ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

ক্রিকেট ও আমাদের বাস্তবতা
এ হুসাইন মিন্টু

প্রথমে এই প্রশ্নের সোরাহা হওয়া প্রয়োজন যে ক্রিকেট আমাদেরকে কি দিয়েছে ?
প্রতি পাঁচ বা তার অধিক পরাজয়ের বিপরীতে একটি জয় এলেও আমি মনে করি,একাত্তরের স্বাধীনতা লাভের পর থেকে আজ পর্যন্ত বাঙালিদের যে ক’টা বড় অর্জন তার মধ্য ক্রিকেট অন্যতম । ক্রিকেট আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে আমাদরকে নতুন করে তুলে ধরেছে । 1971-এ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যপদ্ধের পর ত্রিশ লক্ষ শহীদের তাজা প্রাণ আর হাজার হাজার মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বিশ্বের আন্যতম সুসজ্জিত সেনাবাহিনীকে সসস্ত্র যুদ্ধে পরাজিত করে আমরা বাঙালিরা বিশ্বের মানচিত্র বদলে দিয়েছিলাম লাল সবুজের পতাকা উত্তলনের মাধ্যমে । তখন বাঙালিদেরকে সারা বিশ্ব নতুন করে চিনলেও সেই পরিচয়ে নতুন মাত্রা দিয়েছে ক্রিকেট । যা কোনো এম পি, মন্ত্রী দিতে পারেন নি ক্রিকেট তাই দিয়েছে । যা কোনো বড় আসনের কর্তা ব্যক্তি দিতে পারেন নি ক্রিকেট আমাদেরকে তাই দিয়েছে । বঙ্গবন্ধুকে ব্যতিত অন্যকোনো নেতা নেত্রীর পক্ষে যা করা সম্ভব হয় নি ক্রিকেট তাই করে দেখিয়েছে । গত বাইশ বছর বা তারও অধিক সময় ধরে এই ভূ-খন্ডে দুইটি চাঁদ (ঈদুল ফিতর, যিল হাজ্ঝ) ছাড়া যা আর কারও পক্ষে করা সম্ভবপর হয় নি ক্রিকেট করতে সক্ষম হয়েছে ইতোমধ্যেই ।

75-এ ঘাতকদের হাতে স-পরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যা হবার পর এদেশের আনাচে কানাচে কলমি শাকের মত বহু নেতা নেত্রী জন্মেছে আবার হারিয়েও গিয়েছে অজান্তে । কিন্তু কেউ কি পেরেছে দ্বিধা বিভক্ত জাতিকে একত্রিত করতে ? না বিজয় দিবসে, না ছাব্বিশে মার্চে, না ষোলই ডিসেম্বরে । কিন্তু ক্রিকেট পেরেছে । হাজারো না পাওয়া, হাজারো না বিশ্বাস আর রাজনৈতিক কোলাহলের ভিড়ে জীবন যখন অতিষ্ট ঠিক তখনি ছোট্ট হলেও কিঞ্চিত সুখের বার্তা নিয়ে আসে ক্রিকেট । ষোল কোটি বাঙালিকে এক কাতারে এনে দাড় করে দেয় ষোলজন ক্রিকেটার । সকল রাজনৈতিক দ্বন্ধ ভুলে, সকল মতানৈক্য ভুলে, সকল বৈষম্যের কথা ভুলে, সকল ভেদাভেদের কথা ভুলে আমরা অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকি মিরপুরের শেরে-ই বাংলা স্টেডিয়াম, চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ স্টেডিয়াম, খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়াম কিংবা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক ভেন্যুর দিকে আমরা হারি না জিতি সেই লক্ষে ।

যে ক্রিকেটকে ঘিরে আমাদের এত আবেগ, এত ভালবাসা, সেই ক্রিকেটকে বিপর্যয়ের মুখে ঢেলে দেবার কোনো প্রশ্নই আসে না । পাকিস্তানের নাম শুনলে বা পাকিস্তানিদেরকে দেখলে আমাদের রক্ত এখনো যেমন ফিনকি দেয় ওঠে, ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিতে ইচ্ছে করে, ঠিক তার চেয়েও বহুগুন ঘৃণা ও প্রতিশোধের আগুন আমাদের তরে পাকিস্তানিদের হৃদয়ে দাউ দাউ করে জ্বলে । কারণ বিজয়ের উল্লাস সকল ক্ষত ধোঁযে নিলেও কিন্তু পরাজয়ের গ্লানি ও পরাজিতের মনের ক্ষত যুগ যুগ ধরে অম্লান থাকে । বিজয়ীর চোখে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টি থাকলেও পরাজিতের চোখ বয়ে বেড়ায় প্রতিহিংসার অগ্নি । অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, জঙ্গি নির্মূল, শিক্ষা ও সাম্প্রদায়িক সহবস্থানের দিকে দিয়ে বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে গিয়েছে । আর এই অগ্রগতিই পাকিস্তানিদের মনের নির্বাণ প্রতিহিংসার অগ্নিকে ক্রমস দাবানলে পরিনত করছে । যুদ্ধাপরাধের বিচার সেই দাবানলে তুষের ছিটা হয়ে এসেছে । কারণ এদেশীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা মানে কোনো না কোনোভাবে পাকিস্তানিদের দিকেই অঙ্গুলি পদর্শন করার চেয়ে কোনো অংশে কম না । ( এছাড়াও আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ইদানিংকালের প্রকাশ্য কিছু পাকিস্তান বিরোধী বক্তব্য) এদোশীয় হায়নাদের বিচার সু-সম্পন্ন করা মানেই ততকালীণ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিচারের দাবি জোরদার করা । এ কথা আমাদের নেতা নেত্রী বা বুদ্ধিজীবিদের মোটা মাথায় না ঢুকলেও পাকিস্তানিদের চিকন মগজে ঠিকই আছে । তাইতো এদেশীয় বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনসহ জামায়াতি ইসলামের হেড কোয়াটার পাকিস্তান যে কোনোভাবেই চাইবে এই বিচারকে বাধাগ্রস্ত করতে । আর সে জন্য পাকিস্তানিদেরকে এদেশে সশরীরে আসার কোনো প্রয়োজন পড়বে না । এদেশে এখনো পাকিস্তানিদের বহু সহচর রয়েছে যাদেরকে কিঞ্চিত পথ বাতলিয়ে দিলেই তারা নিজেদের স্বার্থ ভেবে হাসতে হাসতে এমন কিছু করে বসবে যা হয়ত আমরা কল্পনাও করতে পারছি না । যার প্রামাণস্বরূপ ইতোমধ্যেই আমরা বিভিন্ন ধরনের সংঘর্ষমূলক করমকান্ড, ইনিয়ে বিনিয়ে বিচার বিরুদ্ধ বক্তব্য ও কর্মসূচী এবং হেকিং ফেকিং দেখতে পারছি । এত কিছুর পরও আমাদের সরকার সতর্ক তো হয় নি উল্টো বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমকে পাকিস্তান সফরে পাঠিয়ে শত্রুকেই সহযোগিতা করতে যাচ্ছে পরক্ষভাবে । পাকিস্তানে আমাদের দলকে পাঠানোর কী এমন অত্যাবশ্যকতা পড়ল ? যে পাকিস্তান সবার জন্য শতভাগ নিরাপদ হবার পরও আমাদের জন্য কুড়িভাগ নয়, সেই পাকিস্তানকে যখন অন্যরা মোটেও নিরাপদ ভাবছে না তখন আমাদের কর্তাদের হৃদয় পাকিস্তান প্রীতিতে মোমের মত গলে যাচ্ছে !আমরা কি ভুলে গেছি 2009 সালের 3রা মার্চের কথা ? পাকিস্তান সর্বস্বীকৃত একটি জঙ্গি রাষ্ট্র । যেখানে মসজিদ থেকে শুরু করে এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে বোমা না ফাঁটছে, এমন কোনো দিন নেই মানুষ হতাহত না হচ্ছে । এমতাবস্থায় আমরা সেখানে আমাদের ক্রিকেট দলকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে দুঃসাহস অন্যকোনো দেশ দেখাতে পারছে না । পাকিস্তান সরকার জঙ্গিদেরকে মদদ দেয় একথাও সর্বজন জ্ঞাত । সেখানে যদি আমাদের টিম কোনো হামলার শিকার হয়, তার দায় কে নিবে ? আর দায় নিলেই কী হবে ? পুরো পাকিস্তানের বিনিময়ে আমরা একজন সাকিব তামিমকে ফিরে পাবো ? আই সি সি কেন আমাদেরকে দল পাঠাতে বলবে ? কেনই বা চাপ দিবে ? আর যদি চাপ দিয়েই থাকে, আমাদের কর্তাগণ কেন আই সি সি-কে বলছে না যে আমাদের আগে থেকে যারা পাকিস্তানে দল পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে আগে তাদেরকে পাঠান পরে আমরা যাবো ? আগে না হয় আই সি সি-তে আমাদের কোনো নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত ছিল না, এখন তো আমাদের একজন যেমনি হোক আই সি সি-র নেতৃত্ব দিচ্ছেন তার এত পাকিস্তান প্রীতি কেন ? নাকি শেষ পর্যন্ত এ কথাই সত্যি হতে যাচ্ছে যে জঙ্গলের বিঁষধর সর্পের চেয়ে বিছানর মত্কুণ অধিক ক্ষতি সাধন করে ?