ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

আমরা বারবার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা বলি কিন্তু সুষম বন্টন এর হিসাব দিই না। কথা বলি না। অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে শুধু প্রবৃদ্ধি বাড়ালে হবে না সুষম বন্টনও দরকার। প্রবৃদ্ধিতে গড় হিসাবে ধারনা প্রদান করা হয় কিন্তু সেখানে বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন হয় না। সম্প্রতি এক হিসাবে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের ৬০ ভাগ ঢাকা, ২০ ভাগ চট্টগ্রাম আর বাকি ২০ ভাগ সারাদেশে বিনিয়োগ হচ্ছে। আরেকটি হিসাবে দেখা গেছে বিগত দশকগুলোতে তুলনামূলকভাবে পল্লী জনগণের প্রকৃত আয় কমে গেছে এবং শহরগুলিতে স্থান্তরিত হয়েছে পল্লী সম্পদ। পর্দার অন্তরালে যে লাখ লাখ মানুষ তাদের ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের সঞ্চয় দ্বারা ব্যাংকিং কাঠামোকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে তা ব্যবহৃত হচ্ছে গুটিকতক ধনীর ব্যবসা বিকাশের জন্য। আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা মুক্ত বাজার ধারনায় প্রচলিত ব্রিটিশ ব্রাঞ্চ ব্যাংকিং এর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তাই এই ব্যাংকিং ব্যবস্থা বাংলাদেশে শুধু দরিদ্রতাই বৃদ্ধি করছে। একটি উন্নয়নমুখী দেশের জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যে সংস্কার প্রয়োজন সে রকম কোন সংস্কার এ দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় হয়নি। যেটুকু হয়েছে সেটা প্রান্তিক পরিবর্তনের মাধ্যমে, মৌলিক কিছু নয়। এমনকি পাশ্চাত্য দেশের ব্যাংক ব্যবস্থাও একদিনে গড়ে উঠেনি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ‘ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড’ সপ্তদশ শতক থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ শুরু করে; কিন্তু ১৯৪৭ সালে একে রাষ্ট্রীকরণ করা হয়। অনুরূপভাবে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম ষুষ্ঠুভাবে স্থাপিত হয় ১৯১৩ সালে। আসলে এটা একটা প্রাইভেট ব্যাংক (conglomerate of Powerful Pvt. Banks and Individual Companies)।

শুধু প্রবৃদ্ধি নয় সুষম উন্নয়ন জরুরী
ব্যাংকিং ব্যবস্থা আমাদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠুক কিন্তু সেটি বাংলাদেশে ৪০ বছরেও হয়নি। যেমন একজন শূণ্য আয়ের বেকার ব্যক্তির সাথে অপর একজন চাকুরীজীবি ব্যক্তির আয়ের গড় করলে তাতে বেকার ব্যক্তির অবস্থার কোন পরিবর্তন হয় না, কে বেকার তা বোঝা যায় না। ‘ট্রিকল ডাউন’ অথবা চুইয়ে পড়া তত্ত্ব দিয়ে নিচের তলার মানুষের উন্নতি করা সম্ভব নয়। লোকসংখ্যার আপেক্ষিক অনুপাতে দারিদ্রের হার গত দুই দশকে নিশ্চয়ই কমেছে, কিন্তু যথেষ্ট কমেনি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কতটা বাড়লে দারিদ্র কতটা কমবে বলে প্রত্যাশা করা চলে, সে বিষয়ে অর্থনীতিতে একটি তাত্ত্বিক ধারণা ও পরিমাপের ব্যবস্থা রয়েছে। যদি জাতীয় আয়ে এক শতাংশ বৃদ্ধি হয়, তা হলে দেশে দারিদ্র কি অনেকখানি কমবে, না কি সামান্য কমবে? দেখা গিয়েছে এটা নির্ভর করে দেশের মানুষদের মধ্যে গোড়াতে অসাম্য কতখানি ছিল, তার উপর। যদি বৈষম্য বেশি থাকে, তা হলে আর্থিক বৃদ্ধি হলে গোড়াতে যেটুকু বাড়তি সম্পদ আসে তা বড় মাছেরাই খেয়ে ফেলে দরিদ্রদের কাছে পৌঁছায় না। কিন্তু এর মানে এই নয় যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রয়োজন নেই। প্রবৃদ্ধি না হলে প্রান্তিক মানুষের কর্মসংস্থান কোথা থেকে আসবে? কিন্তু শুধু প্রবৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়। ফলে আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা সুষম উন্নয়ন ও দরিদ্র বিমোচনের অন্তরায় হয়েছে। ব্যাংক হবে আর্থ সামাজিক ইনস্টিটিউশন কিন্তু তা হয়নি।

তাই, আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ক্রেডিটকে কৃষ্টির সাথে যোগ করা হয়নি। স্বেচ্ছাসেবক খাতে বিশাল সামাজিক পুঁজি উপেক্ষা করা হয়ছে। পাশ্চাত্য অর্থনীতির প্রভাবে ব্যক্তিনীতি ও ব্যক্তিস্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে আমাদের অর্থনীতি ও ব্যাংকিং কর্মধারা। ব্যক্তি স্বার্থে উপেক্ষিত হয়েছে পরিবার ও সমাজ। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, দারিদ্র বিমোচনের লক্ষ্যে বিকল্প অর্থনীতির প্রবর্তক সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক তার ত্রিমুখী কর্মকান্ড বাস্তবায়নে আনুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিক ও স্বেচ্ছামূলক খাতগুলোর এক অভিনব সমন্বয়ে সবুজ হাট প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১ যুগ আগে ব্যাংকের চারশ’ পল্লী শাখা খোলার পরিকল্পনা নেয় তা আজও বাস্তবায়ন করা হয়নি। পল্লী শাখা লাভজনক করতে হলে কেবল সুদ ভিত্তিক লেনদেনের মাধ্যমে তা সম্ভব নয়। যদি পারস্পরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে পারিবারিক ক্ষমতায়নে ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচীর আওতায় পল্লী শাখা স্থাপন করা যায় তাহলে এগুলো লাভজনক হতে পারে। যারা এই মাইক্রো-ক্রেডিট কার্যক্রমে সফলতা লাভ করবে কেবল তাদেরকেই মাইক্রো-এন্টারপ্রাইজ লোনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। পরে তাদের মুক্ত বাজারের সাথে যোগ করে দেয়া যায়। এর জন্য যে পরিকল্পনা ও বিকল্প চিন্তাধারা বা কমিটমেন্ট দরকার তার অভাবেই আজ আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা সুষম উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারেনি।

খেলাপী ঋণ: ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সবচে’ দুষ্টু ক্ষত
খেলাপী ঋণের সমস্যা সম্পর্কে আমরা অনেকেই অবগত আছি; কিন্তু আমরা ব্যাংকিং ব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখব বিপুল সংখ্যক বেনামী লোনের অস্তিত্ব। যার সাথে জড়িত ব্যাংকের পরিচালকরা। দেখা গেছে লোনের প্রায় ৭৭% দেয়া হয়েছে রাজনৈতিক তদবিরে বা খাতিরে। খেলাপী ঋণ কমছে বলে হিসাব দেখানো হয়েছে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কোটি কোটি টাকার খেলাপী ঋণ লুকিয়ে ফেলা হচ্ছে এবং কোন এক সময় তা মওকুফও করে দেয়া হবে। নিকট অতীতের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ব্যাংক কর্তৃক হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণের ৪০% আছে ১৫৬ জন লোকের হাতে এবং ৭৫% আছে মাত্র ১৮০০ লোকের হাতে। ইতিহাসে আর কখনও এত মুষ্টিমেয় লোক এত বেশি মানুষকে শোষণ করেনি। অধিকাংশ দেশের সরকারী ও বেসরকারী উভয় সংগঠন তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে আপামর জনগণের দরিদ্রতাকে আন্তর্জাতিকীকরণ করেছে। আজ তাদের শোষণ এমন পর্যায়ে যে, সমস্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কারের চিন্তুা করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঋণখেলাপী চর্চা একদিনে গড়ে ওঠেনি বরং তা দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অভ্যাস। এটা গড়ে ওঠার কারণ ব্যাংকের নিজস্ব এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকিতে ব্যর্থতা, পেশাগত অযোগ্যতা ও অদক্ষতা, ব্যাংক কর্মকর্তা ও গ্রাহকের সীমাহীন দুর্নীতি, অযাচিত চাপ ইত্যাদি।
খেলাপী ঋণের সমস্যা থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রতিকার চেয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। যেমন ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপীদের সামাজিক অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের উপযুক্ত শাস্তির জন্য আইনগত বিধান তৈরি। যাতে সশ্রম কারাদণ্ড এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ইত্যাদি শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান থাকবে। ব্যাংকের পরিচালক/উদ্যোক্তাগণ যাতে ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে নিজ নিজ ব্যাংক থেকে ঋণ বা বিনিয়োগ নিতে না পারেন তার ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিলেও একজন সাধারণ গ্রাহকের মতো আচরণ করা হবে।

বিশেষ আদালত স্থাপন:সময়ের দাবী
বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সকল ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলী ষুষ্ঠুভাবে সম্পাদন এবং গতিশীল করার জন্য সকল চাকরী অত্যাবশ্যক ঘোষণা করা প্রয়োজন। সকল কর্মকর্তার নিয়োগ পারফরমেন্স কন্ট্রাক্ট (performance contract) এর আওতায় আনা দরকার। দুর্নীতিপরায়ণ ও আর্থিক অনিয়মকারী অপরাধীদেরকে বিশেষ সংক্ষিপ্ত আদালতে বিচারের মাধ্যমে উপযুক্ত শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অর্থ ঋণ আদালতে দায়েরকৃত মামলা যাতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হয় তাও নিশ্চিত করতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও পরিবর্তিত পরিস্থিতি
প্রায়ই শোনা যায়, দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের কথা। পূর্ণাঙ্গ সায়ত্ত্বশাসনের কথা নতুন করে লিখতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ক্ষমতায়নের সাথে সাথে ক্ষমতা প্রয়োগকারী জনবলের পেশাগত যোগ্যতা বাড়াতে হবে, বেতন কাঠামো প্রতিযোগীতামূলক করতে হবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ব্যর্থতার কারণ বিশ্লেষণ করে অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের একজন ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) এর বেতন ভাতা বেসরকারী ব্যাংকের এমডির চাইতে প্রায় ৫ থেকে ৭ গুণ কম। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের এমডি বেসরকারী ব্যাংকে যোগ দিলে রাতারাতি তার বেতন ৫ থেকে ৭ গুণ বাড়ে কী করে? এর জন্য চাই একটা সুশৃঙ্খল নির্দেশনা। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংককে চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাপনার (Contract Management) মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে দেয়া প্রয়োজন। এর কার্যকারিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্বায়ত্তশাসনসহ এর ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্ণর পদে সাধারণতঃ নিয়োগ পান কোন অবসরপ্রাপ্ত বা সিনিয়র আমলা অথবা রাজনৈতিক বিবেচনায় অনভিজ্ঞ ব্যক্তি। এদের বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই। কিন্তু এদের দ্বারা মৌলিক কোন সংস্কার বা মৌলিক কোন কাঠামোগত পরিবর্তন সম্ভব বলেও আমি মনে করি না। কারণ তারা সবসময় একটি স্থিতাবস্থা বজায় রেখে চলার পক্ষপাতী। তারা হয়তো মার্জিনাল বা প্রান্তিক পরিবর্তন আনায় সিদ্ধহস্ত; কিন্তু সহজে কোন দীর্ঘমেয়াদী বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবর্তন আনতে চান না। ফলে দেখা যাবে এরা সুদূরপ্রসারী কোন পরিবর্তনের পক্ষে যেমন মত দিতে অনাগ্রহী, তেমনি সেই পরিবর্তনকে সামাল দেয়ার মতো যোগ্যতা নাই। তাই এরা ধার করা ব্যাংক ব্যবস্থাকে “Given” বলে ধরে নিয়ে প্রান্তিক পরিবর্তনের পক্ষে। আমাদের বর্তমান অর্থব্যবস্থা নতুন করে দেখতে হলে নতুন চিন্তাধারা, নতুন উন্নতমানের জনবল প্রবেশকে সহজতর করতে হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় প্রধান নির্বাহী হলেন একজন গভর্নর। এর পরিবর্তে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ পেশাজীবীদের সমন্বয়ে একটি ৫ বছর মেয়াদী ‘কাউন্সিল অফ গভর্নরস্’ (Council of Governors)গঠন করা যেতে পারে। যেখানে দেশের আর্থিক, সামাজিক কারিগরি এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞ পেশাজীবী যথা মুদ্রা বিষয়ক অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ, রাজস্ব অর্থনীতিবিদ, ইসলামিক অর্থনীতিবিদ, কৃষিবিদ, পরিকল্পনাবিদ ও অভিজ্ঞ ব্যাংকারগণকে নেয়া যেতে পারে। কাউন্সিল অফ গভর্নরস্ দেশের সার্বিক অগ্রগতির জন্য দিকনির্দেশনা দিবে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে রাজস্ব পলিসি, মনিটরী পলিসি ও উন্নয়ন পলিসি অনুধাবনের মতো বিশেষজ্ঞ জ্ঞান খুবই জরুরী। এই জ্ঞান যে কেবল একজন আমলার বা একজন ব্যাংকারের মধ্যে থাকবে তা কিন্তু নয়। অর্থনীতির সঠিক বিশ্লেষণের জন্য বহুমুখী বিশেষ জ্ঞান প্রয়োজন, যা কোন এক ব্যক্তির পক্ষে ধারণ করা সম্ভব নয়। সম্ভব কেবল কাউন্সিল অফ গভর্নরস্ গঠনের মাধ্যমে।
বর্তমান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যে পরিকাঠামো তাতে স্বায়ত্তশাসন প্রদান হবে অর্থহীন। এতে ক্ষমতায়ন করার অর্থ হবে দুর্নীতিকে আরো ডালপালা বিস্তারের সুযোগ করে দেয়া। কারণ জনবলের গুণগত মান ও ইনসেনটিভ প্যাকেজ যদি সাথে সাথে উন্নত করা না হয় তাহলে ক্ষমতার অপব্যবহার হওয়ার আশংকা অনেকগুণ বেড়ে যাবে। এর অসংখ্য উদাহরণ আমরা সমাজে প্রত্যক্ষ করেছি। ব্যাংকিং কোম্পানী আইন ১৯৯১ এ বাংলাদেশ ব্যাংককে যে লাগামহীন ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে তার অপব্যবহার হলে জবাবদিহিতার কোন আইনগত ব্যবস্থা নেই। উক্ত আইনে বেসরকারী ব্যাংকগুলোর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা হয়নি। তাই ব্যাংকিং কোম্পানী আইনের যেসব ধারা বেসরকারী ব্যাংকেরে উন্নতির পরিপন্থী সেসব ধারা পুনর্বিবেচনা বা বাতিল করা আবশ্যক।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন: সমন্বয়হীনতার চূড়ান্ত নিদর্শন
রাজনৈতিক প্রভাবে আইন হচ্ছে কিন্তু আইনের কোন প্রয়োগ নেই যেমন: ব্যাংক কোম্পানী আইন ১৯৯১ এর ১৫কক ধারায় বলা হয়েছে একজন পরিচালক একাধারে ৩ বছর করে দু’ বার বা ৬ বছর পরিচালক পদে থাকতে পারবেন কিন্তু আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করে বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালকরা একাদিক্রমে ১৮ বছর থেকে ২৮ বছর পর্যন্ত পদ আকড়ে ধরে আছেন। ২২ নভেম্বর ২০১১ সালে পুঁজি বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ এন্ড একচেঞ্জ কমিশন উদ্যোক্তা পরিচালকদের জন্য ২% এবং তাদের সামগ্রিকভাবে ৩০% শেয়ার ধারণ বাধ্যতামূলক করে একটি নোটিফিকেশন জারি করে। এর ফলে অনেক ব্যাংক বিশেষ করে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের ১৬ জন পরিচালকের মধ্যে ১৪ জন পরিচালকই ধরাশায়ী হয়। আরো কয়েকটা ব্যাংকেও একই অবস্থা। এই পরিবর্তনের প্রভাব কী হতে পারে তা আদৌ বিবেচনা করা হয়নি। পুঁজি বাজারের ২২ ক্যটাগরীরর ২৩৫ কোম্পানীকে একই কাতারে শামিল করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে ব্যাংক, বীমা, খাদ্য, ঔষধ, হোটেল, পর্যটন ইত্যাদি। প্রত্যেক কোম্পানীর বৈশিষ্ট্য ভিন্ন, তাদের ভিন্ন ভিন্ন পরিশোধিত মূলধন (Paid Up Capital) রয়েছে এমনকি একই শ্রেণীর কোম্পানীর ও ভিন্ন ভিন্ন পরিশোধিত মূলধন রয়েছে। সিকিউরিটিজ এন্ড একচেঞ্জ কমিশনের নোটিফিকেশন অনুসারে কয়েকটা ব্যাংকের, প্রতিষ্ঠানের কোন বোর্ড নেই। বোর্ড বিহীন ব্যাংক চলছে আর বাংলাদেশ ব্যাংক বসে বসে তা উপভোগ করছে। এখানে কমিশন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে যে সমন্বয়হীনতা বিরাজ করছে তা ঘটনার পৌঁনপুনিকতা দেখে উপলব্ধি করা যায়। সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের মধ্যে যে সমন্বয়হীনতা বিরাজ করছে তাও সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের ওয়েবসাইটে যে মাস্টার প্লান প্রকাশ করা হয়েছে সেখানেও স্বীকার করা হয়েছে। যারা ক্ষুদ্র ঋণ করছে তাদের আদালতে বিচার হচ্ছে কিন্তু বৃহৎ ঋণ খেলাপী লোকজনের বিচার হচ্ছে না যেযমন হলমার্ক, ডেসটিনি। এর কারণ আমাদের কোন সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নেই। এ থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত। আমরা যে একটা লার্নিং প্রসেসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি কিন্তু অদ্যাবধি এমন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি যা দেখে বোঝা যায় ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা হয়েছে। বরং একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আমাদের তদারকি ব্যর্থতাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংক আছে আইন নাই
এটা হয়তো অনেকেরই জানা নেই যে ইসলাম ধর্মের প্রসার শুধু মুসলিম দেশেই হচ্ছে না বরং নন মুসলিম দেশেও প্রসার পাচ্ছে। USA এবং UK তে ইসলামী ব্যাংকিং সিস্টেম হিসেবে গড়ে উঠেছে। শরীয়া আইন অনুসারে বিশ্বে যে সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে তাদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ২০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১০ম স্থান অধিকার করেছে UK। অনেক অমুসলিম দেশেও ইসলামী ব্যাংক প্রসার লাভ করেছে যার মধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত,ফ্রান্স, জার্মানী, আয়ারল্যান্ড অন্যতম।

প্রায় ২৯ বছর পূর্বে এদেশে ইসলামী ব্যাংকের যাত্রা শুরু হলেও শরীয়াভিত্তিক ব্যাংক পরিচালনার কোন আইন নেই। ২০১৬ সালে বিশ্বে মুসলমানদের সংখ্যা হবে ২০৩ কোটি ৪০ লাখ যা ধর্মবলম্বী জনগোষ্ঠী হিসেবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে এবং ইসলামী ব্যাংক পরিচালনা সহজতর করতে একটি ইসলামী ব্যাংক আইন প্রণয়ন ও কার্যকর করা একান্ত জরুরী। উল্লেখ্য, ইসলামী ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ করা হয়েছে। দেশে বর্তমানে প্রায় ৭ শতাধিক শাখাসহ ৬টি ইসলামী ব্যাংক ও কয়েকটি প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী শাখা কাজ করছে। তাছাড়া, পৃথিবীর প্রায় ১০০টি দেশে ৩০০টির ও বেশি ইসলামী ব্যাংক ও বিনিয়োগ কোম্পানী রয়েছে যারা ৮০০ থেকে ১০০০ বিলিয়ন ডলার লেনদেন করছে।

ব্যাংকিং: মুসলমানরাই সর্বপ্রথম
খ্রিস্টীয় অস্টম শতকের মাঝামাঝি মুসলমানরা সর্বপ্রথম বাগদাদে ব্যাংকিং সার্ভিসের প্রর্বতন করে। সে সময় সওদাগররা মুসলিম জাহানের একপ্রান্তে বসে চেক লিখে দিলে তা অন্য প্রান্তে ভাঙানো যেত। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের দক্ষ পেশাজীবী ও ট্রেড গাইড নিয়োগ করা হয়েছিল। পণ্য ও সেবা বিনিময়ের সুবিধার্থে মুদ্রা (সোনার দিনার ও রূপার দিরহাম)মিটিং এর ব্যবস্থা করা হয়েছিল । ইসলামী অর্থনীতি, ব্যাংকিং ও অর্থ ব্যবস্থা পর্যালোচনায় দেখা যায়, সর্বদা অধিক মুনাফা অর্জন করলেই উত্তম ব্যবসা হয় না। সামাজিক ও মানবিক মুল্যবোধকে সমুন্নত রাখতে সচেষ্ট হওয়া এবং ধর্মীয় অনুভূতির সাথে মানবতাবোধ একীভূত করার মাধ্যমে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড গ্রহণ করাই হবে ইসলামী ব্যাংকগুলোর উপোযগী কর্মসূচী। এই কর্মসূচীর মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকিং ও অর্থনীতির সার্থক ব্যবস্থাপনা প্রমাণিত হবে। তাই, এর জন্য চাই আলাদা আইন। আমাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সাথে ব্যাংকের সংযোগ ঘটাতে হলে এর দৃষ্টিভঙ্গীর ব্যাপক পরিবর্তন দরকার। আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে প্রতিযোগিতামূলক করতে দক্ষ জনবল সৃষ্টি করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি জনবলকে শক্তিশালী করা একান্ত প্রয়োজন। রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকের বেতন ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি বেসরকারী খাতের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিযোগীতামূলক হওয়া উচিত বলে মনে হয়। সর্বোপরি পুঁজি বাজারকে সুদৃঢ় করা এবং খেলাপী ঋণ আদায়ের জন্য আমাদের দুর্বল আইন কাঠামোকে শক্তিশালী করতে হবে।

সামাজিক দায়বদ্ধতা
আমাদের দৃষ্টিতে সমসাময়িক সমাজে ব্যাংক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। তাই এই ব্যাংকের প্রধান কাজ হবে ব্যাপকতর সামাজিক উদ্দেশ্য রূপায়ণ এবং যা হবে পরস্পর নির্ভরশী, টেকসই ও সম্মিলিতভাবে সুসংহত। বৃহত্তর জটিল সামাজিক পরিবেশে কেবল উচ্চ মুনাফা অর্জনের জন্য কোন সংকীর্ণ উদ্দেশ্যে ব্যাংক কাজ করবে না। একথা সত্য যে কোন প্রতিষ্ঠান যখন নিছক আত্মমুখী হয়ে গড়ে ওঠে তখন তা শুধুমাত্র কর্মচারীদের কাছে নয়, গ্রাহক ও অন্যদের কাছেও স্বকীয় বৈশিষ্ট্য আত্মপরিচয়, আবেদন ও গৌরব হারিয়ে ফেলে। বস্তুত এই ব্যাংক পরিবর্তনশীল পরিবেশে জীবন ও সামাজিক দায়িত্বের প্রতি নৈতিক সাড়া প্রদানের তাগিদে এ ধরনের সামাজিক উদ্দেশ্য পুনঃনির্ধারণ ও গ্রন্থিবর্ধনের কাজ অব্যাহতভাবে করে যাবে। আত্মকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ সুবিধা লাভের কোন অনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজ করবে না।

-প্রফেসর ড. এম.এ. মান্নান
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড
সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক,জেদ্দা
Email: hmct2004@yahoo.com