ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

বেঁচে থাকার প্রয়োজনে মানুষ বিনষ্ট করে পরিবেশ ও প্রকৃতিকে। এভাবে সমস্যা বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে তখন সমস্যা গ্রাস করে নেয় সমস্ত রাষ্ট্রকে। এমন একটি উদাহরণ আমাদের এই প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশ। ১৯৯২ সালে রিও ঘোষণায় বন সৃজন ও রক্ষার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও সারা পৃথিবীতে উজাড় হয়েছে ২০টি বাংলাদেশের সমান আয়তনের বনভূমি। পৃথিবীতে আয়তনে অতি ছোট এই বাংলাদেশ। কিন্তু জনসংখ্যার বিচারে বিশাল। প্রয়োজনের তুলনায় ন্যূনতম আকারের এই বনভূমিও বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দৃর্বৃত্তপনায় আজ ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন। জীববৈচিত্র্য রক্ষার নামে বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতির গাছ লাগিয়ে দায়িত্ব পালনের নামে চলছে বৈদেশিক মুদ্রা তছনছ করার হরিলুট।
দুর্নীতি যে মানুষকে জানোয়ার বা বিবেক প্রতিবন্ধীতে রুপান্তরিত করে তার সবচে বড় উদাহরণ বন গনি, যে জনগণের ফসল অবৈধভাবে বাজারে বিক্রি করে এত ধনী যে শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে গিয়ে অবশেষে গারদের ভেতরে। কতিপয় অযোগ্য লোক দিয়ে দিনের পর দিন বন ব্যবস্থাপনার নামে যা চলছে তা চোর-লুটেরাদের নাটক ছাড়া আর কিছুই নয়।

ঔপনিবেশিক সময়েও বন কর্মকর্তারা বুট পায়ে দিয়ে অরণ্যের গভীরে ঘোরাঘুরি করে বাস্তব জ্ঞান লাভ করত সঠিক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনে। আর এখন টাই-স্যুট পরে কর্মকর্তারা পাজেরোতে ঘুরে ঘুরে চুরির টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করা ছাড়া তেমন কোনো কাজ করে না। বৃক্ষশূন্য বনভূমির মাটি বিক্রি ও ভূমি বিকৃত করে টাকা কামাতে ব্যস্ত তারা।

আন্তর্জাতিক বন বছর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে চলতি ২০১১ সালকে। জাতিসংঘ পৃথিবীর ন্যূনতম প্রয়োজনে যে বনজ সম্পদ জরুরি তা সৃজন ও রক্ষার্থে প্রতিটি গ্রহবাসীর অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। একটি দপ্তরের ওপর বনের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে বাংলাদেশ যে ভুল করেছে, সেটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করার সময়ে উপনীত হয়েছে সরকার। বিগত ২০ বছর যাবৎ কতিপয় অযোগ্য, দুর্নীতিগ্রস্ত, অপেশাদার বনবিদের নিয়ন্ত্রণে বন প্রশাসন, আর এসব অথর্বদের নিয়ন্ত্রণাধীন পেশাদার বনবিদরা পদমর্যাদাহীনতায় আক্রান্ত। পেশাদার বনবিদদের আধুনিক চিন্তার সাথে ওই অপেশাদার বনখেকোরা কোনোভাবে তাল মিলাতে না পেরে প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করে জাতীয় পরিবেশ স্বার্থকে প্রতিনিয়ত বিঘ্নিত করে যাচ্ছে। আর এসব দেখার যেন কেউ নেই।

পরিবেশ ও প্রকৃতির বিষয়টি বহুবিধ বিজ্ঞানসংশ্লিষ্ট। টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে প্রশাসনের অজ্ঞতা, আর এই অজ্ঞতাকে স্বীকার না করে স্বেচ্ছাচারী আচরণ দ্বারা জনগণের মতামত উপো করা আর সবজান্তা শমসেরের ভাব ধারণ করে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তই আজ দেশের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এখন সময় এসেছে স্থানীয় সরকারের ওপর স্থানীয় বন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ন্যস্ত করা। তা না হলে বিদেশি বৈরী প্রজাতি দিয়ে বনভূমি ভরে টেকসই বন ধবংসের মহোৎসব থামানো যাবে না। ইউনিয়ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদেরকে স্থানীয় বন ব্যবস্থাপনায় সম্পৃক্ত করে ও দায়িত্ব দিয়ে বন বিভাগের কাজে স্থানীয় মানুষের চিন্তাকে সংযুক্ত করার মাধ্যমে বন রার উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। বন বিভাগের কলেবর কমিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব বাড়ানো ও একটি স্বাধীন বন কমিশন প্রতিষ্ঠা করে বন বিভাগের কাজকে স্বচ্ছতার ভেতরে নিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি।

সবশেষে, এটা বলা জরুরি যে বন ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনে ১৯৭৬ সাল থেকে গড়ে তোলা কারিগরি ও পেশাদার বনবিদদেরকে বন ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্বে এনে অন্যান্য বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের জনবলকে সম্পৃক্ত করার ভেতরেই সাফল্য নির্ভর করছে। নতুবা সেদিন বেশি দূরে নেই, যখন আমরা চূড়ান্ত শিক্ষা লাভ করব আরো ওসমান গনি আবিষ্কারের মাধ্যমে। বনভূমির ওপরে ভূমিদস্যুদের অবৈধ পতাকা পতপত করে উড়ার আগেই আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন।