ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

প্রথমেই একটা কথা বলেনেই সেটা হলো, আমি ভীষণ ভয়ে আছি। কেনো আছি সেটা না হয় একটু পরেই বলি। তবে আমার কিছুদিন যাবত মনে হচ্ছে সরকার ভীষণ চাপে আছেন। নানা লোকের নানা বায়না পূরণ করতে গিয়ে বড্ড হিমশিম খাচ্ছেন। একজনের বায়না পূরণ করলে আরেকজন নতুন বায়না করে বসছেন। ঘরের কাউকে খুশি করতে গেলে বাইরের ‘কংশোমামা’টা বেজার হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কেউই বুঝতে চান না আসেলে সবাইকে একসঙ্গে খুশি করা যায় না। সেটা সম্ভবও নয়। জগতের প্রত্যেক সিদ্ধান্ত যতো ভালোই হোক না কেনো সেটা কারো না কারো বিপক্ষে যাবেই। তারপরও ‘সাধ্য মতো’ চলছে আরকি। পুরনো কথায় ফিরে যাই। আমার ভয়ের কারণ হচ্ছে, কিছু বলতে গিয়ে মানহানি আইনে পড়ে যাওয়ার! কারণ আমার কথাও কারো না কারো পক্ষে বিপক্ষে যেতে পারে।

যাই হোক, বেশ কিছুদিন বাংলাদেশে অষ্টম-পে স্কেলে শিক্ষকদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মহদ্য়রা কর্মবিরতি ও ধর্মঘটে মেতেছেন। না মানলে সামনে বৃহৎ আকারের কর্মসূচি আসছে বলেও হুমকি দিয়ে রেখেছেন। বিষয়টি সরকার হালকাভাবে নিলে মনে হচ্ছে ‘ভয়াবহ’ কিছুে একটা হবে। তার প্রমাণও কয়েকদিন আগে পেলাম। মাননীয় অর্থমন্ত্রীর ‘জ্ঞানের অভাব’ মন্তব্যে বেজায় চটেছেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। অবশ্য ক্ষোভ তো হওয়ারই কথা, যারা দেশকে উচ্চ শিখরে নিয়ে যাচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে এতো বড়ো মন্তব্য! এটা মেনে নেওয়া যায় না! তাই শিক্ষকদের হুঙ্কারে মাননীয় মন্ত্রী ‘অনুধাবন করলেন’ আসলেই এমন মন্তব্য করা সমুচিন হয়নি। তাই প্রয়োজন পড়লো বক্তব্য প্রত্যাহারসহ দুঃখ প্রকাশ করার। আসলে মাননীয় অর্থমন্ত্রী যদি মন থেকেও এই মন্তব্য করে থাকেন তা হলেও তাকে দুঃখ প্রকাশ করতে বাধ্য করা হতো। কারণ সরকার চান না একজন মন্ত্রীর জন্য সারাদেশের শিক্ষক সমাজ তার বিরুদ্ধে চলে যাক! তাই মন্ত্রীর নিজের বক্তব্য নিজের কাছেই থাকুক!

আসলে এটাতে কোনো সন্দেহ নেই যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা উন্নত জাতি গঠনে বিরাট ভূমিকা পালন করে থাকেন। তবে এটাও মানতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষকরা তাদের শিক্ষার্থীদের এটাও শেখাচ্ছেন কীভাবে দ্বিমুখী আচরণ করতে হয়। কীভাবে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে হয়। হোক না সেটা একটু ‘দৃষ্টিকটু’ পদ্ধতিতে! বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্দোলনে যাওয়ার মূল কারণ তাদের মর্যাদা লঙ্ঘণ করা হয়েছে। দ্রব্য মূল্য বৃদ্ধির এই বাজারে বেতন কমিয়ে ‘ফকিরি’ হালে ছেড়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। তারা প্রায় বলে থাকেন পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে বিশ্ববিদ্যলয়ের একজন শিক্ষকের বেতন প্রায় এক লক্ষ ৩০ হাজার টাকা বা তারও বেশি। আর সে তুলনায় তাদের অর্ধেকও নয়। আসলে ভারতের যে অর্থনীতি আর বৃহৎ আকার সেটার সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করলে সেটা কতোটুকু ন্যায় সঙ্গত হবে?  এটা তারা স্বপ্নেও ভাবেন না।

প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স থেকে যে অর্থ পাচ্ছেন সেটার কতোটুকু দেন সরকারকে? আর সে টাকার কতোটুকু ভাগ পায় সরকারি আমলারা? যদি সেটাতে কোনো ভাগ না দিয়ে থাকেন তাহলে তাদের বেতন বাড়ালে শিক্ষকদের বুকে লাগে কেনো? এ প্রসঙ্গে একটা  জনপ্রিয় একটা গল্প মনে পড়ে গেলো।  হয়তো সেটা অনেকেরই জানা, তবুও বলি। একটি ছোটো ছেলের ক্ষুধা লাগলে তার মাকে বলেন সে মুড়ি খাবে। তখন তার মা বলেন ভাততো রান্না হয়ে গেছে, তো তুমি ভাত খাবে নাকি মুড়ি খাবে। ছেলেটি উত্তরে বলেন, ভাত খাওয়ার পর মুড়ি খাবো। অর্থাৎ তার দুটিই চাই, এবং সেটা তাকে দিতেই হবে। না দিলে বলোহরি কাণ্ড আরকি।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও সেই একই অবস্থা। নিজেদের অভাবের কথা বলে গরীবের শিক্ষাকে উচ্চমূল্যে বিক্রি করে তাদের নাগালের বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন। সার্বজনীন শিক্ষার কথা বলে প্রকৌশলী অনুষদেও সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স শুরু করেছেন। টাকাওয়া শিক্ষার্থীদের পড়াতে গিয়ে যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কল্যাণে শিক্ষক পরিচয় পেয়েছেন তাদের কথা ভুলে গেছেন। হাতে নোট ধরিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যান। কারণ তাদের রাতের শিক্ষার্থীদের পড়ানোর জন্য প্রস্তুতি দরকার। এই ছোটলোক গরীবের সন্তানদের না পাড়ালেও এমনিতেই প্রতি মাসে নিজের অ্যাকাউন্টে বেতন জমা পড়বে। আর রাতে না পড়ালে বৌ-ছেলে-মেয়েদের সুখ কেনা যাবে না। তাই দিনরাত শুধু কামান। আবার সরকার যদি সরকারি আমলাদের জন্য শিকি পয়সা বেতন বাড়ান সেটাও চান। অর্থাৎ গাছেরটাও চাই গাছের নিচেরটাও চাই। না দিলে যা হয় আর কি সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি! অথচ এটা করার কথা ছিলো সেসব শিক্ষকদের যারা সান্ধকালীন মাস্টার্স-এর বিপক্ষে অবস্থান করে গরীব অসহায়দের কথা ভেবে শিক্ষা বাণিজ্য থেকে নিজেদের সরিয়ে রেখে শুধু বেতনের ওপর সংসার চালান। কিন্তু তাদেরকে এই আন্দোলনে দেখি না।

বিশ্ববিদ্যালয় মানে কী? এখানে শুধু শিক্ষকরাই শেখাবেন, আর শিক্ষার্থীরা শুধু চেয়ে চেয়ে শিখবেন? কয়জন শিক্ষক আছেন তার শিক্ষার্থীর কাছে কিছু শেখেন? হ্যাঁ, একচেটিয়া করে বললে হয়তো অন্যায় হয়ে যাবে। তবে ব্যতিক্রম কখনো উদাহরণ হতে পারে না। অনেকে আছেন হয়তো অনেক ‘মহৎ’; শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উঠবসা। তবে তারা যদি ইহলোক ত্যাগ করেন? তখন এদের স্থলে কারা আসবেন? নিজেদের স্বার্থ হাসিলের ধান্দায় যারা থাকেন তারাই। আর যারা এর বিপক্ষে কথা বলবেন মননীয় মন্ত্রীর মতো তাকেও দুঃখ প্রকাশ করতে হবে। নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিতে হবে। কারণ এটাই নিয়ম। কারণ সরকার মনে করেন ‘যাক জাতি থাক পিরিতি’।

হ্যাঁ, অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে। মাননীয় মন্ত্রী কি ধোয়া তুলসি পাতা? হ্যাঁ সেটা হয়তো তিনি নন। তবে সেটা কেনো নন। এটাও আমরা বুঝি। কেনো দুইদিন আগে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর ভ্যাট আরোপ করে আন্দোলনের মুখে পড়ে দুইদিন পর বলেন এটা বিশ্ববিদ্যালয়কেই দিতে হবে। আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মন্ত্রী কিংবা সরকারের সব কথাই জনগণ বোঝেন। কিন্তু কেউই কাউকে কিছুই বলতে পারেন না। কারণ তাদেরও তো আমার মতো মানহানি আইনের ভয় আছে!