ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

 

কিছু উন্নত শ্রেণীর মস্তিষ্ক থেকে উদ্ভাবিত হচ্ছে নতুন নতুন প্রতারণার কৌশল। আর আমরা আম জনতা সেই ফাঁদে পা দিচ্ছি অনেকটা জেনে বা না জেনেই। প্রতারণার নানা রকম অ্যানালগ কৌশল গুলো নিয়ে পত্র-পত্রিকায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে লেখালেখি হয়েছে এবং হচ্ছে। সম্প্রতি প্রতারণার ডিজিটাল ভার্সন গুলোও চোখে পড়ছে। আরো নিত্যনতুন প্রতারণার ডালি সাজাচ্ছে কেউ কেউ প্রতিনিয়তই।
কিছুদিন আগে বিডি নিউজ ব্লগেই দেশপ্রেমিক সাহেব ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার গুলোর ফেয়ার ইউজেস পলিসি সংক্রান্ত একটা ব্লগ প্রতারণার আরেক নাম FAIR USAGE POLICY লিখেছিলেন। সেখান থেকে আমরা ডিজিটাল প্রতারণার একটা বিষয় জেনেছি। ইটারনেট সার্ভিস প্রোভাইডাররা বেশী দামে ব্যান্ডউইথ কিনে আমাদের কাছে বিক্রি করে বলে কম দামে আমাদের উন্নত সেবা দিতে পারছে না। সেটা বলে দিলেই হয়। কিন্তু ফেয়ার ইউজেস পলিসি নামে একটা ব্যাপার যে তাদের আছে তা গ্রাহকের কাছে সংযোগ বিক্রি করার সময় বলে দিলেই তো সেটা আর প্রতারণা থাকে না। এমন একটা তথ্য গোপন করে সংযোগ বিক্রি করাটাই তো প্রতারণা। তাই না? যাক। সেদিকে আর যাব না।

তারপর আমরা জানলাম ওজনে কম দেয়ার ডিজিটাল ফাঁদ সম্পর্কে মু.আলী সাহেবের ডিজিটাল ওজন মেশিন: নয়া ডিজিটাল ঠগ ব্লগটি থেকে। সিএনজি অটোরিক্সা এবং টেক্সি ক্যাব এর মিটার এর মত ডিজিটাল ওজন মেশিন গুলোতেও যে আগে থেকেই মূল্যহার বাড়িয়ে সেট করে রাখা যায় সেটা আমরা এই ব্লগটা থেকে জানতে পারি। দোকানীরা এভাবে আমাদের প্রতিদিন ঠকাচ্ছে সেটাও বুঝলাম।

এছাড়াও কিছুদিন ধরে কিছু ডিজিটাল এমএলএম কোম্পানীর ডিজিটাল ভার্সন এর ব্যবসার ডিজিটাল মারপ্যাঁচগুলো তো পত্র-পত্রিকা আর ডিজিটাল মিডিয়ার কল্যাণে ইতোমধ্যেই আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। ল্যান্সটেক, ডোল্যান্সার এমন আরো এমএলএম কোম্পানীর অবদানে ‘সর্বশান্ত’ পদমর্যাদার যুবকদের কথা আমরা জেনেছি। তাই সেদিকেও যাচ্ছি না।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। সম্প্রতি মোবাইল কোম্পানী গুলো পিছিয়ে নেই নানারকম ভেল্যু অ্যাডেড সার্ভিস নামক ধোকাগুলো আমদানি থেকে। নিত্য নতুন ভেল্যু অ্যাডেড সার্ভিসের নামে জনগণকে ধোকা দিয়ে পয়সা আদায় করার নানা ফন্দি আঁটতে ব্যস্ত তারা। এটা অনস্বীকার্য যে কিছু কিছু উপকারী ভেল্যু অ্যডেড সার্ভিস ও তাদের আছে। যেমন- মিসড কল অ্যালার্ট সার্ভিস, টেলিমেডিসিন ইত্যাদি।
কিন্তু পাশাপাশি বন্ধ নেই তাদের ভয়েস আড্ডা, ম্যাজিক ভয়েসের মত ফালতু সার্ভিস গুলো। আরো নতুন নতুন সার্ভিস তো আসছেই। হঠাৎ করেই তাদের মাথায় নতুন নতুন ফন্দি আসে আর নানা রকম আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সেগুলো আমাদের গিলিয়ে পকেট থেকে পয়সাটা বের করে নেয়।

আমাদের দেশে ইভটিজিং বড় একটা সমস্যা। তাছাড়া অনেক সময় অনেকের মোবাইলেই অনেক অপ্রয়োজনীয় এবং বিরক্তিকর কল আসে। তো তারা এই জিনিসটা মাথায় রেখে চালু করলো কল ব্লক সার্ভিস এর মত একটা জিনিস। সাধারণ মানুষকে বোঝালো, বিরক্তিকর কল এখন কোন ব্যাপার না। আপনি এই সার্ভিসটা নেন, বিনিময়ে প্রতি মাসে তো আমাদেরকে ৩০টাকা+ভ্যাট দিবেনই এবং রেজিষ্ট্রেশনের জন্য, প্রতিটা নতুন নাম্বার অন্তর্ভুক্তির জন্য আমাদেরকে আরো কিছু টাকা এসএমএস চার্জ+ভ্যাট হিসেবে দিলেই চলবে। আর নতুন কোন নাম্বার বিরক্ত না করলে প্রতি মাসে ভ্যাট ছাড়া ঐ ৩০টাকা+ভ্যাট ই দিয়ে যাবেন। আমরা বলি আচ্ছা, যথা আজ্ঞা। খুবই ভালো হলো এবার। আর ঝামেলা নাই। কেউ আর বিরক্ত করতে পারবে না। অফিস থেকেও কল করে পাবে না, ভালো ভাবে শান্তিমত বউ এর সাথে একটু গল্প করতে পারবো। কিন্তু অন্যদিকে তারা সিম এর দাম দিলো কমিয়ে। যাদের মনমানসিকতাই বিরক্তিকর তারা কি আর থেমে থাকবে? ১০০টাকার মধ্যে নতুন সিম কিনে নেয় সহজেই, তারপর আবার শুরু করে বিরক্ত করা। আমরাও মোবাইল কোম্পানীগুলোকে বাড়তি টাকা গিলিয়ে নতুন নতুন নাম্বার কল ব্লক সার্ভিসে অন্তর্ভুক্ত করে যাই।

কিন্তু সবাই তো আর গৌরীসেন না, তাই কল ব্লক সার্ভিসেরও কাটতি বাড়ছিলো না। ব্যস, নতুন ফন্দি আসলো মাথায়। শুরু হল নতুন সার্ভিস ভয়েস আড্ডা। অপরিচিত, অজানা বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মেতে উঠো, দিন রাত কথা বলো স্বাভাবিকের চেয়েও বেশী কল রেটে আর আমাদেরকে তোমাদের যত্নে জমানো, পকেট মানি থেকে বাঁচানো টাকাগুলো দিয়ে যাও। একসময় ভয়েস আড্ডায় আড্ডা দিতে দিতে অজানা অচেনা বন্ধু তোমার নাম্বার নেবে, কল করে কথা বলবে। একটা সময় ওসবও আর ভালো লাগবে না, বিরক্ত লাগবে। তখন আমাদের কল ব্লক সার্ভিস তো আছেই তোমাদের জন্য, বেশী না শুধুমাত্র ৩০টাকা+ভ্যাট দিলেই চলবে প্রতি মাসে। তাতেও যদি কল ব্লক সার্ভিসের কাটতি বাড়ে। কিছুটা হয়তো সফল হল তাদের এই প্ল্যানটা।

আরো সফল করার জন্য এবার নতুন করে শুরু হল ম্যাজিক ভয়েস। অপরিচিত নাম্বারে এটা অ্যাপ্লাই করে কথা বল, ছেলে হয়ে মেয়ে সাজো আর মেয়ে হয়ে ছেলে সাজো একই কথা। শুরু কর প্রতারণা। হাতিয়ে নাও টাকা সহ আরো কিছু যদি পারো। আমাদেরকে কোন টাকা দিতে হবে না। শুধু সার্ভিস চার্জটুকুই যথেষ্ট, আমরা খুব বেশী কিছু চাই না। এতেও কল ব্লক সার্ভিসের কাটতি বাড়বে পরোক্ষভাবে নিঃসন্দেহে।

মোবাইল কোম্পানী গুলোর ফ্রী দেয়ার আদত শুরু থেকেই। সম্প্রতি তারা ২০০% পর্যন্ত ফ্রী দিচ্ছেন। কিন্তু সেই ফাঁদে পা দিয়েছেন তো মরেছেন। কারণ, ফ্রী টা সম্পুর্ণ ব্যবহারের নিশ্চয়তা তারাও দিতে পারবে না। ঐ যে নিচে স্টার মার্কে শর্ত প্রযোজ্য– এই দুই শব্দের বাক্যটি বাগড়া দিবে। ঐ দুই শব্দের মধ্যে টাইম লিমিটেশন ছাড়াও একই অপারেটর এর মধ্যে কল করা, এফএনএফ নাম্বারে বোনাস প্রযোজ্য নয় সহ আরো অনেক গুলো সুবচন লুকানো থাকে। সেটাও আপনি আগে বুঝতে পারবেন না। আপনাকে নিজের পয়সা খরচ করে ওদের কাছে কল করে জানতে হবে। কারণ, বিস্তারিত পত্রিকায়– এই দুই শব্দের বাক্যটির মধ্যেও যে আরো কিছু মারপ্যাঁচ আছে। সেটা আপনি পত্রিকার বিজ্ঞাপনের সুমধুর ঘোরানো-প্যাঁচানো কথাগুলো থেকে নাও বুঝতে পারেন।
ইংরেজরা শাসন করার সময় আমাদেরকে চা গিলিয়ে সেটা একটা চরম অভ্যাসে পরিণত করে দিয়ে গিয়েছিল। পাকিস্তানিরা উর্দু গেলানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পারেনি, ব্যর্থ হয়েছে। এখন বাবা তোমাদের মোবাইল কোম্পানী গুলোরই সময়। গেলাও, তোমরা আর পিছিয়ে থাকবা কেন? আমরা গেলার জাতি। সবকিছুই গিলতে প্রস্তুত। হিন্দি ভাষা বুঝে, না বুঝে বা অর্ধ বুঝেও তো ওদের সিরিয়াল গুলো গিলে বউ-শ্বাশুড়ির ঝগড়া করা শিখছি। তোমাদেরগুলোও গিলতে পারবো। গেলার পর আমাদের দেশীয় প্রাণ কোম্পানীর হজম ক্যান্ডির টিভি বিজ্ঞাপনের লোহা বাবার মত নাহয় একটা প্রাণ হজম ক্যান্ডি খেয়ে সব হজম করে ফেলব। তারপর আবার প্রস্তুত হব আরো নতুন কিছু গেলার জন্য। তোমরাও তোমাদের মস্তিষ্কের অব্যবহৃত অংশটুকু খাটিয়ে নতুন কোন ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস আবিষ্কার কর আমাদের গেলানোর জন্য। জয়তু ডিজিটাল যুগ, জয়তু ডিজিটাল যুগের নয়া ডিজিটাল প্রতারণা।