাড়ে চারটের পর স্কুল থেকে ফিরে খেয়ে মাঠে খেলতে যাওয়া আর মাগরিবের আজানের সাথে ঘরে ওঠা, ব্যত্যয় হলে গুরুজনদের কাছে শাস্তি পেতে হত। আরেকটা দারুন নিয়ম ছিল, যে কোন গার্জিয়ান যে কোন ছেলেকে এমন কি রাস্তাতেও শাসন করতে পারতেন, বাড়িতে এসে তা নিয়ে বললে আরেক চোট যেত আমাদের ওপর দিয়ে! আজ মনে হয়, সেই কারনেই বুঝি আমাদের সময়ে ছেলেমেয়রা খুব কমই বেয়াদব হয়েছে বলে শোনা যেত! আমার একেবারে ছেলেবেলাতে আমাদের কলোনিতে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান, বিহারী ও পাঞ্জাবিরাও থাকতো, তাদের একটা অংশ কুকুর পালতেন, এসব কুকুর কে আমরা খুব ভয় পেতাম! অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা বেশীর ভাগই হয় পুলিশ, বা অফিস সেক্রেটারী বা রেল বা অন্যান্য যান্ত্রিক বিভাগের কর্মকর্তা বা কর্মচারী ছিলেন, তাদের মহিলা ও পুরুষেরা স্পোর্টসে পারঙ্গম ছিলেন, ডলি ক্রুজ ছিলেন আন্তঃ পুর্ব পাকিস্তানের সেরা মহিলা সাইক্লিস্ট। এরা মাঝে মধ্যে মদ্য পান করে থাকতেন, অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মহিলারাও কখনও মদ্যপান করে রাস্তাতে পড়ে থেকেছেন, পরে পূলিশ এসে স্বযত্নে বাড়িতে পৌছে দিয়ে গেছে, কিন্তু তা নিয়ে কোন খারাপ ইন্সিডেন্স ঘটেছে বলে কখনও শুনি নি, নিরাপত্ত্বা ব্যাবস্থা আর মানুষের মন এতই ভালো ছিল, আর লোকসঙ্খ্যাও ছিল খুব কম।

মনে পড়ে বলাকা হল উদ্বোধনের কথা, “দি লঙ্গেস্ট ডে” নামের বিখ্যাত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের একটি ছবি দিয়ে এই হলের শুরু হয়, সম্ভবতঃ এই প্রথম স্টেরিও সাউন্ড ব্যাবহার হয় বাংলাদেশে বলাকা হলে!আমি শতবার আবদার করলেও কেউ আমাকে নেয় নি সেখানে!

মনে পড়ে আজ, আমাদের সময়ে পাড়ায় পাড়ায় (কলোনীর কয়েকটি বিল্ডিং আর একটি মাঠ নিয়ে ধরুন হয়ে যেত একটি পাড়া) ক্রিকেট ও ব্যাডমিন্টন খেলা শীতকালে নিয়মিত ছিল, এখনকার মতো তা টিভি তে খেলা দেখে নয়, নিজেদের উতসাহ থেকে! উর্দুভাষী বন্ধুরাই বিশেষ করে ক্রিকেট খেলার নের্তৃত্ব দিত, আমরা প্যাড, গ্লাভস ইত্যাদি নিয়ে বিভিন্ন পাড়ায় পাড়ায় ও স্কুলে ম্যাচ খেলে বেড়াতাম! কলোনিবাসীরা খুশী মনেই আমাদের চাঁদা দিতেন খেলার উপকরন কিনতে, আমরা স্টেডিয়ামের হিমালয় ষ্পোর্টস থেকে এই সব খেলার উপকরন কিনতাম, অনেক সময় পথচারীরাও আমাদের চাঁদা দিতেন! শুনলে অনেকে অবাক হবেন বিখ্যাত ক্রিকেট খেলোয়াড় ও পরে ভারতীয় ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন সেলিম দুররানির বাবা আজিজ মাস্টার পুর্ব পাকিস্তানে এবং মতিঝিল কলোনিতে থাকতেন! তিনি ছিলেন বিখ্যাত ক্রিকেট কোচ, আমাদের দল বেধে মাঠে নিয়ে যেতেন ও বিভিন্ন ক্লাব থেকে বাতিল কাঠের বল ও ব্যাট এনে আমাদের দিতেন! পাকিস্তান জাতীয় টিমের খেয়াড় নিয়াজ মোহাম্মদ, বেবি ইত্যাদি আমাদের কলোনিতে থাকতেন, কখনো সখনো আমরা মতিঝিলের বড় ঈদগাহ ময়দানে একসাথে খেলেছি!

পাড়ায় পাড়ায় ছিল ফুটবল ক্লাব, আমাদের টার নাম স্টার বয়েজ ক্লাব ও লাল জার্সি, সামনের কয়েক বিল্ডিং মিলে ন্যাশনাল বয়েজ ক্লাব ইত্যাদি। আমরা স্কুল থেকে এসে ও ছুটির দিনে ফুটবল খেলতাম, বিশেষ করে গরম ও বর্ষা বাদলের দিনে! খানিকটা শারীরিক ভাবে কেন যে দুর্বল ছিলাম আমি তা আজো বুঝতে পারিনে, খুব বেশী ভাল খেলতে পারতাম না, কিন্তু উৎসাহের কমতি ছিল না! আমি বরং কাচের গুলি, লাটিম ও ডাণ্ডাগুলি খেলতে পছন্দ করতাম! আর দৌড়ে দৌড়ে খেলতাম রেসকিউ খেলা! আমার স্কাউটে যোগদানের খুব ইচ্ছে থাকলেও আর্থিক কারনে আমি স্কাউটে ভর্তি হতে পারিনি (ড্রেস, জুতো ও আরো নানা খরচ ছিল স্কাউটে), এ দুঃখ আমার আজো মনে রয়ে গেছে! এরি ভেতর আমি ক্যাডেট কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলাম, তখন তৎকালীন পুর্ব পাকিস্তানে চারটি ক্যাডেট কলেজ ছিল (ফৌজদারহাট, মোমেনশাহী, রাজশাহী আইয়ুব আর ঝিনাইদাহ ক্যা্ডেট কলেজ)! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনিসিয়ামে লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষা হয়েছিল, কি করে যেন আমি সারা পূর্ব পাকিস্তানে ভর্তি পরীক্ষাতে মেধাক্রমে ২য় স্থান দখল করেছিলাম ও ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের জন্যে মনোনীত হয়েছিলাম। কিছুটা হোম সিকনেস, কিছুটা আর্থিক কারনে আমার ঢাকার স্কুলে পড়াই ঠিক হয় শেষ পর্যন্ত কারন আমাদের পরিবারের সেই টুকু বাড়তি খরচ জোগানোর মতো অবস্থা তখন ছিল না! অথচ এই সীমিত সামর্থ্যের মাঝেই লেখাপড়া করে পরবর্তীতে আমরা সেই পাঁচ ভাইবোনের ভেতর একজন ম্যাজিস্ট্রেট, একজন এম ফার্ম ফার্মাসিস্ট, একজন ডক্টরেটসহ দুইজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও একজন ইঞ্জিনিয়ার হতে পেরেছি, যার পেছনে ছিল আল্লাহর রহমত আর বাবা মা ভুমিকা ও আত্মীয়স্বজন-প্রতিবেশীদের নিরন্তর উতসাহ!

হায় ফেলে আসা জীবন, তুমি আর ফিরে আসবেনা জানি, কিন্তু মনের অতলান্ত গভীরে যে তুমি নাড়া দিয়ে যাও যখন তখন, আমাকে ব্যাকুল কর, আমাকে আকুল কর ক্যামন যেন একটা শিকড় ওপড়ানো গভীর ব্যাথায়!