ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেই সরকারী ব্যয়ের একটি বড় খাত হলো শিক্ষা খাত। প্রতি বছর এই খাতে সরকারী সম্পদের যোগান কেবল বাড়ছে। বাংলাদেশের সরকারী রাজস্বের ১২ শতাংশের বেশি ব্যয় হয় এ খাতে; কিন্তু এই বিপুল অর্থ ব্যয করেও কাঙ্খিত ফল লাভ সুদূর পরাহত। অনেকের ধারনা শিক্ষার মত বাণিজ্য বহির্ভূত খাত সরকারের হাতেই থাকা উচিত। এতে সাধারণ মানুষের সার্বজনীন মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে এই বক্তব্যের সাথে এক মত হওয়া গেলেও উচ্চ বা উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রে এ যুক্তি খুব একটা ধোপে টেকে না। আজকে আমাদের দেশে সরকারী ভর্তুকিতে চলা উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালে সহজেই এর সত্যতা মেলে। সেখানে ষুষ্ঠু জ্ঞান চর্চার পরিবর্তে বিষাক্ত ছাত্র রাজনীতি অনেক সম্ভাবনাময় মেধাকে অংকুরে বিনষ্ট করে দিচ্ছে। তাছাড়া, বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে অর্থনীতির অর্থনৈতিক দক্ষতা বাড়ানোর জন্যও এসব খাত বেসরকারী ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেয়া প্রয়োজন এবং সরকারী প্রণোদনা দেয়া প্রয়োজন। ফলে মেধার যেমন ষুষ্ঠু বিকাশ ঘটবে তেমনি সরকার মুক্তি পাবে বিশাল অংকের রাজস্ব ব্যয়ের কবল থেকে। এতে সম্পদের সুষম বন্টনও নিশ্চিত হবে। বর্তমান বিশ্বে জনগণের ক্ষমতায়ন কথাটি বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে। তথাকথিত আমলাতন্ত্রের বেড়াজাল থেকে মুক্তি দিয়ে জনগণকে কিভাবে দেশ ও সমাজ গঠন প্রক্রিয়ায় আরো বেশি সম্পৃক্ত করা যায় তা নিয়ে ভাবনার অন্ত নেই বুদ্ধিজীবী মহলে।

১. উচ্চ শিক্ষা: অধিকার ও দায়িত্বের সমন্বয়
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে জনগণকে ক্ষমতায়নের একটি বড় উপায় হতে পারে শিক্ষা ব্যবস্থাকে বেসরকারী ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেয়া। বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণকারীদের মধ্যে উন্নত দেশে পাড়ি জমানোর একটি প্রবণতা দেখা যায়।গরীব দেশের জনগণের পয়সায় দেয়া ভর্তুকিতে শিক্ষা নিয়ে একটি ছাত্র অপর দেশে গিয়ে সে দেশের উন্নয়নে তার মেধা ও মনন ব্যয় করবে- স্বাভাবিক বিচারে এটা মেনে নেয়া যায় না। তৃতীয় বিশ্ব যেন হয়ে দাড়িয়েছে ধনী বিশ্বের জন্য শস্তায় মেধা ও জনশক্তির উৎসে। তাই এদেশে উচ্চ শিক্ষাকে অবৈতনিক করার কোন যৌক্তিকতা খুজে পাওয়া যায় না। উচ্চ শিক্ষাকে অবৈতনিক করার পরিবর্তে এক্ষেত্রে সামাজিক ঋণ প্রবর্তনের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এই সামাজিক ঋণও এক ধরনের ভর্তুকি। তবে গ্রহণকারী ছাত্রকে কর্মজীবনে গিয়ে তা পরিশোধ করতে হবে। একে শিক্ষা ঋণও বলা যেতে পারে। গরীব ও মেধাবী ছাত্র ছাত্রীরা এ ঋণ পাবে। আবার সরকার যদি একান্তই ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে চায় তাহলে তা যেন অর্থহীন বিষয়ে পরিণত না হয়ে ছাত্রের জন্য একটি সামাজিক দায়ভারে পরিণত হয় সে বিষয়টিও ভাবতে হবে। সত্যিকার অর্থে সরকার যে অনুদান বা ভর্তুকি বা অনুদান দিচ্ছে তা জনগণের দেয়া টাকা। ফলে ছাত্র ছাত্রীদেরও উচিত এই ঋণ পরিশোধ করে সমাজের প্রতি তার দায়িত্ব প্রতিপালন করা। তথ্য বিপ্লবের এ যুগে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু দুরূহ কোন বিষয় নয়। উচ্চ শিক্ষা গ্রহণকারীদের জন্য সরকার শিক্ষা কর প্রবর্তন করতে পারে। বিভিন্ন ডিগ্রির অনুপাতে এই কর নির্ধারিত হবে। ফলে একজন ছাত্র যখন তার ডিগ্রীর বদৌলতে কোন চাকরী পাবে তখন তাকে ওই ডিগ্রীর জন্য নির্ধারিত কর পরিশোধ করতে হবে। মোট কথা শিক্ষায় দেয়া অনুদান, ঋণ বা ভর্তুকি যদি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সামাজিক পরিষেবার সাথে যুক্ত করা না যায় তাহলে তা থেকে কাঙ্খিত ফল পাওয়া যাবে না।

শিক্ষা ভর্তুকি ধারনার সাথে শিক্ষার্থীর দায়িত্বশীলতা ও সামাজিক প্রতিদানের চেতনা অবশ্যই যুক্ত করতে হবে। অধিকন্তু, ভর্তুকির শিক্ষা ব্যবস্থায় মানবসম্পদ উন্নয়ন করতে হবে। যাতে সমাজ ও অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য নূণ্যতম জ্ঞান ও দক্ষতা তৈরি হয়। আবার শিক্ষা খাতের এই প্রাপ্তি ব্যক্তির নিজের আয় বৃদ্ধি ও কল্যাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেই চলবে না। এখান থেকে দেশ, সমাজ ও জাতি কী পাচ্ছে তাও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

২. প্রাথমিক শিক্ষা: অপচয় রোধের কর্মসূচী
আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক। আমি এর পক্ষপাতি; কিন্তু এ শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। এ শিক্ষা অনেক সময়ে অপচয়ে পরিণত হচ্ছে। বিভিন্ন শ্লোগানে আমাদের দেশে নিরক্ষরকে অক্ষর জ্ঞান দান এর কাজ খুব জোরেশোরেই চলছে। সেখানে একজন হয়তো বর্ণমালা চিনছে বা নিজের নাম লেখা শিখছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এই জ্ঞান তার উন্নতি ও উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারছে না। প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর এক সময় এই শিক্ষা ভুলে যাচ্ছে। এতে করে এ কাজে ব্যয়িত সব অর্থ ও পরিশ্রম অপচয় ছাড়া আর কিছুই হচ্ছে না। এর জন্য প্রয়োজন ছিল ফলোআপ কর্মসূচীর, যা একেবারেই অনুপস্থিত। শিক্ষার মানও রক্ষিত হচ্ছে না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কোন মেরামত সুবিধা (রিপেয়ার ফ্যাসিলিটি) নেই। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যত শিক্ষার্থী ভর্তি হয় তাদের মধ্য হতে শতকরা মাত্র ৪ ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ পায়। বাকীরা ঝরে পড়ে। শিক্ষা ব্যবস্থায় এ অপচয় রোধ করা জরুরী।

৩. নারী শিক্ষা: পারিবারিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা
বর্তমানে দেশে নারী শিক্ষার ওপর অত্যাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এটা খুবই প্রশংসনীয় একটি উদ্যোগ। আমাদের নারী সমাজ শিক্ষার অভাবে সামাজিকভাবেও অনেক পিছিয়ে। তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে নানাভাবে। এমনকি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্য সম্পদও তারা পাচ্ছে না। কারণ শিক্ষা দীক্ষায় পিছিয়ে পড়ায় এক শ্রেণীর স্বার্থান্বেষী তাদেরকে শোষণ করার সুযোগ পাচ্ছে। এ অবস্থার অবশ্যই পরিবর্তন হতে হবে। তাদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে হবে।
তবে যে পদ্ধতি ও নীতিতে আমরা নারী উন্নয়নের কথা বলছি তাতে কিছু আশংকাও রয়ে গেছে। এ ব্যাপারে আমাদের কোন ‘ভিশন’ নেই। যেভাবে নারী উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে তাতে এর পরিণতিও আমাদেরকে ভাবতে হবে। সিঙ্গাপুরে একসময় নারী শিক্ষার ওপর খুব গুরুত্ব দেয়া হয়; কিন্তু তা দেশটির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। পরিণতিতে এখন দেশটির পরিবার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার নামে সেখানকার নারীরা কোন পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ থাকতে চাচ্ছে না। অদূরদর্শী শিক্ষানীতি সিঙ্গাপুরের সামাজিক ভিত্তিমূলকেই কাঁপিয়ে দিয়েছে। বর্তমান ধারায় নারী শিক্ষার পরিণতি আমাদের ভাবতে হবে। প্রকৃতিগতভাবে নারী ও পুরুষের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। আর এই পার্থক্য নিয়েই একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যে টিকে আছে এ সমাজ, এ জাতি এ দেশ। নারী ও পুরুষের শিক্ষা ক্ষেত্রেও এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরী। এই ভারসাম্য শেষ পর্যন্ত পরিবারে প্রভাব ফেলে। এই ভারসাম্য নষ্ট হলে পরিবারের ভারসাম্যও নষ্ট হবে, যার পরিণতি খুবই ভয়াবহ। ইতোমধ্যে আমাদের সমাজে কিছুটা হলেও এর আলামত ফুটে উঠেছে। পারিবারিক ও সামাজিক অশান্তি এবং বিশৃঙ্খলার জন্য এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য নষ্ট হওয়া দায়ী কিনা তাও আমাদের ভেবে দেখতে হবে।

আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় ‘শিক্ষিত মা’ এর বিকল্প নেই। নারী ও পুরুষ সৃষ্টি হয়েছে একটি প্রাকৃতিক বিভাজনের মাধ্যমে। পুরষ লালন করবে বর্তমান প্রজন্মকে আর নারী প্রতিপালন করবে ভবিষ্যত প্রজন্ম। আমাদের শিক্ষা নীতিতে এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করা বাঞ্ছনীয়। নারীর প্রথম কাজ সন্তান প্রতিপালন। একিটি সন্তানের জন্য মায়ের কোলই তার প্রথম স্কুল। মায়ের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষায় সন্তানের বৃহত্তর শিক্ষা জীবনের ভিত্তি মূল রচিত হবে। আজকের সমাজে যে বিশৃঙ্খলা তার জন্য অনেকটা দায়ী এই পারিবারিক শিক্ষা তথা মায়ের কাছ থেকে সন্তানের শিক্ষার অভাব। ফলে, কোন সন্তান যখন বাবা-মা তথা পারিবারিক অনুশাসন মেনে চলতে শেখে না, তখন সামাজিক অনুশাসন মেনে চলাটাও তার কাছ থেকে আশা করা যায় না। যার কারণে অমান্যতার এক ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে আজকের সমাজে। নারী শিক্ষা যেমন এমন না হয় যাতে শেষ পর্যন্ত সমাজের ভিত্তিমূল পরিবারের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়ে। নারী যে একজন মা এই চেতনা যেন লোপ না পায়। অর্থনৈতিক বিমুক্তির অজুহাতে যে যেন পরিবারের বন্ধনকে অস্বীকার করতে শুরু না করে।

৪. সামাজিক ঋণের হিসাব
মানুষ নিজের দায়িত্বের চেয়ে অধিকারের কথা বলতে বেশি ভালোবাসে; কিন্তু বাস্তবে দায়িত্বের পর্যায় ভেদে অধিকারের মাত্রা নির্ণীত হওয়া উচিত। যখন বিনামূল্যে বা শস্তায় শিক্ষা গ্রহণের অধিকার স্বীকৃত হবে, তখন এই সুবিধা গ্রহণকারী যোগ্য হওয়ার পর সামাজিক ব্যয়ের বোঝা বহন করাটাও তার দায়িত্ব হয়ে দাড়াবে। বাংলাদেশসহ বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশে জনগণের বঞ্চনা ও অনুন্নয়নের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে এই অধিকার ও দায়িত্বের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনে ব্যর্থতা। আমরা শুধুই বিদেশী ঋণ ও ঋণ সেবার হিসাব করি। এখন সময় এসেছে জাতীয় সামাজিক ঋণের পরিমাণ নির্ধারণ করা এবং এই সামাজিক ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা করার বিষয়টি অচিন্তনীয় হলেও এ ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা প্রয়োজন।

৫. নব্য সামাজিক চুক্তিসমূহের পুনর্লিখন
এটা পরিষ্কার যে, বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সেবার সামাজিক মূল্য নির্ণয়ের প্রয়োজন রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে যে, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ দেশের উন্নয়ন ও দারিদ্র বিমোচনের জন্য তাদের সামাজিক ঋণ পরিশোধ করবে। এটা প্রমাণিত সত্য সমাজের যে বড় সুবিধা বঞ্চিত অংশ রয়েছে তারাই সমাজের সুবিধা প্রাপ্ত শ্রেণীর সামাজিক ব্যয়ের বোঝা বেশিরভাগ বহন করছে। তাই এখন উচিত নব্য সামাজিক চুক্তিসমূহের পুনর্লিখন। এই অনুমিতির ভিত্তি হবে, মানুষ বাধ্যবাধকতা নিয়ে জন্মায়, আর তাই তার দায়িত্বই নির্ধারণ করবে তার অধিকার। যদিও তার এই দায় দায়িত্ব প্রতিপালনের বিষয়ে মতভেদ থাকতে পারে। তখন আর্থিক এবং অর্থনৈতিক অধিকারগুলো সামাজিক কোন দায়িত্ব পালনের সাথে যুক্ত করা যেতে পারে। আমাদের উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থাপনায়ও সামাজিক ঋণ প্রবর্তনের পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করা যেতে পারে। জাতীয় সামাজিক ঋণ কর প্রবর্তন করা যেতে পারে। শুধু প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামাজিক দূরদৃষ্টি। এই সামাজিক ঋণের সঞ্চয় থেকে সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল গড়া যেতে পারে। এই সামাজিক ঋণ হবে ব্যক্তি বিশেষ সামাজিক দায়িত্ব যা মূলত প্রচলিত সামষ্ঠিক সামাজিক দায়িত্বের বিপরীত।ন্যায়পরায়ণতা ও তা রক্ষার প্রয়োজনেই বিকল্প সমাজ এবং সরকার ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপিত হবে বলে মনে করি।
-প্রফেসর ড. এম.এ. মান্নান
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড
সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক,জেদ্দা
Email: hmct2004@yahoo.com