ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

ষাটের ও সত্তরের দশকে ভারত বাংলাদেশের দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের সবকয়টি কিংবদন্তি আর স্মৃতিময় নদীর উতপত্তিস্থলে উজানে বাঁধ দিয়ে চিরদিনের মতো তাদের পানি লুঠে নিয়ে গিয়েছিল এক লাজ-লজ্বাহীন স্বার্থপর কুঁদুলে প্রতিবেশীর মতো! ! সে সব উর্বর পলিবাহী নদীর মধ্যে রয়েছে কপোতাক্ষ, ভৈরব, চিত্রা, আতাই, গৌরী বা গড়াই, মধুমতী, মাথাভাঙ্গা, ইছামতি, নবগঙ্গা আর সোনাইএর মতো নদী, এমন কি রপসী বাংলার কবি জীবনানন্দের বহুল উল্লেখিত গাঙ্গুড় নদীরও (যদিও মূল স্রোত ধারা বাংলাদেশের সীমানার বাইরে বাংলা দেশ সীমান্তের সমান্তরালে) ভাটির পানি প্রবাহ যা বিভিন্ন ছোট নদীর মাধ্যমে বর্তমান ছিল তাও আটকিয়ে তারা তাদের বেশ কয়েকটি পানির রিজার্ভ জলাশয় তৈরী করে ফেলে!

এসব তখন যেমন, এখনও সেই ভাবে মিডিয়াতে আসেনি বা সে না, হয়তো মিডিয়া তখন এতোটা সক্রিয় ছিলনা বা জনসাধারণও ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি, আর পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষও বিষয়টিতে বোধগম্য কারনেই উদাসীন ছিল! সবশেষে ভারত বাংলাদেশের সুন্দরবন সহ পূরো দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চল কে উষর মরুভুমি বানানোর মানসে তৈরী করলো ফারাক্কা বাঁধ! সেই হাজার বছরের চেনা বাংলাদেশের দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের মৃত্যু ঘটলো! মিস্টি পানি নিয়ে সাগর সঙ্গমে চলা অপরুপা সেই নদীদের বাংলাদেশের কাটা পড়া অংশে ভারতীয় মরন বাঁধ সমুহের পরে যা সামান্য কিছু মিস্টি পানির প্রবাহ ছিল, তা আসতো পদ্মা থেকে, বাংলাদেশের ওই অংশের হাজার বছরের প্রকৃতিকে খুন করে ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে অতি নিষ্ঠুর ভাবে মৃতের কফিনে পেরেক ঠুকলো নব্যবেনিয়া আর সামাজিক সম্প্রসারনবাদী “অহিংস” ভারত! বঙ্গবন্ধুর খুনীদের ব্যাপারে “র” এর পি এন কাউ সাউথ ব্লকে বসে নির্লিপ্ত থাকলেন, কিন্তু “পরীক্ষামূলক” ভাবে চালু হয়ে গেল মরন ফাঁদ ফারাক্কা বাঁধ! তাকে ঠেকানোর চেটা করলো না আমাদের ততকালীন মসনদে চেপে বসা সামরিক জান্তাগুলো তাদের নিজস্ব স্বার্থে, ক্ষীন চিৎকার বা চেচামেচির যতটুকু ক্ষমতা বাংলাদেশের জনগণের ছিল, বেসরকারী ভাবে তাই হল, ধীরে ধীরে মরন ফাঁদ ফারাক্কা বাঁধ হালাল হয়ে উঠলো!

তার পর এই দশক মতো আগে, জ্যোতি বসু তখনও পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী, অন্ততঃ একটি চুক্তি হল বাংলাদেশ আর ভারতের মধ্যে, তবু তো কিছু হল ভেবে আমরা কেউ কেউ খুশী হলাম, কারন তার আগে ভারত ইচ্ছেমত পানি নিয়ে যাচ্ছিল, চুক্তি করার ফলে তাতে সামন্য কিছু পরিবর্তন হলেও হল, আমরা কিছু পানি পেতে লাগলাম, কিন্তু তা আমাদের পরিবেশ ধবংসের সেই সর্বনাশা জৈব চক্রকে সামান্যই প্রভাবিত করতে পারল! ফলতঃ চুক্তিটি হল প্রায় নাকের বদলে নরুন পাবার মতোই, আবার এবার পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হয়েই মমতা ব্যানার্জী রাজনৈতিক কারনে প্রায় “ঘষেটি বেগমের” রোল প্লেতে নামলেন! জিদ ধরে দিল্লী থেকে লোক আনিয়ে পানি মাপামাপি করতে থাকলেন আর অনর্গল বলতে থাকলেন যে বাংলাদেশকে নাকি বেশী পানি দিয়ে ফেলেছিল তাদের বামফ্রন্ট!

ওরা কেঊই আমাদের ভাল-মানুষীর দাম দেয় নি, আমরা যে ওদের জন্যে অনুভব করেছি, নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছি, তার কোন মর্যাদা ওরা কেঊই দেয় নি! যেমন পাকিস্তানীরা নির্দ্বিধায় ভারতের সাথে তাদের সিন্ধু সহ পাঞ্জাবের পঞ্চ নদীর সুষম চুক্তি করেছে, কিন্তু ততকালীন পুর্ব পাকিস্তান স্বর্ণ সুত্র পাটের মাধ্যমে পাকিস্তানের সিংহ ভাগ বৈদেশিক মুদ্রা যোগান দিলেও পাকিস্তানীরা ফারাক্কা বাঁধের সে ধরনের বিরোধীতা না করে বিনিময়ে ততাকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে ভারতের “কমন” নদ নদী গুলোর জন্যে সুষম ও লাভজনক চুক্তি করেছে তাদের এই ফারাক্কার বাঁধের “উদাসীনতার” বিনিময়ে! অথচ পুর্ব বাঙ্গলার স্বর্ণসূত্র পাটের টাকায়ই সেই সব “কমন” নদীর ওপরই পশ্চিম পাকিস্তানে তৈরী হয়েছে পৃথিবীর অন্যতম বিশালায়তন শুক্কুর, মংলা ও তারবেলা বাঁধ, ততকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে উষর মরুভুমি পরিনত হয়েছে হাজার যোজনের উর্বর শষ্য ক্ষেত্র!

ফারাক্কার বিষয় বলতে আর লিখতে লিখতে সাধারন বাংলাদেশী মানুষেরা একেবারে আজ ক্লান্ত, কিন্তু তাতে যেন আমাদের সরকার বা “বন্ধু-প্রতীম” ভারতের কিছুই এসে যায় না! বিগত প্রায় ৪০ বছরে বাংলাদেশের দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকার কোটি মানুষের হৃদয়ের রক্তক্ষরন শুধু সময়ের সাথে বেড়েই চলেছে, তীব্র বেদনা আর অন্তর্জ্বালায় নিরন্ত্বর দগ্ধ হচ্ছে কোটি প্রাণ! কিন্তু হায় স্বদেশ, কেউ এগিয়ে আসেনি আমাদের বিপর্যয় রোধে!

আজ বাংলাদেশের ওই সবচাইতে উর্বর ভুখন্ড পরিনত হয়েছে অনুর্বর মুরুতূল্য এলাকাতে! সব কয়েকটি নদী শুকিয়ে নালা বা ড্রেনে পরিনত হয়েছে, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ তল দিয়ে শষ্য ক্ষেত্র আর মেঠো পথ!

শুকনো নদীর খাতে রাতে তারার আলোতে জ্বলে সাগর থেকে উঠে আসা লোনা পানির ফসফরাস, মিস্টি পানির পুটি, বেলে, ট্যাংরা, চাপলে, রুই, কাতলা, বাউস, দাড়কিনা, জিয়া, খলসে ইত্যাদি মিস্টি পানির মাছেরা বিদায় নিয়েছে, লোনা পানির পোয়া, জাবা ইত্যাদি সামান্য কিছু মাছ এখন ওই খাতে বর্তমান! মরে গেছে বৃহত্তর যশোর খুলনা এলাকার সেই ঘন, অজস্র চির সবুজ বৃক্ষরাজি!
নারকেল গাছ, খেজুর গাছ আর শুপুরী গাছ নির্বংশ হয়েছে, হায় কেউ দেখেও দেখেনি সে সব!
গাছপালার পাট্যার্ণ ও পরিবেশ এতোই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে যার কোন তূলনা জগতে নেই! না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না, তবে তাকে আবার জানতে হবে আগে তা কেমন ছিল! ফ্লোরা ও ফোনা (গাছ পালা ও পশু পাখী) বিন্যাস চিরদিনের মতো পরিবর্তিত হয়ে পড়েছে, সুন্দরবন এলাকাতে মিস্টি পানির প্রবাহ শুন্যের কোঠাতে নেমে লবনাক্ততা বেড়েছে ৩০০০ গুন! সুন্দরবনের স্বাভাবিক গেউয়া- গরান-সুন্দরী ভেজেটেটিভ পাট্যার্ন সম্পুর্ণ পালটে আজ সুন্দরবনের মৃত্যু ঘটতে চলেছে, শুধু মাত্র তা সময়ের ব্যাপার এখন! রুপসা, আঠারো-বেঁকি, পশুরের মতো এক সময়কার প্রমত্তা নদীরা এখন আক্ষরিক অর্থেই মৃত, আজ প্রায় পায়ে হেটে পার হওয়া যায়!

আমরা লজ্জাহীন বাংলাদেশীরা সেই খুনীদের (ওরা আমাদের প্রকৃতির খুনী নয়?) এ বছরও ওদের জামাই ষষ্ঠির পার্বনের জন্যে আগাম ১৫ টন ইলিশ মাছ পাঠিয়েছি কোলকাতাতে, আরও শত টন ইলিশ পাইপ লাইনে!