ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

দিনের আলোয় হারিয়ে যাচ্ছে মানুষ। রাজপথ থেকে, ঘরবাড়ি থেকে, পাড়া-মহল্লা থেকে এমনকি নিজের বেডরুম থেকেও। কোনটার পাওয়া যায় প্রত্যক্ষদর্শী কোনটার বা শেষ ভরসা কারো সিসি ক্যামেরা, আর যাদের ভাগ্য সহায় হয় না তাদের থাকেনা এর কোনটাই।

তেমনি একজন কানিজ ফাতেমা। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের এই গৃহবধু পেশায় ছাত্রী। গত ০৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ইং আনুমানিক সকাল সাড়ে ৭টায় বলিয়ারপুর বাসস্ট্যান্ড (আমিন বাজারের পরের বাসস্ট্যান্ড) হতে নিখোঁজ হয়েছে। স্বামীর সাথে বাবার বাড়ি থেকে রওনা হয়ে ঢাকার বাসায় আসার পথে ঘটে এ দুঃসংবাদ। ফাতেমার স্বামী একসাথে কতদূর আসার পরে লক্ষ্য করেন তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাগজ ফেলে এসেছেন। বরের অফিস টাইম হয়ে যাওয়ায় স্ত্রীকে বললেন “তুমি কাগজটা নিয়ে এস আমি অফিসে চলে গেলাম।”

স্ত্রীকে নামিয়ে দেয়ার পর থেকেই নিখোঁজ। সাভার থানাতে জিডি করেছে পরিবার। সাভার থানার আইও সোহেল আহমেদ দেখতেছেন জিডিটি। পরিবারের পক্ষ থেকে র‌্যাবের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হলে র‌্যাব যে ইনফরমেশন দেন তা হলো, কানিজ ফাতেমার ব্যবহার করা মোবাইলটি বাংলামোটর পর্যন্ত তারা সচল দেখেছেন ঐ দিন।

26169506_733288700214958_6305303309024501765_n

.

একটা পুরুষ মানুষ হারিয়ে গেলেই একটা পরিবারের সময় অস্থিরতায় কাটে, সেখানে যখন ভিকটিম হয় কারো মেয়ে, কারো বোন, কারো স্ত্রী তখন সে বিষয়টা কতটা যন্ত্রণাদায়ক তা ওই পরিবার ছাড়া অন্য কারো পক্ষে ঠাহর করা সম্ভব না।

গুম কি? গুম নিয়ে রয়েছে মানুষের মধ্যে নানা কথা একটু জেনে নেই। গুমের ইংরেজি প্রতি শব্দ হলো Disappeared। কোনো ব্যক্তি Disappeared হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো উক্ত ব্যক্তিকে জীবিত বা মৃত না পাওয়া। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তিকে শারীরিকভাবে না পাওয়ার অর্থই হচ্ছে গুম।

সাধারণত তিন ধরনের হতে পারে। প্রথমত, কোনো ব্যক্তি নিজে স্বেচ্ছায় গুম বা উধাও হয়ে যান। দ্বিতীয়ত, কোনো ব্যক্তি দুর্ঘটনাবশত গুম বা উধাও হন এবং তৃতীয়ত, কোনো ব্যক্তিকে জোরপূর্বক গুম বা উধাও করা হয়। বিশ্বে গুমের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে, বহু প্রাচীন যুগ হতে এই গুমের ঘটনা ঘটে আসছে। বিশেষত প্রাচীন যুগে যুদ্ধে পরাজিত হবার পর পরাজিত দলের নেতা গুম হয়ে যেতেন। এই ধরনের গুমে পরাজিত দলের নেতা হয় নিজে উধাও হয়ে যেতেন কিংবা তাকে মেরে ফেলা হতো।

আর বাংলাদেশে সাম্প্রতিক যে ধরনের গুম বা হারিয়ে যাওয়া গুলো ঘটছে তাও ওই তিন প্রকারের মতই। কেউ হারিয়ে গিয়ে জঙ্গী হচ্ছে, কাউকে বা আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তারপর আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। কাউকেবা পাওয়া গেছে দুই তিন পাঁচ মাস পরে ভিন্ন বেসভুষায়। কারো বা লাশ ভেসে উঠেছে পদ্মায়-গঙ্গায়-ব্রহ্মপুত্রে ।

বিবিসি বাংলার রিপোর্ট অনুসারে, বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসেবে গত তিন বছরে নিরাপত্তা বাহিনীর পরিচয়ে ধরে নেয়ার পর ২৬৭ জন নিখোঁজ হয়েছেন। ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ৫৫ জন ছিল এবং ২০১৬ সালে সেটি বেড়ে ৯৭ জনে দাঁড়ায়। আর ২০১৭ সালের তিন মাসে গুমের ঘটনা ঘটে ২৫টি, যার মধ্যে মার্চেই ১৪টি।

আবার নারীদের হারিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রেম সংক্রান্ত ঘটনাও বেরিয়ে আসছে। জোর করে তুলে নিয়ে জোর করে বিয়ে। হট টপিক হিসেবে আলোচিত বর্তমানে এক পুলিশের কর্মকর্তার কাণ্ড। কিন্তু যাদের ক্ষেত্রে এগুলোও ঘটছে না তাদের ভাগ্যে কি আছে? আশি-নব্বইয়ের দশকে এশিয়া এবং আফ্রিকা মহাদেশ থেকে প্রায় দশ কোটি মেয়ে শিশুর হারিয়ে যাওয়া নিয়ে নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন একটি সিরিজ রিপোর্টের পর নড়েচড়ে বসে বিশ্ব। তাতে দেখা যায় শুধু চিন থেকেই এই হারিয়ে যাওয়াদের সংখ্যা ৪.৪ কোটি আর ভারতে এর সংখ্যা ৩.৭! দেশে দেশে গবেষণার রিপোর্ট তুলে আনলে এ সংখ্যা বাড়বে ছাড়া কমবে না।

যার জন্যে আজকের লেখা লিখতে বসা কানিজ ফাতেমা তার পরিবার তার খোঁজ চেয়ে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। পিতা: আব্দুল করিম। মোবাইল : 01736107289, 01680725329.

আমরাও দোয়া করি তিনি সুস্থ-সবল ভাবে ফিরে আসুক পরিবারে। বাংলাদেশের আইন-শৃংখলা অনেক উন্নত আগের থেকে, তারা একটু চেষ্টা করলে তাকে খুঁজে বের করা সম্ভব। যেভাবে ফিরে এসেছে উৎপল, মোবাশ্বের, ফরহাদ মজহাররা। গণমাধ্যমেরও দায় আছে, তারাও এগিয়ে আসুক।