ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

 

আমরা ইতিহাসের এমন একটি বিশেষ সময়ে দাড়িয়ে আছি যেখানে সামগ্রিকভাবে মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ এবং বিশেষভাবে বাংলাদেশ ইতিহাসের অনিবার্য ধারাবাহিকতার উন্নয়নের স্বর্ণযুগের দ্বারপ্রান্তে। বিশ্ব কোষের তথ্যানুসারে, আগামী ২০১৬ সালে বিশ্বে মুসলমানদের সংখ্যা হবে ২০৩ কোটি ৪০ লাখ, যা হবে ধর্মাবলম্বী হিসেবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সম্প্রদায়। ইসলামের আবির্ভাবের হিজরী ১৪৩৪ বছরের ইতিহাসের এরকম ঘটনা এই প্রথম। বিশাল প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ, অপেক্ষাকৃত সুলভ ও তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী উন্নয়নের জোয়ারে শামিল হবে, মানবতা ও বিশ্ব শান্তির  এ উন্নযনের জোয়ারে বাংলাদেশ বলিষ্ঠ অবদান রাখবে বলে আশা করি। সময়ের বালুচরে আমরা জাতি হিসাবে পদচিহ্ন রাখবার একটা অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে (Foot prints on the sands of time)।এই সুযোগের সদ্বব্যবহারের জন্য এখনি যে প্রস্তুতির দরকার তার চরম অভাব আছে বলে আমার মনে হয়।

আমার মতে যে ৯টি মহা কারনেই একবিংশ শতাব্দী মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের বিশেষভাবে বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বর্ণযুগ হতে যাচ্ছে তাহা হলো-

(১) মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বিশ্বের গড় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের তুলনায় বেশি। (২) তরুণ মুসলিম জনসংখ্যা বিশ্বব্যাপি গড় তরুণ জনসংখ্যার তুলনায় বেশি।(৩) তেলের ক্রমবর্ধমান মূল্যের কারনে মুসলিম দেশগুলোই বিশেষ সুবিধা লাভ করবে।(৪) শস্তা শ্রম এবং মজুরী পার্থক্যের কারনে বেশিরভাগ বিনিয়োগ চলে যাবে মুসলিম দেশসমূহে (৫) ইতিহাসের অনিবার্য ধারাবাহিকতায় ইসলামিক আর্থ-সামাঝিক মূল্যবোধের পুনরুত্থান (৬) পারিবারিক সম্পদ এবং ওয়াকফ সম্পত্তির উদ্ভব (৭) মুসলিম জনসংখ্যা পুনঃস্থাপনের হার বিশ্বের সমগ্র জনসংখ্যা পুন:স্থাপনের তুলনায় দ্রুত (৮) পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক মন্দা এবং পেট্রো ডলারের অনিবার্য পতন।(৯) পশ্চিমা বিশ্বে পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও পাশ্চাত্য সভ্যতার অনিবার্য পতন ।

সংলাপ ও সংবিধান

এই নয়টি মহা কারনের ব্যাখ্যা না দিয়ে এই প্রবন্ধে কারণগুলোর রুপরেখা দেওয়া হয়েছে যাহা দেশ ও জাতির উন্নয়নের অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক সংকেত দিচ্ছে তা বুঝতে না পেরে কিছু নন-ইস্যুকে ইস্যু তৈরি করে আজ যে জাতীয় সময়ের অপচয় হচ্ছে সেটা খুবই দু:খজনক। এই জাতীয় সময় অপচয়কে জন-ঘন্টায় (man-hour) রুপান্তর করলে একটা পদ্মা সেতুর অর্থায়ন সম্ভব।২০১১ সালের ১০ মে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলায় এ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে আরা দুই মেয়াদ রাখার ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে জাতি এখন দ্বিধাবিভক্ত। এক্ষেত্রে এরই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন নিয়ে সংলাপ ও সংবিধান-প্রেম নিয়ে যে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় এসেছে  জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে -তা নিয়ে দু’একটি মন্তব্য করতে চাই।

দুঃখের বিষয় হলেও এটা সত্য যে,জনগণের কোন ম্যান্ডেট ছাড়াই  নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংবিধানে এমন পরিবর্তন আনে যা দেশের অধিকাংশ মানুষের মনে আতংক সৃষ্টি করছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চাচ্ছে এবং বারবারই নেতৃবৃন্দ একই কথা বলছে যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অন্যান্য দেশে যেভাবে নির্বাচন হয় আমাদের দেশে সেভাবেই নির্বাচন হবে। এই যুক্তি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতার বহিঃপ্রকাশ। কোন সংবিধানের কথা বলা হচ্ছে ? এই সংবিধান কি যুক্তরাষ্ট্রের, না ইংল্যান্ডের, না ফ্রাঞ্চের? প্রায় ৩০০ বছরের মধ্যে মাত্র কয়েকবার আমেরিকার সংবিধান পরিবর্তন হয়েছে। বৃটেনের পার্লামেন্টারি সিস্টেমের আলোকে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। কিন্তু বৃটেনে কোন লিখিত সংবিধান নেই। সে দেশের রাষ্ট্র পরিচালিত হয় কনভেনশন এবং প্রথার মাধ্যমে। অন্যান্য দেশের মত আমাদের দেশেও একই ভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে- এ কথা বলাই অবান্তর।

যারা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী এনেছেন তারা নিজ নিজ স্থানে যোগ্য ও স্বনামধন্য কিন্তু সংশোধনীতে আপাতত তিনটি অসঙ্গতিপূর্ণ অপব্যাখ্যা করা হয়েছে-১. ইসলামী মূল্যবোধের সাথে অসঙ্গতি, ২. পশ্চিমা গণতন্ত্রের সাথে অসঙ্গতি ও ৩. সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সাথে অসঙ্গতি। প্রথমত, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে বিভিন্ন অনুচ্ছেদে ইসলাম ধর্মকে যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে তা নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, যা মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সাথে আমাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটাবে। দ্বিতীয়ত, গণতন্ত্রের অপব্যাখ্যার কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথেও দূরত্ব তৈরি করবে। এ ছাড়া এই সংশোধনীতে সরকারি দলের প্রয়োজনমতো আংশিকভাবে সুপ্রিম কোর্টের রায় গ্রহণ করা হয়ছে, যা দেশকে একটা বিপর্যয়ের মুখোমুখি এনে দাড় করিয়েছে।

গণভোট

তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে সরকার ও বিরোধীদল দল পক্ষ এবং বিপক্ষ নিয়ে অনেক কথা  বলছেন। দেশ যদি জনগণের হয়ে থাকে, সরকার যদি জনগণের হয়ে থাকে, দেশের সম্পদ যদি জনগণের হয়ে থাকে, রাজনীতি করা যদি জনগণের জন্য হয়ে থাকে, তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে কি হবে না তা জনগণের হাতে ছেড়ে দেয়া যেতে পারে। গণভোটের মাধ্যমেও তত্ত্বাবধায়ক প্রশ্নে সমাধানে আসা যেতে পারে।

গণতন্ত্রের ভাষা এবং নীরব বিপ্লব

তত্ত্বাবধায়ক আর ফিরে আসবে না,এ বিষয়ে এক চুল নড়বো না, এ কথাগুলো গণতন্ত্রের ভাষা নয়।সমাজে নীরব বিপ্লবের (Silent Revolution)যুক্তির সাথে সংগতিপূর্ণ নয় ।মত পরিবর্তনের মাধ্যমেই দিন বদল হতে পারে।Paradigm Shift-এর মাধ্যমেই নতুন ধারার রাজনীতির যাত্রা শুরু হতে পারে।গণতন্ত্র হচ্ছে সহিষ্ণু,গণতন্ত্র হচ্ছে জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দেয়া। এভাবে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের অধিকারের বিষয়গুলোকে হেয় করা হলে অনেকেই ভেবে নেবে যে, আওয়ামী সরকার গণতন্ত্রের লেবাস গায়ে দিয়ে বাকশাল কায়েম করতে চায়। ইতিহাস সাক্ষী, বাংলার জনগণ এ ব্যবস্থাকে মেনে নিবে না।

গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা

স্থানীয় সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এর ফলাফল দ্বারা বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেছে।এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের কাজকর্মে বৈপরীত্য দেখার ফলে চট্রগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সরকার হেরে যায়। এরপর নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে হার। এখান থেকে সরকারের শিক্ষা নেয়া উচিত ছিল। কিন্তু আমরা কি দেখতে পেলাম। এমপি, মন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের লাগামহীন বেপরোয়া এলোমেলো অসামঞ্জস্য কথাবার্তা যা গোটা জাতিকে ভাবিয়ে তুলেছিলো যে, আমরা আজ অভিভাবকহীন কিনা? আমরা আজ নেতৃত্বশূন্য কিনা? ঠিক এরকম অশুভ প্রশ্ন যখন দেশবাসীর অন্তরে ঘুরপাক খাচ্ছিলো ঠিক তখন রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল এই চারটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।চারটিতে জয়ী হলো বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট। এটা কি ১৮ দলের জয়? এখানে জয় পরাজয়ের প্রশ্ন আসছে না। গোটা জাতি যখন বুঝতে পারছিলো যে, কিছু কায়েমী স্বার্থবাদী আমাদের ঘাড়ে চেপে বসতে চাচ্ছে, তারা আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ মুছে ফেলতে চাচ্ছে, আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি কেড়ে নিতে চাচ্ছে ঠিক তখন দিশেহারা পথিক যেমন আলোর সন্ধানে কোন এক জায়গায় আশ্রয় নেয়, ঠিক তেমনি ভাবে ১৮ দলীয় জোটকে চারটি সিটি কর্পোরেশন-এ জয়ী করে বুঝাতে চাচ্ছে যে, দেশবাসী আজ কি চায়? চারটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে একসঙ্গে হারের পর স্থানীয় সরকার ও সমবায় মন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত ছিলো।এতে করে আমি মনে করি, আওয়ামীলীগের ভাব-মর্যাদা কিছুটা হলেও রক্ষা পেত।

এরপর আমরা কি দেখলাম। আওয়ামীলীগ এর ঘাটি গাজীপুরে সরকার দলীয় প্রার্থীর ভরাডুবি। আওয়ামী লীগের বাঘা বাঘা নেতৃবৃন্দ ও এমপি-মন্ত্রী দিনরাত গুণকীর্তন-প্রশংসা করেও নির্বাচনে পরাজয় থেকে রেহাই পাইনি। এই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রায় দেড় লাখ ভোটের ব্যবধানে হারের ফলে সরকারের যদি বোধোদয় হতো যে, তারা জনগণের অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি, গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে পারেনি, তাহলে নতুন করে জনগণের ম্যান্ডেট (mandate) নিতে প্রধানমন্ত্রীর উচিত ছিলো একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঘোষণা দেয়া।এটাই হতো গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা যা দেখা যায় যুক্তরাজ্য ও ভারত ছাড়াও অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে।

সরকারী দল এবং বিরোধী দলগুলো মুখোমুখী অবস্থানে দাড়িয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে প্রধানমন্ত্রী  শুধু আওয়ামী লীগের প্রধান মন্ত্রী নন,তিনি বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের প্রধান মন্ত্রী।ঠিক তেমনিভাবে বিরোধী দলীয় নেত্রী শুধু বিএনপি’র নেত্রী নন, তিনি দেশের ১৬ কোটি মানুষের প্রায় অর্ধেক মানুষের বিরোধী দলীয় নেত্রী।সাধারন মানুষের ভোটের অংকে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ব্যবধান খুবই কম।

জাতিসংঘ ও জাতীয় নির্বাচন

আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং গণচীন নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচনের কথা বলছে। সরকারী দল এবং বিরোধী দলগুলো যার যার অবস্থানে অনড়। এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশ গৃহযুদ্ধের দিকে মোড় নিবে। এমনই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের উদ্যোগ দেশবাসীকে কিঞ্চিত আশার আলো দেখিয়েছে। অচলাবস্থা নিরসনে জাতিসংঘের উদ্যোগে সংলাপ এবং জাতীয় নির্বাচন সংঘটিত হলে তা দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে বলে মনে করি ।

এই প্রবন্ধের মাধ্যমে  যে ৯টি মহা কারণের কথা উল্লেখ করেছি, তা নিয়ে জাতীয় আলোচনা হতে পারে। code of time কে de-code করতে হবে। ইতিবাচক সংকেতগুলোর চ্যালেন্জ  মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি দরকার। এই প্রস্তুতি দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচন এই আলোচনার পথ খুলে দিবে। আমাদের অগ্রগতি নিশ্চিত হবে বলে আমি মনে করি।

 

[নিচের প্রবন্ধটি গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩ তারিখে দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার উপসম্পাদকীয়তে প্রকাশিত হয়। দীর্ঘ দিন  ব্লগে অনুপস্থিত থাকার কারণে তা প্রকাশ করতে দেরী হওয়ায় ব্লগার দুঃখ প্রকাশ করছেন]