ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

শুরুটা হয়ে ছিল আজ থেকে চার বছর আগে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে । ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসের চৌদ্দ তারিখে যে খবরটি সারা বিশ্বে হইচই ফেলে দিয়ে ছিল, তা ছিল একটি জুতার খবর । বিশ্বের এমন কোনো গণমাধ্যম ছিল না যেখানে মুন্তাদার আর জায়েদীর সেই জুতাটি পদর্শন করা হয়নি । ঘৃণার কৃপাণ কতখানি তীক্ষ্ম হতে পারে সাংবাদিক মুন্তাদার আল জায়েদীর সেই জুতা ছিল তার প্রথম প্রমান । তারপর ভারত চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে, এরূপ ঘটানা ঘটেছে পুনঃপুন: বার । আর উক্ত ঘটনাগুলোর সর্বদা শিকার হয়েছেন রাজনীতিবিদগণ । সর্বশেষ ঘটল আমাদের দেশে, বায়তুল মোক্কারমে । নৌ-মন্ত্রী শাজাহান খান জুতা নিক্ষেপের শিকার হয়েছেন । তাকে লক্ষ্য করে একাদিক জুতা ছুড়ে মারা হয়েছে । এখন প্রশ্ন হচ্ছে এরপরও সপদে বহাল থাকার মত নৈতিক কোনো অধিকার তার রয়েছে কিনা ? থাকতেও পারে, আমাদের দেশ বড়ই আজীব দেশ ! এখানে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা চোখে দেখেও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় ।

এটা সেই দেশ যে দেশের স্বাধীনতার জন্য অকাতরে লাখ লাখ তাজা প্রাণ ঝরিয়ে দিলেও সেই দেশের জন্মের ইতিহাস তথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে একেক জনের মুখে একেক রকম গল্প শুনা যায় ! অর্থাত্ নিজেদের জন্মের ইতিহাস নিয়ে আমরা ঐক্যমতে পৌঁছতে পারি না । শুধু তাই নয়, কেবল মাত্র ঠুনকো স্বার্থের জন্য আমরা স্বাধীনতার ঘোষকের নাম পর্যন্ত বদলে বলতে দ্বিধাবোধ করি না । যার জন্যে স্বাধীনতা পেলাম, তার নামে কুত্সা রটাতে পিছ পা হই না ! এটা সেই দেশ, যে দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে এমপি, মন্ত্রী গণ অন্যের কুত্সা গাইতে গাইতে পাঁচ বছর কাটিয়ে দেন হাসতে হাসতে । এটা সেই দেশ, যে দেশ প্রজাতন্ত্র হওযা সত্ত্বেও এখানকার অনেকে যুবরাজ বা রাজকুমারদের মত বুক ফুলিয়ে চলে । এটা সেই দেশ যে দেশের ধন সম্পদ লুট করে বিদেশে প্রচার করার পরও অনেকে নীতি ও সত্যের সার্টিফিকেট বিলিয়ে বেড়ায় । লুটেরাদের বিচারের প্রসঙ্গ উঠলেই হরতাল হয়, অবরোধ হয়, ভাংচুর হয়, অগ্নিসংযোগ হয় !

এটা সেই দেশ, যে দেশের লাখ লাখ মানুষকে যারা হত্যা করল, হাজার হাজার মা বোনের সম্ভ্রম যারা লুটে ছিল তাদের বিচারের বিরুদ্ধে অনেকেই সদম্ভে বক্তব্য দিয়ে বেড়ায় অথচ তাদের পিছনে বাহবারও কোনো কমতি নেই ! এটা সেই দেশ, যে দেশে গণতন্ত্রের নামে প্রকাশ্য দিবালোকে বিশ্বজিতদেরকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় । এটা সেই দেশে, যে দেশে সাজাপ্রাপ্ত কেউ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হয় ! এটা সেই দেশ যে দেশের আরেক স্বরাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে পরিকল্পিতভাবে গ্রেনেড ফাটিয়ে একাধিক লোক হত্যা করেছিল ! এটা সেই দেশ, যে দেশে দুর্নীতির দায়ে মন্ত্রীর দপ্তর যায় কিন্তু মন্ত্রীত্ব যায় !

আমাদের দেশের এতসব বিস্ময়কর কর্মের জন্মদাতা রাজনৈতিকগণ ভালো কিছু করতে পারুক বা না পারুক, উপর মহলের তোষামোদের বেলায় কেউ পিছিয়ে নেই । তারা মনে করেন, তোষামোদ বা চাটুকারীতা দিয়ে আমরা আমাদের নেতানেত্রীদের এমন জায়গায় নিয়ে যাব যেখানে আর কেউ পৌঁছতে পারেনি । এতে করে আমরা সারা জীবন ক্ষমতায় থাকতে পারব কিংবা কখনো ক্ষমতাচ্যুত হবো না । কিন্তু বাস্তবতা কী বলে ? বাস্তবে হিতে বিপরীত হয়েছে । এদের অতিরঞ্জিত প্রশংসা তাদের নেতানেত্রীদের মহিমান্বিত তো করেইনি উল্টা তাদের ব্যক্তিগত ইমেজকে সমালোচনার মুখে ঠেলে দিয়েছে । এ ক্ষেত্রে আমি অন্যান্যদের কথা বলতে চাই না । যার শ্রদ্ধায় আমার শির অবনত হয় তার কথা বলছি । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান, মৃত্যুর পরও তাকে যেসব সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছে তার অধিকাংশের জন্যেই একাত্তরের পরবর্তী আওয়ামী লীগ দায়ী । একাত্তরের পরবর্তী নেতাকর্মীগণ বঙ্গবন্ধুকে বঙ্গবন্ধুর মতন থাকতে না দিয়ে তাদের চাটুকারিতা দিয়ে অতিরঞ্জিত করতে গিয়ে অনেক সময় সমালোচনার মুখে ঠেলে দিয়েছেন । আমাদের রাজনীতিবিদগণ তাদের নেতানেত্রীদেরকে নিয়ে প্রশংসা করতে গিয়ে বাকরুদ্ধ হন না, বাকনিয়ন্ত্রনহীন বা অসংযমী হয়ে ওঠেন যার কারণে তারা নিজেরাও বুঝতে পারেন না কী বলতে গিয়ে কী বলে ফেলছেন । আর এসব নিয়ন্ত্রহীন কথাবার্তাই জনমনে অতুষ্টি বা বিরাগের জন্ম দেয় । সমাজ গড়া, নির্মাণ বা বিনির্মাণের কৃতিত্ব যেমন অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিকদের উপর যায় পক্ষান্তরে যে কোনো সামাজিক অবনতি, রাষ্ট্রীয় যে কোনো ব্যর্থতার দায়ও রাজনৈতিকদের উপর-ই বর্তায় ।