ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

3918747
তখন আমি সবে মাত্র সপ্তম শ্রেণিতে উঠেছি। বাড়তি বই পড়ার অভ্যাস তখনও হয়নি। তবে এক ছুটিতে এক খালার বাসায় বেড়াতে গিয়ে একটি বই তাদের ঘরে আবিষ্কার করলাম। সন্ধ্যার দিকে শুরু করে সারা রাত ধরে পড়লাম। শুধু পড়লামই না কেঁদে কেঁদে নিজের আশে-পাশে জলাশয়ের সৃষ্টি করলাম। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনার ফাকে অনেক বই পড়ি, কেন জানি মনে হল সেই বইটা আবার পড়ি। তো পড়লাম এবং আবার কাঁদলাম। লেখকের লেখার যাদুতে নিজের যৌবনকালকে ফাঁকি দিয়ে আবার যেন সেই কিশোর পাঠক হয়ে গেলাম। কী জানি! এটাই হয়তো ভালো লেখকদের লেখার বৈশিষ্ট্য।

যাই হোক, গল্পটা তের বছরের এক ছন্নছাড়া বালক আরিফুল ইসলাম তপুর। শরীরের বিভিন্নস্থানে কাঁটা ঘায়ের দাগ, নোংরা কাপড়, উষ্কখুষ্ক চুল এগুলোই তার বাহ্যিক বৈশিষ্ট। তার রাত্রি যাপন হয় তাদের বাসার রান্নাঘরের স্টোররুমে, খাওয়া-দাওয়াটাও সেখানেই। কোনো মতে টেনেটুনে আজ সে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। নেই কোন বন্ধু-বান্ধব, আর পরিবার তো থেকেও নেই।

তপুর বর্তমানটা এমন হলেও অতীতটা কিন্তু মোটেও এমন ছিল না। এক সময় তপু ক্লাসের ফার্স্ট বয় ছিল। পরিবারের সকলের আদরের মধ্যমণি হয়ে থাকত সে। কিন্তু পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় হটাৎ এক দুর্ঘটনায় তপুর বাবা মারা যায়। তার পর থেকেই প্রেক্ষাপট বদলে যায়। আসলে তপুর মা কখনও এই দুর্ঘটনা মেনে নিতে পারেনি। সে সমস্ত দায়ভার চাপায় তপুর ওপর। নানা রকম ভাবে নির্যাতন করতে থাকে তপুকে। তপুর শরীরে বিভিন্ন কাঁটা ঘায়ের উৎস এইসব নির্যাতনই। এক সময় তপুর জীবনে প্রিয়াঙ্কা নামের এক কিশোরীর আগমন হয়। প্রেক্ষাপট আবার বদলাতে থাকে। তপু আবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে, আবার জীবনকে ভালবাসতে শুরু করে, আবার দৌড়তে শুরু করে।

গল্পে প্রিয়াঙ্কা নামক কিশোর মেয়েটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র বহন করেছে। লেখক তার চরিত্রে চাঞ্চল্যতার সাথে সাথে উদারপনা ও বুদ্ধিমত্তা জাতীয় বৈশিষ্টাবলি ফুটিয়ে তুলেছেন।

লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালের রচিত অন্যতম সেরা কিশোর উপন্যাস এই ‘আমি তপু’। এটি ২০০৫ সালের অমর একুশে বইমেলায় পার্ল পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত হয়। লেখকের যতগুলো বই আমি ইহজীবনে শেষ করেছি তার মধ্যে এটিই আমার কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে মনে হয়েছে। হয়তো খুব কম বই পাঠকই রয়েছে যারা এটি পড়েননি। যারা এখনও পড়েননি তারা খুব বড় কিছুই মিস করছেন। সময় নিয়ে পড়ে ফেলুন অসাধারণ এই বইটি। হতাশ হবেন না, কথা দিলাম।