ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

 

গ্রাম বাংলার রূপ দেখেছেন? বাংলার-ই প্রত্যন্ত এক গ্রামে জন্ম মেয়েটির। গ্রামের আলো বাতাসেই হেসে খেলে দৌড়-ঝাঁপ করে বেড়ে উঠেছে মেয়েটি। এভাবেই কাটছিল তার উচ্ছল দিনগুলো। দিনে দিনে কেটে গেলো অনেক সময়। মেয়েটি হয়ে গেলো তরুণী। বেশ কাটছিলো তার দিন গুলো। জীবনের অনেকগুলো বসন্ত একা একা কাটানোর পর ক্লান্ত তরুণী অনুভব করে সে একা, বড় একা। তার একজন জীবন সঙ্গী দরকার যে তাকে খুব ভালোবাসবে, পাশে থাকবে, হবে জীবন মরণের সাথী। যৌবনের এই লগ্নে একজন পুরুষ খুব আপন হয়ে তার। কথা দেয় পাশে থাকার। ভালোবাসার ফুল ফোঁটে তার জীবনে। পরম আপন হয়ে উঠা পুরষটিকে আঁকড়ে ধরে পরম বিশ্বাসে। সাদামাটা জীবনটা রঙ্গীণ হয়ে উঠে তার পরম ভালোবাসার বাঁধনে বাঁধা পুরুষটার স্পর্শে। হুম, এখন পর্যন্ত এই পুরুষটি-ই গল্পের নায়ক। সেই নায়কের একটা নাম দরকার। নায়কের নাম ফারুক। গ্রাম বাংলার নায়কের এর চেয়ে আধুনিক নাম কি দরকার, তাই না?

গল্পে ফিরে আসি। এভাবে ভালোই কেটে যাচ্ছিল তাদের। কিন্তু সময় তো থেমে থাকে না। পরম কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ব্যাকুল হয়ে উঠে যৌবন মন। ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে তারা। নায়ক ফারুকও দেখায় তরুণীটিকে রঙ্গীণ কিছু স্বপ্ন। দু’জনের ছোট্ট একটি ঘর যেখানে দু’জনে শুধুই দু’জনার। দুজন দেখা করে অতি গোপনে অভিভাবকের চোখ ফাঁকি দিয়ে। একদিন অন্য অনেক দিনের মতই তারা ঘুরে বেড়ানোর এক পর্যায়ে যৌবনের চেপে রাখা আকাঙ্খা জেগে উঠে মনে।

নায়িকা বলে, না এটা ঠিক না। এটা উচিৎ না। এটা সমাজের চোখে ভালো হবে না। আগে বিয়ে হোক, তারপর…। তখন তো আমি শুধু তোমারই।
নায়ক ফারুক নিজেকে সামাল দিতে পারেনা। সে বলে, বিয়ে তো করবোই আজ বাদে কাল…। কাল সব হতে পারলে আজ নয় কেন? এটা কিছুই নয়। কিছু হবে না তোমার। বিয়ে তো আমি অন্য কাউকে করছি না জান, তোমাকেই করবো।

আকাশে বিদ্যুৎ না চমকালেও আদিম সুখে মেতে উঠে দুই নায়ক-নায়িকা, নায়িকার ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। ইচ্ছায় হলে আমরা সেটাকে বলবো ভালোবাসার গভীরতা, আর অনিচ্ছায় হলে বলবো ধর্ষণ। সেদিকে যাচ্ছিনা আমরা।

সারাটা দিন পেরিয়ে রাত নেমে আসে পৃথিবীতে। সকালের মতোই লোকচক্ষুর অন্তরালে অভিভাবকদের অজান্তে স্থানীয় কলেজের গেটে নায়িকাকে নামিয়ে দিয়ে যায় নায়ক। নায়িকার মনে অনুশোচনা হয়, এ কি করলো সে? এ যে অপরাধ! কিভাবে এই মুখ দেখাবে তার পরিবারের মানুষকে? কিন্তু একরকম পালিয়েই যায় নায়ক ফারুক।

কিন্তু নায়িকার মন মানে না। নায়কের খোঁজে সে নায়কের বাড়িতে যায়। কিন্তু এ কি? কিছুক্ষণ আগেও যে পুরুষটি ছিলো তার এতো আপন, যার সাথে এতোদিন সে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিলো সেই পরম বিশ্বাসের একমাত্র পুরুষটিই যে এখন তাকে চিনতেই পারছে না! মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠে নায়িকার। শূন্যতা ভর করে যেনো মনে, শরীরটা অসাড় হয়ে আসে। অনুনয়-বিনয় করে বোঝানোর চেষ্টা করে সে নায়কের ভাই জাহাঙ্গীর আর আলমগীরকে। কিন্তু ব্যর্থ হয়। যে ভাই এর সাথে সে সম্পর্কের দাবি করছে সে-ই যখন চিনতে পারছে না তখন তারা আর কি করবে? ব্যর্থ হয়ে বাড়ীর মহিলাদের বোঝানোর চেষ্টা করে এই ভেবে যে, তারাও তো নারী। আরেকটা নারীর দুঃখ যদি এতটুকু বুঝতে পারে! কিন্তু বাংলাদেশে এখনো তো এমন পরিবেশ আসেনি যে বাড়ীর মহিলারা কর্তার মতের বাইরে গিয়ে নিজের মত প্রকাশের সুযোগ পাবে। এখানেও ব্যর্থ হয় সে।

বাড়ীর অন্যতম পুরুষ সদস্য জাহাঙ্গীর, আলমগীর যখন দেখলো বাড়ীর মান-সন্মান ধূলায় মিশাতে চলেছে তারা, তখন আর চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। হাতে লাঠি তুলে নিলো তারা। পেটাতে শুরু করলো নায়িকাকে। বাড়ীর মহিলারাও অংশ নিলো এই মিশনে। বাড়ীর মান-সন্মান বাঁচানো দিয়ে কথা! সবাই মিলে বেধড়ক লাঠিপেটা করলো নায়িকাকে।

শোরগোল বাড়ী ছাপিয়ে পৌঁছে গেলো এলাকার মেম্বার মনির হোসেনের কানে। এখন তো এলাকার মান-সন্মান নিয়ে প্রশ্ন। এলাকার মেম্বার হয়ে তো তিনি আর চুপচাপ হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারেন না। চলে এলেন মেম্বার তার বাহিনী নিয়ে। সবাই মিলে আবার পেটান নায়িকাকে পতিতা আখ্যা দিয়ে। তারপর নায়কের বাড়ীর লোকদের নিশ্চিন্ত থাকার আশ্বাস উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলে নিয়ে যান নায়িকাকে। নিজের বাড়ীতে নিয়ে একটি ঘরে আটকে রাখেন তাকে। একপর্যায়ে সেখানেও চালানো হয় আরেক দফা পাশবিক নির্যাতন।

নায়িকার মুখে কোন কথা নেই আর। কিছু বুঝে উঠতে পারেনা সে কি করবে! কত বড় ভুল সে জীবনে করেছে সেটা বিবেচনা করার অবস্থা নেই তার। এখন এই অবস্থা থেকে বাঁচার কোন উপায়ও খুঁজে পায়না সে। কাকে বিশ্বাস করবে সে? এই পৃথিবীতে কি একটাও ভালো মানুষ নেই?

দুঃসংবাদ বাতাসের আগে ছড়ায়। এই খবরটাও পাশের গ্রামে নায়িকার বাড়ীতে যেতে সময় লাগেনা। খবর পেয়ে বোন কে মুক্ত করতে পাগলের মতো ছুটে আসে বড়বোন। কিন্তু মেম্বারের ক্যাডাররা ভাবে নতুন একটা শিকার এলো বুঝি। নায়িকার বড় বোনের উপরও ঝাঁপিয়ে পরে। নিরুপায় বড়বোন পালিয়ে আসে আক্রমণ থেকে বাঁচতে, ছোটবোনকে উদ্ধার করা আর হয় না।

রাতে তাকে আর নিজের বাড়ীতে রাখেন না মেম্বার। পাঠিয়ে দেন ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে। সেখানে আটকে রাখতে বলেন নায়িকাকে। রাত একটু বাড়লে যান ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে। পরম মমতায় নায়িকাকে বলেন, বাথরুমে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে নিতে। এবারও সরল বিশ্বাসে কিংকর্তব্যবিমূঢ় নায়িকা বাথরুমে যায় হাতমুখ ধূয়ে পরিষ্কার হয়ে নিতে। কিন্তু কে জানতো এগুলো ছিলো মেম্বারের নতুন ছলনা? বাথরুমে ঢুকে তার উপর আবার ঝাঁপিয়ে পড়ে মানুষের রূপধারী মেম্বার আর চৌকিদাররা। আরেকদফায় পাশবিক নির্যাতন চালায় তারা নায়িকার উপর।

রাতভর পালাক্রমে তার উপর নির্যাতন চালায় চৌকিদাররা আর নানান কটূক্তির পাশাপাশি পতিতা বলেও গাল দেয় তারা নায়িকাকে।

নায়িকার চোখের পানিও শুকিয়ে আসে, চোখের নদী যেনো শুকিয়ে গেছে। কি করবে নায়িকা? ভাবে। কিন্তু কুল খুঁজে পায় না। সারাদিন আর রাত পাশবিক নির্যাতন সহ্য করে ক্লান্ত সে। অসুস্থ নায়িকা সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াতেও পারে না। ধীরে অনেক ধীরে যেনো কাটছে সময়। একসময় পাখির ডাক শোনা যায়। অন্য আর দশটা দিনের মতো সূর্য ওঠে।

নায়িকার পরিবারের সদস্যরা আসে। মেম্বার মনির হোসেন তুলে দেয় নায়িকাকে তার পরিবারের হাতে। মুখে বিজ্ঞের মতো বলে দেয়, যা হবার তা তো হয়েই গেছে, শত চেষ্টা করলেও তো আর সব আগের মতো ঠিক হয়ে যাবে না। এর চেয়ে ভালো, আপনারাও বসেন, আমরাও বসি, আসেন মীমাংসা করে দিবো ব্যাপারটা। ওরে বাড়ী নিয়া যান এখন, ভালো মন্দ কিছু খাওয়ান। বিষয়টা আমার মাথায় থাকলো, বিকালবেলা একবার আসেন।

কিন্তু বিকেল গরিয়ে যায়, বিচার-মীমাংসার তো নাম-ই নেই উল্টো হুমকী-ধামকী আসে মেম্বারের পক্ষ থেকে যাতে থানা পুলিশ না করে তারা।

উপায়ান্তর না দেখে নায়িকার পরিবার যায় জনগণের বন্ধুর কাছে। কিন্তু জনগণের আজীবনের বন্ধু পুলিশ মামলা নেয় না। দুর দুর করে তাড়িয়ে দেয় নায়িকার পরিবারের লোকজন কে। রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে নায়িকার পরিবারের লোকজন নায়িকাকে সদর হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন। অসুস্থ নায়িকা হাসপাতালের বেডে শুয়ে ভাবে, কেন এমন হল তার জীবনে? আর দশটা মেয়ের মতই তো সে একটা স্বভাবিক জীবন চেয়েছিল। স্বপ্ন দেখেছিলো স্বামী-সন্তান নিয়ে ছোট্ট একটা ঘরের যেখানে সুখ ছাড়া দুঃখের কোন স্থান নেই।

ভাবছেন, এ কেমন গল্প যেখানে নায়ক একটা কাপুরুষ? ভাবছেন এ কেমন গল্প যেখানে নায়িকা নির্যাতিতা? ভাবছেন আর দশটা গল্পের মতো এই গল্পের শেষটা সুখের না হয়ে এমন করুণ হলো কেনো?
আগেই তো বলেছি, সিনেমা লিখছি না। এটা যে জীবনের গল্প। বাংলা সিনেমা হলে নাহয় নায়িকা প্রবল পরাক্রমশালী হয়ে গর্জে উঠতো। ঐ মেম্বার আর তার লালিত ক্যাডারদের মুখ ভেঙ্গে দিতো। নায়ক বিদেশ থেকে ফিরে এসে নায়িকাকে জড়িয়ে ধরে বলতো, এত কিছু হয়ে গেলো আমাকে জানালে না কেনো? আমি আর কখনো তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবনা। তারপর তারা সুখে শান্তিতে বাস করা শুরু করতো।

কিন্তু এটা যে সিনেমার গল্প নয় বন্ধুরা। এটা যে জীবনের গল্প। খুব বেশী দূরের কোন দেশে নয়, এই সোনার বাংলাদেশেরই ভোলা জেলার বাপ্তা ইউনিয়নের এক দুর্ভাগা তরুণীর জীবনে গত বুধবার ঘটে গেছে এই ভয়ংকর দুর্ঘটনা। বাংলার নারীরা যে এখনো অবলা। তারা যে সিনেমার নায়িকার মত নয়। তারা যে এখনো ছোট্ট ঘরেরই স্বপ্ন দেখে, স্বামী-সন্তান নিয়ে নির্ঝন্ঝাট একটা জীবন চায়।

প্রিয় ব্লগার এবং পাঠকবৃন্দ, বলতে পারেন কবে আমরা সত্যিই একটা সোনার বাংলা পাবো? যেখানে কোন অন্যায়-অবিচার হবে না, যেখানে বিকৃত রুচির এই মানুষগুলো থাকবে না, যেখানে সবাই সুখে দুঃখে থাকবে মিলে মিশে পাশাপাশি, যেখানে কেউ কাউকে ল্যাংড়া-লুলা বলে গাল দেবেনা, আর সেও পাল্টা এরকম একটা জবাব দিয়ে ঝগড়া বাড়াবে না, যেখানে কেউ সুপরামর্শ দিলে আন্তরিক ভাবে তা গ্রহণ করা হবে এমন একটা দেশের স্বপ্ন দেখেই কি আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েননি? এমন একটি দেশের জন্যই কি তারা প্রাণ দেন নি?
তাহলে কবে পাবো আমরা এমন স্বপ্নের একটি দেশ?

তথ্যসূত্রঃ ১৮ই ফেব্রুয়ারির ‘দৈনিক কালের কন্ঠ’ এর ‘প্রিয় দেশ’ পাতার ‘এ কেমন নোংড়ামি’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদ।