ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

এই আমি হয়ত জন্মাতে পারতাম ধনী মি: বিল গেট্‌সের স্ত্রীর গর্ভে অথবা ভিয়েতনামের কোন ভিকারির ঘরে। কিন্তু আমি জন্মেছি বাংলাদেশের একটি মধ্যবিত্তের ঘরে। যদি বিত্তকে কোন এক বৃত্তের বাইরের অংশ ধরা হয় তাহলে আমরা আছি সেই বৃত্তের কেন্দ্রে। কিন্তু আমরা কখনো এই বৃত্তের ব্যাসার্ধের বাইরে যেতে পারি না। বারবার হোঁচট খেয়ে নিষ্ফল স্বপ্ন নিয়ে চেয়ে থাকি বৃত্তের ব্যাসার্ধের বাইরে। মধ্যবিত্তের সামাজিক ব্যবস্থাটা এমন যে -পেটে ভাত না পরলেও ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য অন্যের কাছে হাতও পাততে পারে না। আবার পকেটে একটু পয়সা থাকলেই নিজের সখ মেটাতে কার্পণ্য করি না। আল্লাহর কাছে অনেক শোকর গুজার এই জন্য যে, তিনি আমাকে বিকলাঙ্গ করে সৃষ্টি করেননি। একদম গরিব ঘরেও জন্ম গ্রহণ করান নি। বরং একটি মুসলিম ও সামাজিক পরিবারে জন্ম গ্রহণ করিয়েছেন। আর কি চাই? তবে আমরা তো মানুষ, তাই চাওয়ার কোন শেষ নাই। ছোট বেলা থেকেই বাবা-মা চোখে আঙ্গুল দিয়ে জীবনের পরিধি দেখিয়ে দিয়েছেন। যখন পৃথিবীর তুলনায় নিজেকে মাপতে পারি তখন বুঝতে পারি যে-প্রয়োজন মেটাতে যা দরকার তা হয়ত পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এর বাইরে কিছু চাহিদা থাকলে অভাবের আর অভাব থাকবে না। আমাদের ও সাইকেল আছে, আছে হাত ঘড়ি। কিন্তু সাইকেল শব্দটির আগে মোটর শব্দটি লাগাতে চাইলে তা শুধু স্বপ্ন হয়ে থাকতে চায়। সেই সাথে ব্রান্ড পরিবর্তন হয় না ঘড়ির। শুধু ফিতা ও ব্যাটারী পালটে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। আমরা অনেকেই একটি নীতি কথা জানি-”মনে নেয়া আর মেনে নেয়া এক কথা নয়”। আমরা ছোট থেকে শুধু মেনে নিতেই শিখি, মনে নেওয়ার কথাটা চিন্তাও করতে পারি না। আমরা ভাব নিয়ে যে সেল ফোনটা ব্যবহার করি তা শুধু কল রিসিভ করার উপযোগি থাকে, সঙ্গে থাকে সর্বনিম্ন ব্যালেন্স যা শুধু প্রয়োজন মেটানোর জন্য, কোন সখ পূরণের জন্য নয়। আমাদের পায়ের জুতো গুলো কোন ব্রান্ড এর নয় বরং ছিড়ে গেলে বছরের পর বছর সেলাই করে কোনরকম চালাতে হয়। কখনো কোন খুশির সংবাদ পেলে সবাই মিলে আনন্দ করার ইচ্ছে হয় যা আমাদেও জন্য কষ্ট সাধ্য হয়ে পরে। যদিও আমরা প্রিয় মানুষকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি কিন্তু সেখানে আমাদের বাস্তবতা প্রাচীর হয়ে দাড়িয়ে থাকে সেখানে তখন প্রাচীর টপকানোই মুখ্য হয়ে দাড়ায় তখন ভালবাসা বিদ্যুত গতিতে আমাদের থেকে দূরে সরে যায়।

হয়তো আর একটু বড় হলেই আসবে অনেক দায়িত্ব-কর্তব্য। তখন এই আমি সংসারে আসন্ন দায়িত্ব নিয়ে চিন্তায় কাতর। এই আমরা ছোট বাচ্চাদেরও রীতিনীতি শেখাই, মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলি। আমরা এখন পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করার আগে মুরুব্বিদের পায়ে হাত দিয়ে দোয়া কামনা করি। আশির্বাদ চাই ভবিষ্যতের জন্য। বোনদের শালীনতা শেখাই। ১ম পাওয়া বেতন টা মা-এর হাতে তুলে দেই। একদিন ভাল খেলে অন্যদিন খাই না। এক ঈদেও কাপর দিয়ে পুরো এক বছর কাটিয়ে দেবার চেষ্টা করি। আমরা ও টুকটাক গান গাওয়ার চেষ্টা করি, কবিতা লিখি, প্রয়োজনে টিউশনি করি। সুখ ও দুঃখের পার্থক্যটা আমরা খুব ভাল অনুধাবন করতে পারি।

তারপর আরো বয়স হলে অবসর ভাতা দিয়ে কোন রকম জীবন অতিবাহিত করার চেষ্টা করি। আর আফসোস করি হায়রে জীবন। আসলে মধ্যবিত্তরা আজীবন মধ্যবিত্তই থেকে যায়। আর নতুন প্রজন্মকে শেখায় ”লেখা পড়া করে যে, গাড়ি-ঘোড়ায় চেও সে”। দু-এক জনের পক্ষে হয়তো তা সম্ভব হয় বিত্তের পরিধি ছুঁতে আর বাকিরা ঐ বৃত্তের পরিধির উপর হাটতে গিয়ে হোচট খেয়ে পড়ে গিয়ে সমস্যা আরো জটিল করে তোলে।

আবার শেষ বয়সে মারা যাওয়ার দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে কেঁদে কেঁদে আল্লাহর কাছে কৃত অপকর্ম ও গুনাহ্‌ এর জন্য পানা চাই। কোথাও শুনেছিলাম ”বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করাটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় পাপ”। সত্যিই তাই, খিদের জ্বালা হচ্ছে সবচেয়ে বড় জ্বালা। যে দেশে শুধু তিনবেলা কোন রকম খাওয়ার জন্য অসৎ উপায় অবলম্বন করতে হয়, সে দেশকে এর থেকে ভাল উপাধি দেয়া যায় না। এ দেশে কাজ বাড়ছে না, পারিশ্রমিক বাড়ছে না। অথচ পন্যের দাম বাড়ছে আলোর গতিতে। তাহলে কি আগামী ১০ বছরের মধ্যে মধ্যবিত্ত নামে কোন পরিবার থাকবে বাংলাদেশে?