ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

20150421_183512-2000x3000
দশ-পনের দিন আগের কথা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম প্রায় ঘন্টা দুয়েক। আমাকে নিয়ে গিয়েছিল এক অনাগত সন্তানের পিতা, যে তার সন্তানের আগমনের অপেক্ষায় কেবলই ছটপট করছিলো। একজন পুরুষ পিতা হতে যাচ্ছে, একজন রমণী মা হতে যাচ্ছে; এ এক অন্যরকম বেপার। বারান্দায় অনেকগুলো মানুষ, কেউ পিতা হওয়ার অপেক্ষায়, কেউ দাদা, আবার কেউ বা নানা।

ঐ দু‘ঘণ্টায় আমি প্রায় পঞ্চাশ জন নিউকামারকে আমাদের পৃথিবীতে স্বাগত জানিয়েছি। কিছুক্ষণ পরপর একেকটা নবজাতকের চিৎকার(আগমন বার্তা) শীতল করে দিচ্ছে ওয়ার্ড আর বারান্দায় অপেক্ষারত মানুষগুলোকে। খানিক বাদে বাদে একেকজন ‘নতুন মানুষ’ কে নিয়ে আসা হচ্ছে দরজার সামনে, কারণ পিতা সন্তানকে দেখবে, আর সন্তান পিতাকে।
কিছুক্ষণ পরপর একেকটা আযানের ধ্বনি কানে আসছে। এ আযান নামাজের আহবান নয়, এ আযানে নামাজ হয়না, এ আযানে নতুন মানুষটা কে স্বাগত জানানো হয়।

যতক্ষণ বারান্দায় দাড়িয়ে ছিলাম, কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে আমি প্রত্যেকটা নবজাতকের মুখ দেখেছি। আমার খুব ভাল্লাগছিল…..।

যাইহোক, সৌভাগ্যক্রমে সেদিন আমার সাথের মানুষটি আমাকে নিয়ে গিয়েছিলো আছর নামাজ পড়তে। নামাজ শেষে যথানিয়মে বারান্দায় এসে দাড়ালাম। হঠাৎ একজন এসে বললো, ‘ভাইয়া আপনার কি ওজু আছে?’ বললাম, হ্যা। আবার বললো, ‘আমার ছেলের কানে একটা আযান দিয়ে দিবেন?’ কথাটা শুনে এতটাই আশ্চর্য হলাম, মুখ দিয়ে কিছুই বের হচ্ছে না।

শুধু এতটুকুই বললাম, ‘আমার তো অভ্যাস নেই’।

লোকটা আবার বলতে লাগলো, ‘ভাইয়া, আমি তো পারিনা, দয়া করে আযানটা দিয়ে দেন’। সদ্যজাত সন্তান কোলে কোন পিতার এমন অনুরোধ কেউ ফেলতে পারেনা, আমিও পারলাম না।

আমার দু’পা কাঁপছে, ঘামতেও শুরু করলাম। জীবনে আর কবে এতোটা নার্ভাস হয়েছিলাম, মনে নেই। আযান দেয়া শেষ।

ঔ রিক্সাচালক পিতা অনেক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো। কিছুটা হাসি আর উৎসুকমাখা দৃষ্টি নিয়ে এবার বলে ওঠলেন, ‘আমার ছেলের একটা নাম রেখে দেন’। আমি আরো কিংকর্তব্যবিমূঢ়, পিতা বলে কি! ঐ মুহূর্তে এতটাই অস্থির ছিলাম, কোন নামই মনে আসছিল না। হঠাৎ বলে ফেললাম, আপনার ছেলের নাম ‘আযান’।

পিতা কিছুটা অবাক হলো, কিছুটা হাসলো; তারপর বললো, ‘হ্যা, আজ থেইক্কা আমার পোলার নাম আযান’।

আযান, আমি জানি, আমি আর কোনদিন তোমায় দেখবো না। হয়তো দেখা হবে, কিন্তু তোমায় চিনবো না। তুমিও হয়তো কোনদিন আব্বুর কাছে তোমার নামের গল্পটা শুনে মনে মনে আমার চেহারাটা কল্পনা করবে, হৃদয়ের এক কোনে আমাকে দেখার ইচ্ছাটাও জেগে ওঠবে, আবার সেই ইচ্ছা নিমিষেই নিভে যাবে। কিন্ত তোমার কথা আমি জীবনেও ভুলবো না। কেননা তুমিই প্রথম, আমি যার নাম রেখেছি, যার কানে আযান দিয়েছি। ভালো থেকো আযান। অনেক অনেক শুভকামনা রইল।