ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

তখনকার বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত খানা পিনা মোটমুটি ভাল করলেও জীবন যাত্রার মান এখনকার মতো (যদিও তূলনীয় নয়!) ছিল না! আমাদের মূল গ্রামের বাড়ী ততকালীন যশোহর জেলার নড়াইলে ছিল, যদিও আমি থেকে শুরু করে পরের দুই ভাইবোনের জন্ম ঢাকাতেই! গ্রামে আমাদের মোটামুটি ধরনের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি থাকলেও একদিকে যাতায়ত ব্যাবস্থা যেমন দুরুহ ছিল, তেমনি আমাদের গ্রামের বাড়িতে আত্মীয়স্বজন বলতে বিশেষ কেউ ছিলেন না, ফলে সেখানে পর্যাপ্ত খাবার ধান চাল, আম-কাঠাল, নারকেল শুপুরী ও অন্যান্য ফল ইত্যাদি ফললেও, তা কালে ভদ্রে আমাদের কাছে পৌঁছুতো!

তখন আমার ছেলেবেলাতে একমাত্র “স্টীমার রকেট” আর রেল গাড়ীই ছিল নিরাপদতম বাহন, আমাদের সবাই কে নিয়ে তিন-চার বছর পর একবার রোজার ঈদের ছুটিতে বাড়ী যাবার সুযোগ পেতেন বাবা মা! “স্টীমার রকেট” তিনদিনে খুলনাতে যেয়ে পৌছুতো!”স্টীমার রকেট” এ যেতে হনে দশ টাকা দিয়ে ট্যাক্সি ভাড়া করে তখনকার কাকচক্ষু সুনির্মল পানি বিশালাক্ষী শীতলক্ষ্যা নদীর নারায়ণগঞ্জে এসে উঠতে হতো! পরবর্তীতে প্রথমে “পাক ওয়াটার” কোম্পানীর, স্বাধীনতার পরে যেটি “বেঙ্গল ওয়াটার” কোম্পানী নামে খ্যাত হয়, তাদের দ্বারা চালিত দুইটি বিদেশে অ্যাসেম্বেল্ড বড় স্টীল বডি লঞ্চ “লিলি” ও “শামস” এও আমরা ভ্রমন করেছি গ্রামের বাড়ির পথে।

“স্টীমার রকেট” দের নানা রকম মনলোভা নাম ছিল, গাজী, অস্ট্রিচ, টার্ণ ইত্যাদি বাহারী সব নাম, দেখতেও অতি মনোহর আর বিশাল ছিল তারা, শাল সেগুনের শতবর্ষী সব মজবুত পেডেস্টাল জলযান। ঢাকা থেকে খুলনা যেতে চাঁদপুর, বরিশাল, ঝাল কাঠি ইত্যাদি স্টেশনে নোঙ্গর করতো এসব স্টীমার! তখন নদীগুলোও ছিল অতি বিশাল বিশাল, আমি অন্যদের সাথে বয়লার রুম দেখতে আগ্রহ বোধ করতাম, অত গরমে কি করে খালাসীরা কাজ করে ভেবে অবাক হতাম! পরবর্তীতে অবশ্য সব “স্টীমার রকেট”ই ডিজেল করে ফেলা হয়! আমরা রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে দেখতাম কোন নাম না জানা নদী কত বড়, কত ঢেউ, স্টিমারের তোড়ে ঢেউ কত বাড়ে, তীরের আছড়ে পড়া ঢেউ আর তীরের ঘাটে জলক্রীড়ারত অচিন গ্রামের ছেলেমেয়েদের, দেখতাম পদ্মা-মেঘনা ও অন্যান্য বিশালায়তন নদীর সঙ্গমে ইলিশ মাছ ধরা ডিঙ্গি নৌকোর সারি! পুর্ণিমার ভরা কোটাল ও অমাবস্যার মরা কোটালে নদীর পানি ফেঁপে উঠতো, তখনি জালে বেশী মাছ পড়তো বলে তখন বেশী নৌকো দেখা যেত! স্টীমার রকেটে ভ্রমনের অন্যতম আকর্ষন ছিল উপাদেয় খাবার, স্টীমারের ক্যান্টিনে তা পাওয়া যেত, সেখানেই আমি খুব ছেলেবেলাতে জীবনে খাসির গোস্তের সাথে টম্যাটো ও শসার সালাদ প্রথম বারের মতো খাই! রান্নার মান ছিল অতি উণ্ণত ও সুস্বাদু! আমি জানি, আজকের ছেলেমেয়েরা, যারা কে এফ সি আর ফাস্ট ফুডে অভ্যস্ত, এমন কি আমাদের নিজেদের ছেলে মেয়েরাও এসব কথা পড়লে হয়তো মনে মনে মুচকি হাসবে, কিন্তু এটাই আমার ছেলেবেলা!
আরেক রোমাঞ্চকর আর স্বপ্নীল অভিজ্ঞতা পেতাম রেল গাড়িতে গ্রামের বাড়ী যেতে! সম্ভবতঃ তিন বা চার বছর পর পর বাবা কেন্দ্রীয় সরকারী কর্মকর্তা হিসেবে রেল বা স্টিমারে পুরো পরিবার সহ বাড়ী যাবার খরচ, হ্যা,প্রাদেশিক সরকারের চাইতে কেন্দ্রীয় সরকারী কর্মকর্তারা কিছু সুবিধে বাড়তি পেতেন। আমরা ঘিয়ে আর সবুজ রঙের মিটারগেজ লাইনের রেলগাড়িতে উঠতাম গুলিস্তানের ফুল বাড়িয়া স্টেশন থেকে, কখন ডিজেল ইঞ্জিন, কখন কয়লার ইঞ্জিন লাগানো হলো তা নিয়ে ভাই বোনেরা তর্কাতর্কি করতাম!

বাবা পরিবারের জন্যে ইন্টারক্লাসের টিকেট পেতেন, গাড়ি প্রায় ফাঁকাই থাকতো! আমরা এখনকার গাজীপুরের বিশাল বিশাল গজারী বনের ভেতর দিয়ে যেতে রোমাঞ্চ অনুভব করতাম, সে সময় মা টিফিন ক্যারিয়ার থেকে বের করে দিতেন খাবার, সকালে ফুল বাড়িয়া স্টেশন থেকে ছেড়ে সন্ধ্যা নাগাদ রেলগাড়ী এসে পৌছুতো জগন্নাথগঞ্জ ঘাটে! বিরাট বিশাল যমুনা নদী বড় স্টিমারে পার হয়ে এপারে সিরাজগঞ্জে এসে ব্রড গেজের অনেক বড় আর উঁচু গাড়িতে উঠতাম, কিসে সেই আনন্দ, কাউকে হায় তা বোঝাতে পারবো না আজ! কি সেই সময়, লোকজন খুবই কম ছিল বলেই হয় তো সবাই সবার সাথে আলাপে মত্ত হতেন, কেউ কেউ আমার সাথে কথা বার্তা বলে বাবার কাছে এক রকম অকারনেই আমার বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করতেন, আর বয়সে ছোটো মানুষ আমি তাতে বেশ আত্মশ্লাঘা লাভ করতাম! শুনলে অবাক হবেন এখনকার অল্প বয়সী পাঠকেরা, সিরাজগঞ্জ আর ইশ্বরদীতে এক টাকায় ৫০ টা করে “রাঘবশাহী” নামের এক রকম উতকৃস্ট দুধের মিস্টি পাওয়া যেত, আমরা রেল গাড়িতে বসে দরদাম করে সেই মিস্টি কিনে খেতে খেতে যশোহরের পথে চলতে থাকতাম! অবশেষে সারারাত চলে কাক ডাকা সকালে পৌছে যেতাম যশোহর স্টেশনে! তারপর রিক্সাতে নড়াইল বাস স্ট্যান্ড, কাঠের বডির ভেপু বাজানো বাসে অবশেষে এসে পৌছে যেতাম কাকচক্ষু পানির নদী চিত্রার দেশ নড়াইলে!

যাই হোক, বাড়ীর সম্পদের থেকে তেমন কোন সাপোর্ট বাবা মা সংসার চালাতে বা আমাদের লেখা পড়া করাতে গিয়ে পান নি! আগেই লিখেছি কিছুটা আর্থিক কারনেই মূলতঃ আমার ক্যাডেট কলেজে পড়া না হয়ে ঢাকার স্কুলেই আমাকে পড়তে হয়, অবশ্য তাতে আমার কোন মানসিক খেদ তৈরী হয়নি, কারন পরিবারের থেকে বাইরে যেতে আমার সব সময়েই খুব খারাপ লাগে আজও! কিন্তু কি আশ্চর্য, পরবর্তী জীবনে দীর্ঘ দিন আমাকে বাংলাদেশ ছাড়াও দুইটি মহাদেশে বছরের পর বছর কাজ করতে হয়েছে জীবিকার প্রয়োজনে! ঢাকাতেই আমার পড়াই ঠিক হয় শেষ পর্যন্ত কারন আমাদের পরিবারের সেই টুকু বাড়তি আর্থিক সঙ্গতি তখন ছিল না যে আমি ক্যাডেট কলেজে পড়ি! য়াগেই একবার লিখেছি যে অথচ এই সীমিত সামর্থ্যের মাঝেই লেখাপড়া করে পরবর্তীতে আমরা সেই পাঁচ ভাইবোনের ভেতর একজন ম্যাজিস্ট্রেট, একজন এম ফার্ম ফার্মাসিস্ট, একজন ডক্টরেটসহ দুইজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও একজন ইঞ্জিনিয়ার হতে পেরেছি, যার পেছনে ছিল আল্লাহর রহমত আর বাবা মা ভুমিকা ও আত্মীয়স্বজন-প্রতিবেশীদের নিরন্তর উতসাহ!

ততকালীন ইপিআইডিসি ভবন ছিল ঢাকার সবচাইতে বড় ও নতুন তৈরী অট্টালিকা, আমরা গল্প শুনতাম রাতে কেউ ওই ভবনে থাকতে গিয়ে ভুতের খপ্পরে পড়েছিলেন, সে সব গল্প শুনে আমরা শিহরিত হতাম! মতিঝিল আর দিলকুশা কমার্সিয়াল এলাকাতে যে কয়েকটি বড় বিল্ডিং ছিল, সে গুলোই ছিল ঢাকার সর্বাধুনিক অট্টালিকা! আমাদের হেটে হেটে টহলের আরেকটি প্রিয় জায়গা ছিল জি পি ও বিল্ডিং এর ফরেন পোস্ট অফিস শাখা, ওই জায়গাটি সহ কমার্শিয়াল এলাকাতে বিভিন্ন ফেলে দেয়া কাগজের ভেতর আমরা দল বেধে বিভিন্ন দেশের পোস্টাল স্ট্যাম্প কুড়ুতে যেতাম! পোস্টাল স্ট্যাম্প কলেকশন তখন খুব জনপিয় হবি হিসেবে ধরা হতো! অনেকে তা লাইব্রেররী বা বইয়ের দোকান থেকে স্ট্যাম্পের অ্যালবাম কিনে আনতেন, মনে পড়ে “হেল্ভেটিয়া” বা গ্রীসের নানা ধরনের স্ট্যাম্প ছিল! আম্রা যারা সেই দাম দিয়ে অ্যাল্বাম কিনতে অসমর্থ হতাম, তারা মতিঝিল কমার্শিয়াল এলাকাতে, বিশেষ করে জিপিও তে ফরেন পোস্ট অফিসের পেছনে ফেলে দেয়া কাগজের গাদার ভেতর স্ট্যাম্প খুঁজতাম, পেতামও বটে! তখন ঢাকার রাস্তাতে বা আশেপাশে খুব কম বস্তি ছিল, সেখানে যারা থাকতো তারা বেশীর ভাগই লোকের বাড়িতে ছুটা ঝি হিসেবে কাজ করতো, পুরুষেরা একটা কিছু করতো যেমন কলা বেচা, সিগারেটের দোকান ও রিকশা চালানো, “টোকাই” বলে যাদের বোঝায়, তাদের প্রথম দেখি সম্ভবতঃ স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালের মন্বন্তরের সময়!
রাস্তাতে লোকজন গাড়ি ঘোড়া খুবই কম ছিল, রিক্সা, স্কুটার, ট্রাক আর সামান্য কিছু ট্যাক্সি ছাড়া আর ছিল ঘোড়ার গাড়ী!

আমাদের ছোট বড় সকলের চিত্ত বিনোদনের আরেক আকর্ষন ছিল ১৪ ই আগস্ট ইত্যাদি তখনকার পাকিস্তানী আমলের জাতীয় দিবস গুলোতে আলোক সজ্বা, মতিঝিল থেকে এখনকার কাক রাইলের এজি অফিস পর্যন্ত মোটে দুই কি তিন টি বড় বাড়ী ছিল, যে গুলো সাদা বাল্ব দিয়ে আলোক সজ্বায় সজ্বিত করা হত, আর করা হত ডিআইটি ও অন্যান্য সরকারী অট্টালিকাতেও!

হায় জীবন, এভাবেই তুমি বয়ে চলে গেলে বহতা নদীর মতো সাথে নিয়ে তোমার সেই সূবর্ণ মূহুর্ত আর মাহেন্দ্রক্ষন, আর কত দূর সেই কাঙ্খিত মঞ্জিল, পথের শেষ কোথায়? কোন সে মুহুর্তে ঘুচবে আমার আজীবনের পথচলার শ্রান্তি?