ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

আমি তিন দশক আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের ছাত্র ছিলাম। ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ নামে খ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কখনও র‌্যাগিং দেওয়া দেখিনি বা শুনিও নাই। আমার জানা মতে, দেশের বড় বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আগে কখনও র‌্যাগিংয়ের প্রচলন ছিল না। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ব্যতীত দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে এই র‌্যাগিং মহামারি রূপ ধারণ করেছে।
.
আধিপত্য বা কর্তৃত্ব বিস্তার অথবা নিছক মজার ছলে কতিপয় সিনিয়র শিক্ষার্থী র‌্যাগিং দিয়ে থাকেন। উক্ত র‌্যাগিং প্রদানকারী শিক্ষার্থীদের অধিকাংশ সহপাঠি বা সিনিয়র ভাইয়েরা এই র‌্যাগিং সমর্থন করেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণও র‌্যাগিংকে নিরুৎসাহিত করেন। কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ‘র‌্যাগি মুক্ত ক্যাম্পাস’ ঘোষণা করেছেন। তবুও র‌্যাগিং বন্ধ হচ্ছে না।
.
বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে তো প্রায়শই র‌্যাগিং এর প্রতিযোগিতা চলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে যেসব নবীন শিক্ষার্থী মেসে অবস্থান করেন তারাও র‌্যাগিং থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। তাদেরকে ফোন করে অন্যত্র নিয়ে গিয়েও ‘র‌্যাগ’ দেওয়া হচ্ছে। যেসব নবীন শিক্ষার্থী ফোন পাওয়ার পরে ভয় পেয়ে বড় ভাইদের কাছে যান না, তাদের ওপর চলে অভিনব প্রক্রিয়ায় অমানবিক নির্যাতন। নবাগত শিক্ষার্থীদেরকে দিগম্বর করতেও ছাড়ে না সিনিয়র ভাইয়েরা! এ ধরনের অমানবিক নির্যাতন কি মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়? এটি কি কোনো সভ্য সমাজের কাজ হতে পারে?
.
বিশ্ববিদ্যালয়ে বা মেডিকেল কলেজে অধ্যয়ন করা প্রতিটি শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থাকে দীর্ঘদিনের। অনেক সাধনা করে বহু কাঙ্ক্ষিত সেই বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার পর তাদের সেই স্বপ্ন পরিণত হয় দুঃস্বপ্নে! শুধুমাত্র র‌্যাগিং এর কারণে তাদের এই অবস্থা হয়। এই ‘র‌্যাগিং’ বন্ধ হলে তাদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হবে স্বর্গোদ্যানে- শান্তি নিকেতনে। অথচ অক্রান্ত অনেক শিক্ষার্থী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে পাগল হয়ে যাচ্ছেন। অনেকে আবার আত্মহননের পথ পর্যন্ত বেছে নিচ্ছেন!
.
‘Great Expectations’ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তাদের ‘Paradise Lost’ হয়ে যাচ্ছে। অনেক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটছে। র‌্যাগিং সহ্য করে যারা টিকে থাকেন, তাদের প্রাণও থাকে সরাক্ষণ ওষ্ঠাগত। হঠাৎ করে বড় ভাইদের কথা স্মরণ হলে বা তাদেরকে দেখলে নবাগত শিক্ষার্থীদের প্লীহা চমকে ওঠে, আতঙ্কে হৃদ-স্পন্দন বেড়ে যায় বহু মাত্রায়।
.
বিশ্ববিদ্যালয় হলো মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তজ্ঞান চর্চার অবাধ ও স্বধীন ক্ষেত্র। সেখানে কেন এই র‌্যাগিং বাধ সাধবে? কেন নবাগতদের স্বাধীন চলাফেরায় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে? যে করেই হোক র‌্যাগিং এর পাগলা ঘোড়ার লাগাম টানতে হবে এবং এই র‌্যাগিং বন্ধ করতে হবে অনতিবিলম্বে। আর এটি করতে না পারলে জাতির সামনে নেমে আসবে গভীর অন্ধকার। মেধাশূন্য হয়ে পড়বে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। বুদ্ধি প্রতিবন্ধীর সংখ্যা বেড়ে যাবে অতি মাত্রায়। অতএব, র‌্যাগিং বন্ধে দেশের সচেতন শিক্ষিত সমাজ, বুদ্ধিজীবী ও সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। র‌্যাগিং বন্ধে যা করণীয় বলে আমার মনে হয় তা নিম্নরূপ:
১। র‌্যাগিং এর কুফল সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ মাঝেমধ্যে শ্রেণিকক্ষে আলোচনা করতে পারেন এবং র‌্যাগিংকে নিরূৎসাহিত করতে পারেন।
২। বিভিন্ন স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরবর্তী সময়ে (জানুয়ারি থেকে জুন) র‌্যাগিং সংক্রান্ত ‘টকশো’ করতে হবে।
৩। বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকায় র‌্যাগিং বিষয়ে দেশের সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজকে লেখালেখি করতে হবে।
৪। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম- ফেসবুকে এবং অনলাইন পত্রিকায় এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালযের ছাত্র-ছাত্রীরা ব্যাপক লেখালেখি করতে পারে।
৫। দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন ছাত্র সমাজ র‌্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভিতরে ও বাইরে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে।
৬। র‌্যাগিংয়ের কুফল নিয়ে বিভিন্ন নাটক-নাটিকা রচনা করে তা রেডিও এবং টেলিভিশনের প্রচার করতে হবে।
৭। র‌্যাগিং বন্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। র‌্যাগিং প্রদানকারী শিক্ষার্থীদের আইনের অওতায় আনতে হবে।
৮। র‌্যাগিংয়ে আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারকে নিতে হবে।
৯। যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে র‌্যাগিং বন্ধ হবে না সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
.
লেখক-
মোঃ ইব্রাহিম হুসাইন
শিক্ষক, ইংরেজি বিভাগ, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মহিলা কলেজ
মিরপুর-২, ঢাকা-১২১৬